উপ সম্পাদকীয়

কেউ শোনে না কৃষকের কথা

বিশ্বজিত রায় প্রকাশিত হয়েছে: ২৬-০৬-২০১৯ ইং ০০:২৮:২১ | সংবাদটি ৯১ বার পঠিত

ঋণের চাপ ও জীবিকার প্রয়োজনে ধান বিক্রয় করতে গিয়ে উৎপাদন খরচও তুলতে পারছেন না কৃষকেরা। কৃষকের এই দুর্দশাগ্রস্ত সময়েই ঘোষণা হয়েছে বাজেট। ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কৃষিক্ষেত্রে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৪ হাজার ৫৩ কোটি টাকা, যা গত অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের চেয়ে প্রায় ১ হাজার ২৬১ কোটি টাকা বেশি। প্রস্তাবিত বাজেটে বলা হয়েছে, কৃষিক্ষেত্রে বিদ্যুৎচালিত সেচযন্ত্রের ব্যবহারের জন্য বিদ্যুৎ বিলের ওপর ২০ শতাংশ রিবেট প্রদান অব্যাহত থাকবে। যার সুবিধা একচেটিয়াভাবে ভোগ করবে সেচযন্ত্রের মালিকরা। যাতে কৃষকের কোনো উপকারই হবে না।
কৃষির মূল শক্তি দেশের ৮২ শতাংশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষক। তারা মনে করছেনÑ সেচযন্ত্রের ওপর বিদ্যুৎ বিলের এই সুবিধা সেচযন্ত্র মালিকদের প্রদান না করে ধান উৎপাদনকারী কৃষকদের প্রদান করা হলে ধানের উৎপাদন খরচ কিছুটা হলেও কমে আসবে। এতে লাভবান হবেন দেশের অধিকাংশ কৃষক। এ ছাড়াও কৃষির উন্নয়নে স্বাভাবিক বিনিয়োগের অতিরিক্ত হিসেবে কৃষিপণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ নগদ প্রণোদনা দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে এই বাজেটে। অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া মোকাবিলায় প্রায়োগিক গবেষণার মাধ্যমে বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ও অধিক তাপমাত্রা-সহিষ্ণু ফসলের জাত উদ্ভাবন কার্যক্রম জোরদার করার কথাও বলা হয়েছে কৃষি বাজেটে। রয়েছে শস্যের বহুমুখীকরণ কার্যক্রম জৈব বালাই-ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম জনপ্রিয়করণ ও খামার যান্ত্রিকীকরণ জোরদার করার কথা। কৃষকের সুবিধার্থে বাজেটের কৃষি বরাদ্দে এতসব বলা হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে কতটুকু উপকৃত হবে কৃষক? বাজেটে বরাদ্দকৃত অর্থের পূর্ণ সুফল যাতে পায় কৃষক সেদিকে নজর দিতে হবে। কৃষি ও কৃষকের সুবিধার্থে বাজেটে যে চিন্তা করেছে সরকার তার বাস্তব প্রতিফলন ঘটাতে হবে।
গায়ের ঘাম ঝরিয়ে ফসল উৎপাদন করছেন কৃষক। খাদ্য যোগানের পাশাপাশি ভরিয়ে দিচ্ছেন দেশের সমৃদ্ধি গোলাঘর। দেশের খাদ্য চাহিদা পূরণ এবং খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার প্রধান কারিগর কৃষকই থাকছেন অবহেলিত। এই কৃষকের হাড়খাটুনি পরিশ্রমে বেড়েছে রেকর্ড উৎপাদনশীলতা। একসময়ের খাদ্যাভাবের বাংলাদেশ উদ্বৃত্তের দেশে পরিণত হয়েছে। দেশকে এগিয়ে নিতে দু’হাত ভরে উপহার দেওয়া উৎপাদন শক্তিধর সোনালী মানুষটি নানা সমস্যায় ভোগছেন দিনের পর দিন। সরকারি কোনো সুবিধাই পাচ্ছেন না কৃষক সমাজ। বাকচাতুর্যপনায় সরকারি সুযোগ সুবিধার ফুলঝুরি থাকলেও বাস্তবে তা চোখে পড়ছে না। যেমন সরকারের পক্ষ থেকে ধান ও চাল ক্রয় করা হচ্ছে বলে প্রশংসা কুড়ানোর চেষ্টা চলছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের অনেক সরকারি কর্মকর্তা কৃষকের বাড়ি গিয়ে ধান ক্রয় করে তৃপ্তির ঢেকুর তুলছেন। কিন্তু ক’জন কৃষক উপকৃত হচ্ছে সে খবর কি কেউ রাখেন?
উদাহরণ হিসেবে যদি বলি, এবছর দেশে বোরোর বাম্পার ফলন (প্রায় ২ কোটি টন) হয়েছে। তবে সরকার প্রতি কেজি ২৬ টাকা দরে কিনবে মাত্র দেড় লাখ টন ধান। তাহলে ক’জন কৃষক এই সুবিধার সুমিষ্ট ফল ভোগ করতে পারছেন? এটা তো গেল উৎপাদন পরবর্তী হিসাব-নিকাশ। এর আগে অভাবী কৃষক বিভিন্ন মাধ্যম থেকে ঋণ নিয়ে জমি চাষাবাদের পর ফলন তুলেই কম দামে ধান বিক্রি করে চড়া সুদের ঋণ পরিশোধ করতে বাধ্য হচ্ছেন। এদের মধ্যে কয়জন কৃষক কৃষি ব্যাংক থেকে ঋণ পাচ্ছেন। এ সংক্রান্ত একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে ধানসহ বিভিন্ন ফসল চাষে কৃষকের যে খরচ হয়, তার বড় অংশই আসে বেসরকারি ঋণ থেকে। এই ঋণের সুদও অনেক বেশি। আর সরকারি ঋণের সুদের হার কম হলেও কৃষক তা পান না বললেই চলে। আবার উৎপাদিত ধানের খুব সামান্যই কেনে সরকার। এর ফলে সুদে-আসলে সেই ঋণ শোধ করতে কৃষক কম দামে দ্রুত ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। সম্প্রতি দেশের প্রধান ধান উৎপাদনকারী জেলা ঘুরে এই চিত্র তুলে ধরেছে একটি সংবাদ মাধ্যম।
দেশে কৃষিঋণ পরিস্থিতির চিত্র খাদ্যনীতি পরামর্শ বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (ইফপ্রি) সমীক্ষায় দেখা গেছে, বেসরকারি সংস্থা (এনজিও), আত্মীয়স্বজন, বেসরকারি ব্যাংক, দাদন ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন বেসরকারি উৎস থেকে কৃষক ৮১ শতাংশের বেশি ঋণ নেন। এসব ঋণের বড় অংশের সুদের হার ১৯ থেকে ৬৩ শতাংশ। আর সরকারের কৃষি ব্যাংক ৯ শতাংশ সুদে যে ঋণ দেয়, তা কৃষক খুব সামান্যই পান।
কৃষকের মোট ঋণের মাত্র ৬ শতাংশ আসে কৃষি ব্যাংক থেকে। ইফপ্রির সমীক্ষায় দেখা গেছে, কৃষকেরা কৃষিকাজের জন্য যে ঋণ নেন, তার সবচেয়ে বড় উৎস হচ্ছে এনজিও। সেখান থেকে আসে ৩৬ দশমিক ৪ শতাংশ ঋণ। এরপরই তাঁরা ঋণ নেন আত্মীয়স্বজনদের কাছ থেকে। মূলত প্রবাসী ও সচ্ছল আত্মীয়দের কাছ থেকে আসা ওই ঋণের পরিমাণ প্রায় ১৯ শতাংশ। জমির মালিকের কাছ থেকেও অগ্রিম টাকা ঋণ হিসেবে নেন কৃষক। এই ঋণের পরিমাণ প্রায় ১৫ শতাংশ। গ্রামাঞ্চলের অনানুষ্ঠানিক সুদের কারবারি বা দাদন ১১ দশমিক ৪ শতাংশ ও সমিতিগুলো থেকে আসে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ ঋণ। অন্যদিকে সরকারের কৃষি ব্যাংক থেকে আসা ঋণের পরিমাণ ৬ শতাংশের মতো। এই ঋণের সবচেয়ে বেশি অংশ পান বড় চাষিরা, প্রায় ১৫ শতাংশ। বড়, মাঝারি ও ছোট চাষি মিলে মোট ঋণের ৩৬ শতাংশ পান। আর প্রান্তিক চাষি পান ৫ শতাংশের মতো। বর্গাচাষী অর্থাৎ অন্যের জমি ইজারা নিয়ে চাষ করেন এমন কৃষকেরা এই ঋণ পান না। ফলে তাঁদের এনজিওসহ অন্য উৎসের ঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়। তাহলে সরকার কৃষি ও কৃষকের প্রতি কতটুকু আন্তরিক তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
২০১৫ সালে করা ওই সমীক্ষার সুপারিশ গত ২০ মে কৃষি মন্ত্রণালয়ের কাছে উপস্থাপন করেছে ইফপ্রি। সংস্থাটি বলছে, কৃষিঋণ ও সুদের হারের পরিস্থিতি বর্তমানে প্রায় একই রকম আছে। কৃষককে লোকসান থেকে বাঁচাতে হলে কম সুদে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। উচ্চ সুদে ঋণের ফলে দেশে ধানের উৎপাদন খরচও প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে অনেক বেশি। ভারতের কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, দেশটিতে চলতি বছর এক কেজি ধানের উৎপাদন খরচ বাংলাদেশি টাকায় ১৮ টাকা ৭৫ পয়সা। সরকার কিনছে ২০ টাকা ৮০ পয়সায়। প্রধান ধান উৎপাদনকারী অন্য দেশগুলোর মধ্যে থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামেও প্রতি কেজি ধান উৎপাদনে খরচ ২০ টাকার কম। আর বাংলাদেশে প্রতি কেজি ধানের উৎপাদন খরচ ২৫ টাকা। সরকার তা কিনছে ২৬ টাকায়। তাও হাতেগোনা কয়জন কৃষক সে সুবিধা পাচ্ছেন। আর লাখ লাখ কৃষক বঞ্চিত হচ্ছে ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি থেকে। এ অবস্থায় কৃষক সরকারের ঋণ যেমন কম পাচ্ছেন, তেমনি উৎপাদিত ধানের বেশির ভাগ সরকার নির্ধারিত দরে বিক্রিও করতে পারছেন না। ধান উৎপাদনকারী অনেক এলাকায় কৃষি মজুরি দিনে ৭০০-৮০০ টাকায় পৌঁছেছে। চাষের আগে কৃষক যে ঋণ নিয়েছিলেন, তা শোধ করার জন্য তাঁদের ওপর চাপ বাড়ছে। ফলে কৃষক ১২ থেকে ১৫ টাকা কেজি দরে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কৃষকের ঋণের কিস্তি ও সুদের হার শিথিল করেনি। ফলে এবারের বোরো মৌসুমে বেশির ভাগ ক্ষুদ্র ও মাঝারি চাষি মারাত্বক সঙ্কটকাল অতিক্রম করছেন। [সূত্র : প্রথম আলো, ০৯.০৬.১৯]
নিরুপায় কৃষক তার কষ্টের কথা কাউকে বলতে পারছেন না। শুধু নিরবে মাথা টুকে চলেছেন। অনেকে রাগে-ক্ষোভে কৃষি কাজ ছেড়ে দেওয়ার পণ করছেন। কিন্তু বললেই কি ছেড়ে দিতে পারবেন পেশায় নেশায় অন্তরঙ্গ এই কৃষিকর্ম। গ্রামের অধিকাংশ কৃষক যেহেতু কৃষির উপর নির্ভরশীল সেহেতু কৃষি কাজ করেই জীবিকা নির্বাহ করতে হবে তাদের। কিন্তু বয়সে বয়োবৃদ্ধ কৃষকেরা কৃষির প্রতি আগ্রহী হলেও তাদের পরবর্তী প্রজন্ম আর সেখানে লেগে থাকতে চাইবে না। এই অনিশ্চিত প্রেক্ষাপটে কোনো মানুষই চাইবে না কৃষিতে জীবন পরিচালিত হোক। তাহলে কি দিন দিন কমে আসবে কৃষি মাত্রা। কৃষি কাজে নানা প্রতিবন্ধকতা কৃষককে কৃষি থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।
কৃষক নিয়ে অ্যাকশনএইড ও খাদ্য নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক পরিচালিত সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা যায়, ৮৩ শতাংশের বেশি কৃষকের আয় পরিবারের চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট নয়। এ কারণে ৬৫ শতাংশেরও বেশি কৃষক নানা সময় অন্য পেশায় চলে যেতে চায়। জরিপের তথ্য বলছে, ৬৫.৪৮ শতাংশ কৃষক কৃষিকাজ করলেও বিভিন্ন সময়ে অন্য পেশায় চলে যাওয়ার চেষ্টা করে। অনেক সময় অন্য পেশায় গিয়ে কিছু কাজও করে। কারণ কৃষিকাজ থেকে যে পরিমাণ আয় আসে তা তার পারিবারিক চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট নয়। ৮৯৯ জন কৃষকের ওপর এই জরিপ পরিচালিত হয়েছে। এসব কৃষকের মধ্যে ৮৩.১৫ শতাংশই বলেছে তাদের খামারের আয় পারিবারিক চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট নয়।
জরিপের ফল বলছে, ৮৯৯ জন কৃষকের মধ্যে ১৯৩ জন কৃষকের ক্ষেতখামার থেকে মাসিক আয় মাত্র এক হাজার টাকা। ১০৫ জনের আয় এক হাজার এক থেকে চার হাজার টাকা, ১৫৫ জনের চার হাজার এক থেকে সাত হাজার টাকা, ১৫৪ জনের সাত হাজার এক থেকে ১০ হাজার টাকা, ৮০ জনের ১০ হাজার এক থেকে ২০ হাজার টাকা, ২১ জনের ২০ হাজার এক থেকে ৪০ হাজার টাকা এবং ২২ জন কৃষকের মাসিক আয় ৪০ হাজার টাকার বেশি। অর্থাৎ ৬০৭ জনের মাসিক আয় ১০ হাজার টাকার নিচে। এই চিত্র হাওরাঞ্চলের প্রায় জায়গাতেই লক্ষ্যণীয়। কৃষিতে সুযোগ সুবিধাহীন এই মন্দা চলতে থাকলে আগামীতে কৃষিশূন্য হয়ে পড়বে কৃষিনির্ভর বাংলাদেশ। তাই এখন থেকেই সরকারকে কৃষি ও কৃষক নিয়ে ভাবতে হবে। কৃষিজীবী সোনালী কারিগরকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে কৃষিতে ভর্তুকি বাড়াতে হবে। কৃষকদেরকে দিতে সর্বোচ্চ সুযোগ সুবিধা।
লেখক : কলামিস্ট।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • কিশোর-কিশোরীদের হালচাল
  • বলকানস : ইউরোপের যুদ্ধক্ষেত্র
  • সন্তানের প্রতি অভিভাবকের দায়িত্ব
  • শিক্ষার হার এবং কর্মসংস্থান প্রসঙ্গ
  • শিক্ষার রাজ্যে এক বিস্ময়
  • ডেঙ্গু ও বানভাসি মানুষ
  • শিল্প-সাহিত্যে ১৫ আগস্ট
  • ইমাম-মুয়াজ্জিন সার্ভিস রোলস-এর প্রয়োজনীয়তা
  • বাঙালির মুক্তিসনদ ঐতিহাসিক ৬ দফা
  • শিশুদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশে পরিবেশ
  • তিনি কোন দলের নয়, সমগ্র বাঙালির
  • ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম অধ্যায়
  • বঙ্গবন্ধুর ফিরে আসা
  • শিক্ষা ও নৈতিকতা
  • কুরবানির সূচনা
  • কুরবানি ও আমাদের করণীয়
  • উন্নয়নের মানবিকতা বনাম গতানুগতিকতা
  • বিশ্বাসের উপলব্ধি
  • নিরাপত্তাহীনতায় নারী
  • স্বাগতম ঈদুল আযহা
  • Developed by: Sparkle IT