সাহিত্য

স্বপ্নের রঙ

কাজী রাফি প্রকাশিত হয়েছে: ৩০-০৬-২০১৯ ইং ০০:২৩:৫০ | সংবাদটি ৬৩ বার পঠিত

এক্সরে রিপোর্টে চোখ রেখে ডাক্তার অবাক হলেন। মাত্র আম্বুলেন্সে আসা মারাত্মক আহত রোগীটির বাম পাজরের ছয়টা হাড়ই ভাঙা! অথচ ভদ্রলোক স্ট্রেচার থেকে নেমে হেঁটে এসে একটু আগেই এক্সরে মেশিনের সামনে দাড়িয়েছিলেন। তেষট্টি বছর বয়সেও রাহিদের মতো এত সুস্থ আর সুঠামদেহী মানুষ তিনি কমই দেখেছেন। এক্সরে ফ্রেম থেকে ডাক্তার চোখ নামালেন।
ডাক্তার উঠলেন। দ্রুতপদে রোগীর কেবিনের কাছে গিয়ে অপেক্ষাকৃত বয়সী একজনকে ডেকে বাইরে নিলেন। নিচু স্বরে বললেও কেবিনের ভেতর থেকে রাহিদ ডাক্তারের কথাগুলো শুনতে পেলেন- এমন রোগী হাজারেও একজন বাঁচার ইতিহাস আমাদের খুব বেশি জানা নেই। তিনি আমাদের চিকিৎসার বাইরে। তাকে অন্য কোনো হাসপাতালে নিন’।
কথাগুলো বিশ্বাস হতে চায় না রাহিদের। এক দুর্ঘটনা কত দ্রুত স্বপ্নগুলোকে এলোমেলো করে দেয়। শহরের সবচেয়ে ভালো হাসপাতালে নেওয়ার পথে রাহিদ তার বাম পাঁজরে প্রথম প্রচন্ড ব্যথা অনুভব করলেন। সেই ব্যথা সামান্য ঝাকুনি অথবা নড়াচড়ায় তিরতিরিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে। সন্তর্পণে নিঃশ্বাসটুকু নিতেও যখন রাহিদের হাড়মজ্জা ভেঙে পড়ার উপক্রম, তখন থেকেই অজানা এক আতঙ্ক দখল করে বসল রাহিদের সব ভাবনা। ইন্টেনসিভ কেয়ার ইউনিটে নেওয়ার পর অক্সিজেনের সরবরাহ বাড়াতে তার নাকে নল প্রবেশ করানো হলো। ডাক্তার আর নার্সদের ব্যস্ততা যত বাড়তে থাকল, রাহিদ প্রাণপণে তত বিশ্বাস করতে চাইলেন যে, তিনি একটা স্বপ্ন দেখছেন।
ডাক্তার ফিসফিস করে নার্সদের বললেন, আপনাদের খুব সাবধানে থাকতে হবে। যত রাতই হোক সার্বক্ষণিক এই রোগীকে নজরে রাখতে হবে। বি ভেরি ভেরি কেয়ারফুল। হি ইজ ইন ক্রিটিক্যাল স্টেজ।
বলে তিনি তার বিছানার সামনে ইংরেজিতে লেখা ডিআইএল প্লেটটি ঝুলিয়ে দিলেন। বলাবাহুল্য, চোখ বন্ধ করে বুক থেকে মেরুদ- হয়ে কোমর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়া তীব্র ব্যথার সাথে যুদ্ধরত রাহিদ ডাক্তারের এই কথাগুলোও শুনলেন। গলার স্বরভঙ্গ সমস্যায় জীবনে মাত্র একবার ডাক্তার দেখিয়েছেন রাহিদ। ডাক্তার-হাসপাতাল-নার্স এই শব্দগুলোর সাথে তার জীবন তাই অভিযোজিত নয়। নার্স-ডাক্তারসহ আশেপাশে দাঁড়ানো মানুষগুলোকে তার এক একজন প্রেতাত্মা বলে ভুল হতে থাকল। রাহিদের মনে হলো, তিনি এক ভয়াবহ স্বপ্নের খপ্পড়ে পড়েছেন। ভয়ংকর এই স্বপ্নের হাত থেকে তিনি বাঁচতে মরিয়া হয়ে উঠলেন। স্রষ্টার কাছে আকুল হয়ে মাত্র কয়েকটা ঘন্টা আগে ফিরে যেতে চাইলেন। ফারহানা যখন তাকে বলছিলেন, শরীর ঠিক আছে বলে বয়সকে অবজ্ঞা করাটা তোমার মোটেও ঠিক নয়। এই হরতাল-অবরোধের মধ্যে তোমার গ্রামে যাবার প্রয়োজন নেই।
রাহিদ জুতা-মোজা পরা শেষ করে ফারহানার কাছে এসে তার চোখে চোখ রাখলেন। মিষ্টি করে হেসে ফারহানার এখনো সুউন্নত কাঁধে দু'হাত রেখে, তার কপালে লম্বা চুমু দেন। রাহিদের আদর করার এই চিরচেনা ভঙ্গি ফারহানার চেনা। আজ আদরে বিগলিত না হয়ে তিনি বরং রাহিদের শার্টের বোতাম খুলে দেয়া শুরু করলেন। ঠিক ওই সময়েই নাহিদ ফিরে যেতে চান। তিনি ফারহানাকে তাহলে বলবেন না, তুমি আমাকে এই চিনলে! এত ভীতু আমি?' কয়েক ঘন্টা আগের ওই সময়টুকুতে ফিরে গেলেই ফারহানার চিরচেনা সুন্দর আঙুলগুলো তিনি তার শার্টের বোতাম খুলে দেয়া থেকে থামাবেন না। আহা! তার নিত্যনতুন এই জীবনই তার কাছে কত দ্রুত এক স্বপ্ন হয়ে গেল! নাকি এই হাসপাতাল, এই বুক ব্যথায় কুঁকড়ে আসামাত্র ক্ষণটুকুই স্বপ্নের কোনো ঘোরে? তাই-ই হোক, এ যেন স্বপ্নই হয়।
জীবনে ডাক্তারের কাছে আসার স্মৃতি মনে করতে না পারা রাহিদ তার চোখের সামনে অনেক বছর আগে হারিয়ে যাওয়া বাবার মুখটা যেন স্পষ্টই দেখতে পেলেন। বাবা এই হেমন্তকালে যে শালটা গায়ে দিয়ে মাঝে মাঝে কাঁধের পাশে তার প্রান্ত ছুড়ে দিতেন সেই ভঙ্গিতে শালটা ঠিক করতে করতে বাবা যেন তাদের গ্রামের বাড়ির উঠানে হাঁটছেন। রাহিদ তাকে ডাকলেন, বাবা!
স্যালাইনের ভেতর প্যাথিডিনসহ এক গাদা ইনজেকশন পুশ করতে করতে তাসফিয়া নামের সেবিকা অবাক হয়ে একবার রাহিদ আর একবার ফারহানার চোখে চোখ রাখল। দ্বিতীয়বার রাহিদ তার মৃত বাবাকেই ‘বাবা’ বলে ডাকছেন নিশ্চিত হওয়ার পর ফারহানার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। কিন্তু তিনি কিছুই বলতে পারলেন না। ঝাপসা দৃষ্টি মুছতেই থাকলেন। যতবার মুছলেন ততবার রাহিদের ডাকা ‘বাবা’ শব্দটা ফারহানার আত্মাকে অবশ করে চলল। ততবার ফারহানা রাহিদের চোখে চোখ রাখা প্রথম দিনটার কাছে গিয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলা মধুর সেই ক্ষণটায় ফিরে যেতে চাইলেন।
২. ব্যথায় বুকের পাঁজর ভেঙে এলেও এতক্ষণ পর্যন্ত রাহিদ তার ভয়াবহতা অনুভব করেননি। কারণ তখনো তার সামনে স্বপ্ন নামের কিছু কল্পনা ঘুরপাক খাচ্ছিল। রাহিদ ভাবছিলেন, হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেলেই তিনি গ্রামে ফিরে গিয়ে ইতিমধ্যে ইঞ্জিনিয়ার আর স্থপতি দিয়ে করে নেওয়া পরিকল্পনামতো নতুন এক বাংলো বাড়ি নির্মাণে হাত দেবেন।
স্ত্রীর পরিতৃপ্ত স্নিগ্ধ মুখে তাকিয়ে রাহিদ আবার বলেছিলেন, জীবন বড় ছোট। দেখো, কয়দিন আগেই যেন গেল তোমার আমার বিয়ের সেই লগ্ন। সানাইয়ের সুর । এখনও কানে বাজে। চাকরি করতে করতে কোন ফাঁকে তুমি, আমি...। যাহোক, এখন যে কয়দিন বাঁচি, খুব আনন্দ তুমি, আমি...। যাহোক, এখন যে কয়দিন বাঁচি, খুব আনন্দ করে কাটাব আমাদের জীবন। রাহিদের কথা শুনে মুগ্ধ ফারহানা প্রশ্ন করেন, এই বয়সে কী আনন্দ করবে শুনি!
আমাদের গ্রামের পুরাতন বাড়িটা ভেঙে সেখানে নতুন এক বাংলো উঠাব। আমাদের বাড়ির সামনে দিগন্ত বিস্তৃত যে মাঠের শীত-হেমন্তে লুকিয়ে আছে আমাদের শৈশব-কৈশোরের দিনগুলো, সেদিকে বারান্দা বানিয়ে সেখানে বসে হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করব। তাতে আমাদের জীবন লম্বা হয়ে যাবে।
রাহিদের কথায় নষ্টালজিয়ায় আক্রান্ত হন ফারহানা। তিনি তখন অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী। পুরো গ্রামের একটামাত্র ব্যাটারিচালিত সাদা-কালো টেলিভিশনটা তাদের চৌধুরীবাড়িতে আভিজাত্য বাড়িয়ে দিয়েছে। রাত ৮টার একমাত্র টিভি চ্যানেলের বাংলা সংবাদের পর যেদিন বাংলা কোনো চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয় সেদিন বাড়ির বাইরে উঠানে চেয়ার-মাদুর বিছানো হয়। মানুষগুলো তাদের চোখে-মুখে অপার্থিব এক জগতের অনুভবমাখা আবেগ নিয়ে রাজ্জাক-শাবানা অথবা ববিতা-কবরীর প্রেমময় গানের সুরে বুদ হয়ে আছে। কিন্তু পৃথিবীর অচেনা এক গাঁয়ে, আঁধারি এই রাতে টেলিভিশনের দৃশ্যের দিকে এই সব মানুষের আবেগভরা বিনয়ী আর ভাষাহীন চাহনির চেয়ে যা সবচেয়ে বেশি ফারহানার হৃদয়ে টনটন করে বাজে, তা হলো মাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া রাহিদের চোখজুড়ে ভরে ওঠা আবেগপূর্ণ অশ্রু।
তাদের গ্রামের সবচেয়ে মেধাবী আর সুদর্শন যুবক রাহিদের চোখের ভাষায় যেন কবিতা লুকানো। টেলিভিশনের দৃশ্যের চেয়ে রাহিদের ভেজা ভেজা চোখ ফারহানার ভাবনার কারণ হয়ে থাকে। এই সব হেমন্তের শীত শীত রাতে ঘুমিয়ে গিয়েও সে স্বপ্নে রাহিদের সেই চোখগুলোকেই দেখে। শিশিরভেজা-স্বপ্নভরা ভোরে ঘুম থেকে জেগে প্রেমময়, গভীর সেই দৃষ্টি পুনরায় দেখার জন্য অস্থির হয়ে ওঠেন ফারহানা । না দেখতে পেয়ে গায়ে চাদর জড়িয়ে আর পায়ে স্যান্ডেল পরে তিনি ধীর পায়ে বাইরে যান। শীতের আমেজে মগ্ন পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে বাঁশবাগানের ফাঁকফোকর দিয়ে তিনি দিগন্ত বিস্তৃত মাঠটার পানে তাকিয়ে থাকেন, যেখানে আঁধার কেটে গিয়ে ভোরের আলো মাত্র স্পষ্ট হচ্ছে। পুকুরজল থেকে কুয়াশার ধোঁয়াশা তুলে মিলিয়ে যাচ্ছে ভোরের স্পন্দনহীন বাতাসের শরীরে। ফারহানার হৃদয়ে এই দৃশ্যকল্প নিঃসঙ্গতার এক অনবদ্য প্রতীক হয়ে যায়। তবু তার মনে হয়, এই সব দৃশ্যকল্পের মাঝে কোথায় যেন তিনি ফেলে রেখেছেন তার তরুণী হৃদয়ের স্বপ্নবীজ। কল্পনায় বোনা স্বপ্নবীজের গোপন আর গহিন রহস্য তিনি কাঁপা কাঁপা হৃদয়ে যতবার খুঁজতে গিয়েছেন ততবার রাহিদ তার পাশে এসে যেন ছায়াসঙ্গীর মত দ-ায়মান। প্রেম কি এর নাম? ভালোবাসলেই কি কল্পলোক এমন সব দৃশ্যকল্পে ভরে যায়? ফারহানা জানেন না।
আহ! সেই দিনটা, পুকুরপাড়ের অন্য প্রান্তে রাহিদের সাথে দেখা হওয়ার প্রথম ক্ষণটা! এক পলকেই হাজার শব্দচয়নের বায়োস্কোপ চোখটার হঠাৎ অমন করে থেমে যাওয়ার অনবদ্য মুহূর্তটা।
৩. ডাক্তারের বলা কথাগুলো ফারহানাও শুনলেন। তার হৃদয়-বীণার তারে গাঁথা সব কবিতা যেন বিশৃঙ্খল অনুভব নিয়ে মাতাল করে তুলল ফারহানাকে। তিনি ঢাকায় কর্মরত বড় ছেলে ফারহানকে ফোন করলেন। ফোন করলেন দেশের শেষ প্রান্তে বাস করা একমাত্র মেয়ে রাদিয়াকে। কাঁদো কাঁদো স্বরে বললেন, বাবা, তুমি এখুনই চলে এসো। তোমার বাবার শরীর ভালো নয়।
বাবার কী হয়েছে মা?
চলন্ত বাসে ছুড়ে দেয়া পেট্রোল বোমা থেকে বাঁচার জন্য জানালা দিয়ে লাফ দিয়েছিল...। ফারহানা আর বলতে পারলেন না।
বস্তুত, রাহিদ ফারহানার কান্নাজড়ানো কণ্ঠে বলা কথাগুলো শুনে বিস্ময়ে হতভম্ব। এই হেমন্তের ধান আর সরিষা ফুলের ম-ম গন্ধমাখা শৈশব-কৈশোরের দিনগুলোতে তার ফিরে যাওয়ার ভাবনাটায় মাত্র ছেদ পড়ল এবং সাথে সাথে অনেক দিন আগে সেই পুকুরপারের অন্যপ্রান্তে ফারহানার চোখে চোখ পড়ার প্রথম ক্ষণটায়, হঠাৎ অমন করে থেমে যাওয়ার অনবদ্য মুহূর্তটায় তিনি ফিরে গেলেন। মাঝখান থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল শহরে বাস করা এতগুলো বছর। চলন্ত বাসের জানালা দিয়ে লাফ দিয়ে পড়ে যাওয়ার সময় রাহিদের চোখের সামনে বারার মুখটা ভেসে উঠেছিল। আর মাটিতে পড়ে গিয়ে পৃথিবীটা যখন ঝাপসা হয়ে এলো তখন তার মা'র কণ্ঠ স্পষ্টতই তিনি শুনতে পাচ্ছিলেন। যে কণ্ঠ পৃথিবীর সব আত্মাকে ডাকতে ডাকতে মিশে গেল তার গ্রামের বাড়ির উঠানে গিয়ে। যে উঠানে এমনি শীতকালে ছোট্ট রাহিদকে গোসল করিয়ে দেয়ার জন্য মা তার শরীরের সব কাপড় খুলে নিয়ে কাঠের পিঁড়িতে দাঁড় করিয়ে দিতেন। তারপর টিউবওয়েল থেকে বালতি ভরে পানি আনতে গেলে রাহিদ এক দৌড়ে পালিয়ে আমবাগান পার হয়ে মধ্যমাঠে। বাড়ির দু’জন পরিচারক তখন দৌড়াচ্ছে তার পেছনে।
রাহিদ তেমনি ছোট্ট হয়ে আজও ছুটছে মাঠ পেরিয়ে অনন্তের পথে। পোষাকশূন্য তার শরীর হাওয়া থেকে শুষে নিচ্ছে সব শীত। খুব শীত লাগছে রাহিদের। বুকের বাম প্রান্তে যেন এক বরফের - সাগর জমেছে। মা তার পেছন থেকে ডাকছেন- রাহিদ, রাহি দ, রা...হি...দ।
সেই শব্দ ছড়িয়ে যাচ্ছে সরিষা ক্ষেতের পাশ দিয়ে, প্রায় শুকিয়ে আসা মাঠের একটা খাল হয়ে আকাশের সীমানা ছেড়ে আরো দূরে কোথাও। রাহিদের দৌড় তো শেষ হয়নি। ফুরিয়ে যায়নি মাকে ধরা দেয়ার অনবদ্য মুহূর্তের স্মৃতি। তবু এই ডাক্তার কেমন নিষ্ঠুরভাবে তার স্বপ্ন পরিসমাপ্তির ইঙ্গিত দেন!
মায়ের কণ্ঠ শোনার পর থেকে সারাদেশে চলমান ভয়াবহ হরতালের মাঝেই ফারহান রেল স্টেশনে এসে টিকেট কাটল। সারারাত গেল; ট্রেনের কোনো পাত্তা নেই। ভোরে স্টেশন মাস্টার জানালেন, রেলের ফিশপ্লেট তুলে ফেলায় এই বিপত্তি।
অবশেষে চব্বিশ ঘণ্টা বিলম্বের ট্রেন ধরে ফারহান তারও পরদিন পৌঁছুল সান্তাহার । ভীত-সন্ত্রস্ত মানুষের সাথে বগুড়ায় পৌঁছার একমাত্র ভরসা ভটভটি নামের অদ্ভুত যানে উঠে দিগন্ত বিস্তৃত মাঠের পানে তাকাল ফারহান। সরিষা আর আলুর ক্ষেত পেরিয়ে গোধূলি-প্রান্তে সবুজ সবুজ গ্রামের দিকে তাকিয়ে মন খারাপ হয়ে গেল তার। কেন যেন হঠাৎ তার মনে হলো, ওই দূর গ্রামের সীমারেখার কাছে কোনো এক বৃক্ষের নিচে দাঁড়িয়ে বাবার জন্য তার মা অপেক্ষা করছেন।
সন্ধ্যায় হাসপাতালের ইন্টেনসিভ কেয়ার ইউনিটে পৌছামাত্র তার প্রথম যে দৃশ্যে চোখ আটকে গেল তা হলো, ডিআইএল বোর্ড ঝোলানো সাদা বিছানায় মায়ের হাতটিকে বাবা তার বুক পর্যন্ত ঢেকে রাখা কম্বলের ভেতর নিয়ে সকরুণ চোখে দরজার দিকে তাকিয়ে আছেন। যেন তিনি সন্তানের আসার পরম এই মুহূর্তের জন্যই অপেক্ষারত। সেই দৃশ্য দেখে মাত্র সেবিকা-প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করে হাসপাতালে নিয়োগ পাওয়া তাসফিয়ার সকরুণ হৃদয় কেন যেন কেঁপে উঠল। ডাক্তার গতকাল রাতে তাকে বলেছেন, এই রোগীর দিকে খুব খেয়াল রাখবে। উনার পাঁজরের ভাঙা হাড় ফুসফুসে ঢুকে গিয়েছে। যে কোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটবে।
কথাগুলো মনে হওয়ামাত্র তাসফিয়ার মন খারাপ হয়ে গেল। গ্রাম্য মেয়েটির মাটির সোঁদা গন্ধমাখা আত্মা থেকে তার অজান্তেই এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে গেল। তার হাহাকার হৃদয়ে মন খারাপ করা অযুত প্রশ্ন বারবার উকি দিয়ে গেল- যে মানুষটি পৃথিবী ছেড়ে চলে যাচ্ছেন তিনি অমন আকুল দৃষ্টিতে দরজার দিকে কেন তাকিয়ে আছেন? পৃথিবীকে বিদায় জানানোর মুহূর্তেও কি মানুষের মনে কোনো স্বপ্ন দোল খেয়ে যায়!
হ্যাঁ, রাহিদ একটা স্বপ্নকে এই ক্ষণে মনে মনে লালন করছিলেন। আর তা হলো, এই হরতাল-অবরোধে তার সন্তানরা যেন নিরাপদে তার কাছে পৌঁছতে পারে! এই আইসিইউ নামের কফিন ঘরে অন্য কোনো স্বপ্নকে স্বপ্নময় করতে গেলে বারবার শুধু পথ-অতিক্রমের ভয়াল দুঃস্বপ্ন তাকে আঁকড়ে ধরছে। যতবার তিনি স্বপ্নহীন হয়ে যাচ্ছেন ততবার একটা দীর্ঘশ্বাস তার ফুসফুসের কোন প্রান্তরে যেন হারিয়ে যাচ্ছে!
তাসফিয়ারা জানে না, অথবা তরুণ এই বয়সে জানতে শেখেনি নিরাপত্তাহীন দেশে স্বপ্নরা বাস করে না।
ফারহান বাবার কাছে এসে তার বিছানার পাশে বসামাত্র তিনি অশ্রুসজল পিটপিট চোখে জিজ্ঞাসা করলেন, কীভাবে এলে বাবা?
জীবনের এই অন্তিমলগ্নে বাবার কষ্ঠে এমনভাবে বাক্যটা উচ্চারিত হলো যেন সন্তানের পথ চেয়ে তার নিরাপদ ফিরে আসার প্রত্যাশাটুকু স্বপ্নের চেয়েও বড় কোনো কল্পনা! বুকের বাম পাঁজরের সব হাড় ভেঙে যাওয়ায় বাবার কণ্ঠ-নিঃসৃত শব্দগুলো ফারহানের কানের চেয়ে বুকে গিয়ে বাজল। আর ‘ডাক্তার’ নামক এক যন্ত্রমানব কিছুক্ষণ পরই ডেকে পাঠালেন ফারহানকে। প্রতিনিয়ত মৃত্যু দেখা এই মৃত্যুদূত খেলাচ্ছলেই ফারহানকে বললেন, হিজ কন্ডিশন ইজ ভেরি ক্রিটিক্যাল। থোরাসিক সার্জন দিয়ে বুকের ভেতর জমা রক্তগুলো বের করে দেয়া যায়। কিন্তু উনি বেঁচে থেকেই বা কী করবেন! কোমরের নিচের হিপ-বোনেও ফ্রাকচার হয়েছে... । ফারহান তার শার্টের কলার চেপে ধরে বলল, আমার বাবাকে একদিন এমনকি এক ঘন্টা বাঁচিয়ে রাখার জন্য আমি লাখ টাকা খরচ করতে রাজি। ইমিডিয়েটলি তার ব্লাড ক্লিয়ারের ব্যবস্থা করুন....
থোরাসিক সার্জন আমাদের নেই। তাকে দ্রুত ঢাকায় নিন...। তবে এখন তো সিরাজগঞ্জ থেকে পুরো রাস্তায় গাছ ফেলে রাখা। তাই অ্যাম্বুলেন্স পাবেন না। হেলিকপ্টার ডাকুন।
অন্যদিকে বাবার খবর শোনার পর থেকে প্রায় জ্ঞান-অজ্ঞানের এক ঘোরের মধ্যে ডুবে গেল রাদিয়া। জ্ঞান ফিরে যখন সে জানতে পারে তার স্বামী ঢাকা পর্যন্ত প্লেনের টিকিট পায়নি, জোগাড় করতে পারেনি এমনকি একটা অ্যাম্বুলেন্স তখনই তার দু'চোখের প্রান্ত বেয়ে অনবরত ঝরে পড়া তার অশ্রুবিন্দু সবেগে বড় বড় ফোটার বৃষ্টিকণা হয়ে গেল।
৪. স্কয়ার হাসপাতালের হেলিকপ্টারটি সিলেট ও দিনাজপুর থেকে রোগী বহনের জন্য আগে থেকেই বুকড। পরদিন সকাল ৯টায় হেলিকপ্টার ভাড়া বাবদ ফারহান অ্যাডভান্স টাকা পেমেন্ট করল। রাদিয়া আর তার স্বামী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ব্যক্তিগত কারে করে বগুড়ার উদ্দেশে রওনা করল। রাহিদের বিছানার পাশে আরো নিবিড় হয়ে ফারহানা বললেন, আজ একটু আগেই বাসায় যাব। তুমি ঘুমানোর চেষ্টা করো। আগামীকাল তোমাকে ঢাকা নেয়ার জন্য হেলিকপ্টার আসবে।
কথাগুলো শুনে ফ্যাল ফ্যাল দৃষ্টিতে রাহিদ ফারহানার চোখে চোখ রাখলেন। তারপর অভিমানভরা কণ্ঠে বললেন, আমি ঢাকায় যাব না গ্রামের বাড়ি ফিরে যাব।
গ্রামের বাড়ি! হ্যাঁ। নতুন বাসাটায় ভিত দিতে হবে না?
অপার্থিব এক স্বর যেন রাহিদের কণ্ঠে ভর করেছে। রাহিদের বলার অমন আনমনা আর অভিমানি ভঙ্গিতে ফারহানা ভয় পেলেন। তার ঘর্মাক্ত কপালে মায়াভরে হাত রাখলেন ফারহানা।। ভেজা ভেজা আঠালো কপাল। ফারহানার ভেতরটা কেঁপে উঠল। মা ওঠো, আমার মোটরসাইকেলে তোমাকে এখনই বাসায় যেতে হবে।
ফারহানের কথা

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT