উপ সম্পাদকীয়

স্টার্টআপ ফান্ড : শিল্পায়ন গড়ার আশার আলো

গোলাম সারওয়ার প্রকাশিত হয়েছে: ২৫-০৬-২০১৯ ইং ০১:১৩:৫০ | সংবাদটি ৬৯৩ বার পঠিত

পাঁচ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার (২০১৯-২০২০ সালের) বাজেটে ১০০ কোটি টাকার স্টার্টআপ ফান্ড যথেষ্ট নয়, তবুও আমরা সরকারের এই পদক্ষেপকে অভিনন্দন জানাই। নতুন শিল্প উদ্যোক্তা তৈরীর লক্ষ্যে ‘ স্টার্টআপ ফান্ড’ এই প্রথম ঘোষিত হলো সরকারের বাজেটে। এই ফান্ড নতুনদের আশার আলো হোক, কামনা করি। আবার একই সাথে প্রজেক্ট না করে কেউ যেন ফান্ড নিতে না পারে, সেদিকেও সরকারের কড়া নজরদারি কামনা করি।
ভাঙ্গা অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে হলে শিল্পায়নের কোনো বিকল্প নেই। শিল্পায়ন ছাড়া অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন সম্ভব নয়। শিল্পায়নে ব্যাপকহারে কর্মসংস্থানের সুযোগ থাকে। কর্মসংস্থান হলেই আর্থিক উন্নতি হয়। তাই ঘরে ঘরে কর্মসংস্থান করে দেয়াই হচ্ছে সরকারের এখন মূল টার্গেট। সরকারের এখন বড় বড় প্রজেক্ট থাকার কারণে জিডিপিতে গ্রোথ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কিন্তু সরকারের এসব প্রজেক্ট তো দীর্ঘদিন থাকবে না। অতএব জিডিপি গ্রোথ ধরে রাখতে উৎপাদনশীলতার দিকে যাওয়া ছাড়া কোনো উপায়ও নেই।
চীন দেশে ঘরে ঘরে শিল্প নয়, মাথায় মাথায় শিল্প। স্কুল-কলেজের ছেলে-মেয়েরা পড়ালেখার ফাঁকে ফাঁকে শিল্পকর্মে ব্যস্ত থাকে। নিজেদের পড়ালেখার খরচসহ যাবতীয় বাড়তি খরচ শিল্পকর্ম করেই এরা জোগাড় করে নিতে পারে। ফলে পরিবারের বোঝা হয়ে দাঁড়ায় না। এ কারণেই চীনারা দ্রুত শিল্পায়নে এগিয়ে যেতে পারছে। সারা বিশ্বেই এখন চীনা পণ্যের জয়ধ্বনি।
আমাদের দেশের চাকরীর বাজার অনেকদিন ধরেই কলাপসিবল গেইটে আবদ্ধ। বেসরকারি খাত থেকে মাঝেমধ্যে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেখা গেলেও সরকারি বিজ্ঞপ্তি নেই বললেই চলে। ফলে দেশে শিক্ষিত-অশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা দিন দিনই বাড়ছে। জনশক্তি রপ্তানীও এখন আগের মত নয়, আগের চেয়ে অনেক কমে এসেছে। এতে বেকারের সংখ্যা বাড়লেও ইতিবাচক দিক রয়েছে। মেধা রপ্তানী থেমে গেছে। ফলে কিছু মেধা বাধ্য হয়েই উদ্ভাবনী শক্তি দেশের ভেতরেই প্রয়োগ করছে। আর এই মোক্ষম সময়ে সরকারের এই স্টার্টআপ ফান্ড অমৃতের মতো কাজ করতে পারে। পাড়ায় পাড়ায় ঘরে ঘরে নিমন্ত্রণ জানিয়ে মেধাবী তরুণ-তরুণীদের বের করে আনতে হবে। এদের ট্রেইনআপ করে কিছু যন্ত্রপাতির টেকনিক্যাল নো হাউ (ঞবপযহরপধষ কহড়ি যড়)ি শিখিয়ে স্টার্টআপ ফান্ড (ঝঃধৎঃঁঢ় ঋঁহফ) ধরিয়ে দিলে আশা করা যায় দেশ দ্রুত শিল্পায়নের দিকে অগ্রসর হবে।
শিল্পায়ন করতে বয়সের সময়সীমা লাগে না। তবে চোখ, কান, নাক ভালো থাকতে হয়। সুস্থ দেহ, প্রশান্ত মন, সৃজনশীল চিন্তা-চেতনা আর সাহস থাকলেই শিল্পায়ন করা সম্ভব। তবে শিল্পায়ন করতে কিছুটা অর্থ লাগে। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে অর্থ ছাড়া তো কিছুই সম্ভব হয় না। শিল্পায়নের অনুমোদন থেকে শুরু করে উৎপাদিত পণ্যের বাজারজাতকরণ পর্যন্ত অর্থ ছাড়া কিছুই হয় না আমাদের দেশে।
শিল্পায়নের দিক দিয়ে সিলেট অনেক পিছিয়ে। আঙ্গুলে গোনা দু’চারটি ক্ষুদ্র শিল্প ছাড়া শিল্পায়ন বলতে সিলেটে কিছু নেই। ব্রেড-বিস্কুট আর মিষ্টির কারখানাকে কি শিল্পায়ন বলা চলে? ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, বগুড়া যেভাবে এগিয়ে গেছে ঠিক সেভাবে এগিয়ে যেতে পারেনি সিলেট। এক সময় বলা হতো বাজারজাতকরণের বিশাল পরিধি নেই এখানে। ঢাকা-চট্টগ্রাম থেকে কাঁচামাল এনে উৎপাদিত পণ্য ঢাকা-চট্টগ্রামেই বাজারজাতকরণ করতে হতো বিধায় পোষাতো না। কিন্তু এখন দিন পাল্টেছে। মানুষ বাড়ার সাথে সাথে গ্রামে-গঞ্জে-শহরে দোকানপাট, বিপনীবিতান এবং হাট বাজারের সংখ্যা বেড়েছে বহুগুণ।
যে হারে সমগ্র সিলেটে মানুষ ওষুধ খায়, সে হারে তো একটা ওষুধ কোম্পানীও গড়ে ওঠেনি! ফ্রিজ-টিভির ব্যবহার বেড়েছে, ইলেকট্রিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ গড়ে ওঠেনি একটাও। প্রতিবছর বাজেটে বিড়ি-সিগারেটের দাম যতই বাড়ানো হোক না কেন বিড়ি-সিগারেটের ফ্যাক্টরী তো নাই সিলেটে। প্রতিদিনই আলীশান বাড়ি-হাসপাতাল নির্মাণ হচ্ছে, কিন্তু গৃহ নির্মাণ সামগ্রী গড়ে উঠতে পারে না সিলেটে? তবে ডায়াগনস্টিক ল্যাবের সংখ্যা দিন দিনই বাড়ছে। কেনো জানেন? রোগীর ওপর ভর করে ডাক্তার, ল্যাব মালিক এবং এক শ্রেণীর দালালদের বিশাল মার্জিন থাকার কারণে। টেস্ট দেয়ার প্রয়োজন নেই, অথচ ডাক্তার বিনা প্রয়োজনে টেস্ট লিখে দিচ্ছেন। রোগীরা এক প্রকার বাধ্য হয়েই ডায়াগনস্টিক ল্যাবে যাচ্ছেন আর মাঝখানে যা হবার তাই হচ্ছে। কেউ কি দেখার নেই? ধরতে চাইলেই এদের সহজে ধরা যায়। প্রতিটা ল্যাব টেস্টে ডাক্তারদের রেফারেন্স থাকে। রেফারেন্সের আধিক্যই প্রমাণ করবে এর পেছনের মূল রহস্য ‘রোগ নির্ণয় নয়, কমিশন বাণিজ্য’।
ঢাকার এক একটা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীতে হাজার হাজার শ্রমিক কাজ করে। তেমনি প্লাস্টিক, ইস্পাত, আলপিন, বিয়ারিং, পেইন্টিং সহ নানান জাতি শিল্প কারখানায় লক্ষ লক্ষ মানুষ কর্মসংস্থানের সুযোগ করে নেয়। সেই হিসেবে সিলেট প্রায় অচল, অনড়, অথর্ব! খাদিমনগর এবং গোটাটিকরে শিল্পনগরী বলে দুটো প্লট আছে। ওখানে ব্রেড-বিস্কুট আর মিষ্টির কারখানাই বেশি। ওরিয়েন্ট আইটেমের শিল্প খুব একটা চোখে পড়ে না। প্লট বরাদ্দ নিয়ে বেশীর ভাগ রুগ্ন শিল্পই পড়ে আছে ওখানে। ওখানকার ব্যবস্থাপকের সঙ্গে কথা বললে হতাশার কথাই উঠে আসে। হতাশা কাটিয়ে উঠারও কোনো প্ল্যান নেই ওনাদের। সিলেটের বাজারে চলে এমন প্রোডাক্টের আইডিয়া নিতে গেলে ওনারা ব্রেড-বিস্কুট ফ্যাক্টরীর কথাই বলেন। নতুন পণ্য কিংবা প্রযুক্তি বিষয়ক ধারণা নিতে ‘ইউটিউবে’ সার্চ দিলে যতটা মঙ্গল হবে, ডিজিটাল বাংলাদেশের এসব কর্মকর্তার কাছে সার্চ দিলে ততটাই ক্ষতি হবে, কারণ ওনাদের এসব বিষয়ে ধারণা নেই বললেই চলে। আমাদের সিলেটে অনেক ব্রান্ডিং রো ম্যাটেরিয়েলস আছে, যা দিয়ে উৎপাদন করে শুধু সিলেট নয় বিদেশে রপ্তানী করেও বাজারজাত সম্ভব। কিন্তু ওনারা তা মানতে রাজী নন। আসলে ওনাদের ভীমরতি ধরেছে, বসে বসে সরকারি বেতনেই দিনাতিপাত করতে চাইছেন!
বিশ্বব্যাপী আমাদের সিলেটিদের সাকসেস রেইট প্রায় হান্ড্রেড পারসেন্ট। বিদেশে সব কাজই ওনারা করতে পারেন। কিন্তু দেশের ভেতর সে রকম কাজের অনুকূল পরিবেশ নাই অর্জিত অর্থে প্রবাসের অনেকেই শিল্প স্থাপনে আগ্রহী। কিন্তু উন্নত বিশ্বে শিল্প স্থাপনের অনুমোদন নিতে যেখানে সর্বোচ্চ ৪-১৮ দিন সময় লাগে সেখানে আমাদের দেশে বছরের পর বছর ঘুরেও যখন অনুমোদন মিলে না তখন উনারা উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন। বাধ্য হয়েই তখন বিশাল বিশাল আলীশান বাড়ি, প্রাসাদ, কনভেনশন হল নির্মাণ করেন। শিল্পে উৎসাহ, উদ্দীপনা, প্রণোদনা আজ বড় বেশী প্রয়োজন। আর এ কাজটি করতে হবে প্রথমে সরকারকেই। প্রবাসী সিলেটিদের যেমন ভরসা পেতে হবে, তেমনিভাবে দেশী এবং বিদেশী বিনিয়োগকারীদের প্রতিও ভরসার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। নইলে সিলেটের শিল্পখাত জিরোতে আছে, জিরোতেই পড়ে থাকবে। ভরসার হাত প্রসারিত না হলে সরকারের স্টার্টআপ ফান্ডও বেশী দূর এগিয়ে যেতে পারবে বলে আমাদের মনে হয় না।
শাহজালাল-শাহপরাণের পুণ্যভূমিকে আল্লাহই বাঁচিয়ে রাখছেন। যুগ যুগ ধরে সারা দেশসহ পৃথিবীর যে কোনো প্রান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসেন মহান ওলি সাধকগণের স্মৃতি বিজড়িত পুণ্যভূমি দর্শনের জন্য। দিন দিনই বাড়ছে অতিথিদের আগমন। পুণ্যার্থী এবং পর্যটকদের চাপে ছোট্ট শহরের হোটেল-রেস্তোরাঁগুলো এখন আর লোড নিতে পারে না। হোটেলে সিট নেই! খাওয়ার জন্য রেস্টুরেন্টে লাইন! চেয়ারের পেছনেই দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, উনি উঠে গেলেই খাওয়ার জন্য বসে যেতে হবে। কী বিশ্রী কান্ড রে বাপ!
সময় এসেছে এখন সিলেটে পর্যটন শিল্প গড়ার। এক পর্যটন শিল্পের ওপর ভর করেই সিলেট এখন বহুদূর যেতে পারে। প্রয়োজন শুধু নিরাপত্তা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন করা। বিছনাকান্দি, রাতারগুল কিংবা টাঙ্গুয়ার হাওড়ে যেতে কী যে দুর্গম পথ পাড়ি দিতে হয় ভুক্তভোগীই কেবল জানেন। মহান আল্লাহর অসীম কৃপায় সিলেটে এমন কিছু প্রাকৃতিক উপাদান আছে, এমন কিছু দৃশ্য আছে, এমন অনেক নদী, পাহাড়, টিলা, হাওর আছে যা দেশের অন্য কোনো অঞ্চলে এক সাথে নেই। আর ব্যতিক্রমী এই বিষয়গুলোই পর্যটকদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে।
পর্যটকদের ঢল আর থামানো যাবে না। ঢলে এই ছোট্ট সিলেট শহরে যানজট বাড়ছে। হোটেল-রেস্তোরাঁয় ধারণক্ষমতা নেই! তাহলে করণীয় কী? অবশ্যই হোটেল-রেস্তোরাঁগুলোকে রিসোর্ট এরিয়ায় স্থাপন করার জন্য বাধ্য করতে হবে। এতে শহরের যানজট কমে আসবে এবং একই সাথে পর্যটন শিল্প দ্রুত প্রসারিত হবে। সরকারের প্রশাসন যন্ত্রের উচিত এখনই যাতায়াত এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া। শিল্প তো শিল্পই, হোক না সে পর্যটন শিল্প মন্দ কী!
লেখক : প্রাবন্ধিক।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বৃক্ষরোপণ
  • জলবায়ু পরিবর্তনই আসল সমস্যা
  • কিশোর অপরাধ
  • আ.ন.ম শফিকুল হক
  • হোটেল শ্রমিকদের জীবন
  • বিশেষ মর্যাদা বাতিল ও কাশ্মীরের ভবিষ্যত
  • বাংলাদেশে অটিস্টিক স্কুল ও ডে কেয়ার সেন্টার
  • বেদে সম্প্রদায়
  • গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে সুপারিশমালা
  • ত্যাগই ফুল ফুটায় মনের বৃন্দাবনে
  • প্রকৃতির সঙ্গে বিরূপ আচরণ
  • ঈদের ছুটিতেও যারা ছিলেন ব্যস্ত
  • সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের বর্ষপূর্তি : প্রাপ্তি ও প্রত্যাশা
  • আইনজীবী মনির উদ্দিন আহমদ
  • শিশুদের জীবন গঠনে সময়ানুবর্তিতা
  • শাহী ঈদগাহর ছায়াবীথিতলে
  • কিশোর-কিশোরীদের হালচাল
  • বলকানস : ইউরোপের যুদ্ধক্ষেত্র
  • সন্তানের প্রতি অভিভাবকের দায়িত্ব
  • শিক্ষার হার এবং কর্মসংস্থান প্রসঙ্গ
  • Developed by: Sparkle IT