ধর্ম ও জীবন

রক্তদান : ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি

মোহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ প্রকাশিত হয়েছে: ০৫-০৭-২০১৯ ইং ০০:৫২:৩৩ | সংবাদটি ৬৫ বার পঠিত

ইসলাম বিশ্বধর্ম, মানবতার ধর্ম, পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। মানব কল্যাণের প্রত্যেকটি বিষয় এখানে গুরুত্বের সঙ্গে আলোকপাত করা হয়েছে; নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে সঠিক পথের। যে কোনো প্রয়োজনে তাই ইসলামের বিধি-বিধান ও দৃষ্টিভঙ্গির ওপর আস্থা এ ধর্মের অনুসারীদের ওপর অবশ্যকর্তব্য। রক্তদান আধুনিক বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম এবং বর্তমান সময়ের চিকিৎসাবিজ্ঞানের অপরিহার্য বিষয়। সুতরাং এ বিষয়ে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি কী তা সব অনুসারীর জানা আবশ্যক।
রাসুলুল্লাহ (সা.) এর জীবদ্দশায় রক্তদানসংক্রান্ত কোনো প্রয়োজনীয়তা কিংবা চিকিৎসাবিজ্ঞানে এর ব্যবহার শুরু না হওয়ায় সরাসরি কুরআন ও সুন্নাহে এ বিষয়ের কোনো উল্লেখ নেই। তদুপরি, এ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়ের বিধান, সে সবের দৃষ্টিভঙ্গি ও শরয়ি লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য (মাকাসিদ আল-শরিয়াহ) এসবের ওপর ভিত্তি করে আধুনিক ইসলাম বিশেষজ্ঞরা এ বিষয়ের বিধান নিরূপণ করার চেষ্টা করেছেন। ফলে কিছু সূক্ষ্ম বৈপীরত্য একে অন্যের মতের মাঝে পার্থক্য দেখা গেলেও মৌলিক বিষয়ে কারও কোনো দ্বিমত উল্লেখযোগ্য নয়। রক্তদান সম্পর্কিত এ মাসআলার নিম্নে উল্লেখিত বিষয়গুলো তাই বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
ইসলামে রক্তের বিধান : রক্ত মানবদেহের অবশ্য প্রয়োজনীয় উপাদান। রক্ত ছাড়া কেউ এক মুহূর্ত বেঁচে থাকতে পারে না। শরীর অভ্যন্তরে এর অবস্থান এবং যতক্ষণ তা শরীরের ভেতরে আছে তা পবিত্র। কিন্তু যখনই তা শরীরের বাইরে আসে তখন তা অপবিত্র। এটি কোনোক্রমেই ভক্ষণযোগ্য নয়। কুরআন এটিকে হারাম (নিষিদ্ধ) ঘোষণা করেছে। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য হারাম (নিষিদ্ধ) করা হয়েছে মৃত জীব, রক্ত, শূকরের মাংস এবং যেসব জন্তু আল্লাহ ছাড়া অন্যের জন্য উৎসর্গ করা হয়ে থাকে। অবশ্য যে লোক অনন্যোপায় হয়ে পড়ে এবং নাফরমানি ও সীমা লঙ্ঘনকারী না হয়, তার জন্য কোনো পাপ নেই। নিঃসন্দেহে আল্লাহ মহান ক্ষমাশীল, অত্যন্ত দয়ালু।’ (সূরা : বাকারা, আয়াত : ৩)।
এসব আয়াতে রক্ত সম্পর্কিত দুটি বিষয় সুস্পষ্ট। এক. রক্ত হারাম বা নিষিদ্ধ (উল্লেখ্য, হারাম বস্তুর অন্যান্য ব্যবহারও সর্বসম্মতিক্রমে অবৈধ) এবং দুই. অনন্যোপায় হলে তা বৈধ। ইসলামের এই বিশেষ ব্যবস্থাপনায়ই তাকে অনন্য করে তুলেছে। ইসলামের শরয়ি বিধান তাই সবসময়ই মানবতা এবং তার কল্যাণ ও প্রয়োজনকে গুরুত্বের সঙ্গে নিশ্চিত করেছে।
রক্ত ক্রয়-বিক্রয় : উদ্দেশ্যের ওপর ভিত্তি করে শরিয়ত এ বিষয়ের বিধান নির্ধারণ করেছে। সর্বসম্মতিক্রমে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে রক্ত ক্রয় কিংবা বিক্রয় করা হারাম (অবৈধ/নিষিদ্ধ)। তিনটি কারণ এর পেছনে রয়েছে।
প্রথমত : মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গসহ অনান্য শারীরিক আনুষঙ্গিক জিনিসের পূর্ণ মালিকানা আল্লাহর। তাই এটি কেনাবেচার অধিকার স্রষ্টা কর্তৃক সংরক্ষিত।
দ্বিতীয়ত : এটি অপবিত্র বস্তু। শরিয়তের বিধান হলো অপবিত্র এবং নিষিদ্ধ বস্তুর ক্রয়-বিক্রয় কিংবা ব্যবসা সবই নিষিদ্ধ/অবৈধ।
তৃতীয়ত : জীবন নাশের হুমকিস্বরূপ। এটি ফলাফলগত কারণ। ইসলামি শরিয়তের পাঁচটি মৌলিক উদ্দেশ্য রয়েছে। যাকে পরিভাষায় ‘মাকাসিদ আল-শরিয়া আল-ইসলামিয়্যা’ বলা হয়। তার মধ্যে প্রথম উদ্দেশ্য হলো ‘হিফজু আন-নাফস’ বা ‘জীবনের নিরাপত্তা/সংরক্ষণ’ নিশ্চিত করা। রক্ত ক্রয় কিংবা বিক্রয় উভয়ই মানব জীবন নাশের সম্ভাবনা তৈরি করে। সুতরাং তা থেকে দূরে থাকাকে বিধান করা স্বাভাবিক। ইসলামী আইনের একটি নিয়ম হলোÑ ‘মুকাদ্দামাতু আল-হারামি হারামুন’ (কোনো হারাম বিষয়/কাজের ভূমিকাও হারাম)।
রক্তদাতা যদি বিনামূল্যে রক্ত দিতে না চান, তাহলে জরুরি পরিস্থিতিতে রোগীর কল্যাণের জন্য রক্ত ক্রয় করা বৈধ হবে; কিন্তু বিক্রয়দাতার পাপ হবে। (বিস্তারিত দেখুন : মুফতি মুহাম্মদ শফি, জাওয়াহিরুল ফিকহ, খ- ২, পৃ. ৩৮)।
রক্তদান ও রক্তদাতার বিধান : শরিয়তের প্রতিটি বিধান যেহেতু মানবতার জন্য, সৃষ্টির কল্যাণের জন্য সেহেতু এ বিষয়গুলোর ওপর লক্ষ রেখে প্রয়োজন ও পরিস্থিতি অনুযায়ী কোনো কোনো অবৈধ (হারাম) বিষয়কে বৈধতা দেওয়া হয়েছে শর্তসাপেক্ষে। ঠিক তদ্রুপ হলো রক্তদান করার ব্যাপারটি। এটি যদি এমন পরিস্থিতিতে হয় যে, রক্তগ্রহীতার মৃত্যুর সম্ভাবনা থাকে এবং রক্তদাতার বিকল্প কোনো কিছুই করা সম্ভব না হলে স্বাভাবিকভাবেই রক্ত দেওয়া বৈধ। এ বৈধতার ব্যাপারে দুটি কারণ রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
প্রথমত, রক্তগ্রহীতার জীবন রক্ষার চেষ্টা করা। এ ব্যাপারে কুরআন সরাসরি বলেছে, ‘যে কোনো একজন ব্যক্তির জীবন রক্ষা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে রক্ষা করল।’ (সূরা : মায়েদা, আয়াত : ৩২)। এ আয়াতের মাধ্যমে মানবতার জীবন রক্ষা করার জন্য এসব উপায়কে ব্যবহার করার প্রতি উৎসাহের নামান্তর। দ্বিতীয়ত, অনন্যোপায় হওয়া। অর্থাৎ বিকল্প কোনো কিছু না পাওয়া। কারণ, প্রশ্ন উঠতে পারে রোগীর জন্য এটি বৈধ কিন্তু যিনি রক্ত দেবেন তিনি তো সুস্থ ও স্বাভাবিক। এ জন্য বিকল্প চিকিৎসা ও উপায় না পেলে তখন বৈধ হবে। বিশেষ পরিস্থিতিতে রক্তদান বৈধ হওয়ার ব্যাপারে শরিয়ত বিশেষজ্ঞরা যেসব যৌক্তিক কারণ রয়েছে বলে মনে করেন তা হলো :
এক. শরীরের অন্য আনুষঙ্গিক বিষয়ের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। যেমন, মায়ের দুধ। এটি শিশুর প্রয়োজনে যেমন ব্যবহারযোগ্য তেমনি রক্তও অন্যের জীবন বাঁচানোর জন্য জরুরি। তাই এটি বৈধ।
দুই. এটিতে কাটাছেঁড়ার কোনো প্রয়োজন পড়ে না। বরং ইনজেকশনের মাধ্যমে ব্যথাহীনভাবে নেওয়া যায়। তিন. নির্দিষ্ট পরিমাণ রক্ত দেওয়ায় ব্যক্তির কোনো ক্ষতি হয় না। চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে, তিন মাসের মধ্যে প্রাকৃতিকভাবেই রক্তের প্রয়োজন পূর্ণ হয়। (বিস্তারিত দেখুন : মুফতি মুহাম্মদ শফি, জাওয়াহিরুল ফিকহ)।
এটি অবশ্য বিশেষজ্ঞ ডাক্তার কর্তৃক নির্দেশিত হতে হবে এবং এ ব্যাপারটি নিশ্চিত করতে হবে, যেন রক্ত দেওয়ার কারণে রক্তদাতার জীবন হুমকির সম্মুখীন না হয়।
অমুসলিমদের রক্ত দেওয়া বা নেওয়া : মুসলিমের জন্য অমুসলিমের রক্ত কিংবা অমুসলিমের জন্য কোনো মুসলিমের রক্ত দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বিধি-নিষেধ নেই। অর্থাৎ উপরোল্লেখিত পরিস্থিতিতে একজন মুসলিম ব্যক্তি অমুসলিম থেকে রক্ত নিতেও পারবেন, তাকে দিতেও পারবেন। (দেখুন : মুফতি মুহাম্মদ শফি, জাওয়াহিরুল ফিকহ, খ- ২, পৃ. ৪০০)। যদিও মুশরিকদের কোরআনে অপবিত্র ঘোষণা করা হয়েছে। (সূরা মায়েদা : ২৮)। তবে রক্তের প্রভাব অন্য দেহেও পড়ার সম্ভাবনা আছে, তাই মুসলিমের জন্য কোনো মুসলিমের রক্ত নেওয়ার চেষ্টা করা উত্তম।
স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে রক্ত দেওয়া-নেওয়া : স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে রক্ত দিতে পারবেন এবং সে ক্ষেত্রে সম্পর্কের মধ্যে কোনোরূপ প্রভাব পড়বে না। (দেখুন : মুফতি মুহাম্মদ শফি, জাওয়াহিরুল ফিকহ)। মাতৃদুগ্ধের বিধান এখানে প্রযোজ্য নয়। অর্থাৎ রক্ত দেওয়া নেওয়াতে সম্পর্কের ওপর কোনো প্রভাব পড়ে না।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT