ধর্ম ও জীবন

তাফসিরুল কুরআন

প্রকাশিত হয়েছে: ২৮-০৬-২০১৯ ইং ০১:৩৮:৪১ | সংবাদটি ৭৫ বার পঠিত

সূরা : বাক্বারাহ
[পূর্ব প্রকাশের পর]
ঘটনাটি ঘটে তওরাত অবতরণের পূর্বে। তখন মুসা (আ.) এর নবুওতের সত্যতা প্রমাণ করার জন্যে যেসব যুক্তি প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত ছিলো, আয়াতে ‘বাইয়্যিনাত’ বলে সেগুলোকেই বোঝানো হয়েছে। যেমন, লাঠি, জ্যোতির্ময় হাত, সাগর দ্বি-খন্ডিত হওয়া ইত্যাদি।
ইহুদীদের দাবির খ-নে আয়াতে বলা হয়েছে যে, তোমরা একদিকে ঈমানের দাবি কর, অন্যদিকে প্রকাশ্যে শিরকে লিপ্ত হও। ফলে শুধু মুসা (আ.) কেই নয়, আল্লাহকেও মিথ্যা প্রতিপন্ন করে চলেছ। কুরআন অবতরণের সময় হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর আমলে যেসব ইহুদী ছিলো, তারা গোবৎসকে উপাস্য নির্ধারণ করেনি সত্য; কিন্তু তারা নিজেদের পূর্ব-পুরুষদের সমর্থক ছিলো। অতএব তারাও মোটামুটিভাবে এ আয়াতের লক্ষ্য।
আয়াতে বর্ণিত কারণ ও ঘটনাসমূহের সারমর্ম এই যে, ভুমধ্যসাগর পাড়ি দেয়ার পর তারা একটি কুফরি বাক্য উচ্চারণ করে। পরে মুসা (আ.) এর শাসানোর ফলে যদিও তওবা করে নেয়, কিন্তু তওবারও বিভিন্ন স্তর রয়েছে। উচ্চস্তরের তওবার অভাবে তাদের অন্তরে কুফরের কালিমা থেকেই যায়। পরে সেটাই বেড়ে গিয়ে গোবৎস পূজার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কোনো কোনো টীকাকারের বর্ণনা মতে গোবৎস পূজা থেকে তওবা করতে গিয়ে তাদের কিছু লোককে হত্যা বরণ করতে হয় এবং কিছু লোক ক্ষমা প্রাপ্ত হয়। এদের তওবাও সম্ভবত” দুর্বল ছিলো। এছাড়া যারা গোবৎস পূজায় জড়িত ছিলো না, তারাও অন্তরে গোবৎস পূজারীদের প্রতি প্রয়োজনীয় ঘৃণা পোষণ করতে পারেনি। ফলে তাদের অন্তরে শিরকের প্রভাব কিছু না কিছু অবশিষ্ট ছিলো। মোটকথা, তওবার দুর্বলতা ও শিরকের প্রতি প্রয়োজনীয় ঘৃণার অভাবÑ এতদুভয়ের প্রতিক্রিয়ায় তাদের অন্তরে ধর্মের প্রতি শৈথিল্য দানা বেঁধে উঠেছিলো। এ কারণেই অঙ্গিকার নেওয়ার জন্য তুর পর্বতকে তাদের মাথার উপর ঝুলিয়ে রাখার প্রয়োজন দেখা দেয়।
আনুষাঙ্গিক জ্ঞাতব্য বিষয় :
প্রকৃতপক্ষে ইসলাম যে সত্যধর্ম, তা প্রমাণ করার জন্যে এ ঘটনাটি যথেষ্ট। এখানে আরও দু’টি বিষয় উল্লেখযোগ্য :
প্রথমত : নবী করিম (সা.) এর আমলে বিদ্যমান ইহুদীদের সঙ্গে উপরোক্ত যুক্তির অবতারণা করা হয়েছিলোÑ যারা তাঁকে নবী হিসেবে চেনার পরেও শত্রুতা ও হঠকারিতাবশতঃ অস্বীকার করেছিলো, সকল যুগের ইহুদীদের সঙ্গে নয়।
দ্বিতীয়ত : এখানে এরূপ সন্দেহ করা ঠিক নয় যে, মন ও জিহবা উভয়টি দ্বারাই কামনা হতে পারে। ইহুদীরা সম্ভবতঃ মনে মনে মৃত্যুর কামনা করেছে। উত্তর এই যে, প্রথমতঃ আল্লাহর উক্তি ‘কস্মিনকালেও তারা মৃত্যু কামনা করবে না’ এ সম্ভাবনাকে নাচক করে দিচ্ছে। দ্বিতীয়তঃ তারা মনে মনে মৃত্যু কামনা করে থাকলে, তা অবশ্যই মুখেও প্রকাশ করত। কারণ, এতে তাদেরই জয় হতো এবং নবী করিম (সা.) কে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার একটা সুযোগ পেয়ে যেত।
এরূপ সন্দেহও অমূলক যে, বোধ হয় তারা কামনা করেছে; কিন্তু তার প্রচার হয়নি। কারণ, সর্বযুগেই ইসলামের শত্রু ও সমালোচকদের সংখ্যা ইসলামের মিত্র ও শুভাকাক্সক্ষীদের সংখ্যার চাইতে বেশি ছিলো। এরূপ কোনো ঘটনা ঘটে থাকলে তারা কি একে ফলাও করে প্রচার করতো না যে, দেখ তোমাদের নির্ধারিত সত্যের মাপকাঠিতেও আমরা পুরোপুরি উত্তীর্ণ হয়েছি।
আরবের মুশরিকরা পরকালে বিশ্বাসী ছিলো না। তাদের মতে বিলাস-ব্যসন ও সুখ স্বাচ্ছন্দ্য সবই ছিলো পার্থিব। এ কারণে তারা দীর্ঘায়ু কামনা করলে তা মোটেই আশ্চর্যের বিষয় ছিলো না। কিন্তু ইহুদীরা শুধু পরকালে বিশ্বাসীই ছিলনা; বরং তাদের ধারণামতে পরকালের যাবতীয় আরাম-আয়েস ও নেয়ামতরাজি তাদেরই প্রাপ্য ছিলো। এরপরও তাদের পৃথিবীতে দীর্ঘায়ু কামনা করা বিষ্ময়কর ব্যাপার নয় কি?
সুতরাং পরকালে বিশ্বাস সত্ত্বেও তাদের দীর্ঘায়ু কামনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, পারলৌকিক নেয়ামত সম্পর্কিত তাদের দাবি সম্পূর্ণ অন্তঃসারশূন্য। প্রকৃত ব্যাপার তাদেরও ভালোভাবে জানা রয়েছে যে, সেখানে পৌঁছলে জাহান্নামই হবে তাদের আবাসস্থল। তাই যতোদিন বেঁচে থাকা যায়, ততোদিনই মঙ্গল।
[চলবে]

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT