উপ সম্পাদকীয়

সৃজনশীলতার জন্য সৃজনশীলতা

শেখর ভট্টাচার্য প্রকাশিত হয়েছে: ২৫-০৬-২০১৯ ইং ০১:১৪:৫৪ | সংবাদটি ৯২ বার পঠিত

অনেক দিন থেকে আমার ক্ষুদ্র মস্তিষ্কে একটি বিষয় সমাধানহীন ভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে, বিষয়টি শুনে হয়ত, বিষয় বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা আমার অজ্ঞতায় হেসে উঠবেন এবং বলবেন এতটুকু বিদ্যার বহর নিয়ে লেখালেখির জগতে না আসাই শ্রেয়। গৌরচন্দ্রিকা দীর্ঘ না করে এবার খোলাসা করি, বিষয়টি হল, আমরা কেন আমাদের শিক্ষাপদ্ধতিকে সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি বলছি? শিক্ষা বিষয়টির মধ্যেই তো সৃজনশীলতা অন্তর্ভুক্ত আছে, তা হলে তার পিছনে সৃজনশীল তকমাটি জুড়ে দিয়ে কি বুঝাতে চাচ্ছি আমরা? শিক্ষাপদ্ধতির সফল ব্যবহারের মাধ্যমে যে সমস্ত দেশ প্রমাণ করেছে যে তাদের শিক্ষাপদ্ধতি সৃজনশীল তারা কেউতো তাঁদের শিক্ষা পদ্ধতিকে সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি বলছে না। বিষয়টি এরকম হাস্যকর নয়তো, যেমন আমরা যদি বলি বিজ্ঞানভিত্তিক পদার্থবিদ্যা, কিংবা বিজ্ঞানভিত্তিক জীববিদ্যা, আশা করি বিশেষজ্ঞরা বিষয়টি ভেবে দেখবেন।
শিক্ষার উদ্দেশ্য হিসেবে জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ বলা আছে, মানবতার বিকাশ এবং জনমুখী উন্নয়ন ও প্রগতিতে নেতৃত্বদানের উপযোগী মননশীল, যুক্তিবাদী, নীতিবান, নিজের ও অন্যান্য ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, কুসংস্কারমুক্ত, পরমতসহিষ্ণু, অসাম্প্রদায়িক, দেশপ্রেমিক কর্মকুশল নাগরিক তৈরি করা। তার সাথে শিক্ষার মাধ্যমে জাতিকে দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলার দক্ষতা ও যোগ্যতা অর্জন করার গুরুত্ব প্রদান করা।
আমাদের দেশের অন্যান্য জাতীয় নীতিমালার মতো শিক্ষানীতিতে ও অত্যন্ত উচ্চচিন্তার প্রতিফলন দেখা যায়। নীতি প্রণয়নে আমাদের দক্ষতা ও যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করার যোগ্যতা এখন খুব কম বিশেষজ্ঞেরই আছে । আমাদের জাতীয়-শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, মৎস্য ও নারী বিষয়ক নীতিমালাগুলো পড়ার যথেষ্ট সুযোগ হওয়ায় আমি ঢালাও ভাবে এ মন্তব্য করার সাহস পেয়েছি। যে বিষয়টি নিয়ে আমরা এখন জাতি হিসাবে সবচেয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত আছি তাহলো নীতিমালাগুলো বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি, সক্ষমতা যোগ্যতা, প্রস্তুতি ও সৃজনশীলতা কি আমাদের যথেষ্ট আছে। আজ স্বল্প পরিসরে আমাদের সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি নিয়ে কিছু বিষয় উত্থাপন করবো।
সৃজনশীলতা বিষয়টি মানুষের অন্তর্নিহিত গুণাবলীর মধ্যে অন্যতম। সৃজনশীলতা কি কোন একজন মানুষ অন্য আর এক জন মানুষের মধ্যে সৃষ্টি করতে সক্ষম। ধরে নেয়া হয় প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই কিছু না কিছু সৃজন করার ক্ষমতা আছে, সেই ক্ষমতাকে বিকশিত করার জন্য প্রয়োজন হয় অনুকূল পরিবেশ যেমন বৃক্ষ বীজের সঠিক বিকাশের জন্য প্রয়োজন প্রয়োজনীয় আলো, হাওয়া, জল একই ভাবে মানুষের অপার সৃজনের সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তোলার জন্য প্রয়োজন নানাবিধ সহায়তা, ইংরেজীতে যাকে বলে ফ্যাসিলিটেশন বা সহায়তা। এই সহায়তা কিন্তু শিক্ষার্থীকে দিয়ে করিয়ে নেয়া, বুঝিয়ে দেয়াকে বুঝায় না, এটা হল শিক্ষার্থী যাতে নিজে পথ খুজে বের করতে পারে এবং সে পথে নিজের ক্ষমতায় এগিয়ে যায়। শিক্ষার্থীদের দিয়ে আউট অব বক্স চিন্তা করার শক্তি যোগানো। যে চিন্তা নুতন নূতন বিষয় আবিষ্কারে সহায়তা প্রদান করবে। আমাদের শিক্ষানীতিতে চাওয়া কাংখিত মননশীল, যুক্তিবাদী, নীতিবান, নিজের ও অন্যান্য ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, কুসংস্কারমুক্ত, পরমতসহিষ্ণু, অসাম্প্রদায়িক, দেশপ্রেমিক নাগরিক তৈরিতে সহায়তা দান করবে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষাবিজ্ঞানী বেঞ্জামিন স্যামুয়েল ব্লুম ১৯৫৬ সালে শিক্ষার্থীদের চিন্তন শক্তি বৃদ্ধির লক্ষ্যে ছয়টি স্তরে ভাগ করে সৃজনশীল মূল্যায়ন পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছিলেন। তা ছিল : ১. জ্ঞান, ২. উপলব্ধি, ৩. প্রয়োগ, ৪.বিশ্লেষণ, ৫. মূল্যায়ন, ৬. সংশ্লেষণ। এই ছয় স্তরকে চারটি স্থানে সন্নিবেশিত করে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রয়োগ করা হয়েছে।
স্যামুয়েল ব্লুমের চিন্তন শক্তির বিকাশ সহায়ক মূল্যায়ন পদ্ধতিটি অনুসরণ করে আমরা চাচ্ছি প্রগতিবাদী ও কর্মকুশল মানুষ তৈরি করতে। জাতীয় শিক্ষানীতির উদ্দেশ্যকে সফল করার জন্য ২০১০ সাল থেকেই সৃজনশীল মূল্যায়ন পদ্ধতির সূচনা করা হয়েছে মাধ্যমিক ও সমপর্যায়ের পরীক্ষাগুলোতে এবং পরবর্তীতে যা উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নেও প্রয়োগ হচ্ছে। প্রত্যাশা ছিল প্রতি বছর অপার সৃজন ক্ষমতা সম্পন্ন শিক্ষার্থীরা জ্ঞান বিজ্ঞানে উন্নত চিন্তা ও তার প্রয়োগের মাধ্যমে জ্ঞান ভিত্তিক সমাজ গঠনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে এবং জাতীয় উন্নয়নে দৃশ্যমান পরিবর্তন সূচনা ঘটবে।
আমাদের প্রচলিত মূল্যায়ন পদ্ধতিতে আমরা মূলত শিক্ষার্থীদের মুখস্থ করার ক্ষমতাকে যাচাই করে দেখার প্রচেষ্টা করেছি নানাভাবে এবং শিক্ষাবিজ্ঞানী ও গবেষকরা মনে করেছেন এ মূল্যায়নের মাধ্যমে আমরা প্রধানত অকার্যকর ফলাফল পেয়েছি।
আমরা যদি ২০১০ সাল থেকে বাস্তবায়িত সৃজনশীল মূল্যায়ন পদ্ধতির বাস্তবায়নের প্রকৃত অবস্থা বিশ্লেষণ করি তাহলে বুঝতে পারবো বাস্তবায়নের সফলতা কতটুকু। মূলত প্রতিটি বিষয়ের মূল্যায়নের জন্য শিক্ষকদের বিশ্লেষণধর্মী, জ্ঞানমূলক, প্রয়োগধর্মী ও উপলব্ধি যাচাইয়ের জন্য, ভিন্নধর্মী সৃজনশীল প্রশ্ন প্রণয়নের কথা। উল্লেখিত প্রশ্ন গুলোর সৃজনশীলতা শিক্ষার্থীদের প্রকৃত উদ্ভাবনী শক্তির পথ নির্দেশ করে বিশ্লেষণধর্মী মনন ও তার ব্যাবহারিক প্রয়োগের দিকে এগিয়ে নেবে। বাস্তবে আমাদের সম্মানিত শিক্ষকরা সৃজনশীল প্রশ্ন প্রণয়নে তাঁদের মেধা ও শ্রমকে উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যাবহার করতে সক্ষম হচ্ছেন না বা মনোনিবেশ করতে আগ্রহী হচ্ছেন না। ফলশ্রুতিতে বাজারের চটকদার গাইডবইয়ের প্রশ্ন তারা অনুসরণ করছেন। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একই ধরনের প্রশ্ন প্রতি বছর শিক্ষার্থীদের করা হচ্ছে। এর ফলে শিক্ষার্থীরাও সৃজনশীল প্রশ্নের সৃজনশীল সদাতৈরী (Eveready) উত্তর মুখস্থ করে পরীক্ষার খাতায় লিখে আসছে। সামগ্রিক ফলাফল বিবেচনায় আমরা কার্যকর ফলাফল পেতে সক্ষম হচ্ছিনা এবং সৃজনশীল মূল্যায়ন পদ্ধতি বাস্তবায়নের সার্বিক লক্ষ্য থেকে অনেক দূর সরে এসেছি। সার্বিকভাবে যদি সৃজনশীল মূল্যায়ন পদ্ধতির বাস্তবায়নের অবস্থা বিশ্লেষণ করি, তাহলে দেখা যাবে যে সৃজনশীলতা, আউট অব বক্স না হয়ে, বৃত্তাবদ্ধ বা ঝুড়ির ভিতরের সুনির্দিষ্ট কিছু ফলের রূপ ধারন করছে। গাইড বই প্রণেতাদের দ্বারা রচিত সৃজনশীল প্রশ্ন ভা-ার থেকেই সৃজনশীল প্রশ্ন করা হচ্ছে যা ঘোষিত শিক্ষানীতি ও ব্লুম পদ্ধতির উদ্দেশ্য থেকে দৃশ্যমানভাবে লক্ষ্য হারিয়েছে।
যেহেতু শিক্ষা মন্ত্রণালয় সৃজনশীল মূল্যায়ন পদ্ধতির মূল উদ্দেশ্য থেকে সরে আসেন নি এবং এপদ্ধতি বাস্তবায়নে অবিচল সুতরাং সময়ের চাহিদা মিটিয়ে মানবিক ও উদ্ভাবনী জ্ঞানসম্পন্ন জাতি গঠনের জন্য আমাদের অবশ্যই বর্তমান বাস্তবায়ন পদ্ধতির ত্রুটিগুলো চিহ্নিত করে পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে যেতে হবে। সামগ্রিক পদ্ধতির সংস্কার ও পরিকল্পিত, গঠনমূলক, উদ্দেশ্য অভিমুখী (Objective oriented result) ফলাফল লাভের জন্য শিক্ষা প্রশাসন, শিক্ষা গবেষক, শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের কার্যকরী সমন্বয়ের বিকল্প নেই। সৃজনশীল মূল্যায়ন পদ্ধতির মূল্যায়ন ও যথাযথ সংস্কারের উপর নির্ভর করছে জাতি হিসাবে আমরা আমাদের নিকটবর্তী ও দূরবর্তী ভিশন অর্জনে কার্যকরী ভাবে সক্ষম হব কি না। আশার বিষয় হল, সামগ্রিক অবস্থা বিবেচনা করে সরকার সম্প্রতি কারিকুলাম সংস্কারের পদক্ষেপ নিয়েছেন। আমাদের প্রত্যাশা থাকবে এই সংস্কারের মাধ্যমে যুগোপযোগী, বিশ্বজগতের চাহিদা ভিত্তিক ও নৈতিক মান সম্পন্ন একটি কারিকুলাম প্রণয়নে সক্ষম হবে।
সৃজনশীলতা বিকাশের জন্য চাই ব্যাপক ও পরিকল্পিত প্রস্তুতি। আমাদের বিশ্বাস, এ কর্মযজ্ঞকে সফল করার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ মেধাবী, যোগ্য ও কর্মকুশল বিশেষজ্ঞ আমাদের জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে ভূমিকা রাখার জন্য প্রস্তুত আছেন। আগামীদিনের দায়ীত্বশীল ও সৃজনক্ষম নাগরিক তৈরির জন্য চাই ব্যাপক সৃজনশীল কর্মযজ্ঞ, জাতি হিসাবে এটি হল যুগপৎভাবে সময়ের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা ও ঝুঁকি। আশাবাদী মানুষ হিসাবে আশার পালে হাওয়া লাগবে বলেই দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।
লেখক : একটি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার ঊর্ধ্বতন ব্যবস্থাপক ও গবেষক

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বৃক্ষরোপণ
  • জলবায়ু পরিবর্তনই আসল সমস্যা
  • কিশোর অপরাধ
  • আ.ন.ম শফিকুল হক
  • হোটেল শ্রমিকদের জীবন
  • বিশেষ মর্যাদা বাতিল ও কাশ্মীরের ভবিষ্যত
  • বাংলাদেশে অটিস্টিক স্কুল ও ডে কেয়ার সেন্টার
  • বেদে সম্প্রদায়
  • গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে সুপারিশমালা
  • ত্যাগই ফুল ফুটায় মনের বৃন্দাবনে
  • প্রকৃতির সঙ্গে বিরূপ আচরণ
  • ঈদের ছুটিতেও যারা ছিলেন ব্যস্ত
  • সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের বর্ষপূর্তি : প্রাপ্তি ও প্রত্যাশা
  • আইনজীবী মনির উদ্দিন আহমদ
  • শিশুদের জীবন গঠনে সময়ানুবর্তিতা
  • শাহী ঈদগাহর ছায়াবীথিতলে
  • কিশোর-কিশোরীদের হালচাল
  • বলকানস : ইউরোপের যুদ্ধক্ষেত্র
  • সন্তানের প্রতি অভিভাবকের দায়িত্ব
  • শিক্ষার হার এবং কর্মসংস্থান প্রসঙ্গ
  • Developed by: Sparkle IT