শিশু মেলা

নিঝুম দ্বীপে একদিন

এম. আশরাফ আলী প্রকাশিত হয়েছে: ০৪-০৭-২০১৯ ইং ০০:২৩:২০ | সংবাদটি ২৮৩ বার পঠিত

দুদুলরা চিরকুট পেয়ে ‘থ’ হয়ে গেল। এমনটা ওরা আশা করেনি। ওকে নিয়ে কী স্বপ্নটাই বুনছিল দুদুল। ওর জগৎ সম্পর্কে জানবে; জীবনযাত্রা সম্পর্কে জানবে... ইত্যাদি। কিন্তু সবাইকে বোকা বানিয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে গেল সসার। ভগ্ন হৃদয় নিয়ে বাড়ি ফিরল ওরা।
দুদুল কিছুতেই ভুলতে পারে না ওকে। স্বপ্নের মত সসার ওকে ঘিরে রাখে। সবচাইতে যে বিষয়টি ওকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে সেটা হলো ওর বাঁশি। কী অদ্ভুত সে সুর। যাদু মন্ত্র যেন। সেই সুর মন্ত্রমুগ্ধের মত টেনে নিয়ে যায়। উদাসী করে। প্রতিদিন দুপুরে একবার বাঁশির সুর ওর কানে বাজে। মনের অজান্তেই ছুটে সে নিঝুম দ্বীপের দিকে। কারও সাথে কোন কথা বলে না। দুদুলের মা বাবা ওকে লক্ষ্য করেন। ওরা ভাবেন.... কী হলো আমাদের দুদুলের। আগে তো ও এরকম ছিল না।
দুদুল যখন স্কুলে থাকে তখনও সে একই কান্ড করে। ঠিক বারোটায় কেমন আনমনা হয়ে যায়। অনেকদিন এমনও হয়েছে-স্কুলে বই খাতা রেখে কাউকে কিছু না বলেই চলে এসেছে বাড়িতে। স্কুলের শিক্ষকরা এ ব্যাপারে অভিযোগও দিয়েছেন ওর বাবাকে। উনি বিষয়টি দেখবেন বলে জানিয়েছেন কিন্তু উনি নিজেও জানেন না-কী কারণে দুদুল এমন করছে। ছুটির দিনে ওকে দুপুর বেলা দেখে দেখে রাখা হয়। কারণ দুপুর বারটা হলেই সে কথা বলা বন্ধ করে কিসের টানে গ্রামের পূর্ব দিকে যাত্রা শুরু করে। অনেকদিন পাশের গ্রামের লোক নিঝুম দ্বীপের পাশ থেকে ওকে ধরে নিয়ে এসেছিল। একাকী কাদা মাটিতে বসা দেখে ওরা ভাবত- হয়ত জ্বীন ভূত আছর করেছে। জিজ্ঞেস করলেও কিছু বলত না।
দুদুলের বন্ধুরাও কাউকে সসার সম্পর্কে কিছু বলেনি। তবে ওরা নিজেদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে মাঝে মধ্যে আলাপ করে। দুদুলের অবস্থা দেখে ওকে ওরা বুঝায়-সান্ত¦না দেয়। শার্দুল বলে-দুদুল চিন্তা করিস না আরও কোন এক সময় হয়ত ও পৃথিবীতে আসবে। তখন তোর সাথে আবারও দেখা হবে। দুদুল শুধু চেয়ে থাকে আর ওদের কথা শুনে মাথা দোলায়। মুখে একটা ছোট্ট কাঠি নিয়ে আনমনে চিবোয়। কোন মন্তব্য করে না।
দুদুল ইদানিং বেশ অনুভব করে অনেকের মনের ভিতর সে ঢুকতে পারে। কার মনটা সাদা- কার মনটা কালো কে কত বড় শয়তানি মারপ্যাচ নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে তা মোটামুটি সে দেখতে পায়। সসারের সাথে সে চার ঘন্টা কাটিয়েছিল। এতে সে ওর থেকে এই যোগ্যতাটা পায়। যতই দিন গড়াচ্ছে ততই যেন মানুষের মনের ভিতরটা সে স্পষ্টই দেখতে পাচ্ছে।
একদিন স্কুলে ঘটলো এক কান্ড। বিজ্ঞানের পিরিয়ড চলছিল। বিজ্ঞানের স্যার আকাশে চন্দ্র অভিযান বুঝাচ্ছিলেন। দুদুলের ক্লাস কম্বাইন্ড অর্থাৎ ছেলে মেয়েরা একই সাথে বসে ক্লাস করে। স্যার দেখতে যেমন স্মার্ট তেমনি তাঁর বুঝানোর ক্ষমতা। ক্লাসের ছাত্রী অনিন্দিতা সুন্দরী- কিশোরী। ওর মনে একটি আকাক্সক্ষা জাগে। স্যারের ভাষণ শুনছে আর মনে মনে ভাবছে আমি যদি ঐ স্যারের মত একজন স্বামী পাই। খুব ভাল হবে। খুব করে ভালবাসবো।
ঠিক তখনই দুদুল বলে উঠল-স্যার ও বলছে আপনাকে ভালোবাসে। স্যার উল্টো প্রশ্ন করেন-তুমি কী করে বুঝলে?
-ওকে জিজ্ঞেস করেই দেখুন না স্যার।
-অনিন্দিতা ইতস্তত করছে আর ভাবছে-আমি মনে মনে বললাম আর ও কী করে বুঝলো?
-দুদুল বলল-স্যার ও এখন চিন্তা করছে আমি সেটা কী করে বুঝলাম?
বিজ্ঞান স্যার এস. আর কায়স্থ স্থির মস্তিষ্কের লোক। উনি যে কোন জিনিস সহজে উড়িয়ে দেন না। একটু চিন্তা গবেষণা করেন। কিন্তু এই মুহূর্তে অনিন্দিতাকে প্রশ্ন করলে ও লজ্জা পাবে বিধায় তিনি সবার দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য বললেন- দুদুল বলত শার্দুল কী ভাবছে?
দুদুল চট করে বলল-ও নিঝুম দ্বীপের কথা ভাবছে। আমরা ক’বন্ধু ক’দিন আগে সেখানে গিয়েছিলাম-ওই কথাটি ওর মনে পড়েছে এখন। আরও ভাবছে-অনিন্দিতা ওই নিঝুম দ্বীপের বাঁশিওয়ালীর মত সুন্দরী। ওর মন অনিন্দিতার প্রতি দুর্বল। চট করে একটা ঘা লাগল এস. আর কায়স্থের মনে। আসলে ক্লাসের মধ্যে উনিও অনিন্দিতাকে পছন্দ করেন। ঠিক সেই মুহূর্তে দুদুল বলল-স্যার এই মাত্র আপনার মনেও ঘা লেগেছে-আমার কথা শুনে।
এস. আর কায়স্থ বিস্মিত হলেন। এতটুকুন ছেলে মনের কথা পড়তে পারে? তারপরও তিনি ওকে একটা ধমক দিলেন। আর বললেন-দুদুল এরকম করে না। তুমি ক্লাসে বেশি কথা বল। ভবিষ্যতে আর এরকম করবে না। ঠিক আছে? দুদুল মাথা নেড়ে বলল-জ্বী স্যার।
দুদুলের এ বিষয়টি চাপা থাকে না। এ কান থেকে ও কানে, এ বাড়ি থেকে ও বাড়ি জানা জানি হয়ে গেল। দুদুল মনের কথা পড়তে পারে। কেউ উপাধি দিল ছাবাল পীর, কেউ বলে বাচ্চা পীর, কেউ বলে নিঝুম পীর। পুরুষ-মহিলা ছেলে বুড়ো অসংখ্য লোক আসতে লাগলো ওর কাছে। পানি পড়া তেল পড়া নিতে চায় ওরা। গ্রামে গঞ্জে রটে গেল-দুদুলের তেলেসমাতির খবর। তেল পড়া, পানি পড়া খেয়ে অনেকের নাকি অনেক রোগ ভাল হয়েছে-এ কথাটি রাষ্ট্র হলে-প্রতিদিনই দর্শনার্থী বাড়তে লাগলো। দুদুল না চাইতেই লোকেরা টাকা পয়সা দিয়ে ওর পকেট ভারী করতে লাগলো। দুদুল প্রতিদিন দুপুর বারোটা থেকে একটা পর্যন্ত ধ্যানে বসে। অনেক রাজনীতিবিদ অনেক পেশাজীবি আসেন তাদের সমস্যা নিয়ে। দুদুল পটাপট সমাধান বলে দেয়।
ছ’মাস পর। একদিন দুপুরে প্রচন্ড ঘূর্ণিঝড় শুরু হলো। এর সাথে প্রচন্ড মেঘের গর্জন আর বজ্রপাত চলছে। দুদুলের কানে সেই বাঁশির সুর বেজে উঠল। কে যেন ওকে সেই বাঁশিতে ডাকছে। হঠাৎ কাউকে কিছু না বলেই সে ঘর থেকে বের হয়ে গেল। ঝড়-তুফান মাথায় নিয়েই চলল নিঝুম দ্বীপের দিকে। আশেপাশে প্রচন্ড শব্দে বজ্রপাত হচ্ছে। সে দিকে কোন ভ্রƒক্ষেপ নেই। দূরের গ্রাম পেরিয়ে পৌঁছে গেল নিঝুম দ্বীপের সেই শাপলা-পদ্মের ঝিলের পাড়ে। হ্যাঁ ঐতো স্পষ্ট বাঁশি শোনা যাচ্ছে। বোধ হয় ভিন গ্রহের সেই সসার এসেছে। সাঁতরে ঝিল পার হয়ে পৌঁছে গেল নির্দিষ্ট গুহায়। হ্যাঁ ঐতো সেই পুরনো বন্ধু সেই সোনালী চেয়ারে বসে বাঁশি বাজাচ্ছে।
ওর কাছাকাছি পৌঁছার আগেই বাঁশির সুর বন্ধ হয়ে গেল। সেই সুরেলা কন্ঠেই ডাকলো-দুদুল এসেছো তোমার টানেই আবার পৃথিবীতে এলাম। তুমি যে হন্যে হয়ে আমাকে খুঁজছো। আমি ভিন গ্রহে থেকেও শান্তি পাচ্ছি না। আমরা সসার হলেও তোমাদের মন থেকে আমাদের মনটা আরও সংবেদনশীল। যাদের সাথে পরিচয় আছে- চট করে আমরা ওদের মনের কথা পড়তে পারি। যদিও তোমাদের অঙ্গ প্রত্যঙ্গের সাথে-রক্তের সাথে আমাদের মিল নেই-তবে একটা মিল আছে সেটা হল চিন্তাশক্তি। যত দূরেই থাকি কেউ যদি আমাদের কথা চিন্তা করে- আমরা সহজেই বুঝতে পারি।
দুদুল এতক্ষণ হা করে ওর মিষ্টি ভাষণ শুনছিল। একটা কথাও ওর মুখ দিয়ে বের হলো না। এখন সুযোগ পেয়ে সে বলল-তোমার একটা নাম দিচ্ছি সসার নেবে?
-হ্যাঁ, বল।
-‘লহরি’। আজ এখন থেকে তোমায় লহরি বলে ডাকবো।
-আচ্ছা। তাই ডেকো।
দুদুল বলল- লহরি- তোমার যাওয়ায় পর থেকে একটিবারও তোমাকে ভুলতে পারিনি। কী করে যে গেলে? কিছু বলেও গেলে না। ভাগ্যিস একটা চিরকুট রেখে গেছো। না হলে তো আমি এতদিনে পাগল হয়ে যেতাম।
-এ কারণেই তো তোমার ডাকে সাড়া দিয়ে ফিরে এলাম। তুমি আর কষ্ট নিও না প্লিজ।
-হ্যাঁ আমি খুব খুশি হয়েছি লহরি। তোমার কাছে আমার অনেক কিছুই শিখার আছে। এবার কিন্তু হঠাৎ করে যেতে পারবে না। যাওয়ার আগে বলে যেতে হবে।
-আচ্ছা দুদুল। তাই হবে। তবে আরেকটা সুখবর আছে। সেটা হলো-এবারের পর থেকে আর তুমি একা নও। সব সময় একটা নজরদারী তোমার উপর থাকবে। এটা আমার বিশেষ মায়া তোমার প্রতি। আমি যদি চলেও যাই-তারপরও তুমি ডাকলেই আমাকে পাবে। এই নাও একটি আয়নার টুকরা। এটা তোমার সাথে রাখো। বিপদে পড়লে এটা সূর্যের আলোয় ধরবে। ব্যস আমি তোমাকে সাহায্য করতে পারবো।
দুদুল আয়না টুকরা নিয়ে ওর পকেটে রাখল। লহরি বলল-জানো দুদুল-আমি কিন্তু তোমাদের পৃথিবীর অনেক খবরই ইতোমধ্যে জেনে গেছি।
-কী ভাবে?
-কিছু দিন আগে যখন তোমার সাথে পরিচিত হই-তখনই তো তোমার আত্মার সাথে একটা সম্পর্ক গড়ে উঠে। এতো দিন ধরে তুমি যত লোকের মনের ভিতর প্রবেশ করেছ-সে সকল মনের কার্যক্রম আমার হৃদয় পটে ভেসে উঠেছে। তোমরা মানুষেরা এত রহস্যময় সত্যিই আমি অবাক হয়ে যাই। তোমাদের চিন্তা ভাবনা বড়ই জটিল। আমরা দুয়ে দুয়ে চার ভাবি। কিন্তু তোমরা দুইয়ে দুইয়ে পাঁচ এমনকী ছয় পর্যন্ত বানাতে চেষ্টা কর। দুদুল একটু সময় নিয়ে বলল-ঠিক তোমার কথা বুঝতে পারলাম না লহরি।
-এই যেমন ধরো তোমরা আছো দুজন কিন্তু ভাবছ-সেখানে একজন সৃষ্টিকর্তা আছেন-হয়ে গেল তিন জন। আরও দুজনের সাথেও ওরা ভাবে প্রভু আছেন-কাজেই এক ধর্মের হলে এক প্রভু। কাজেই দুইয়ে দুইয়ে পাঁচ হলো। আর যদি ভিন্ন ধর্মাবলম্বী হয় তাহলে তো দুইয়ে দুইয়ে ছয় হয়ে যায়।
দুদুল বলল-হ্যাঁ বুঝেছি-সত্যিই তুমি জিনিয়াস লহরি....।
-ব্যাখ্যাটা আরেকটু বাকী।
-সত্যি?
-হ্যাঁ দুদুল।
লহরি বলল-শোন যদিও প্রভু স্বীকার করে এবং সে মত কাজ করে তবে সেগুলো লোক দেখানো। ওর খোলা অন্তর দিয়ে প্রভুকে ভয় করে না। যদি প্রকৃত পক্ষে-অন্তরে খোদা ভীতি থাকতো তাহলে তোমাদের অন্তরাত্মা এত জটিল হতো না।
-দুদুল বলল হ্যাঁ ঠিকই বলেছ। লহরি তুমি তোমাদের ভিন গ্রহের লোকদের কিছু গোপন খবর বল।
-ও আমাদের সসারদের কথা জানতে চাও?
-তবে শোন-আমরা কিন্তু অজ¯্র ধর্মে বিশ্বাসী নই। আমাদের একটি ধর্ম। সেটি হল আমরা বিশ্বাসী। একে অন্যকে বিশ্বাস করি। তাই বিশ্বাসই আমাদের ধর্ম। আর বিশ্বাস না করেও কোন উপায় নেই। কারণ আমরা একে অন্যের অন্তরের খবর পড়তে পারি। কাজেই মুখ দিয়ে যা বলি-অন্তর দিয়েও তাই বলি। এখানে ফাঁকি দেয়ার কোন সুযোগ নেই। কিন্তু তোমরা?
একে অন্যের মনটা পড়তে পারো না বলেই মুখে যা বল মন দিয়ে তা বল না। মুখে আর মনে মিল রেখে চলে এরকম লোকের সংখ্যা খুবই কম। যারা এটা করতে পারে-তারা তোমাদের মধ্যে অতিমানব হয়ে যায়। আর এরাই প্রকৃত প্রভুর সন্ধান লাভ করে।
-দুদুল বলল সত্যিই তুমি অসাধারণ কথা বলছ লহরীণ তোমার মধ্যে জ্ঞান ভান্ডার লুক্কায়িত আছে। তুমি সেগুলোর সব আমাকে জানতে দিবে।
-হ্যাঁ, সব না জানলেও অনেক কিছুই জানতে পারবে। তবে এক সাথে নয়।
আলাপ আলোচনায় সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। ইতোমধ্যে ঝড়-বৃষ্টি থেমে গেছে। সারা আকাশ জুড়ে মেঘলা ভাব। থেমে থেমে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। বিদ্যুতের আলো লহরির গায়ে দাগ কাটছে অর্থাৎ বিদ্যুৎ চমকালেই ওর গাটা লাল হয়ে উঠে।
দুদুল বলল চল লহরি আমার বাড়িতে। তোমার সাথে সারা রাত ধরে গল্প করব। লহরি বলল-হ্যাঁ চল। লহরিকে দুদুলের গায়ের ভারি শার্টটি পরিয়ে দিল। ওর বিচ্ছুরিত আলো এখন আর বাহিরে বেরোতে পারছে না। নিরাপদে পৌঁছে গেল ওরা কাঞ্চন গ্রামে।
ঝড় বৃষ্টিতে ভিজে শরীর খারাপ করল দুদুলের। নাক দিয়ে পানি পড়ছে। জ্বর হওয়ার পূর্বাবাস। লহরি লক্ষ্য করল। সে দুদুলকে কাছে ডাকল। ওর মাথায় হাত রাখল লহরি। সাথে সাথে জ্বর উদাও। নাকের পানি পড়া গেল থেমে। দুদুল বলল-আশ্চর্য। তুমি তো যাদু জানো।
-আরে যাদুর কী দেখেছো? আমার সাথে কিছুদিন থাকো। অনেক শক্তি তুমি অর্জন করতে পারবে।
-লহরির হাতের ছোয়া পেয়ে ঘুমিয়ে পড়ল দুদুল।
ভোরে ওঠে দুদুল ওর বন্ধুদের খুঁজে গেল। ওদের জন্য কী সুসংবাদ অপেক্ষা করছে তা জানতেই সে বেরিয়ে পড়ল।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT