মহিলা সমাজ

ঘনঘোর বরষায়

ঝরনা বেগম প্রকাশিত হয়েছে: ০২-০৭-২০১৯ ইং ০০:০৬:২৫ | সংবাদটি ১৭৩ বার পঠিত

প্রকৃতিতে এখন বিরাজ করছে ঋতুরানি বর্ষা। এই দেশে প্রত্যেক ঋতু আসে তারা নিজস্ব রূপে। কারণ, এ দেশ ঋতুবৈচিত্রের দেশ। আর সে বৈচিত্রের সঙ্গে তাল মিলিয়েই এগিয়ে চলে আমাদের দিন-প্রতিদিন। বাংলার ঋতুর সৌন্দর্য প্রকৃতিপ্রেমীদের বুঁদ করে রাখে। ‘বর্ষা’Ñ এমনই এক সৌন্দর্যময় ঋতু। আষাঢ়-শ্রাবণ মাসকে ঘিরেই বর্ষা ঋতুর সৌন্দর্য্যসম্ভার। তাইতো বর্ষার রঙ-রূপ-রস নিয়ে বাংলা সাহিত্যে রচিত হয়েছে অসংখ্য গান, কবিতা ও উপন্যাস, গল্প, নাটক। বাংলার কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বর্ষা’র বন্দনা করতে গিয়ে বলেছেন, এসো শ্যামল সুন্দর/ আনো তব তাপহরা তৃষাহরা সঙ্গসুধা।/ বিরহিনী চাহিয়া আছে আকাশে।/ এসো শ্যামল সুন্দর...।
নারীকে বলা হয় নদীর মতো। নদী যেমন বর্ষা ঋতুতে ভরে ওঠে। নারীও নাকি বর্ষায় রোমান্টিক আর প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। তাই আগেকার দিনে বর্ষা ঋতুতে বিয়ে-শাদি করতে অনেক লাজুক পুরুষ তার পরিবারের সদস্যদের বলতেন। আবার, আমাদের বাংলা সাহিত্যেও বলা হয়েছে, ‘বর্ষা ঋতু’ মিলনের উত্তম সময়। বৃষ্টির নূপুর রিমঝিম শব্দে এই সময় বাজে। আর বিবাহিত তন্বী নারীর শরীরও মিলনের জন্য একটু বেশি তৈরি থাকে। পিপাসিত দৃষ্টিতে মিলনের আকাক্সক্ষায় উন্মুখ কবি তাই বুঝি বলেছেন, নাচ ময়ূরী নাচরে!/ রোম ঝোমাঝোম নাচরে!/ ওই এলো আকাশ জুড়ে বর্ষারানি সাঝ রে!/ নাচ ময়ূরী...।
বর্ষার প্রকৃতি, ফুটে থাকা ফুল, বৃষ্টির রিমঝিম শব্দ মনে দোলা দেয় না, এমন মানুষ ভার। তরুণ-তরুণীদের মন তো আরও একধাপ এগিয়ে। বৃষ্টির মোহিত রূপে মুগ্ধ হয়ে এ যুগের অনেক তরুণী, বিশেষ করে বাঙালি তরুণীদের অনেকে ফেসবুকে প্রিয় বয়ফ্রেন্ডকে উদ্দেশ্য করে লিখে পাঠান, রিমিঝিমি রিমিঝিমি বৃষ্টিতে!/ রিমিঝিমি রিমিঝিমি!/ নূপুর বাজে/ এই মন সারাক্ষণ ছুটে যেতে চায়/ ভালোবাসা ভরা এক মনের কাছে/ রিমিঝিমি...। ব্যস, এমন সুন্দর কমেন্টস-এর রিপ্লাই আসে লালন ফকির যেভাবে বলেছেন সেভাবেÑ মেঘের বিদ্যুৎ মেঘে যেমন/ লোকালে না পায় অন্বেশন/ তোমারে হারায়ে তেমন/ তো-মা-রে হারায়ে তে-মন/ ও প্রেম যে করে সে জানে/ আমার মনের মানুষেরও সনে/ মিলন হবে কতো দিনে...। আবার, কমেন্টস আসে, চাতকী কয় অহর্নিশি/ চেয়ে আছে কাল শশী/ হবো বলে চারণ দাসী/ আমি হবো বলে চ-র-ণ দা-সী। ও তা হয় না কপাল গুণে!/ আমার মানে মানুষেরও সনে/ মিলন হবে কতো দিনে...।
Ñচমৎকার, সুন্দর এই কমেন্টস লিখে তরুণী মজা করে তার স্মার্টফোনটা হয়তো অফ করে দিলো, হৃদয়ে তুফান নিয়ে তরুণ জানালায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টির অপরূপ সৌন্দর্য্য দেখে রবি ঠাকুর-এর বিরহের সেরা গানটিই গাইবে, মাঝে মাঝে তবো দেখা পাই/ চিরদিন কেন পাই না/ কেন মেঘ আসে? হৃদয়ও আকাশে!/ তোমারে দেখিতে দেয় না/ মোহ মেঘে তোমারে দেখিতে দেয় না/ওহে! ক্ষণিক আলোকে আঁখির পলকে/ তোমায় যবে পাই দেখিতে।/ ওহে! হারাই হারাই সদা ভয় হয় হারাইয়া/ হৃদয় না জুড়াতে হারাইয়া/ পলক না মিটিতে হারাইয়া ফেলি চকিতে/ মাঝে মাঝে তব দেখা পাই...।
বিভিন্ন প্রজাতির পাখিও এখন ব্যস্ত ঘর বাঁধার জন্য। স্বপ্ন বুকে নিয়ে, খড়-কুঁঠো মুখে নিয়ে কেবলই ছুটছে পাখিরা। বৃষ্টিতে কতোবার কতো পাখির ঘর ভেঙে যায়। তবু তারা আবার ঘর বাঁধে। কী দারুণ এসব দৃশ্য! কোনো পাখির ঘর বা বাসার একটু কাছে গিয়ে দেখবেন চিৎকার পাখিরা আপনার দুই চোখে আক্রমণ করবে। আবার, জলজ প্রাণীর কথাও যদি ধরেন, তাহলে দেখবেন, রাত গভীর হওয়া লাগে না, সন্ধ্যার পরই বড় বড় ব্যাঙ খালের ঝোঁপে অথবা পুকুরের কোণায় বসে বেলা বাজায় সঙ্গীকে আকর্ষণ করার জন্য। কারুকার্যময় এসব আওয়াজ শোনে আপনার একা একা হাসতে ইচ্ছে করবে। শামুক-ঝিনুক এসবও ছুটোছুটি করছে। বরষা শেষে দেখবেন মাঠে, সবজি ক্ষেতে সাদা ভাতের মতো অথবা সাগুদানার মতো শামুকের ডিম পড়ে রয়েছে। পুকুরে দেখবেন ব্যাঙের কালো কালো বাচ্চা খেলা করছে। এসব দৃশ্য দেখেও আপনার মন খুশিতে ভরে ওঠবে। কেবলই হাসবেন আর দেখবেন প্রকৃতির লীলা! বিরহের আগুনে যাদের মন একদম পুড়ে গেছে, এমন দৃশ্য দেখলে তাদের মনেও কিছুটা পুলক জাগবে, কিছুটা ভাবুক দৃষ্টিতে সৃজনের দৃশ্য দেখে বলবেন, এমন খেলা কে জমিয়েছে? কে?
বাংলা সাহিত্যের যতো কবিতা, গান গল্প, উপন্যাস, নাটক আমরা পড়েছি, গভীরভাবে খেয়াল করে দেখেছি, তার বেশিরভাগই বর্ষা ঋতুতে রচিত হয়েছে। অর্থাৎ, কবি-সাহিত্যিক সমাজওÑএই সময় সরগরম হয়ে ওঠেন। গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থেকে সাহিত্য সাধনা করেন। বিরহী সাহিত্যিকরা তো বর্ষাকে মনে করেন সাহিত্যের উপযুক্ত সময়। কেউবা কাঁঠাল বিচি ভাজা, কেউবা শিমের বিচি ভাজা টেবিলে রেখে কুট্ কুট্ করে আয়েশী ভঙ্গিতে খেতে খেতে সাহিত্য রচনা করে সময় কাটান। লিখতে লিখতে মাথাটা যখন ভারি হয়ে আসে, তখন জানালায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টির রূপ দেখে কেঁদে বুক ভাসান, আর গাইতে থাকেন শিল্পী লতা মুঙ্গেশকর-এর বিরহের গান, প্রেম একবার এসেছিলো নীরবে/ আমারও দুয়ারও প্রান্তে/ সে তো হায়!/ মৃদু পায়!/ এসেছিল পারিনি তা জানতে/ সে যে এসেছিল বাতাস তা বলেনি/ হায়! সেই রাতে দ্বীপ মোর জ্বলেনি/ তারে সে আঁধারে চিনিতে যে পারিনি/ আমি পারিনি ফিরায়ে তারে আনতে/ প্রেম একবার এসেছিলো নীরবে...।
সাহিত্যের আরেক ক্লাসিক বিষয় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীঁত। তো, উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত যারা প্র্যাকটিস করেন তারা কিন্তু শান্তিতে গলা খুলে গাইতে পারেন না, পাশের বাসা থেকে অনুরোধ আসে একটু নিচু গলায় গাইতে। তাই বর্ষা-মুখর রাতে তারাও শান্তিতে রেয়াজ করেন, মোর ঘুমঘোরে এলে মনোহর/ নমঃ নমঃ নমঃ শ্রাবণ মেঘে নাচে নটবর/ শ্রাবণ মেঘে নাচে নাচে/ শ্রা-ব-ণ মেঘে নাচে নটবর/ রমঝম রমরমঝম রমঝম/ মোর ঘুমঘোরে এলে মনোহর...। অর্থাৎ, দেখা যাচ্ছে, নৃত্য, সঙ্গীত, সাহিত্য সবকিছুর সাধানাটা কিন্তু বরষায় বেশিই হয়। প্রকৃতির সব কিছুতে এ সময় যেন এক আনন্দ খেলা করে। বিশাল আকাশও রঙধনুর সাত রঙে সাজে। এ আকাশটা কেবলই দেখতে ইচ্ছে করে। মেঘের খেলা, তারার মেলা জমায় মধুর সুর, এমন দিনে তারে বলা যায়/ এমন ঘনঘোর বরিষায়/ এমন দিনে মন খোলা যায়/ এ-ম-ন দিনে তারে বলা যায়।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT