পাঁচ মিশালী

সে দিনগুলোর কথা

প্রফেসর মো. আজিজুর রহমান লসকর প্রকাশিত হয়েছে: ২৯-০৬-২০১৯ ইং ০০:২৯:৪৮ | সংবাদটি ২১৪ বার পঠিত


শামসুন নূর বিএ, আমাদের নবম ও দশম শ্রেণিতে ইংরেজি পড়াতেন। তখন ইংরেজি পাঠ ছিল কঠোরভাবে গ্রামার নির্ভর। শামসুন নূর স্যার তা আমাদের জন্য অত্যন্ত সহজ করে তুলতেন। আমার বিশ্বাস, আমার ইংরেজি শিক্ষার মূল ভিত্তি গড়ে উঠেছিল স্কুলে এবং তা শামসুন নূর স্যারের বদৌলতে। এখনো কানে বাজে স্যারের ছন্দময় কন্ঠ, ‘I am going, We are going, You are going, You are going, He is going, They are going?’
পাঠদানের ফাঁকে ফাঁকে শামসুন নূর স্যার মাঝে মাঝে উপদেশমূলক গল্পও বলতেন। স্যারের বলা একটি গল্প এখনো মনে পড়ে। একজন উস্তাদ তাঁর তিন জন ছাত্রকে অনেক দিন পড়ানোর পর একদিন পরীক্ষা নেবার উদ্দেশ্যে প্রত্যেক ছাত্রের হাতে একটি কবুতর ও একখানা ছুরি দিয়ে বললেন, ‘যাও প্রত্যেকে কবুতর জবাই করে নিয়ে এসো। শর্ত হলো, আল্লাহ যেন কিছুতেই না দেখেন!’
অতঃপর একজন ছাত্র অল্পক্ষণ পরই তার হাতের কবুতর জবাই করে রক্তমাখা ছুরিসহ মহাদর্পে উস্তাদের নিকট ফিরে এল! উস্তাদ জিজ্ঞেস করলেন,
-আল্লাহ দেখেননি তো?
-না, হুজুর! আল্লাহ দেখেননি! ছাত্রের জবাব।
-কোথায় গিয়ে জবাই করলে? উস্তাদের প্রশ্ন।
-দরোজার আড়ালেই! জবাব দিল ছাত্র। বেশ কিছু সময় পর দ্বিতীয় ছাত্র জবাইকৃত কবুতর নিয়ে উস্তাদের নিকট হাজির হলো। উস্তাদ জিজ্ঞেস করলেন,
-আল্লাহ দেখেননি তো?
-না, দেখেননি।
-কোথায় গিয়ে জবাই করলে?
-দরোজা-জানালা ভালো করে বন্ধ করে ঘরের মধ্যে অন্ধকারে জবাই করেছি। আল্লাহ দেখতে পাননি!
-অতঃপর দিন প্রায় অতিক্রান্ত হতে চললো। তৃতীয় ছাত্রটির খবর নেই। দিবসের অবসানে মাগরিবের আগে ছাত্রটি ক্লান্ত অবসন্ন দেহে জীবন্ত কবুতর ও ছুরিসহ ফিরে এসে বললো,
-হুজুর! অনেক চেষ্টা করলাম! কিন্তু আল্লাহর দৃষ্টি থেকে নিজকে আড়াল করতে পারলাম না। অন্ধকার কক্ষেও দেখি আল্লাহ আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। দীঘির গভীর পানির নিচে গেলাম, সেখানেও দেখি আল্লাহ আমার দিকে চেয়ে আছেন!
উপরোক্ত উপদেশমূলক গল্পটি শামসুন নূর স্যারকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে আমি বহুবার আমার ছাত্রদেরকে বলেছি। পবিত্র কুরআনে বর্ণিত মূসা আঃ ও খিজির আঃ-এর চমকপ্রদ কাহিনী শামসুন নূর স্যারের কাছ থেকেই প্রথম শুনেছিলাম।
স্কুল জীবন সমাপ্তির অনেক দিন পর তখন আমি কলেজে অধ্যাপনা করি, স্যারের শেখঘাটের বাসায় ক’দিন তাঁকে দেখতে গিয়েছিলাম। আমার বড় ভাই আব্দুর রহমানের সহপাঠী জহির উদ্দিন আমিন ভাইর সাথে একদিন স্যারের বাসায় গিয়েছিলাম। স্যার খুব খুশি হয়েছিলেন। অনেক দিন হয় স্যার ইন্তেকাল করেছেন। এ মুহূর্তে শামসুন নুর স্যারসহ পরলোকগত আমার সকল শিক্ষকের রূহের মাগফেরাত কামনা করছি। এখন আফসোস হয়, শিক্ষকগণ জীবিত থাকাকালে কেন বার বার তাঁদের বাসায় গিয়ে দেখা করলাম না!
আব্দুল মান্নান স্যার ছিলেন পুরোপুরি বিজ্ঞান মনস্ক ব্যক্তি। তিনি গণিত ও বিজ্ঞান পড়াতেন। ছাত্ররা অতি আগ্রহের সাথে স্যারের ক্লাসে উপস্থিত হতো। বিজ্ঞানের অনেক প্রশ্নের উত্তরে চিত্র এঁকে দিতে হয়, যা অধিকাংশ ছাত্রের জন্য দুরূহ ছিল। একদিন আমাদের একজন সহপাঠী স্যারকে জিজ্ঞেস করেছিল,
-স্যার! উত্তরের সাথে চিত্র না দিলে কি হবে না?
-বিজ্ঞানের প্রশ্নপত্রে যদি লেখাও থাকে যে, চিত্রের প্রয়োজন নেই, তাহলেও চিত্র দিতে হবে!
প্রসঙ্গক্রমে একদিন আব্দুল মান্নান স্যার ক্লাসে বলেছিলেন,
-প্রাণী জগতে মানুষ সবচে বুদ্ধিমান। মানুষের মগজেরও ওজন বেশি। এজন্য মানুষ পানিতে ডুবে যায়। ভাসতে পারে না। তখন আমি স্যারকে জিজ্ঞেস করেছিলাম,
-স্যার! মানুষের মধ্যে যে একেবারে নির্বোধ, বুদ্ধিহীন! নিশ্চয় তার মগজ ছোট ও হালকা হবে। সে কি পানিতে ভাসবে?
-নির্বোধ মানুষেরও মগজের ওজন অন্য যে কোন ইতর প্রাণীর মগজের ওজনের চেয়ে বেশি। তাই সেও ডুববে! সাথে সাথে জবাব দিয়েছিলেন আব্দুল মান্নান স্যার।
আব্দুল মান্নান স্যার সম্ভবত শৈশবে পলিও রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকবেন। তাই স্যারের একটি পা অস্বাভাবিক ছিল! কিন্তু তাঁর জ্ঞান পিপাসা ও অধ্যবসায়ে কোন কমতি ছিল না! তাই আমাদের স্কুল ত্যাগের পরই স্যার স্কুল শিক্ষকের চাকুরি ছেড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে যথাসময়ে গণিতে এমএসসি, ডিগ্রী অর্জন করেন এবং সরকারি কলেজে অধ্যাপনায় যোগদান করেন। কর্ম জীবনের শেষ পর্যায়ে আব্দুল মান্নান স্যার এম.সি কলেজে গণিত বিভাগের প্রফেসর ও বিভাগীয় প্রধান হিসেবে যোগদান করেছিলেন। তখন স্যার আমাকে এম.সি কলেজে অধ্যাপনায় নিয়োজিত দেখে খুব খুশি হয়েছিলেন। কিছুদিন পর স্যার এম.সি কলেজের অধ্যক্ষের পদ অলংকৃত করেছিলেন। ১৯৯২ সালে রোটারেক্ট ক্লাব কর্তৃক সিলেটে আমার একক চিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রিন্সিপাল প্রফেসর আব্দুল মান্নান বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। তা আমার জন্য আনন্দের বিষয় ছিল। উল্লেখ্য, উক্ত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছিলেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ও তদানীন্তন ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. সদর উদ্দিন আহমদ চৌধুরী।
প্রসন্ন কুমার শর্মা (বিদ্যাবিনোদ) স্যারকে আমরা পেয়েছিলাম তাঁর বৃদ্ধাবস্থায়। তিনি নবম ও দশম শ্রেণিতে আমাদের বাংলা পড়াতেন। ছাত্রদের প্রতি তিনি ছিলেন অত্যন্ত ¯েœহপরায়ণ। ছাত্ররাও তাঁকে আন্তরিকভাবে শ্রদ্ধা করত। পড়ানোর ফাঁকে ফাঁকে তিনি উপদেশমূলক বক্তব্য রাখতেন। মাঝে মাঝে স্যার ব্যতিক্রমি প্রশ্ন করতেন। একদিন স্যার বললেন, ‘সর্বশক্তিমান ¯্রষ্টা সব করতে পারেন। তিনি সৃষ্টি করেন, ধ্বংসও করেন। ¯্রষ্টা জীবন দান করেন, মৃত্যুও ঘটান।’ অতঃপর স্যার আমাদের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করলেন, ‘বলতো দেখি, ¯্রষ্টা কি করতে পারেন না?’ স্যারের এ প্রশ্ন শুনে সমস্ত ক্লাস নিশ্চুপ! সবাই মনে মনে উত্তর খোঁজছে, ¯্রষ্টা কি করতে পারেন না? আর স্যার ঘুরে ফিরে একই প্রশ্ন বার বার করে চলেছেন! অথচ আমরা কেউই সঠিক উত্তর দিতে পারছি না। ক’জন ছাত্র আন্দাজের উপর ভরসা করে এটা ওটা বলছে! সবই ভুল! একজন সহপাঠী বলেছিল, ‘¯্রষ্টা বিয়ে করতে পারেন না!’ শুনে সবাই হাসলো। স্যারও হাসলেন। অতঃপর আমরা সবাই অক্ষমতা স্বীকার করে বললাম, স্যার। আপনিই বলুন, ¯্রষ্টা কি করতে পারেন না? অবশেষে স্যার মৃদু হেসে দৃঢ়কন্ঠে বললেন, ‘¯্রষ্টা অবিচার করতে পারেন না।’ তখন আমাদের মনে হয়েছিল- উত্তরটি খুবই সোজা ছিল। কিন্তু আমরা কেউ সঠিক উত্তর দিতে না পারায় দারুন আফসোস করতে লাগলাম।
১৯৬০ সালে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের একমাত্র শিক্ষা বোর্ড, ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের অধীন অনুষ্ঠিত ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় আমাদের স্কুলের ছাত্র খসরুজ্জামান চৌধুরী দ্বিতীয় স্থান অর্জন করায় স্কুল থেকে তাঁকে এক সংবর্ধনা দেয়া হয়। এতে প্রসন্ন কুমার স্যার একটি চমৎকার গান নিজ কন্ঠে পরিবেশন করেছিলেন-
‘আমি চাই এমন মানুষ,
আমি চাই এমন প্রাণ!
বাক্যে যার অগ্নি ঝরে,
হৃদয়ে যার আকাশ খান!...’
রজনী কান্ত শি স্যারকেও পেয়েছিলাম তাঁর বৃদ্ধাবস্থায়। যদ্দুর মনে পড়ে তখন আমি পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ি। তিনি আমাদের গণিত ও ড্রয়িং এর ক্লাস নিতেন। স্যার ছিলেন খুব কড়া মেজাজের। ক্লাসের কোন ছাত্র দুষ্টামি করলে সাথে সাথে তিনি ডাস্টার ছোড়ে মারতেন। কক্ষের পেছনের বেঞ্চে বসা অর্থাৎ দূরের ছাত্রের প্রতি তাঁর ছোড়া ডাস্টারটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হতো না।
তখন ক্লাস টিচাররা প্রতি মাসের পনের তারিখ নিজ নিজ ক্লাসের ছাত্রদের কাছ থেকে টিউশন ফি আদায় করতেন। টিউশন ফি-কে সবাই বলতো বেতন। বেতন আদায়ের কাজে ক্লাস-টিচারদের প্রায় সারা দিন কেটে যেত। তাই ঐ দিন শিক্ষক পাঠদান করতে পারতেন না।
এইডেড হাইস্কুলে তখন নিয়ম ছিল বার্ষিক পরীক্ষার রেজাল্টে ছাত্রের অবস্থান সম্ভবত পাঁচ বা দশের মধ্যে থাকলে মাসিক বেতন ফুল-ফ্রি হয়ে যেত এবং পরবর্তী বার্ষিক পরীক্ষাগুলোয় সংশ্লিষ্ট ছাত্র অকৃতকার্য না হলে ফুল-ফ্রি দশম শ্রেণি পর্যন্ত অব্যাহত থাকত। এতে ছাত্রের অভিভাবকের আর্থিক অবস্থাও বিবেচনা করা হতো। আমি চতুর্থ শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে উত্তীর্ণের সময় আল্লাহর রহমতে দ্বিতীয় স্থান লাভ করেছিলাম এবং ফুল-ফ্রি অর্জনের সৌভাগ্য হয়েছিল, যা দশম শ্রেণি পর্যন্ত বলবৎ ছিল। তাই স্কুল জীবনে আমি কেবল চতুর্থ শ্রেণিতে মাসিক বেতন পরিশোধ করেছিলাম। তবে ষান্মাসিক ও বার্ষিক পরীক্ষার ফি সব সময় পরিশোধ করতে হয়েছিল। তখন চতুর্থ শ্রেণিতে মাসিক বেতন সম্ভবত এক টাকা বা দেড় টাকা মাত্র ছিল। এদিকে তখন আমার আব্বা কেবল পেনশনের অর্থ দিয়ে বড় পরিবার ভরণপোষণে খুবই হিমশিম খাচ্ছিলেন। আমার বেতন ফুল-ফ্রি তাঁর আর্থিক অসচ্ছলতা কিঞ্চিত লাগব করে থাকবে।
সেকালে স্কুল-কলেজে পাঠ্যপুস্তক ঘন ঘন পরিবর্তন হতো না। বিভিন্ন শ্রেণিতে নির্ধারিত পাঠ্যপুস্তক অনেক বছর অপরিবর্তিত থাকত। তাই পুরানো পুস্তকের ব্যবহার খুবই স্বাভাবিক ছিল। পুরাতন পুস্তক অর্ধেক মূল্যে বিক্রয় হতো। নতুন শ্রেণিতে উত্তীর্ণ ছাত্ররা সিনিওর ছাত্রদের কাছ থেকে অর্ধেক মূল্যে পুস্তক ক্রয় করে বৎসরান্তে জুনিওর ছাত্রদের কাছে ঐ একই মূল্যে বিক্রয় করত। তখন মধ্যমাকারের একটি পুস্তকের মূল্য দেড় বা দু’টাকা মাত্র ছিল। কাগজের দামও ছিল কম।
তখনকার দিনে দেশে দ্রব্যাদির ওজন মাপতে মণ, সের, ছটাক ইত্যাদি একক ব্যবহারের প্রচলন ছিল। চার কাচ্চায় হতো এক ছটাক, চার ছটাকে এক পোয়া, চার পোয়ায় এক সের এবং চল্লিশ সেরে এক মণ হতো। তখনকার এক সের সমান বর্তমানে প্রচলিত ০.৯৩৩ কেজি হয়ে থাকবে। মুদ্রার ক্ষেত্রে চার পয়সায় এক আনা এবং ষোল আনায় এক টাকা হতো। চক্রাকার এক পয়সার ধাতব মুদ্রার (Coin) মধ্যে একটি বড় ছিদ্র ছিল। তাই একে লোকে কানা পয়সা বলত। ঘনিষ্ঠ জনের কাছে নিজের আর্থিক দুরবস্থা প্রকাশে কাউকে বলতে শোনা যেত, ‘আমার পকেটে এক কানা পয়সাও নেই!’ উল্লেখ্য, তদানীন্তন পাকিস্তানের স্বৈর শাসক প্রেসিডেন্ট জেনারেল মুহাম্মদ আইয়ুব খানের আমলে ১৯৬১ সালে এতদঅঞ্চলে দশমিক পদ্ধতি চালু হয়।
তখন রজনী স্যার আমার বড় ভাই আব্দুর রহমান-এর ক্লাস-টিচার। বড় ভাইর কাছ থেকেই ঘটনা শোনেছিলাম। রজনী স্যার ছাত্রদের কাছ থেকে টিউশন ফি আদায়ে ব্যস্ত। একজন ছাত্র কৌতুক করতে বেতনের সমুদয় অর্থ কানা পয়সায় রূপান্তর করে সবগুলো পয়সা একত্রে একটি তারের সাহায্যে ঝুঁটি বানিয়ে রজনী স্যারের হাতে তোলে দিয়েছিল। পয়সার ঝুঁটিকে চাবির ঝুঁটির মতো দেখাচ্ছিল। তা লক্ষ করে ক্লাসের ছাত্ররা মুখ টিপে হাসছিল। স্যার বিরক্ত হলেও সৌভাগ্যক্রমে রাগ করেননি। তিনি কেবল বলেছিলেন, ‘তুই আবার আমাকে কি ঝামেলায় ফেললি!’

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT