ইতিহাস ও ঐতিহ্য

বর্ষা এলো বর্ষা

আবদুল হামিদ মানিক প্রকাশিত হয়েছে: ২৬-০৬-২০১৯ ইং ০০:২৭:৪৬ | সংবাদটি ২১৭ বার পঠিত

গগনে গরজে মেঘ ঘন বরষা
কূলে একা বসে আছি নাহি ভরসা।
রাশি রাশি ভারা ভারা, ধান কাটা হল সারা
ভরা নদী ক্ষুরধারা খর পরশা।
কাটিতে কাটিতে ধান এল বরষা।
ষড়ঋতুর দেশ বাংলাদেশে এই বর্ষা অতি পরিচিত। এর আগমন পত্রিকার পাতা ঘেঁটে বুঝতে হয় না। আকাশের চেহারা দেখেই বোঝা যায় বর্ষা নেমেছে। খালবিল হাওরের দৃশ্য আর ঝর ঝর বৃষ্টি জানিয়ে দেয় এসেছে বর্ষা। আবহমান বাংলায় তাই ঋতুটি ঘরে ঘরে পরিচিত।
বাংলাদেশ একটি প্রাচীন জনপদ। এখানকার প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য যুগ যুগ ধরে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আসছে। মোগল, পাঠান, তুর্কি, ইংরেজ, ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে এদেশে এসেছেন। সবাই বাংলার নিসর্গের সৌন্দর্য ও প্রকৃতির বৈচিত্র্য দেখে মুগ্ধ হয়েছেন। কখনো-বা প্রকাশ করেছেন বিস্ময়। জোয়ার ভাটার দৃশ্য, বনবনানীর ঘন ঘন রূপ পরিবর্তন, শীত গ্রীষ্মের বিবর্তন বহিরাগত অনেকের চোখেই চমকপ্রদ। প্রাকৃতিক পরিবর্তন সত্ত্বেও বাংলার ঋতু-পরিক্রমা অব্যাহত রয়েছে। বর্ষার আগমনে তা সহজে অনুভব করা যায়।
পঞ্জিকার হিসাবে আষাঢ় শ্রাবণ দুই মাস হচ্ছে বর্ষাকাল। বর্ষার প্রধান বৈশিষ্ট্য বৃষ্টিপাত। মেঘলা আকাশ। দিনের পর দিন সূর্যের দেখা নেই। যখন তখন ঝরঝর বৃষ্টি। নদীনালা খালবিল জলে টইটম্বুর। রাস্তাঘাটে ছাতা মাথায় পথচারীর বিচরণ দেখা যায়। আর মাঠে মাঠে চাষির হালচাষ তো দেখাই যায়। এই হলো বর্ষার সাধারণ দৃশ্য।
অবশ্য বর্ষার আগে থেকেই বৈশাখ জ্যৈষ্ঠ মাসে বৃষ্টির ঝুপঝাপ শুরু হয়। তবে বর্ষার সঙ্গে সেই বৃষ্টিপাতের পার্থক্য আছে। বৈশাখ কালবোশেখির মাস। হঠাৎ ঈষাণকোণে অন্ধকার মেঘ জমে। দুদ্দাড়, শনশন বাতাস ছুটে। ঝড় তুফানে ভেঙে পড়ে গাছগাছালি, গরিবের কুঁড়েঘর, ভূমিম্মাৎ হয় বিদ্যুতের খুঁটি। ধ্বংসের মুখে সৃষ্টির নেশায় মানুষ সংগ্রাম করে বেঁচে থাকার। জ্যৈষ্ঠেও বৃষ্টিপাত হয়। তবে মাঝে মাঝে। এ সময় রোদে তেজ থাকে ঝাঝালো। আম কাঠাল পাকে। বাতাসে আম আনারসের মৌ মৌ গন্ধ থাকে। এর রেশ নিয়েই আসে বর্ষার প্রথম মাস আষাঢ়।
আষাঢ়ে অবিরাম বৃষ্টি নামে। বজ্রের হুংকার প্রায় নেই। কালবোশেখির তা-ব নেই। শুধুই নিরবচ্ছিন্ন বৃষ্টি। এর রূপ শান্ত স্নিগ্ধ। চিরকালীন এই বর্ষার প্রভাব কাব্যে, গানে ও সাহিত্যে ফুটে উঠেছে। এ ঋতুতে বাঙালির হৃদয় যেন ভাবাতুর, ঘরমুখো হয়ে ওঠে। ‘এমন বাদল দিনে বাহিরে কে যায় রে।’ ঘরবন্দি ভাবুক হৃদয় কাকে যেন খুঁজে ফিরে। ‘এমন দিনে তারে বলা যায়, এমন ঘনঘোর বরিষায়। এমন মেঘস্বরে, বাদল ঝরঝরে, তপনহীন ঘন তমসায়।’ অথবা ‘হৃদয় আমার নাচেরে, আজিকে ময়ূরের মতো নাচেরে।’ এমন সব ভাব ভাবনায় ভাবুক চিত্ত বর্ষায় দুলে দুলে ওঠে। বনে ময়ূর পেখম তুলে নাচে। ফুটে কদমফুল। টিনের চালে টপটপ বৃষ্টি পড়ে। গাছের পাতায় দরদর সুর তোলে। তবে সবার চোখে পড়ে, ‘বরষার ঝরঝর সারা দিন ঝরছে। মাঠ ঘাট থই থই খালবিল ভরছে।’ ভরা নদীতে পাল তুলে কোন সুদূরে তরি বেয়ে চলে মাঝি। সারা বাংলা তখন নতুন রূপ নেয়। গ্রীষ্মে নেতিয়ে পড়া নদী বর্ষায় প্রমত্তা। দু’কূল উপচে পড়ে পানি। স্রোতের শা শা কুলকুল শব্দ দিনরাত কানে বাজে। বর্ষার বিল জল থই থই। ডাহুক, কুড়া ও জলচর পাখির গান ভেসে আসে অথই পানির ওপর দিয়ে।
আবহমান বাংলায় আষাঢ় মাস হলো গৃহবধূর নাইওরির মৌসুম। বউ-ঝিরা নৌকায় যান বাপের বাড়ি। আষাঢ় মাসে নাইওর যাইতে কে করে মানা।’ এ জিজ্ঞাসা বাংলার বধূর চিরন্তন। নাইওর যাব, আম জাম, কাঁঠাল খাব, মা ভাইবোনেরে দেখে আসবো, নতুন কাপড় পরে বাপের বাড়ি থেকে ফিরে আসবো।’ বর্ষায় বউ-ঝির এই ছিল প্রত্যাশা। অতীতে নৌপথই ছিল সম্বল। বিল-হাওর দিয়ে ছইঅলা নৌকা ছুটছে, ভেতরে নাইওরি। খাল বা বিলের পাড়ে জনপদের দিকে নাইওরি ছইর ভেতর থেকে তাকান। আর ঘরবাড়ি থেকে অন্য বউ-ঝিরাও উকি দিয়ে দেখে নাইওরিকে। আজকাল এমন দৃশ্য কমে এলেও ভাটি বাংলায় বর্ষার এ রূপ অম্লান হয়ে আছে। বাড়ির পাশের খাল অথবা হাওর। অনেক নৌকা এদিক সেদিক যায়। বাপের বাড়ির স্মৃতিতে কাতর সংসারবন্দি বউ উঁকি দেয় আর দেখে-আমার নি কেউ আসে-রে।
ঘনঘোর বরষায় পথঘাট থাকে স্যাঁৎসেঁতে ভেজা। গ্রীষ্মে যে মাটি শুকনো খাঁ খাঁ করে সেই মাটি বর্ষায় নরম সজল। বীজ বোনার উপযোগী। এ সময়ে বাংলার উর্বর জমিন যেন সকল বাঁধন আলগা করে দেয়।
অতীতের বর্ষার মধুর রূপ এ যুগে পুরোপুরি নেই। পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। তাই প্রায়ই দেখা দেয় বিপত্তি। নদনদী আর আগের মতো পানি ধরে রাখতে পারে না। তীর ছাপিয়ে ডুবিয়ে দেয় খেতের মাঠ, বস্তি জনপদ, হাটঘাট। বন্যার গ্রাসে পতিত হয় জনজীবন। চাষির চোখের স্বপ্ন ভেঙে যায়, হাহাকার ওঠে।
আবহমান বাংলায় বর্ষা নতুন নয়। কিন্তু বিপর্যয়টা নতুন। বর্ষার বৃষ্টির প্রয়োজন আছে। তাই বাংলার প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য বজায় রেখেই বন্যার মোকাবিলা করতে হবে। বন্যা রোধ করা সম্ভব। হাজার হাজার বছরের বর্ষা রোধ করা সম্ভব নয়-কাম্যও নয়।

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • ঐতিহ্যবাহী গ্রাম আজিজপুর
  • সিলেটের গণভোটের অগ্রনায়ক মৌলানা ছহুল উসমানী
  • বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আরেক অধ্যায়
  • কোচিংনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার প্রভাব
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • ঐতিহাসিক নানকার আন্দোলন
  • গৌড়-বঙ্গে মুসলিম বিজয়
  • শত বছরের ঐতিহ্যের ধারক দাউদিয়া মাদরাসা
  • পৃথিবীর প্রাচীন লাইব্রেরিগুলো
  • আল হামরা : ইতিহাসের অনন্য কীর্তি
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • বাঙালির ইতিহাসে দুঃখের দিন
  • ঐতিহ্যবাহী নকশিকাঁথা
  • সাংবাদিকদের কল্যাণে সিলেট প্রেসক্লাব
  • প্রাকৃতিক মমিতে নির্মমতার ইতিহাস
  • গৌড়-বঙ্গে মুসলিম বিজয় ও সুফি-সাধকদের কথা
  • ঐতিহ্যের তাঁত শিল্প
  • সিলেট প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠাকাল নিয়ে ভাবনা
  • খাপড়া ওয়ার্ড ট্রাজেডি
  • জাদুঘরে হরফের ফোয়ারা
  • Developed by: Sparkle IT