ইতিহাস ও ঐতিহ্য

বর্ষাযাপন : শহর বনাম গ্রামগঞ্জ

আবদুল হামিদ মানিক প্রকাশিত হয়েছে: ০৩-০৭-২০১৯ ইং ০০:৪৬:৪০ | সংবাদটি ২৯৪ বার পঠিত

ঋতু বৈচিত্র্যের বাংলায় বর্ষা আসে ‘ভৈরব হর্ষে।’ আসে বিদ্যুৎচমক, গর্জন আর অবিরল টুপটাপ ঝুপঝাপ শব্দের আড়ম্বর নিয়ে। শহর ও গ্রামে বর্ষা তাই নারী পুরুষ শিশু বৃদ্ধ সকলেরই অতি পরিচিত। প্রতিদিনের জীবনে, ঘরে বাইরে মনের অঙ্গন প্রাঙ্গণে বর্ষা নিয়ে আসে পরিবর্তন। অন্যান্য ঋতুর চেয়ে বর্ষা তাই সহজেই সকলের কাছে ধরা দেয়। বর্ষার রূপ, বর্ষার প্রভাব শহর এবং গ্রামগঞ্জে রেখাপাত করে সবখানে। শ্রাবণের একটানা বৃষ্টিপাত সজল সজীব করে দেয় চারদিক। বর্ষা তাই ঘরে ঘরে অতি পরিচিত ঋতু।
গ্রীষ্মের কঠিন শুকনো দিনগুলো মাড়িয়ে আসে বর্ষা। গ্রীষ্মে খটখটে প্রকৃতি যেন রসকষহীন। একেবারে মাঠঘাট চৌচির। পানি নেই পুকুরে। মাটি, গাছপালা এবং মানুষ সবাই গ্রীষ্মের দাপটে অস্থির হয়ে অপেক্ষা করে বর্ষার। শুরু হয় গুরু গুরু গর্জন। আকাশে জমা হতে থাকে কালো মেঘ। বিদ্যুৎ চমকায়। সূর্য ঢাকা পড়ে যায় মেঘের আড়ালে। এক সময় শুরু হয় অবিরল বর্ষণ। আকাশ ভেঙে বৃষ্টি। বর্ষার সজল ছোঁয়ায় নেচে ওঠে প্রকৃতি। গাছপালা বনবনানীর পাতায় পাতায় সজীব সবুজের, নতুন জীবনের যেন বান ডাকে। বর্ষা নিয়ে আসে ব্যতিক্রমী আমেজ।
বর্ষার বৃষ্টির সঙ্গে বাংলার জীবন ও জীবিকা ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। বর্ষাকালে বৃষ্টি না হলে তাই চারদিকে শুরু হয় আহাজারি। আল্লা মেঘ দে পানি দে প্রার্থনায় মুখর হয়ে ওঠে বাংলার মানুষ। শহর এবং গ্রামবাসীর কাছে তাই বর্ষার বর্ষণ কাক্সিক্ষত। তবে বর্ষার রূপ শহর এবং গ্রামে কিঞ্চিৎ ভিন্নভাবেই ফুটে ওঠে।
ইট কাঠ ধুলোবালি পেশার বহর নিয়ে গড়ে ওঠা শহরে বৃষ্টি স্নিগ্ধ পরশ নিয়ে নামে। ধুলোবালির উপদ্রব কমে যায়। ঘন বসতির এবং বড় বড় দালানের শহরে স্বস্তি আসে। জঞ্জাল আবর্জনা ধুয়ে মুছে নিয়ে যায় বৃষ্টির জল। সময়-বিশেষ অতি বর্ষণে শহরের রাস্তায় পানি উঠে পড়ে। রিকশা অথবা অন্যান্য যানবাহন জলের ওপর দিয়ে গন্তব্যে ছুটে যায়। নালা নর্দমাগুলোতে গ্রোতের শাঁ শাঁ শব্দ শুনে অনেকেই শৈশব-কৈশোরের গ্রামীণ স্মৃতি রোমন্থন করে। বড় বড় দালানের নিচে দিনমজুরদের জীর্ণ কুটিরে পানি ঢুকে পড়ে। ভীষণ কষ্ট হয় তাদের। বর্ষায় শহরের দৃশ্য বদলে যায়। ধোপদুরস্ত কাপড় পরা শহরবাসীদের অনেক সময় ঘরে আটকা পড়ে যেতে হয়। বৃষ্টি ঝরছে তো ঝরছেই। এদিকে স্কুল কলেজ অথবা অফিসের সময় বয়ে যায়। মনে হয় বৃষ্টি যেন এক আপদ। আবার অনেক সময় দোকানের বারান্দায় বারান্দায় দাঁড়িয়ে সারি সারি লোক হাঁকডাক করেন রিকশাকে। অপেক্ষা করেন-কখন বৃষ্টি থামে। কেউ কেউ রেইনকোট গায়ে চড়িয়ে নেমে পড়েন রাস্তায়। ছাতা হাতে পথচারীদেরও চোখে পড়ে মাঝে মাঝে। শহরে বর্ষার এ ছবিই প্রধান।
বর্ষার আসল রূপ ফোটে গ্রামে। গ্রামগঞ্জে বর্ষার মনোহর রূপ চিরদিন কবির অন্তরে জাগিয়েছে ভাবের দোলা। ছন্দের বাঁধনে কবিরা গেঁথেছেন বর্ষার বিচিত্র মালা। বৃষ্টির সজল ছোঁয়ায় ফোটে কদমফুল, কেয়া ও জুঁই। খালবিল নদীনালা থই থই করে বর্ষার জলে। টিনের চালে টপটপ ঝরে বৃষ্টি। খড়ের চালে শব্দহীন ধারা সৃষ্টি করে এক অবর্ণনীয় ভাবালুতা। ঝোপঝাড়ে বৃষ্টির সঙ্গে বাতাসের নাচন দেখে মন চলে যায় অজানা জগতে। কই, শিং, পুটি প্রভৃতি মাছ শিকারের ধুম পড়ে যায়। চাষি মাথাল মাথায় মাঠে কাজ করে। কর্দমাক্ত হয়ে ওঠে পথঘাট। হাটবাজারে নতুন পানির মাছ ওঠে। আম আনারস কাঁঠালের গন্ধ ছড়ায়। ছাতায় ছাতায় ছেয়ে যায় গ্রামীণ হাট। গ্রামগুলো হয়ে ওঠে দ্বীপের মতো। নৌকা ছাড়া চলাচল করা যায় না। বর্ষার পানিতে শিশু-কিশোর কলাগাছের ভেলা বানিয়ে খেলা করে। চারদিকে সৃষ্টি হয় চাঞ্চল্য। একটানা বৃষ্টিতে গৃহবধূরা অসুবিধার সম্মুখীন হন। ধান শুকানো, ভিজে কাপড় শুকানো প্রভৃতি ছোটখাট সমস্যার মোকাবিলা করতে হয় তাদের। বৃষ্টি থামলেই ধান অথবা কাপড় হয়তো উঠোনে বের করে দেয়া হয়। কিন্তু ঘরে ফিরতে না-ফিরতেই হয়তো আবার টপটপ বৃষ্টি নামে। আবার শুরু হয় গুটানোর পালা।
গ্রামগঞ্জে বর্ষায় গৃহবধূরা তৈরি করেন পিঠা। মাঠে কর্মরত পুরুষদের খাবার হিসেবে তৈরি করা এসব পিঠা গ্রামে আজও বহুল আদৃত।
বর্ষার জন্য অপেক্ষা চলে। বৃষ্টির অঝোর ধারা ফল-ফসলের ফরমান নিয়ে আসে। ছোটখাট অসুবিধা হলেও তাই বর্ষার বৃষ্টি আনন্দিত করে সবাইকে। বন্যা দেখা দিলেই দুর্ভোগ বড় হয়ে ওঠে। অন্যথায় বর্ষা শহর গ্রামে সবখানেই কাক্সিক্ষত এবং সবুজ সজীবের প্রতীক হিসেবে সমাদৃত।
বর্ষার ঐশ্বর্য কেবল প্রকৃতিতে নয় বরং মনের ভুবনেও নিয়ে আসে পরিবর্তন। কবির কণ্ঠে তাই ধ্বনিত হয় উচ্ছ্বসিত ছন্দÑ
মেঘলা থমথম সূর্য ইন্দু/ ডুবলো বাদলায় দুললো সিন্ধু।/ হেম কদম্বে তৃণ স্তম্ভে/ ফুটলো হর্ষের অশ্রুবিন্দু!/ মৌন নৃত্যে মগ্ন খঞ্জন/ মেঘ সমুদ্রে চলছে মন্থন/ দুগ্ধ দৃষ্টি বিশ্ব সৃষ্টির/ মুগ্ধনেত্রে স্নিগ্ধ অঞ্জন। -সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত।

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • সিলেটের গণভোটের অগ্রনায়ক মৌলানা ছহুল উসমানী
  • আদিত্যপুরের গণহত্যা
  • জালালাবাদের ইতিহাস ঐতিহ্য
  • বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশ
  • সিলেটে আরবি ভাষাচর্চা
  • গৌড়-বঙ্গে মুসলিম বিজয় এবং সুফি-সাধকদের কথা
  • ঐতিহ্যবাহী গ্রাম আজিজপুর
  • সিলেটের গণভোটের অগ্রনায়ক মৌলানা ছহুল উসমানী
  • বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আরেক অধ্যায়
  • কোচিংনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার প্রভাব
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • ঐতিহাসিক নানকার আন্দোলন
  • গৌড়-বঙ্গে মুসলিম বিজয়
  • শত বছরের ঐতিহ্যের ধারক দাউদিয়া মাদরাসা
  • পৃথিবীর প্রাচীন লাইব্রেরিগুলো
  • আল হামরা : ইতিহাসের অনন্য কীর্তি
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • বাঙালির ইতিহাসে দুঃখের দিন
  • ঐতিহ্যবাহী নকশিকাঁথা
  • সাংবাদিকদের কল্যাণে সিলেট প্রেসক্লাব
  • Developed by: Sparkle IT