মহিলা সমাজ

চাপমুক্ত সুন্দর জীবন

সুমাইয়া শহীদা চৈতী প্রকাশিত হয়েছে: ২৫-০৬-২০১৯ ইং ০১:১৬:১৮ | সংবাদটি ৯৮ বার পঠিত

সকালে ঘুম থেকে ওঠা। সন্তানদের স্কুলের জন্য তৈরি করা। তাদের স্কুলের টিফিন রেডি করা। সেই সঙ্গে ঘর-গেরস্থালির আরও নানান কাজ। ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে নিত্য দৌড়াতে হয় প্রতিটি মানুষকে। তিনি নারীই হোন কিংবা পুরুষ। আর নারী যদি কর্মজীবী হন তাহলে তো কথাই নেই। সামাল দাও ঘর-বাহির। দশভুজা হয়ে। কর্মক্ষেত্রে নিজেকে টিকিয়ে রাখতে চাও তবে সংসার সামলিয়ে অফিসমুখী হও। আগে সংসার, সন্তান, গৃহব্যবস্থাপন; পরে ক্যারিয়ার। নারীরা তো এই শর্ত মাথায় রেখেই ক্যারিয়ার গড়েন এবং সেই সঙ্গে তাদের মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকে ২৪ ঘণ্টায় ঘোড়দৌড়।
কর্মজীবী নারীদের কিছু কাজ ঠিক করে রাখতে হয় আগের দিন রাতেই। তাদের যেমন দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে হয় কর্মক্ষেত্রে, তেমনি বাড়ির পান থেকে চুন সবকিছুর খবর তারই রাখতে হয়। আর কর্মজীবী না হলেও গৃহিণী নারীরও ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে দৌড়েই চলতে হয়। এই যে সংসারের এত কিছু, পরিবারের সবার দেখভাল এবং সংসারের নিত্য ঝামেলায় নারী অজান্তে কখন স্ট্রেসের মুখোমুখি হন, নিজেও বুঝে উঠতে পারেন না।
দৈনন্দিন জীবনে কীভাবে মানসিক চাপমুক্ত থাকা যায় এবং কীভাবে জীবনকে সুন্দরের পথে চালানো যায়, তা নিয়ে পরামর্শ দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ফারাহ দীবা। তিনি জানান, অনেকে বুঝে উঠতে পারেন না তিনি আসলে কী চান। কী পেলে জীবনটা ঠিকঠাক চলে। সবকিছুর পেছনে না ছুটে সঠিক লাইফস্টাইল নির্বাচন করা। এখনকার পুরুষ-মহিলারা 'সব চাই আরও চাই' করতে গিয়ে ঘরে-বাইরের ব্যালান্স হারিয়ে ফেলছে। এতে ডিপ্রেশনের আশঙ্কা দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে। যদি আপনাকে বেশি কাজ করতে হয়, তবে নিজের জীবনযাত্রাকে একটা নিয়মের মধ্যে আনতে হবে। তাতে মন ও শরীর সুস্থ থাকবে। কোয়ালিটি টাইমটা ভালো কাজে ব্যয় করা যাবে।
মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা, বিষণœতা থেকে বাঁচতে হলে একটা সময় ব্যবস্থাপনা করতে হবে। মানসিক চাপের শিকার হলে যে লক্ষণগুলো দেখা যায়- হঠাৎ ওজন বেড়ে যায়, কারণ তখন খাওয়া বাড়ে। ডিশব্যালান্স হয়ে যায়। হরমোনের মানসিক চাপে ত্বক খারাপ- যেমন কালো ও শুস্ক হয়ে যায়, ব্রণ হয়। সোরাইসিস, রোসিয়া, একজিমা, ফেস ড্যামেজ হয়, অ্যালার্জি বেড়ে যায়। ত্বক প্রাণহীন ও স্পর্শকাতর হয়ে পড়ে।
মানসিক চাপ থেকে অনেকেই নানা রোগে আক্রান্ত হন। তবে সফল ব্যক্তিরা এ চাপ মোকাবেলা করেই কাজ করে যান এবং সফলতা ছিনিয়ে আনেন। রইল তেমনই কিছু পরামর্শ-
সন্তুষ্টিময় জীবন : অসন্তুষ্টি থেকে অনেক সমস্যা তৈরি হয়। তাই সফল ব্যক্তিরা এ থেকে দূরে থাকেন। তারা নিজের যা আছে তাই নিয়ে সন্তুষ্ট থাকেন। এটি কর্টিসল নামে স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা কমিয়ে রাখে। ফলে মানসিক চাপও কমে। জীবনে ‘যদি’ না থাকুক : ‘যদি বিষয়টা এমন হতো, তাহলে কেমন হতো...' ধরনের প্রশ্ন কোনো সমাধান আনে না। বাস্তবতাকে মেনে নিতে সমস্যা করে এমন প্রশ্ন। তাই এ ধরনের প্রশ্ন সফলরা এড়িয়ে চলেন।
ইতিবাচক ভাবনা : ইতিবাচকতা মস্তিস্কের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি মানসিক চাপমুক্ত রাখে এবং সফল হতে সহায়তা করে। নেতিবাচক চিন্তাভাবনা থেকে তৈরি হতে পারে নেতিবাচক আত্মকথন। এতে মানসিক চাপ আগের তুলনায় আরও বেড়ে যেতে পারে। আর এ সমস্যা দূর করার জন্য সফল ব্যক্তিরা নেতিবাচক আত্মকথন বাদ দেন। কোনো পর্যায়ে মানসিক চাপের সৃষ্টি হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতেই পারে। এমন পরিস্থিতিতে সফল ব্যক্তিরা 'বিচ্ছিন্নতা' তৈরি করেন। ফলে মানসিক চাপের অনেক বিষয় তাদের স্পর্শ করতে পারে না।
ক্যাফেইন গ্রহণ নিয়ন্ত্রণ : চা কিংবা কফির মতো পানীয়তে থাকা ক্যাফেইন মানসিক চাপ অনেকখানি বাড়িয়ে দেয়। এ পানীয় নিয়ন্ত্রণ করলে তা মানসিক চাপ থেকে মুক্তি পেতে সহায়তা করে। আর ঘুম মানসিক স্বস্তি দেয় এবং চিন্তাভাবনা পরিস্কার করে। পর্যাপ্ত ঘুমালে মানসিক চাপ কমার পাশাপাশি ঠা-া মাথায় বড় কোনো সমস্যার সমাধান করাও সহজ হয়।
মানসিক চাপের কারণ : কী কারণে মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে সে বিষয়ে স্পষ্টভাবে চিন্তাভাবনা করা অনেক সময় চাপ কমাতে সহায়তা করে। এ কাজটি সফল ব্যক্তিরা অহরহ করে থাকেন মানসিক চাপ উপশম করতে। সঠিক উপায়ে বড় করে শ্বাস নিয়ে মানসিক চাপ কমানো যায়। এ অনুশীলন করে অনেকেই মানসিক চাপ কমাতে সক্ষম হন। এ ছাড়া যে কোনো ব্যাপারে চিন্তিত হয়ে পড়া শুরু করলে নিজেকে প্রশ্ন করুন, 'দুশ্চিন্তা কি আমাকে কোনোভাবে সাহায্য করতে পারবে?' বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই প্রশ্নের উত্তর ‘না’। প্রশ্নের উত্তর দিয়ে বড় করে শ্বাস নিলেই একটু ফুরফুরে লাগতে থাকবে!
আবার স্ট্রেসগুলোকে চমৎকার একটা ছকে বেঁধে ফেলুন। অফিসের কাজটাকে অফিসেই করে, কাজের চিন্তাটুকু সেখানেই রেখে দিয়ে আসুন। কাজ যদি শেষ নাও হয়, বাসায় বসে দুশ্চিন্তা করে যেহেতু আমার কোনো উপকার হবে না (প্রথম প্রশ্ন!), তাই সেটা নিয়ে না ভাবা। বাসায় আয়েশ করে এক কাপ চা নিয়ে সবার সঙ্গে গল্প করতে থাকলেই স্ট্রেস কমে যাওয়া শুরু করবে, পরদিন চট করে বাকিটুকু শেষ করে ফেলুন। দৈনন্দিন কাজের মাঝে ‘করতে ভালোবাসি’ এমন সময়টা বাড়ানোর চেষ্টা করুন। সপ্তাহে একবার অন্তত পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়া, সন্ধ্যার পরে পার্কে দৌড়ানো, সকালে সাইকেলটা নিয়ে একটা চক্কর। খুব কাজের চাপ আর স্ট্রেসফুল সময়েও ‘শুক্রবারে সবার সঙ্গে আড্ডা হবে’ ভাবনাগুলোর সঙ্গে আনন্দ বের করুন!
আমার এই পথচলাতেই আনন্দ। মাথায় রাখতে পারেন এই কথাটি। জীবন একটাই। তাকে যাপন করতে হয় নিজের মতো করে। যাপিত জীবন যখন আপনার আনন্দের হবে। সাফল্যের হবে। তখন দেখবেন ডিপ্রেশন পালিয়ে গেছে আপনার কাছ থেকে। আর যে কাজটি আপনি করছেন তা আনন্দ নিয়েই করুন। আনন্দহীন কাজে যেমন সফলতা আসে না। তেমনি আনন্দহীন জীবনেও প্রতিদিন বিষণœতা গ্রাস করে বেড়াবে আপনাকে। তাই সুস্থ থাকতে হবে। থাকতে হবে প্রফুল্ল। এই ভাবনা মাথায় রেখেই আপনি যাপন করুন সুন্দর এই জীবনটি।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT