সাহিত্য

ডিজিটাল সিলেট এক্সপ্রেস

সৈয়দ মবনু প্রকাশিত হয়েছে: ৩০-০৬-২০১৯ ইং ০০:২৩:১৮ | সংবাদটি ২১২ বার পঠিত

ট্রেনের টিকেট এখন আর আগের মতো ষ্টেশনের কাউন্টারে দাঁড়িয়ে কিংবা চোরাই পথে খরিদ করতে হয় না। সব চলে এখন অনলাইনে। বেশ আগেই বাংলাদেশের রেলওয়েতে যোগ হয়েছে সর্বাধুনিক হাইস্পিড কোচ। ট্রেনের গতি এখন প্রতি ঘন্টায় ১৫০ কিলোমিটার। দু’ঘন্টার মধ্যে ট্রেন সিলেট থেকে ঢাকায় পৌঁছে যায়। প্রতিদিন সময় মতো ট্রেন প্লাট ফরম ছাড়ে এবং সময় মতো পৌঁছে। প্রতি দু’ঘন্টা পর ট্রেন সিলেট থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে যায়। শুধু চাকুরি কিংবা ব্যবসার জন্য কেউ এখন ঢাকার মারাত্মক যানজট আর পলোশনের মধ্যে বসবাস করে না। শরিফ সাহেব এক সময় চাকুরীর জন্য ঢাকায় থাকতেন। কিন্তু এখন প্রতিদিন সিলেট থেকে ঢাকায় গিয়ে অফিস করেন। ‘ডিজিটাল সিলেট এক্সপ্রেস’ চালু হওয়ার পর থেকে তিনি যাওয়া-আসা করেন ট্রেনে। সকালে ঘুম থেকে উঠে গোসল এবং নাস্তা শেষে তিনি সাতটা পচল্লিশ মিনিটে ষ্টেশনে আসেন। ঠিক আটটায় ট্রেন প্লাট ফরম ছাড়ে।
শরিফ সাহেব ‘ডিজিটাল সিলেট এক্সপ্রেস’ ট্রেনে বসে মাঝেমধ্যে ভাবেন যুগ বদলের কথা। ছোটবেলা তিনি কি দেখেছেন আর এখন কি? তার বয়স যখন পাঁচ-ছয় ছিলো তখন ট্রেনের গতি কত স্লো ছিলো। সুরমা মেইলে সিলেট থেকে ঢাকা যেতে প্রায় বারো ঘন্টা লেগে যেতো। আর ক্রসিং-এ পরলে সময়ের কোন নির্দিষ্টতা ছিলো না। কোনদিন চৌদ্দ-পনেরো ঘন্টাও লেগে যেতো। প্রতি ডাব্বায় যাত্রীদের অবস্থা ছিলো একেবারে গিজগিজ। কেউ একবার একটি সিটে বসলে আর উঠার সুযোগ ছিলো না। একবার উঠলে আর ফিরে এই সীট পাওয়া যেত না। উপরের সীটের বাচ্চাদের শি শি মাঝেমধ্যে নীচের সীটের যাত্রীর গায়েও পরতো। চিৎকার দিয়ে প্রতিবাদ হতো, ঝগড়া চলতো, কিন্তু করার কিছু ছিলো না। ধূমপান আর পিছনের রাস্তার বায়ূ নিষ্কাসনের গন্ধে ডাব্বার ভেতর একেবারে অস্বস্তিকর হয়ে যেতো। শরিফ সাহেব ছোটবেলা তার বাবার সাথে এমন পরিস্থিতির মধ্যে বেশ ক’বার ঢাকায় গিয়েছেন। বর্তমান ডিজিটাল ট্রেনে বসে বিষয়টি ভাবতে তার ঘিণঘিণ করলেও তখন টিকেট পাওয়াটাই ছিলো ভাগ্যের ব্যাপার। ছোটবেলা তিনি যতবারই ঢাকায় গিয়েছেন ততবারই সিটে বসে বাবার মুখ থেকে শোনেছেন টিকেট এবং সিট পাওয়ার জন্য কৃতজ্ঞতা স্বরূপ ‘আলহামদুলিল্লাহ’ উচ্চারণ।
প্রথম সিলেট লাইনে আন্তঃনগর ট্রেন ‘উপবন’ চালু হয় হোসেন মুহাম্মদ এরশাদ যখন বাংলাদেশে রাষ্ট্র ক্ষমতায়। অতঃপর ‘জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস’। সেই ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দের কথা। শরিফ সাহেবের বয়স তখন আট-দশ। রাষ্ট্রপতি কর্তৃক ‘উপবন’ উদ্বোধনের পরেরদিন শরিফ সাহেব ঢাকা থেকে সিলেট এসেছেন এই ট্রেনে। আজও শরিফ সাহেবের স্মৃতিতে সেদিনের কথা মাঝেমধ্যে রোমাঞ্চকর হয়ে উঁকি মারে। চলন্ত ট্রেনে এক ডাব্বা থেকে অন্য ডাব্বায় হেঁটে যাওয়া যায়, অনেক আত্মীয়-স্বজন, পরিচিতদের সাথে দেখা হয় এবং অনেকের সাথে নতুন সম্পর্কও গড়ে ওঠে, তাই সেই সময়ে ট্রেনের ভ্রমণটা শরিফ সাহেবের কাছে খুবই মজার ছিলো। বর্তমানে ট্রেন ডিজিটাল হয়েছে, ট্রেনের গতি প্রতি ঘন্টায় ১৫০ কিলোমিটার হয়েছে, ট্রেনের সীটগুলো হয়েছে আরামদায়ক এবং বেশ বড়, কিন্তু সেই কৈশোর কিংবা যৌবনের ‘উপবন’ কিংবা ‘জয়ন্তিকা’য় ভ্রমণের স্বাদ এখন আর ডিজিটাল সিলেট এক্সপ্রেসে আছে বলে তিনি মনে করেন না। শরিফ সাহেবের বয়স এখন প্রায় ষাটের কাছাকাছি। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি পেনশন পেয়ে যাবেন। সুরমা মেইল’ থেকে ‘উপবন’ হয়ে ‘ডিজিটাল সিলেট এক্সপ্রেস’ পর্যন্ত তিনি জীবনে অনেকবার ট্রেনে ভ্রমণ করেছেন। কিন্তু উপবনের স্মৃতি তাকে সর্বদা শোকনন্দ করে। ‘উপবন’ নামের সাথে তার জীবনের অনেক সুখ-দুঃখ জড়িয়ে আছে।
উপবনে-ই ইয়াসমিনের সাথে শরিফ সাহেবের প্রথম পরিচয় হয়েছিলো। সেই ১৯৯৪ খ্রিস্টাব্দের কথা। তখন শরিফ সাহেবের বয়স ছিলো আটারো। তরুণ বয়স। শরিফ সাহেব দুদিন আগেই টিকেট করে রেখেছিলেন ডাব্বা ‘ঘ’-এর ৫ নম্বার সীটে। তিনি সময় মতো ট্রেনের ডাব্বায় উঠে দেখেন একটি মেয়ে বসে আছে। তিনি তাকে বলেন, এই সিট আমার। সে বললো, পাশেরটা আমার, আপনি দয়া করে এই সীটে বসতে পারেন, আমি রোদ সহ্য করতে পারি না, মাথায় ব্যথা করে। মেয়েটির কথায় শরিফ সাহেব প্রথমে খুব বিরক্ত হয়েছিলেন। ইচ্ছে ছিলো তাকে ধমক দিয়ে বলবেন, যান আপনি আপনার সীটে, আমিও তো রোদে বসতে পারি না। শেষ পর্যন্ত তা আর বলা হলো না। একজন সুন্দরী মেয়ের পাশাপাশি বসে দীর্ঘ ভ্রমণের কথা ভাবতেই তরুণ শরিফ সাহেবের মন উষ্ণ প্রেমে আক্রান্ত হয়। তিনি চুপ করে ব্যাগটি মাথার উপর রেখে সীটে বসেন। বসার কিছু সময় পর তিনি মনে মনে ভাবেন, মেয়েটির সাথে কি কথা বলা যায়? তাকে কি নাম জিজ্ঞাস করবেন? যদি সে মাইন্ড করে, তা ভেবে তিনি কথা না বলে একটি বই বের করে পড়তে চেষ্টা করেন। কিন্তু বইয়ে মন বসছে না। সুন্দরী মেয়ের শরীরের উষ্ণতা বাতাসের সাথে উড়ে এসে তার শরীরে বারবার ধাক্কা দিচ্ছে। মেয়েটি জানালার দিকে চেয়ে আছে। ট্রেন সময় মতো না ছাড়লেও কিছু বিলম্বের মধ্যে প্লাট ফরম ছাড়ে। ট্রেনের চাকার ধ্বনি, বাইরের বাতাস, আর বাসাতে উড়ন্ত মেয়েটির উড়নার মাথা এবং উড়নার ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আসা উড়ন্ত চুল তরুণ শরিফ সাহেবের মনে অন্যরকম ভাব সৃষ্টি করে। বই হাতে থাকলেও তিনি চোখ বন্ধ করে মনের জানালা দিয়ে দেখতে থাকেন মেয়েটির লিপিস্টিক লাগানো ঠোঁট, ডাগর ডাগর চোখ আর চাকুর মতো ধারালো নাক। স্ব-শব্দে ট্রেন যতই চলতে থাকে ততই শরিফ সাহেব হারাতে থাকেন নিজের মনের গভীরে। এক সময় তিনি ঘুমের মতো চেতনশূন্য হয়ে যান। মেয়েটির ‘হ্যাঁলো মিস্টার’ আওয়াজে তার চেতন ফিরে। তিনি খুবই লজ্জিত হন যখন বুঝতে পারেন তার শরীর ঝুলতে ঝুলতে পরেগিয়েছিলো মেয়েটির শরীরে। তিনি মেয়েটিকে ‘সরি’ বলেন। মেয়েটি উত্তর দেয়, সমস্যা নেই। শরিফ সাহেব এরপর খুব সচেতন থাকেন যাতে মেয়েটির শরীরে তার কাপড়ের স্পর্শও না-লাগে। এভাবে ট্রেন পৌঁছে আখাউড়া। রাত তখন অনেক। সেই সময় আখাউড়ায় ট্রেনের ইঞ্জিন দিক পাল্টাতো। এখানে বেশ কিছু সময় ট্রেনকে দাঁড়াতে হতো। আখাউড়া প্লাট ফরমে অনেক রকমের খাদ্য এবং পানিয় নিয়ে ফেরিওয়ালারা আসে। ডাব নিয়ে একজন বৃদ্ধ ফেরিওয়ালা জানালার কাছে আসলে মেয়েটি দুটি ডাব দিতে বলে। বৃদ্ধ প্রথম ডাব কেটে মেয়ের দিকে এগিয়ে দিলে সে তা হাতে নিয়ে শরিফ সাহেবের দিকে এগিয়ে বলে, মিষ্টার ডাব নেন। মেয়েটির ডাব দেওয়া দেখে শরিফ সাহেব কিংকর্তব্য বিমূঢ় হলেন। তিনি প্রায় অচেতনেই ডাবটি হাতে নিলেন। ভদ্রতার জন্যও একবার না উচ্চারণ করেননি। আবার মেয়েকেও বলেননি, আপনি নেন। মেয়েটি ফেরিওয়ালার কাছ থেকে দ্বিতীয় ডাব নিয়ে শরিফ সাহেবের দিকে এগিয়ে দিয়ে আবার যখন বললো, মিস্টার ধরেন। শরিফ সাহেব এতে প্রায় বোকা হয়ে যান। প্রশ্ন করলেন, একটিই তো যথেষ্ট, আরেকটি কেন? মেয়েটি মুসকি হেসে বলে, মিষ্টার এটা আমার জন্য। ফেরিওয়ালাকে টাকা দিতে হবে তো, তাই তা ধরতে বলেছি। শরিফ সাহেব মনে মনে খুব লজ্জিত হলেন। মেয়েটি ফেরিওয়ালাকে টাকা দিয়ে শরিফ সাহেবের কাছ থেকে ডাব নিয়ে পাইপ দিয়ে পান করতে করতে বলে, স্যরি আপনাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য। আপনি চাইলে এখন আপনার সীট ফেরত নিতে পারেন। শরিফ সাহেব হাসতে হাসতে বলেন, ধন্যবাদ, এখন আর প্রয়োজন নেই। তবে মনে কিছু নিবেন না, আপনার নামটা জানা হলো না? মেয়েটি উত্তর দেয়, আমার নাম ইয়াসমিন। শরিফ সাহেব তার নিজের নাম বলে প্রশ্ন করেন, ঢাকায় কি থাকেন? ইয়াসমিন বললো, হ্যাঁ। শরিফ সাহেব জানতে চাইলেন, কি করেন? ইয়াসমিন বললো, পড়ালেখা। অতঃপর তাদের ঢাকায় পৌঁছা পর্যন্ত অনেক কথা হলো। কমলাপুর ষ্টেশনে নেমে একে অন্যকে বাড়ির ঠিকানা দিয়ে বিদায় নিলেন। তখন তো আর মোবাইল-ইন্টারনেট ছিলো না। এরপর থেকে চলে দুজনের মধ্যে চিঠির আদান-প্রদান। অবশেষে হয়ে যায় প্রেম থেকে বিয়ে।
‘উপবন’ ট্রেনের সেই কাহিনী শরিফ সাহেব ভুলবেন কীভাবে? অতঃপর বিয়ের আগে এবং পরে ইয়াসমিনের সাথে এই ট্রেনে তাদের কতবার ভ্রমণ হয়েছে ঢাকা টু সিলেট। কত রোমাঞ্চকর কাহিনী রয়েছে তাদের দাম্পত্য জীবনে এই উপবনকে কেন্দ্র করে। আবার আছে মর্মান্তিক ঘটনাও। শরিফ সাহেব জীবনে সবকিছু ভুলতে পারেন, কিন্তু ‘উপবন’কে ভুলতে পারেন না। আজ থেকে সতেরো বছর পূর্বে এই উপবন তাকে নিঃসঙ্গ করেছে, নিঃস্ব করেছে, ইসমিনের জীবন নাশ করেছে। শরিফ সাহেব যখন ‘ডিজিটাল সিলেট এক্সপ্রেস’-এ বসে প্রতিদিন অফিসে যাওয়া-আসা করেন তখন ট্রেনে বসে সার্বক্ষণিক ভাবেন ইয়াসমিনের সাথে তার পরিচয় থেকে বিয়ে, অতঃপর সেদিনের কথা যেদিন ইয়াসমিনের মৃত্যু হয়। ২০১৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে ২০৩৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ কিংবা গোটা পৃথিবী অনেক পাল্টে গেলো, পাল্টে গেলো বাংলাদেশ রেলওয়ের অনেক নিয়ম-পদ্ধতি এবং রেলওয়ের ডাব্বা, ইঞ্জিন, রাস্তা হলো অনেক উন্নত। শুধু পাল্টিলোনা শরিফ সাহেবের মনের সেই বেদনাময় স্মৃতিচারণের নিয়ম-পদ্ধতি। তিনি আজও ট্রেনে বসলে নিয়ম করে চোখের জল মুছতে মুছতে স্মৃতিচারণ করেন সেই সতেরো বছর আগের ‘উপবন’ ট্রেনের মর্মান্তিক দুর্ঘটনাকে।
২০১৯ খ্রিস্টাব্দের ২৪ জুন। শরীফ সাহেব তখন স্বপরিবারে ঢাকায় থাকেন। সরকারী অফিসে চাকুরী করেন। ঈদের ছুটিতে ইয়াসমিনকে নিয়ে সিলেট এসেছিলেন। ইয়াসমিন থেকে গিয়েছিলেন। ছুটির শেষে তিনি চলে যান ঢাকায়। ২৩ জুন রাতে সিলেট আসেন ইয়াসমিনকে নিয়ে যেতে। তখন সিলেট ঢাকা রোডে গাড়ী চলাচল বন্ধ ছিলো হবিগঞ্জের শাবাজপুর একটি ব্রিজ ভেঙে যাওয়ায়। শরিফ সাহেব আগেই ‘উপবন’ ট্রেনের দুটি টিকেট কাটিয়েছিলেন ২৪ জুন রাতে উপবনে ইয়াসমিনকে নিয়ে ঢাকায় যাবেন বলে। সময় মতো তারা ষ্টেশনে এসে ট্রেনে উঠেন। ট্রেন প্লাট ফরম ছাড়ার কিছু সময় পর ইয়াসমিন ঘুমিয়ে যান। মোগলাবাজার পেরিয়ে মাইজগাঁও গিয়ে ট্রেন প্রায় আধাঘন্টা থামে। এই ফাঁকে শরিফ সাহেবেরও ঘুম লেগে যায়। অতঃপর শরিফ সাহেবের ঘুম ভাঙে যখন ট্রেনের ডাব্বা হুমরি খেয়ে জমিনে পরে গরাগারি করতে থাকে এবং মানুষ আতঙ্কিত হয়ে চিৎকার দিতে শুরু করে। এই সময় একটি সিট ছিটকে এসে পড়ে ইয়াসমিনের উপর। মূহুর্তের মধ্যে ইয়াসমিনের সমস্ত শরীর রক্তে লাল হয়ে যায়। শরিফ সাহেব চিৎকার দিয়ে ইয়াসমিনকে ঝাপটে ধরেন। এরপর ট্রেনের ডাব্বা উলট-পালট হতে থাকলে শরিফ সাহেবের কাছ থেকে ইয়াসমিন হারিয়ে যান। শরিফ সাহেব ইয়াসমিন-ইয়াসমিন বলে ডাকতে থাকেন। চারদিকে মানুষের চিৎকার আর কালেমা পাঠের ধ্বনি শোনতে শোনতে এক সময় শরিফ সাহেব নিজেও জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। তার জ্ঞান ফিরে একদিন পর সিলেট ওসমানী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায়। চোখ খুলে তিনি প্রথমেই জানতে চাইলেন, ইয়াসমিন কোথায়? তার সন্তানরা তাকে জড়িয়ে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলে; মা আর এই পৃথিবীতে নেই।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT