উপ সম্পাদকীয়

আসুন বই পড়ি

মো. আবদুল আউয়াল প্রকাশিত হয়েছে: ২৪-০৬-২০১৯ ইং ০১:০৫:০৪ | সংবাদটি ৯৫ বার পঠিত

বই মানব সভ্যতার অন্যতম উপকরণ ও অনন্ত জ্ঞানের ভান্ডার। তাছাড়া, বই মানুষের সবচেয়ে নিকটতম ও বিশ্বস্থ বন্ধু। মানুষের কর্মময় জীবন যখন ক্লান্তিতে ভরে ওঠে তখন বই তার মনের ক্লান্তি দূর করে নির্মল আনন্দ দিতে পারে। অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের মধ্যে সেতু বন্ধন রচনায় বইয়ের কোন বিকল্প নেই। আজ এবং অনাগত ভবিষ্যতের মানুষও একদিন এ বইয়ের মাধ্যমে অতীতের মনীষীদের সীমাহীন জ্ঞান ভান্ডারের সঙ্গে একাত্ম হয়ে ওঠবে। কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিক, বৈজ্ঞানিক, জ্ঞানী-গুণী ও ধ্যানী জীবনভর নিরলসভাবে সাধনা করে যে সত্যকে আবিস্কার করেন-সে চিন্তা ও অভিজ্ঞতার শাশ্বত রূপই বইয়ের পাতায় কালো অক্ষরের শৃঙ্খলে আবদ্ধ থাকে। বই মানুষের জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করে এবং মনের প্রসারতা ঘটায়। সত্যিকার অর্থে নির্মল আনন্দ লাভের ও জ্ঞান লাভের উৎস হিসেবে বই-ই একমাত্র সর্বজন স্বীকৃত উপকরণ।
বই পড়ার গুরুত্ব অসীম। কাজেই বই পড়ার গুরুত্ব বর্ণনা করা গন্ডুস দ্বারা সমুদ্র মন্থন করার ন্যায়ই ব্যর্থ প্রচেষ্টা-যার কোন শেষ নেই। বর্তমান বিশ্ব হলো প্রতিযোগিতায় ভরপুর। অতএব, সঙ্গত কারণেই এ প্রতিযোগিতাপূর্ণ বিশ্বের সকল শ্রেণির মানুষকে অনেক কিছু জানতে হয়। আর জানার সর্বোত্তম পন্থাই হচ্ছে বইপড়া। মানুষের অস্তিত্বের জন্য, ভালোভাবে বাঁচার জন্য জীবনকে সুন্দর করে গড়ে তোলার জন্য বই পড়ার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। যেমন-একটি উত্তম বই নিত্য দিনের বন্ধু, তেমনি একজন শিক্ষকও বটে। জগতে যাঁরা বড় হয়েছেন, আবার মরেও ইহজগতে অমরত্বও লাভ করেছেন, তাদের জীবনভর সাধনা ও কৃতকর্মের ফল প্রতিটি মানুষের হৃদয়পটে নির্মেঘ আকাশের উজ্জ্বল নক্ষত্রের ন্যায় চিরভাস্বর হয়ে আছে।
সকল মনীষীর দৈনন্দিন জীবনের রুটিনের অন্যতম উপাদান ছিল বইপড়া। কেননা বই পড়ার মাধ্যমেই মানুষের আত্মা হয় পরিশুদ্ধ ও নির্মল। তাছাড়া, গ্রন্থ পাঠ মানব মনে সৃষ্টি করে নীতি, সহানুভূতি, ¯েœহ, মায়ামমতা, ভক্তি, প্রেমপ্রীতি ও অকৃত্রিম ভালোবাসা, বীরত্বের মমত্ববোধ, সুন্দরের সাধনা ও ত্যাগের দীক্ষা। নির্জন অরণ্যে কিংবা জনমানবহীন দ্বীপে একাকী মানুষের নিঃসঙ্গতার বেদনা দূর হয়ে যেতে পারে যদি তার কাছে তাকে কিছু তেমন বই। জাগতিক নানা ঘাত-প্রতিঘাতের ফলশ্রুতিতে মানুষ কখনোও কখনোও চরমভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে ডুবে যায় হতাশায়। এহেন হতাশা ঘোচাতে পারে একটি ভালো বই। বই পড়া মানুষের মনে আনে আনন্দ বেদনার কাব্যিক ও দার্শনিক সত্যবোধ।
বই মানব হৃদয়ে অনাবিল আনন্দ সৃষ্টির অফুরন্ত উৎস। বহু বিচিত্র বিষয় নিয়ে রচিত হয় বিধায় আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সকল প্রকার মানুষকে নির্মল আনন্দ দিতে পারে। এ পৃথিবীতে মানুষের আয়ুস্কাল নিতান্তই সীমিত। কিন্তু মানুষ এ সীমিত সময়ের মধ্যেই তার মন ও হৃদয়কে সুখ ও আনন্দে ভরে তুলতে চায়। প্রকৃতপক্ষে মানুষের মনের আনন্দই সবচেয়ে বড়। আনন্দহীন জীবন কোন জীবন নয়। এ জীবন বিশুষ্ক বালুকাময়-মরুভূমি সমতুল্য। যা সম্পূর্ণ রস-কষ বিবর্জিত। তাই গ্রন্থ প্রেমিক মানুষ মনের আনন্দ উপভোগের জন্য হাতে তুলে নেয় বই। বই মানুষকে আনন্দ দানের মাধ্যমে তার জীবনকে ঐশ্বর্যময় করে তুলে। তাই বই যদি মানুষের জীবনে নিত্য দিনের সঙ্গী হয়ে ওঠে তবে জীবন হতে পারে অনেক সুন্দর ও মধুময়। মূলত: বই কেবল পাঠককে আনন্দই বিতরণ করেনা, বই সভ্যতার ধারক ও বাহক হিসেবে কাজ করে। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রাচীন সভ্যতা ও বিভিন্ন জাতির ইতিহাস বই পড়েই জানা যায়। জীবন জগতকে পূর্ণাঙ্গভাবে উপলব্ধি করতে হলে বইপড়া ছাড়া অন্য কোন পথ নেই।
মানুষ সব সময়ই সঙ্গ পেতে চায়। আনন্দ লাভের প্রত্যাশায় সে নিরবধি সঙ্গ কামনা করে। তাই বই যদি মানুষের জীবনে নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে ওঠে তবে জীবন হতে পারে অনেক সুন্দর ও মধুময়। এক পর্যায়ে সে অন্যের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে সংসার বন্ধন তৈরি করে নেয়। অথচ এমন প্রিয় মানুষটিও এক সময় তাকে কাঁদায়। প্রতারণা করে। মানুষের কাছে মানুষ নির্মমভাবে প্রতারিত হয়। এক বন্ধু আরেক বন্ধুকে ঠকায়। কিন্তু বই মানুষের এক নিঃস্বার্থ ও অকৃত্রিম বন্ধু, সে কারো সাথে প্রতারণা করেনা, কাউকে প্রবঞ্চিত করেনা, ঠকায় না। সে পরম নিঃস্বার্থভাবে তার পাঠককে নীরবে সবচেয়ে আপন বন্ধুর মত কাজ করে যায়। সে ক্রমে ক্রমে তার বন্ধুর জ্ঞান রাজ্যকে সমৃদ্ধ করতে থাকে। মানুষ যখন সম্পূর্ণরূপে একাকিত্ব অনুভব করে তখন বই তার সবচেয়ে আপন বন্ধুর ভূমিকা পালন করে। তাই বই যদি মানুষের জীবনের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে ওঠে তবেই জীবন হতে পারে অনেক সুন্দর ও মধুময়।
ইতোপূর্বে বলা হয়েছে বই জ্ঞানের ভান্ডার। তাই বই আমাদের বহুমুখী জ্ঞান দান করে। সাহিত্য, বিজ্ঞান, ইতিহাস, সভ্যতা, সংস্কৃতি তথা সর্ববিষয়ে জ্ঞান দান করে। বন্ধুকে নিতান্ত প্রয়োজনের মুহূর্তে হয়ত না-ও পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু যে কোন প্রয়োজনে, যেকোন সময়ে বই পাওয়া যায়। প্রয়োজনে সাহায্য করে। যেমন-আকাশ-পাতাল, পাহাড়-জঙ্গল, জীবজন্তু সববিষয় সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করা যায় বই থেকে। তাই সন্দেহাতীতভাবে বলা যায়, বই কেবলই আনন্দের উৎস নয়, জ্ঞানেরও অফুরন্ত ভান্ডার যা নিঃশেষ হয়না কখনো।
বই স্মরণীয় ব্যক্তিদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন মানব-প্রেমিক, দেশ-প্রেমিক, রাজনৈতিক নেতা, রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন, আজও আছেন এদের কার্যাবলী, এদের জীবনাদর্শ আমাদের জীবন চলার পথে উজ্জ্বল আলোক-বর্তিকার ন্যায় প্রতিভাত হয়। এ কথা অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই যে, বই আমাদের এ সকল মনীষীদের চিন্তাÑভাবনা ও কার্যাবলীর সাথে ঘনিষ্টভাবে পরিচয় করিয়ে দেয় এবং তাদের আদর্শে অনুপ্রাণিত ও প্রভাবিত করে। তাছাড়া, মহামনীষীদের ত্যাগের কাহিনী, বীরত্ব, মহিমা, সত্য প্রতিষ্ঠাকল্পে আত্মবলীদান, দুস্থ-আর্তপীড়িতদের জন্য সেবা ও আত্মত্যাগের জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত আমরা বই পড়ে জানতে পারি। অপরপক্ষে, জঘন্য মানুষের অপকর্ম-কুর্কীতি ও তাদের নির্মম পরিণতির কথা জেনে আমরা আত্মসচেতন হতে পারি। বই পড়ার ফলে মানুষের মন হয় উন্মোচিত ও প্রসারিত। ভালো বই চিরকালই কুসংস্কারাচ্ছন্ন মনকে পরিশোধিত করে, যার ফলে মানুষ খুঁজে পায় যথার্থ মানুষ হয়ে ওঠার বাস্তব ঠিকানা। এতে মনের জানালা খুলে যায়, উকি দেয় মুক্ত চিন্তা।
মানুষ যুগ যুগ ধরে তার চলার পথে যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছে তার লিখিত রূপই বই। মানুষের প্রাপ্তি, বঞ্চনা, সফলতা, ব্যর্থতা ও আশা-আকাক্সক্ষার প্রকাশ হলো একমাত্র বই। তাই বই পড়ে মানুষ লাভ করে এক দুর্লভ প্রশান্তি। বই মানুষকে সঠিকপথ ধরে এগিয়ে চলার প্রেরণা দেয়, সাহস জোগায়, সংগ্রামী চেতনায় উজ্জ্বীবিত করে, সত্যকে আবিষ্কারে সহায়তা করে। তাই বিখ্যাত ঔপন্যাসিক লিউ টলস্টয় বলেছেন-
ঞযৎবব ঃযরহমং ধৎব বংংবহঃরধষ ভড়ৎ ষরভব,/ ধহফ ঃযবংব ধৎব নড়ড়শং, নড়ড়শং ধহফ নড়ড়শং.”
ইংরেজ সাহিত্যিক ভিন সেন্ট বলেছেন, ডযবহ বি নুঁ ধ নড়ড়শ বি নুঁ ঢ়ষবধংঁৎব. উক্ত বাক্যে তাই পরিস্ফুট হল যে, বই পড়ে আমরা আনন্দের অংশটাই বেশি উপভোগ করি। পুস্তক পাঠের আনন্দ সম্বন্ধে লিখতে গিয়ে রাশিয়ার ম্যাক্সি গোর্কি বলেছেন-“আমাদের মধ্যে যদি উত্তম বলে কিছু থাকে তার জন্য আমরা বইয়ের কাছেই ঋণী।” রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন-“মানুষ বই দিয়ে অতীত ও বর্তমানের মধ্যে সাঁকো বেধে দিয়েছে।” পারস্যের কবি ওমর খৈয়াম বলেছেন-রুটি মদ ফুরিয়ে যাবে, প্রিয়ার কাল চোখ ঘোলাটে হয়ে যাবে; কিন্তু একখানা বই অনন্ত যৌবনা যদি তেমন বই হয়’। এ জগতের জীবন্ত আত্মীয়দের আমাদের দুর্দিনে কাছে না পেলেও, হাত বাড়ালেই বই পাই। বই সর্বদাই আনন্দ দেয়। তাই আনন্দের জন্য বই পড়া। বই পড়ে আনন্দ পাওয়া যায়। তাই আমরা সকলেই বই পড়ব। আনন্দ লাভ করবো। এমনিভাবে জ্ঞানার্জন করে আমরা দেশ ও জাতির সেবায় আত্মনিয়োগ করবো।
লেখক : কলামিস্ট।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বৃক্ষরোপণ
  • জলবায়ু পরিবর্তনই আসল সমস্যা
  • কিশোর অপরাধ
  • আ.ন.ম শফিকুল হক
  • হোটেল শ্রমিকদের জীবন
  • বিশেষ মর্যাদা বাতিল ও কাশ্মীরের ভবিষ্যত
  • বাংলাদেশে অটিস্টিক স্কুল ও ডে কেয়ার সেন্টার
  • বেদে সম্প্রদায়
  • গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে সুপারিশমালা
  • ত্যাগই ফুল ফুটায় মনের বৃন্দাবনে
  • প্রকৃতির সঙ্গে বিরূপ আচরণ
  • ঈদের ছুটিতেও যারা ছিলেন ব্যস্ত
  • সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের বর্ষপূর্তি : প্রাপ্তি ও প্রত্যাশা
  • আইনজীবী মনির উদ্দিন আহমদ
  • শিশুদের জীবন গঠনে সময়ানুবর্তিতা
  • শাহী ঈদগাহর ছায়াবীথিতলে
  • কিশোর-কিশোরীদের হালচাল
  • বলকানস : ইউরোপের যুদ্ধক্ষেত্র
  • সন্তানের প্রতি অভিভাবকের দায়িত্ব
  • শিক্ষার হার এবং কর্মসংস্থান প্রসঙ্গ
  • Developed by: Sparkle IT