পাঁচ মিশালী

চায়ের রাজ্য শ্রীমঙ্গলে একদিন

এখলাছুর রহমান প্রকাশিত হয়েছে: ২৯-০৬-২০১৯ ইং ০০:২৮:২৪ | সংবাদটি ১৭৩ বার পঠিত


শ্রীমঙ্গলের সারি সারি চা-বাগানের নয়নাভিরাম দৃশ্যে মুগ্ধ হয়ে ঈদের ছুটিকে কাজে লাগিয়ে আমার স্ত্রী-সন্তান ও ময়নুল ইসলাম নামের একজন সহকারী শিক্ষকের পরিবার নিয়ে বেড়াতে যাই সবুজের চাদর বিছানো চায়ের রাজধানী শ্রীমঙ্গলে।
শ্রীমঙ্গলে পৌঁছার পর একটু স্থির হয়ে দেখি দেশের নানা প্রান্ত থেকে শহরের কোলাহলে দিন কাটানো ক্লান্ত মানুষরা এসে ভিড় করেছেন সবুজের রাজ্য চায়ের রাজধানী শ্রীমঙ্গলে। সবুজ চায়ের বাগানের ফাঁকে ফাঁকে রংবেরঙের পোশাক পরা পর্যটকের ভিড়। কয়েক হাজার পর্যটকের ভিড়ে শ্রীমঙ্গল মুখর হয়ে উঠেছে। চা-বাগানঘেরা উঁচু-নিচু টিলা ঘেঁষে এখানে গারো, খাসি, ত্রিপুরা, মণিপুরিসহ নানা জাতির বাস। চা-বাগানের মণিপুরিপাড়ায় রয়েছে মণিপুরি হস্তশিল্পের বিশাল মেলা। শ্রীমঙ্গলের উত্তর-পশ্চিম পাশে কিছু অংশ হাইল হাওর ছাড়া পুরোটা উপজেলাই চা বাগান দ্বারা আবৃত। যখন মাইলের পর মাইল চা বাগানের ভেতর দিয়ে যাই তখন মনে হয়েছে বিশ্বের সকল সৌন্দর্য্য রাশি যেন আমাদের সামনেই। সবুজে মোড়ানো শ্রীমঙ্গল বিশ্বের সর্ববৃহৎ চা বাগান। চায়ের সাথে রয়েছে কাঠাল, লেবু, আনারস ও রাবার বাগান। অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর পশুপাখির বিচরণ নিমিষেই মুগ্ধ করে দেয় চোখ আর মনকে। পর্যটকরা পরিবার-পরিজন নিয়ে এসব জায়গায় ঘুরে ক্যামেরায় বন্দী করে নেন নিজের ছবিগুলো।
তবে ঈদের সময় অরণ্যে বন্য প্রাণীর আবাসস্থলে মানুষের ভীড়ের কারণে বাগানে মুক্ত থাকা প্রাণীগুলোকে তেমন চোখে পড়েনি। আমার মনে হচ্ছে, অরণ্যে প্রাণীগুলোকে শান্তিতে থাকতে দিলে তারাও হয়তো দেখা দেয়। অযথা হৈচৈ করে তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে বিঘিœত করা ঠিক নয়। চায়ের রাজ্য ভ্রমণের পর আমার স্কুলের শিক্ষিকা তাহমিনা বেগমের বাবা আব্দুল মুমিনের সাথে দেখা হয়। তিনি জকিগঞ্জের খলাছড়া গ্রামের বাসিন্দা। চাকরীর সুবাদে তিনি শ্রীমঙ্গলে বসবাস করেন। বেশ কয়েকদিন থেকে তিনি শ্রীমঙ্গলে আমন্ত্রন করছেন। এবার ঈদের ছুটিতে চায়ের রাজধানীতে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে হিসেবে মুমিন সাহেবের দাওয়াতে সাড়া দিয়ে উনার বাসায় যাই। সেখানে দুপুরের খাবার সেরে আবারো বেরিয়ে পড়ি প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করতে। নোহা গাড়ীযোগে টি-রিসোর্ট গ্রান্ড সুলতান দেখতে যাই। গ্রান্ড সুলতানের সামনে যখন গাড়ী পৌঁছে তখন সংশ্লিষ্ট একজন কর্মচারী জানায় গ্রান্ড সুলতানে প্রবেশ করতে হলে বুকিং কিংবা ভিআইপি হলে ভ্রমণ করা যাবে। বুকিং টিকেট সংগ্রহ করতে হলে বিশাল অংকের ব্যাপার। পরে আমি একজন কর্মচারীর সাথে কথা বলে নিজের পরিচয় দেই। পরিচয় পেয়ে ঐ কর্মচারী মোবাইল ফোনে তার উর্ধতন কর্মকর্তার সাথে কথা বলে ভিআইপি হিসেবে আমাদেরকে ভিতরে প্রবেশের সুযোগ দেন। ভিতরে প্রবেশ করে নতুন অভিজ্ঞতা। ঢেউ খেলানো পাহাড়ে সবুজে ঢাকা চারপাশ দেখতে দেখতে চায়ের পাতার ঘ্রাণ নেওয়ার অভিজ্ঞতা মনে রাখার মতো। গ্রান্ড সুলতান যেন এক আলিশান কারবার! বিশাল যজ্ঞের কাজ। পাঁচতারকা বিশিষ্ট টি-রিসোর্ট গ্রান্ড সুলতানে গিয়ে দাঁড়ালে এ কথাই যে কারও মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসবে।
এরপর যাই সিতেশ বাবুর চিড়িয়াখানায়। সেখানে গিয়েও জানতে পারি টিকেট সংগ্রহ করতে হবে। যাইহোক এবারও নিজের পরিচিত একজন সাংবাদিকের মাধ্যমে চিড়িয়াখানায় ফ্রি ভ্রমণের সুযোগ পাই। চিড়িয়াখানায় প্রবেশ করে দেখি খাচার ভিতরে নানা প্রজাতির প্রাণীর বসবাস। চিড়িয়াখানায়ও অসংখ্য মানুষের ভীড়। হঠাৎ দেখতে পেলাম চিড়িয়াখানার একজন কর্মী একটি ভাল্লুককে খাবার দিচ্ছেন। খাচার ভিতর থেকে ভাল্লুকটি খাচার বাইরে পর্যন্ত নখ বের করে দেয়। তখন আমি চিড়িয়াখানার ঐ কর্মীকে বললাম ভাল্লুকটা খাঁচার বেষ্টনি থেকে যেহেতু নখ বের করতে পারে সেহেতু কতটুকু নিরাপদ। প্রতিত্তোরে ঐ কর্মী জানালেন, তাদের সাথে ঐ প্রাণীদের একটা সম্পর্ক তৈরী হয়ে গেছে। কখনো ওরা তাদের উপর আক্রমণ করবেনা। যাইহোক আমি মনে করি, নিরাপত্তার জন্য প্রতিটি খাচার বেষ্টনি আরো ঘন করার প্রয়োজন।
সিতেশ বাবুর পার্ক দেখার পর রাত ৮টার দিকে বাড়ীর দিকে রওয়ানা হই। তখন এত সুন্দর দৃশ্যকে পিছনে ফেলে আসতে মন চায়নি। আমার মনে হয় শ্রীমঙ্গলের বাগানগুলো হাত নাড়া দিয়ে আমাদের বিদায় জানিয়ে বলেছে যাও আমায় ছেড়ে, সময় সুযোগ হলে আবার ফিরে আসিও আমায় দেখিতে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT