পাঁচ মিশালী

লজিং জীবন

সৈয়দ আহমদ প্রকাশিত হয়েছে: ২৯-০৬-২০১৯ ইং ০০:২৮:৫০ | সংবাদটি ২৪৭ বার পঠিত


নোয়াপাড়া গ্রামটি গোবিন্দগঞ্জ নতুন বাজার অথবা গোবিন্দগঞ্জ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় হতে প্রায় ৩/৪ কিলোমিটার দক্ষিণ পশ্চিমে ভটের খাল নদীটির দক্ষিণ তীরে অবস্থিত। বাজার বা বিদ্যালয় হতে রেল সেতু পার হয়ে নদীর দক্ষিণ পারের রাস্তা দিয়ে শিবনগরের পশ্চিম পাশে ভটেরখাল নদীর পূর্ব পারের রাস্তা দিয়ে পায়ে হেঁটে লজিং বাড়িতে যেতে হতো। এখন আর নদীর পারের রাস্তাটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত নয়। বর্তমানে সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়কের ভটেরকাল নদীর উপর সড়ক সেতু দিয়ে নদী পার হয়ে দক্ষিণ পাশের কালিদাসপাড়া (জিগলী) গ্রামের ভিতর দিয়ে আফজলাবাদ রেল স্টেশনের পাশ দিয়ে এবং শিবনগরের পূর্ব পাশ দিয়ে যে রাস্তাটি বাংলাবাজার পর্যন্ত গিয়েছে সেই রাস্তা দিয়ে নোয়াপাড়া গ্রামে যাওয়া যায়। আমার লজিং বাড়িটি নোয়াপাড়া গ্রামের নদীর পারস্থ পুরাতন মসজিদের পাশে। নদী ভাঙনের কারণে মসজিদটি স্থানান্তর করে গ্রামের ভিতরে নেওয়া হয়েছে। আমার নোয়াপাড়াস্থ লজিং অভিভাবকের নাম ছিল মরহুম মোঃ হরমুজ আলী। আমাকে আমার বন্ধু মোঃ রমিজ উদ্দিন বিকালের দিকে লজিং বাড়িতে নিয়ে গেলো, তখন লজিং অভিভাবক বাড়িতে ছিলেন না। উনার ভাতিজা মোঃ আব্দুল জলিল ভাই আমাকে তাদের পুবের ঘরে বসতে দিয়ে বল্লেন, উনার চাচা এখন বাড়িতে নেই। উনি আসলে দেখা হবে। এখন থেকে আমাকে এ ঘরেই থাকতে হবে। রমিজ উদ্দিন আমাকে লজিং-এ পৌঁছে দিয়ে চলে গেলো। আমি নদীর পারের মসজিদে নামাজ পড়তে গেলাম। নদীর অপর পারে গ্রামটির নাম কৃষ্ণনগর বা রাওলী নামেও পরিচিত। সেখানে ‘আফজল শাহ’ নামের একজন পীর সাহেবের মাজার রয়েছে। পীর সাহেবের জনপ্রিয়তা ও সুনামের কারণে গোবিন্দগঞ্জ রেল স্টেশনের নাম ‘আফজলাবাদ’ রাখা হয়েছিল। প্রতি বছরেই পীর সাহেবের বাড়িতে ওরস হয়ে থাকে। ওরসের সময় প্রচুর মানুষের সমাগম হয়ে থাকে। আমরা নদীর দক্ষিণ পারের মসজিদের বাউন্ডারী দেওয়ালে বসে ওরস শরীফের তামাশা দেখতাম। মসজিদে নামাজ শেষে সন্ধ্যায় লজিং বাড়িতে ফিরে আসলাম। এই দিন থেকেই নোয়াপাড়া গ্রামে আমার ৪র্থ লজিং শুরু হল।
প্রথমদিন সন্ধ্যায় শুধু ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে পরিচিত হলাম। অভিভাবকের ভাতিজা আব্দুল মন্নাফ, আব্দুর রউফ আমার ছাত্র। তারা রাধানগর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিল। রাতের খাবারের সময় হওয়ায় তাদের পশ্চিম পাশের মূল ঘরে যাওয়ার জন্য ছাত্র আব্দুল মন্নাফ আমাকে সাথে নিয়ে গেল। ঘরে ঢুকেই নজরে পড়ল কালো হালকা পাতলা মাঝ বয়সী একজন রাসভারী লোক মুর্তার চাটিতে ঘরের এক কোণে বসে আছেন। আমি ঘরে ঢুকেই সালাম দিলাম। উনি আমার সালামের উত্তর দিয়ে আমাকে পাশের একটি মুর্তার চাটিতে বসতে বল্লেন। তিনিই যে আমার লজিং অভিভাবক জনাব হরমুজ আলী পরে জানতে পারলাম। মুর্তার ছোট একটি চাটিতে বসার পর, তিনি আমাকে আমার নাম ঠিকানা জিজ্ঞাস করলেন। আমি যথারীতি উত্তর দিলাম। তিনি ধীরস্থিরভাবে আমাকে বল্লেন, ‘তোমাকে আমার বাড়িতে লজিং দিলাম শুধু আমার ছেলে-মেয়েকে পড়ানোর জন্যই নয় বরং তুমি নিজেও ভালোভাবে লেখাপড়া করার জন্য। তোমাকে লজিং দেওয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো, আমাদের গোবিন্দগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়টিতে ছাত্র-ছাত্রী বৃদ্ধি করে স্কুলটিকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য, তাই শুধু আমার ছেলে মেয়েই নয়, তোমাকেও লেখাপড়া করে মানুষ হতে হবে এবং স্কুলের সুনাম বৃিদ্ধ করতে হবে। তবে হ্যাঁ, তোমাকে আমার বাড়িতে লজিং থাকতে হলে কিছু নিয়মনীতি মেনে চলতে হবে। তুমি বাচ্চা মানুষ তাই তোমাকে কথাগুলো আগেই জানিয়ে রাখলাম যাতে সাবধানে চলাচল করতে তোমার কোনো অসুবিধা না হয়।’
‘আমি মধ্যবিত্ত মানুষ, ডাল-ভাত যা জোগাড় করতে পারি, তওফিক অনুযায়ী তাই তোমাকে খেতে হবে। তুমি আমার বাড়িতে থাকবে, লেখাপড়া করবে, আমার ২/৩ জন ভাতিজাসহ আমার একমাত্র মেয়েকে পড়াবে আর নদীর পারস্থ মসজিদটিতে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়বে। আমার গ্রামের ছেলেরা বেশি ভালো নয় তাই আমার বাড়িতে থাকতে হলে গ্রামের কারো সাথে আড্ডা-ইয়ার্কি দিতে পারবে না। তোমার স্কুলের ছাত্র ছাড়া গ্রামের কারও সাথে মিশতে বা আড্ডা দিতে দেখলে বা তোমার বিরুদ্ধে গ্রামের কেউ নালিশ দিলে, আমার বাড়িতে লজিং থাকাতো বটেই, স্কুলেও আর তোমার লেখাপড়া হবে না। তাই আমার বাড়িতে লজিং থাকতে হলে সোজা হয়ে, ভালো ছেলের মতো বা একজন ভদ্র-ন¤্র ছাত্র হিসাবে থাকতে হবে।’ ইতিমধ্যে আমার লজিং মিস্ট্রেস আমাদের জন্য রাতের খাবার দিলেন। তিনি আমাকে খাবার খেতে বলে, নিজেও খেতে আরম্ভ করলেন। কিছুক্ষণ পর খাবার খেতে খেতেই বল্লেন, ‘আমার একমাত্র মেয়ে এখনো স্কুলে যাচ্ছে না, তাকে একটু খেয়াল করে পড়াতে চেষ্টা করবে। যদি ভদ্রভাবে চলো তবে তোমার কোনো অসুবিধা হবে না। আমার বাড়িতে তোমার যতদিন সম্ভব লজিং থাকতে পারবে। হ্যাঁ গ্রামের কোনো ছেলে যদি তোমাকে ডিস্ট্রার্ভ করে বা তোমার চলাফেরায় অসুবিধার সৃষ্টি করে তবে আমাকে সাথে সাথে জানাবে। গ্রামের সবাই আমাকে ভালোভাবে চিনে। আশা করি তোমার কোনো অসুবিধা হবে না। এখন থেকে তুমি আমার বাড়ির একজন সদস্য এবং তোমার সকল দায়িত্ব আমার।’
আমি মাত্র ৭ম শ্রেণিতে পড়ছি, বয়স কম থাকায় জ্ঞান বুদ্ধিও তেমন নেই। তাছাড়া এলাকায় আমার পরিচিতজন বলতে কেউ ছিল না বলেই অভিভাবক জনাব হরমুজ আলী চাচার কথায় ভয় পেয়েছিলাম। তাই প্রথম দিন থেকেই যতদিন এই লজিং বাড়িতে ছিলাম চাচাজীকে ভীষণ ভয় পেতাম। তাই রাস্তাঘাটে কোনো খারাপ কাজের দিকে যেতে বা অনর্থক আড্ডা দিতে উনার কথাগুলো স্মরণে আসতো। লজিং বাড়ির এমন কড়াকড়ি ও নিজের সতর্কতা, ভয় ও সাবধানতার জন্যই হয়তো আমি লেখাপড়া করতে বা শিখতে পেরেছি। কেননা তখন লেখাপড়া ছাড়া বাজে আড্ডা, অহেতুক ঘুরাঘুরি, কথা ও কাজ থেকে সর্বদা বিরত থাকতে চেষ্টা করেছি। নোয়াপাড়া লজিং অভিভাবকের এমন কড়াকড়ি ও সাবধানতার কারণেই লেখাপড়া ছাড়া অহেতুক ঘুরাঘুরি করা ও অবান্তর কাজ থেকে সবসময় বিরত থেকেছি। ভালো ছাত্র হিসাবে বিদ্যালয়টিতে আমার যথেষ্ট সুনাম ছিল, ক্লাসের শিক্ষকবৃন্দও আমাকে বেশ ¯েœহ করতেন। লজিং বাড়িস্থ নোয়াপাড়া গ্রামের সবাই আমাকে ভালো ছেলে হিসাবে ¯েœহ করতেন। ছোটরা তো বটেই খেলার সাথীরাও আমাকে শ্রদ্ধা করতো। আমি কোনো দিন কারও সাথে খারাপ ব্যবহার করতাম না। এটা আমার স্বভাবসিদ্ধও ছিল না।
নোয়াপাড়ার লজিং বাড়িতে আত্মীয় মেহমান আসলে সবাইকে মুর্তার ছোট সাইজের চাটিতে বসতে দেওয়া হতো। আমাকে প্রথম দিনই মুর্তার চাটিতে বসে খাবার খেতে দেওয়া হয়েছিল এবং প্রতিদিনই চাটিতে বসেই আহার করতাম। তখনকার সময় অত্রাঞ্চলে মুর্তার চাটি বা আদির ব্যবহার অধিক প্রচলন ছিল। তখন কারও বাড়িতে ঘুমানোর জন্য সামর্থ থাকলেও চকি, খাট বা পালঙ্ক ব্যবহার করার প্রচলন ছিল নগন্য। তখন প্রায় বাড়িতেই মুর্তার চাটি বিছিয়ে ঘুমানোর ব্যবস্থা ছিল। মুর্তার চাটি অত্যন্ত শীতল হয়, তাই গরমের দিনে মুর্তার বেত দ্বারা সৌখিনভাবে বুনায়নকৃত চাটি বিছিয়ে ঘুমানো হতো। আত্মীয় মেহমানবৃন্দকেও মুর্তার চাটিতে বসতে দিয়ে আপ্যায়ন করা হতো। তখনকার সময় মুর্তার সৌখিন চাটির ব্যবহার অত্রাঞ্চলের ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে গণ্য করা হতো। তখন প্রায় বাড়িতেই মুর্তা গাছের বাগান ছিল এবং নিজেরাই সুন্দর করে মুর্তার চাটি তৈরি করতো। মুর্তা এক প্রকার উদ্ভিদ জাতীয় গাছ। এর ছাল থেকে বেত তৈরি করে চাটিগুলো তৈরি করা হতো। সিলেটের মুর্তার চাটি এখন বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। মুর্তার তৈরি শীতলপাটির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে গরমের দিনে তা ঠান্ডা অনুভূত হয়। তাই অনেকেই গরমের দিনে শীতল পাটি বিছানায় বিছিয়ে ঘুমাতে দেখা যায়। সিলেট জেলার বালাগঞ্জ উপজেলা শীতল পাটির জন্য বিখ্যাত। সিলেট বিভাগের প্রতিটি উপজেলাতেই কম বেশি মুর্তার চাটি বা শীতল পাটি তৈরি করা হয় এবং সিলেট অঞ্চলে তার কদরও খুব বেশি। উন্নতমানের কারুকার্য খচিত মুর্তার চাটি বা শীতলপাটি বা নামাজের জন্য ছোট পাটির কদর খুব বেশি। শীতলপাটির বুনন, তৈরি ও ব্যবহারের কাহিনী অনেক দীর্ঘ। বৃটিশ আমল থেকেই তার কদর ছিল এবং এখনো বিদ্যমান। বৃটিশ রাজপ্রাসাদে শীতল পাটি ব্যবহার হতো। ইউনেস্কো কর্তৃক শীতলপাটিকে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়ায় শীতলপাটির কদর সারা বিশ্বেই বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকার কর্তৃক মুর্তা চাষের পৃষ্ঠপোষকতা দিলে শীতল পাটির কারিগরদের যেমন কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি পেতো তেমনি শীতপাটি বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হতো। কেননা দেশ বিদেশে শীতল পাটির কদর বৃদ্ধি পাচ্ছে।
আমি কয়েক মাসের মধ্যেই লজিং বাড়িতে মোটামুটি সবার সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলাম। হরমুজ আলী চাচা আমাকে বেশ ¯েœহ করতেন। আমার ছাত্র-ছাত্রী সবাই আমাকে বেশ ভালোবাসতে শুরু করেছিল। আং মন্নাফ ও আং রউফ আমার ছাত্রদ্বয় বেশ ভালো ফলাফল করায় বাড়ির সবাই আমাকে ¯েœহ করতো। জনাব আং মতিন লজিং অভিভাবকের ভাতিজা লামাকাজি মাদ্রাসায় লেখাপড়া করতো। সে আমাকে সবসময় বলতো যে, আমি অবশ্যই এস.এস.সিতে ভালো ফলাফল করবো। সে লামাকাজিতে লজিং থেকে মাদ্রাসায় লেখাপড়া করতো। সে বাড়িতে আসলে যেহেতু সে আমার সমবয়সী তাই তার সাথেই সর্বদা ঘুরে বেড়াতাম। ইতিমধ্যে তার ছোট ভাই জনাব আং ছত্তারকে লন্ডন পাঠানোর তুড়জোড় চলছে। আমি ইতিমধ্যে অষ্টম শ্রেণিতে উন্নীত হয়েছি। অভিভাবক হরমুজ আলী চাচা একদিন আমাকে ডেকে নিয়ে বল্লেন, ‘আমার ভাতিজা আং ছত্তারকে লন্ডনে পাঠানোর প্রায় সব ব্যবস্থা শেষ করে ফেলেছি। যেহেতু অন্যের ছেলে বানিয়ে বিদেশে পাঠানো হবে তাই তার নকল পিতামাতা ও আত্মীয়-স্বজনের নাম তাকে মুখস্ত করাতে হবে। যেহেতু সে লেখাপড়া জানে না তাই এখন থেকে আগামী তিন মাসের মধ্যে তুমি তাকে এই নকল নামগুলো মুখস্থ করাতে চেষ্টা করবে। আমি চাচার কথামত সেদিন থেকেই তাকে, তার নকল আত্মীয় এবং পিতামাতার নাম শিখানোর কাজে ব্যস্ত থাকলাম।
তখনকার সময় সিলেট অঞ্চলের অনেক মানুষ লন্ডন যাবার জন্য উদগ্রিব ছিল। যেকোনো উপায়ে মানুষ লন্ডন যাওয়ার জন্য চেষ্টা করতো। লন্ডন যাওয়ার পক্ষে বিপক্ষে তখনকার পত্র পত্রিকা ও রেডিওতে নানা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হতো। তখন একটি গান খুব বেশি ভাইরাল ছিল। ‘ও আমার লন্ডনী ভাইসাব, আমায় তুমি লন্ডন ......’। আমার লজিং বাড়ির আং ছত্তারকে উনার চাচা লন্ডন পাঠানোর জন্য জগন্নাথপুর তাদেরই এক দূরাত্মীয়ের সাথে কন্ট্রাক করেন। সে অনুযায়ী উক্ত আত্মীয়কে নকল পিতা সাজিয়ে ও একজন নকল মা বানিয়ে ভাতিজা আং ছত্তারসহ মোট চারজন নকল সন্তানকে নিয়ে উক্ত লন্ডনী তাদেরকে লন্ডন নিয়ে যান। বর্তমানে তারা লন্ডনের স্থায়ী সিটিজেন এবং বাংলাদেশেও তারা প্রতিষ্ঠিত। পরবর্তীতে হরমুজ আলী চাচা উনার এক মাত্র মেয়ে রোকেয়া বেগমকে উক্ত ভাতিজা লন্ডনী আং ছত্তারের সাথে বিয়ে দিয়ে মেয়েকেও লন্ডন পাঠিয়েছিলেন। তারা এখন সুখে শান্তিতে লন্ডনে বসবাস করছে। আমার সাথে তাদের দেখা না হলেও আমি তাদের সুখী জীবন ও দীর্ঘায়ু কামনা করছি।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT