উপ সম্পাদকীয়

ভারতের লোকসভা নির্বাচন এবং একটি কবিতা

ব্রজেন্দ্র কুমার দাস প্রকাশিত হয়েছে: ২৪-০৬-২০১৯ ইং ০১:০০:২৪ | সংবাদটি ১৩৮ বার পঠিত

ভারত এক বিশাল দেশ। এর বিশালতা সর্বক্ষেত্রে। এর রাজনীতি, সমাজনীতি, ধর্ম, সংস্কৃতি, নির্বাচন সবকিছুতেই এই বিশালতা বিরাজমান। এ যেন এক মহাসিন্ধু। জ্ঞানের বিন্দু নিয়ে সিন্ধু সম্পর্কে কথা বলা সমীচিন নয় বলেই নিকট অতীতের ভারতের লোকসভা নির্বাচন সম্পর্কে কিছু বলা বা লিখার সাহস পাইনি। পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত বিজ্ঞজনের আলাপ-আলোচনা-বিচার-বিশ্লেষণ-সমালোচনা পড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছি। পত্রিকার পাতা উল্টাতে উল্টাতে হঠাৎ চোখ পড়লো ‘মানি না’ নামে একটি কবিতার দিকে। লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূলের ভরাডুবির পর এই কবিতাটি লিখেছেন পশ্চিমবঙ্গের মূখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কবিতাটি এরকম-
সাম্প্রদায়িকতায় আমি বিশ্বাস করি না, সব ধর্মেই সব উগ্রতা-ন¤্রতা আছে/আমি ন¤্র জনগণের এক সহিষ্ণু সেবক, বাংলায় যার উত্থান।/বিশ্বাস করি না সাময়িক উগ্র ধর্ম বিক্রি করতে/বিশ্বাস করি মানবিকতার আলোকে আলোকিত ধর্ম।/ধর্ম বিক্রি যাদের তাস ধর্ম পাহাড়ে টাকার বাস??/আমি থাকি আমার নিজ কর্মে/কর্ম নেই তোমাদের!!!!/তাই বিক্রি হয় উগ্রতার ধর্মে/ যারা বিশ্বাস করেন সহনশীলতায়/আসুন, জাগরিত করুন এক সাথে আসুন সবাই।/সারা বিশ্ব একটাই দেশ/তবে এটি অঙ্ক?/যার উগ্রতাই অভিলাস।
কবিতাটির কাব্যিক মূল্য কতোটুকু সেটি বিচার করবেন কবিতা বিশেষজ্ঞগণ তবে আপাতত মনে হয় এতে ভারতের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একে অন্যকে উদ্দেশ্য করে কিছু একটা লিখা। একটা বক্তব্য। যে কোন বিষয় নিয়ে বলা এক আর বাস্তবতা এক। আন্তরিকভাবে তথা মনে প্রাণে অসাম্প্রদায়িক হওয়া আর কৌশল করে অসাম্প্রদায়িকতার অভিনয় করে নির্বাচনে ভোটারদের মন জয় এক বিষয় নয়। কোন কোন সময় অর্থাৎ কিছু সময়ের জন্য হয়তো এতে ভাল ফলাফল হতে পারে কিন্তু এক সময়ে এর মুখোশ খুলে যায়। কৌশল-বুদ্ধি পরাজয় বরণ করে। স্বামী বিবেকানন্দ যথার্থই বলেছেন-‘বুদ্ধি দিয়ে মহৎ কাজ করা যায় না।’ অর্থাৎ সেটি করতে হয় অন্তর দিয়ে।
মমতা ব্যানার্জির ‘কৌশল’ সম্পর্কে আমার একটু সামান্য অভিজ্ঞতার কথা না বলে পারছি না। জানি না সেটা সঠিক না বেঠিক। তারপরও বলছি। মাস সাতেক আগে চিকিৎসার জন্য আমরা স্বামী স্ত্রী দু’জন ভেলুরের ‘সিএমসি’তে। সেখানে বাংলাদেশের হাজার হাজার রোগী তো আছেই, পশ্চিমবঙ্গের রোগীর সংখ্যাও প্রায় আমাদের মতোই। সমানে সমান। বারবার প্রশ্ন জাগে-আমরা যে কারণে সেখানে যাই সে কারণটা কি মমতাদির পশ্চিবঙ্গেও বিদ্যমান? বিদ্যমান না হলে তো তারা এতো আসতেন না। পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু-মুসলমান সবাই আসেন। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক-সামাজিক অবস্থা নিয়ে অনেকের সাথে কথা হয়। মুসলিম ভাইদের সাথে কথা হলে তারা জানান, তাদের মমতাদি ক্ষমতায় থাকলে তাদের (মুসলিম) জন্য খুবই ভালো, হিন্দু ভাইদের সাথে দেখা হলে তারা জানান, মমতা ব্যানার্জি তাদের (হিন্দুদের) জন্য ভালো নয়। অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সম্প্রদায় নীরবে মমতাবিরোধী হয়ে উঠে। আর সচেতন অনেক সংখ্যালঘু মুসলমানও ধর্ম নিয়ে মমতা ব্যানার্জির এক ধরনের অভিনয় বুঝতে ভুল করে ননি। ধর্ম নিয়ে মমতার নানা সময়ের নানা ধরনের আচরণকে ভালো চোখে দেখেননি। তার ওপর বিশ্বাস স্থাপন করতে পারেননি। আর সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুরা যে গোপনে গোপনে মমতাবিরোধী হয়ে উঠেছেন সেটা তিনি আঁচ করতে পারেননি। আর এর সুযোগটা হিন্দুত্ববাদী বিজেপি নেতৃবৃন্দ ভালো ভাবেই গ্রহণ করেছেন। যার প্রতিফলন ঘটেছে বিগত নির্বাচনে।
পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জি যদি ভোটকেন্দ্রীক অসাম্প্রদায়িক না হয়ে সত্যিকার অর্থেই অসাম্প্রদায়িক হতেন তাহলে হয়তো পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির এমন উত্থান হতো না। এদিকে, গোমাংস বিতর্কে উগ্রবাদী গোরক্ষক গোষ্ঠীর অমানবিক কর্মকান্ডের প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে পশ্চিমবঙ্গের কিছু কিছু লোক নিজেদেরকে অতি প্রগতিবাদী আর ধর্মনিরপেক্ষ বলে প্রচার করতে গিয়ে রাস্তায় গোমাংস রান্না করে ভক্ষণ করে যা করলেন এতে হিন্দু-মুসলমান সমাজের কেউই খুশী হয়নি। তাদেরকে ধর্ম নিরপেক্ষ বলে মনে প্রাণে গ্রহণ করতে পারেনি বা বিশ্বাস করতে পারেননি। এতে হিতে বিপরীতই হয়েছে। গোহারা হেরেছে বামেরা আর তৃণমূলও। খবরে প্রকাশ কলকাতার যাদবপুরে বিকাশ রঞ্জন মজুমদার নামে একজন বিখ্যাত বাম নেতা নির্বাচনে হেরে গিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে স্বীকার করেছেন অসাম্প্রদায়িকতা প্রমাণ করার জন্য তিনি প্রকাশ্যে গো-মাংস খেতে কসুর করেননি। তারপরও সংখ্যালঘু মুসলমানরা তাকে বিশ্বাস করেননি। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন এসে যায়-কেন? এই কেন, এর উত্তর এই বাম নেতার কাজের মধ্যেই ফুটে উঠেছে। ইমামদের ভাতা দেয়ার বিরুদ্ধে যে মামলা সেটায় ভাতা বন্ধের জন্য তিনি লড়েছেন। এ কেমন স্ববিরোধীতা? এ কেমন দ্বিচারিতা? এগুলো বুঝার ক্ষমতা কি পশ্চিম বঙ্গের বা সারা ভারতের সংখ্যালঘুদের মাথায় নেই? মার্কস ও লেনিনের দর্শনে কী এমনটি আছে? নেই। কিন্তু তাদের অনুসারীরা পৃথিবীর দেশে দেশে এমন কর্ম করে ব্যর্থ হচ্ছেন। আমাদের এই বাংলাদেশেও এমনটি আর যেন দেখতে না পাই! সত্যি কথা বলতে কি, অসাম্প্রদায়িকতা প্রমাণের বিষয় নয় অন্তরের অনুভূতির বিষয়, বিশ্বাসের বিষয়। এ প্রসঙ্গে ১৬.০৫.২০১৯ তারিখের ‘দৈনিক সিলেটের ডাক’ পত্রিকার একটি খবরের শিরোনাম খুবই প্রাসঙ্গিক মনে করছি আর সেটি হলো-‘ভারতের জেলে মুসলিমদের সঙ্গে রোজা রাখছেন হিন্দু বন্দিরাও। দিল্লির তিহার জেলে হিন্দু রোজাদারের সংখ্যা নাকি ৫৯ জন। অনুরূপভাবে প্রতি বছর হিন্দুদের বিভিন্ন উৎসবে সংখ্যালঘু মুসলিম বন্দিরাও সংহতি প্রকাশ করে উপোস করেন। এ প্রসঙ্গে জেল সুপার জানান, বন্দিরা নাকি এমনটি করেন তাদের প্রভুকে সন্তুষ্ট করতে এবং ফলে নাকি শিগগিরই জেল থেকে মুক্তি মিলবে। জেল সুপার আরো জানান, হিন্দু মুসলিম এ ধরনের সম্প্রীতি শুধু তিহার জেলেই নয়, ভারতের অন্যান্য জেলেও এমন ঘটনা বাড়ছে। এখন প্রশ্ন হলো এমন ঘটনা যদি জেলের বাইরেও বৃদ্ধি পায় তাহলে জাতিগত, ধর্মগত, বর্ণগত, শ্রেণিগত সম্প্রীতির পরিসরে কি সুবাতাস বইবে না? আর এটা শুধু ভারতেরই বা কেন পৃথিবীর সকল দেশের জন্যই তো প্রযোজ্য হতে পারে! এতে তো কারো কোন ক্ষতির কারণ থাকতে পারে না! বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট সবারই বোধ হয় ভাবনার সময় এসেছে।
এবার আসা যাক মমতাদির কবিতার সহনশীলতা আর সহিষ্ণুসেবক প্রসঙ্গে! এবার নির্বাচনে মমতা ব্যানার্জি তথা তৃণমূলের এক কথা, এক স্লোগান-‘দুই হাজার ঊনিশ, বিজেপি হবে ফিনিশ’। বিপরীত মোদি সাহেবের বিজেপি স্লোগান-‘এবার হাফ, একুশে তৃণমূল সাফ’। এই ‘সাফ’তো কোন ধর্ম বিশ্বাসীর ভাষা হতে পারে না। আর মানবিকতা বা সহনশীলতায় ঋদ্ধ কোন কবির কবিতার ভাষা তো ‘ফিনিশ’ হতে পারে না। কিন্তু বাস্তবে অন্তত পশ্চিমবঙ্গে এই ‘হাফ-সাফ ফিনিশ’ এর নির্বাচনী খেলাটিই হয়েছে। আর দুঃখজনক হলো, মোদির ‘হাফ’, ‘সাফে’র দিকেই এগিয়ে চলছে। যা তৃণমূলের জন্য অশনি সংকেতই বলা চলে। মনে পড়ে ২০১৪ সালে লোকসভা নির্বাচনে মূখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি নরেন্দ্র মোদিকে কোমরে রশি বেঁধে জেলে নেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। এবার মমতাদি মোদিকে ‘গণতন্ত্রের চড়’ দিতে চেয়েছেন। এটা কি গণতন্ত্রের ভাষা? কোন ‘সহিষ্ণু সেবকের’ ভাষা? মোদি হাসিমুখে মজা করে জবাবে বলেন, ‘দিদির চড় আমার জন্য আশীর্বাদ’। সব কথার শেষ কথা হলো দম্ভ, অহংবোধ, উগ্রতা কারো জন্যই কখনো শুভ বার্তা বয়ে আনে না। কবিতার ‘ন¤্র জাগরণের প্রতীক হয়ে উঠলেন মোদী। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় মমতার আশীর্বাদেই ‘গণতন্ত্রের চড়’ খেয়েই মোদি মমতাদির কোল থেকে ১৮ আসন ছিনিয়ে নিলেন। তাই সবার উদ্দেশ্যেই বলি, মাথা ঠান্ডা রাখুন, জনগণ তো দূরের কথা আল্লাহ-ভগবান কেউই দাম্ভিক-অহংকারীকে পছন্দ করেন না!
কে না জানে বিজেপির হাত ধরেই তো মমতার জাগরণ আর সিপিএম নিধন। ‘তৃণমূলের গুন্ডাদের দ্বারা’ বামদের নেতা-কর্মীরা কি ধরনের নির্যাতন সহ্য করতে করতে প্রায় উধাও হয়ে পড়ছেন সে তো ইতিহাসই বলবে। পশ্চিমবঙ্গে বাম এবং কংগ্রেসকে নির্মূল করে কী তৃণমূলের মূল শক্ত হয়েছে? হয়নি। হয়েছে হিন্দু জাতীয়তাবাদের জাগরণ! একুশে অগ্নি পরীক্ষা। দেখা যাক কি হয়। কবি মমতা ব্যানার্জি নিজেই স্বীকার করেছেন নির্বাচনে অনেক তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা কর্মীও বিজেপির টাকা খেয়েছেন, খবর তো ভালো নয়!
ভারতের নির্বাচন নিয়ে অনেকের প্রশ্ন-জিতল বিজেপি হারল কারা! আমি বলি, বিজেপি জিতলেও আসলে জিতেছে পুঁজিবাদ। হেরেছে ভারতের গর্ব-ঐতিহ্য ধর্মনিরপেক্ষতা, উদার গণতান্ত্রিক ধারা। হেরেছে বিশ্ব পুঁজিবাদের প্রতিপক্ষ। তারই প্রমাণ মোদি মন্ত্রিসভার ৫৮ জন মন্ত্রীর মধ্যে ৫১ সদস্যই কোটিপতি। এই পুঁজিবাদের প্রতীকদেরকে রুখবে কারা? যাদের কাঁধে এদের রুখে দেবার দায়িত্ব তারা অর্থাৎ সেই বামেরা একটি আসনও পায়নি। তারপরও এরাই আশা। এরাই ভরসা। এদেরকে ঘুরে দাঁড়াতে হবে। ইতিহাস বলে ঐতিহাসিক দায়িত্ব বিশ্বজুড়ে তাদের কাঁধেই।
বিজেপির বিজয়ে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে অনেকেই অনেক ধরনের শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। ভারতে বিজেপি ও কংগ্রেস দু’টি বৃহৎ দলের সাথে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উষ্ণ বন্ধুত্বের সম্পর্ক রয়েছে। মোদি এবং সোনিয়া গান্ধীর সাথে রাষ্ট্রীয় এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কও ভালো। তাই সবারই আশা-বিশ্বাস-প্রত্যাশা-সম্পর্ক মধুরই হবে। তিক্ত হবার কোন সম্ভাবনা নেই। আর মমতাদির কবিতার মর্মবাণীও আশার কথাই বলে।
লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, কলামিস্ট, সাবেক ব্যাংকার।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • এই বর্বরতায় শেষ কোথায়?
  • কি করে ফেরানো যায় ভারতমুখী রোগীর স্রোত
  • প্রসঙ্গ : শিশু হত্যা ও নির্যাতন
  • শব্দের অত্যাচারে নিঃশব্দ ক্ষতি
  • এমন মৃত্যু কাম্য নয়
  • কোন সভ্যতায় আমরা!
  • দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ রোল মডেল
  • বৃক্ষ নিধন রোধে চাই জনসচেতনতা
  • আফ্রিকা-চীনের দ্বিতীয় মহাদেশ
  • শিশুরা নিরাপদ কোথায়?
  • অপেক্ষার অশেষ প্রহরগুলি
  • ঘুষ-জুয়া বন্ধে কঠোর হোন
  • মা ইলিশ রক্ষায় সচেতনতা বাড়াতে হবে
  • ছাত্ররাজনীতি হোক কল্যাণ ও বিকাশের
  • পার্বত্য অঞ্চল বিষয়ক গবেষক আতিকুর রহমান
  • শিশুহত্যা : শিশুদের মানসিক বিকাশের অন্তরায়
  • আওয়ামী লীগের সম্মেলন ও শুদ্ধি অভিযান প্রসঙ্গে
  • পৃথিবীর বিশাল ক্যানভাসে
  • শিক্ষাঙ্গনে দলীয় রাজনীতি
  • আমাদের সন্তানরা কোন্ পথে যাচ্ছে
  • Developed by: Sparkle IT