পাঁচ মিশালী

সাদা পাথরে একদিন

সালমান আহমদ সোহেল প্রকাশিত হয়েছে: ০৬-০৭-২০১৯ ইং ০০:০৭:৪৩ | সংবাদটি ৩০৪ বার পঠিত

রূপ মাধুরির অসাধারণ এক প্রাকৃতিক শোভা ভোলাগঞ্জের ‘জিরো পয়েন্ট’। ধলাই নদীর স্বচ্ছ জল সৌন্দর্যকে দেয় আরো বাড়িয়ে। ধলাই নদীটি ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের পাহাড় থেকে উৎপত্তি হয়ে মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ দিয়ে আমাদের দেশে প্রবেশ করেছে। সিলেটের ভোলাগঞ্জের কাছে এসে আবার সে ভারতের মেঘালয় পর্বতমালার কোলঘেঁষে বয়ে গেছে। নদী থেকে সারি সারি পাথর তোলার দৃশ্য, ধলাই নদের অসাধারণ রূপ। সবুজ পাহাড়ে ঘেরা সাদা পাথর আর পাহাড় থেকে পাথরছুঁয়ে গড়িয়ে পড়া স্ফটিক-স্বচ্ছ জল দেখলে আপনাকে মুগ্ধ হতেই হবে। স্বচ্ছ জলে সাদা পাথর দেখবেন আর তার সাথে আলিঙ্গন করবে না! তা যেন প্রকৃতির সাথে মাননসই নয়।
সিলেটে পাথরের স্বর্গরাজ্য হিসেবে খ্যাত ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারি। সিলেট নগরী থেকে ৩৩ কিলোমিটার দূরত্বে সীমান্তবর্তী উপজেলা কোম্পানীগঞ্জ। জিরো পয়েন্ট সংলগ্ন নতুন পর্যটন স্পট হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছে ‘সাদা পাথর’ নামক স্থানটি। এখানে বর্ষাস্নাত প্রকৃতি যেন সেজে ওঠে সবুজের আচ্ছাদনে। ভোলাগঞ্জ রোপওয়ে, পাথর কোয়ারী আর পাহাড়ি মনোলোভা দৃশ্য অবলোকনের জন্য এখানে প্রতিদিনই আগমন ঘটে পর্যটকদের। ভোলাগঞ্জ কোয়ারির জিরো পয়েন্টের ওপারে উঁচু পাহাড়ে ঘেরা সবুজের মায়াজাল। সেখান থেকে নেমে আসা ঝরনার অশান্ত শীতল পানির অস্থির বেগে বয়ে চলা, গন্তব্য ধলাই নদীর বুক, প্রকৃতি যেন নিজ হাতে সাজিয়েছে। স্বচ্ছ নীল জল আর পাহাড়ের সবুজ মিলেমিশে একাকার। নদীর বুকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা পাথরের বিছানা নদীটির শোভা বাড়িয়ে দিয়েছে হাজারগুণ। সাদা পাথরের ওপর দিয়ে বয়ে চলা ঝরনার পানির তীব্র ¯্রােত নয়ন জুড়ায় আর শীতল জলের স্পর্শে প্রাণ জুড়িয়ে যায় নিমিষেই। শহুরে যান্ত্রিকতা থেকে মুক্তি পেতে সারা দেশ থেকেই ছুটে আসেন পর্যটকরা। পথে যেতে দূর থেকেই পাহাড়ের সৌন্দর্য মন কাড়বে আপনার। মন চাইবে দুই হাতে জড়িয়ে প্রকৃতির এই সৌন্দর্যকে আলিঙ্গন করতে।
শুক্রবার সকালটা ছিলো আধো আলো আধো ছায়ায় মাখা দিন। যাত্রা শুরু বাড়ি থেকেই প্রাইভেট গাড়ি নিয়ে। ওখান থেকে আমি, গিয়াস উদ্দিন, জুনাইদ আহমদ গাড়িতে চেপে বসলাম। শুরু হলো ভোলাগঞ্জের উদ্দেশ্যে যাত্রা। সিলেট শহরে পৌঁছে লামাবাজার থেকে জয়নুল আবেদিন, জুবায়ের আহমদ, মতিউর রহমান এবং আম্বরখানা থেকে আব্দুল হাকিম। (সম্পর্কে- চাচা, মামা ও ভাই। তবে আমাদের চলাফেরা বন্ধুসুলভ)। তো গাড়ির চাকা ঘুরছে আর আমরা খোশগল্প আর আড্ডায় গাড়িতে মত্ত। এয়ারপোর্ট পাড়ি দিতেই দেখা মিলে বৃষ্টির। বৃষ্টির প্রকোপ এমন ছিলো যে গাড়ির সামনের কোনো কিছুই দেখা যাচ্ছে না। সিলেট-ভোলাগঞ্জ সড়কে উন্নয়ন কাজ চলছে। ভালো-মন্দের রাস্তায় ড্রাইভার গাড়ির গতি কমিয়ে দিলেন। ধীরে ধীরে চলতে থাকে।
সাদা পাথর পর্যটন স্পট ছবিতে অনেকটা বিছনাকান্দির মতো দেখতে মনে হলেও সামনাসামনি দেখলে পার্থক্যটা ধরা পড়বে। পাথরের ওপর দিয়ে প্রবল বেগে বয়ে চলা ধলাইর কলকল শব্দে পাগল করা ছন্দ। সিলেট থেকে সাদা পাথর পর্যন্ত পুরোটা পথই প্রকৃতি তার সৌন্দর্যে বিমোহিত করবে যে কাউকে। সিলেট নগরীর সীমানা ছাড়ালেই বাংলাদেশের প্রথম চা বাগান লাক্কাতুরা। সারি সারি চায়ের গাছ দেখতে দেখতেই যাবেন অনেকটা পথ। চা বাগানের সীমানা পেরিয়ে আরো খানিকটা এগুলে সালুটিকর বাজার, কোম্পানীগঞ্জের সীমানা শুরু। বাজার পেরুলেই একদিকে সবুজ ধানক্ষেত আর অন্যদিকে বিশাল জলাভূমি। বর্তমানে ভোলাগঞ্জ যেতে হাতের ডানে কাটাখালের পাশেই বর্নি এলাকায় গড়ে তোলা হচ্ছে ‘আইটি পার্ক’। বিশাল এলাকা জুড়ে এর নিমার্ণ কাজ চলছে। জলাভূমি নীল আকাশের প্রতিচ্ছবিতে জলাভূমির পুরোটাই আকাশ মনে হয়, দেখে মনে হয় জলের বুকে ভেসে বেড়াচ্ছে মেঘ। আকাশ আর জলের খেলা দেখতে দেখতেই কোম্পানীগঞ্জের টুকেরবাজার।
বন্ধু রুবেল মিয়া। বাংলাদেশ রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী (আরএনবি) তে এসআই পদে চাকুরিরত। রেলের বাংকারে অফিসার ইনচার্জ হিসেবে কর্তব্যরত আছে। দেখা হলেই বলতো ভোলাগঞ্জ-রোপওয়ে বাংকারে বেড়াতে যাওয়ার কথা। ভোলাগঞ্জ-রোপওয়ে বাংকারে রয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ের বিশাল সম্পদ। এক সময় ভোলাগঞ্জ থেকে ছাতকবাজার হয়ে পাথর বাংলাদেশ রেলওয়ের পথ বিভাগে ব্যবহার হতো। বর্তমানে রেলের পাথর উত্তোলন বন্ধ রয়েছে। পাথর ভাঙার মেশিনটিও রয়েছে বিকল। আগে থেকেই বন্ধুকে ফোন দিয়ে যাওয়ার কথাটি জানিয়ে ছিলাম। সে হাসতে হাসতে বললো তথ্যটা কি সঠিক না পাল্টে যাবে। উত্তরে বললাম না দোস্ত এবার সবই সঠিক।
টুকের বাজার পৌঁছাতেই ফোন দিলাম বন্ধু এসআই রুবেল মিয়াকে। বন্ধু আমি এখন টুকেরবাজার, সে বললো গাড়ি নিয়ে বিজিবি ১০নং গেটে থামার কথা। সেখানে প্রচুর পর্যটক আছে। সেখানে নেমেই ফোন দিতে। সে আগে থেকেই একটি নৌকা প্রস্তুত রেখেছে আমাদেরকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। বিজিবি ১০নং গেটে গিয়ে ফোন দিতেই বলে দিলো মাসুক মিয়া মাঝি আছে তোমাদের অপেক্ষায়। ঘাটে নেমে পড়ো। নদীতে নেমে দেখি সারি সারি নৌকা বাঁধা। নামতেই মাঝিরা আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। সেখানে জিজ্ঞেস করলাম মাসুক মিয়া মাঝি আছেন নাকি। হাসিমুখে বললো স্যার আমি মাসুক মিয়া। আরএনবি স্যার আপনাদের কথা বলিয়া রাখছে। আসেন, এটা আমার নৌকা। ঘাটের অপর পাশেই বাংলাদেশ রেলওয়ের বাংকার। ওপারে বন্ধু রুবেল মিয়া তার দুইজন ফোর্স নিয়ে নদীর তীরে পায়চারি করছে। ফোন দিয়ে বলল, বন্ধু ওপারে দেখ আমি আছি। আমার গায়ে হলুদ কালার চেক শার্ট। নৌকার ভেতর থেকে বাহিরে এসে দাঁড়ালাম, চোখে পড়ল হলুদ শার্ট, সেই সাথে মাঝিও চিৎকার করে বলল, স্যার এই যে আমাদের বাংকারের স্যার আপনাদের জন্য অপেক্ষা করছে। বাংকারের ঘাটে নৌকা ভিড়তেই বন্ধু বললো, বাংকারে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে জিরো পয়েন্টের উদ্দ্যেশে যাত্রা করতে। কিন্তু আমার সাথের সবাই মানতে নারাজ। এখানে দুপুরে এসে জুম’আর নামাজ ও খাওয়া দাওয়া শেষে আড্ডা হবে। এখন জিরো পয়েন্টে যাবো।
টুপটাপ বৃষ্টি পড়ছে। বন্ধু তার ফোর্স নিয়ে একসাথে নৌকায় চেপে বসলাম। হৈ হুল্লোড় আর আনন্দ চিৎকারে শুরু হলো জিরো পয়েন্টের উদ্দেশ্যে নৌকা যাত্রা। স্বচ্ছ জলের নিচে পাথরের দৃশ্য আপনাকে এতোটাই কাছে টেনে নিবে যে, আপনাকে পাথর ছুঁতেই হবে। তবে এখানে শুধু সাদা পাথর না, কালো পাথরও রয়েছে। সাদা-কালোর মিশ্রণ অনন্য এক রূপ ধারণ করে আছে। ১২-১৫ মিনিট নৌ যাত্রা শেষে জিরো পয়েন্টে পৌঁছলাম। আমাদের সাথে মাত্র একটি ছাতা। নৌকাতেই কাপড় পাল্টিয়ে নেমে পড়লাম। সাদা পাথরের কোলে। বৃষ্টি সেই সাথে শীতল পানি। শরীরটা পানিতে বিলিয়ে দিতেই অস্বাভাবিক অনুভূতি দেহের মধ্যে জেগে ওঠে। একে অন্যেকে পানি ছিটিয়ে আনন্দে উচ্ছাসে মেতে উঠলাম সবাই। সেখানে আগে থেকেই অনেক পর্যটক আনন্দ উপভোগ করছে। নদীর বুকে পাথর মধ্যে সাঁতার কেটে আরও সামনের দিকে অগ্রসর হলাম। বাংলাদেশ সীমান্ত পেরিয়ে ভারত সীমান্তে আমরা ঢুকে পড়েছি বুঝতেই পারিনি। ভারত সীমান্তে ঝরনার পানিতে বৃষ্টি¯œান চলছেই। হঠাৎ বাঁশির পর পর শব্দ, সাদা পাথরের উপরে দাড়িয়ে দেখলাম এক বিজিবি সদস্য ও বন্ধু রুবেল মিয়া। বললেন, আমরা ভারত সীমান্তে অবস্থান করছি। আমাদের সীমান্তে চলে আসতে। পরে আমরা ধীরে ধীরে আমাদের সোনার বাংলায় চলে আসলাম। ঘড়ির কাঁটা তখন পৌনে ১টা ছুঁই ছুঁই। আরএনবি বন্ধু বলল, জুম’আ দেড়টায়। বাংকারে ফিরতে হবে। সাথে সাথেই আমার বাংকারের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম।
বাংকারের ঘাটে নৌকা আটকিয়ে আমরা নামিয়ে পড়লাম। বন্ধু সামনে আর আমরা পিছনে। ঝোঁপঝাড় দেখে বললাম এদিকে কোথায় যাচ্ছি আমরা। ও বললো, এই তো উপরেই আমরা থাকি। ভিতরে ভিতরে অনেক ভয় নিয়ে বন্ধুর পিছন ঝোঁপঝাড়-বনজঙ্গল পাড়ি দিয়ে দেখলাম পুরনো কয়েকটি ঘর। আর কিছু মানুষের শব্দ। সময়মতো পৌঁছে জুম’আর নামাজ আদায় করলাম। খাওয়া-দাওয়া করলাম বন্ধুর গেস্ট হাউজে। খাওয়া-দাওয়া শেষে ভোলাগঞ্জ রূপওয়ে বাংকার এলাকায় ঘুরাঘুরি শেষে আবার নৌকা নিয়ে জিরো পয়েন্টের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম।
ঝরনা আর আনন্দের ¯্রােতে সাদা-কালো পাথরে আবারও শুরু হলো আনন্দ উল্লাস। আমি, গিয়াস উদ্দিন ও জুবায়ের আহমদ আমরা তিনজন স্থির করলাম সাঁতার কেটে নদীর ওপারে যাবো। কিন্তু বুঝতে পারিনি পানির ¯্রােত যে আমাদেরকে নিয়ে খেলা শুরু করবে! গিয়াস ও জুবায়ের কোনোমতে নদীর তীরে ভিড়ে দাঁড়িয়ে গেছে। আমি কিন্তু এখনো সাঁতার কাটছি। ওদের কাছে আসেতেই ওরা আমাকে ধরে এবং তিনজন একজন অন্যজনের হাত ধরে নদীর তীরে উঠলাম। মাথায় চিন্তার ঢেউ এপারে আসলাম। এবার ওপারে কিভাবে যবো। ভাবলাম, নদীর তীর দিয়ে হেঁটে দেখবো যেদিকে পানি ও ¯্রােত কম সেদিকেই নদী পাড়ি দিবো। সামনে এগিয়ে গিয়ে আবার তিনজন একজন অন্যজনের হাত ধরে নদীতে নেমে দে সাঁতার চিৎ-কাত হয়ে সাঁতার কেটে আবার বাংলাদেশ সীমানায় ঢুকলাম। তবে পাঠকদের বিনয়ের সাথে সর্তক করছি, আনন্দের ঠেলায় বিপদের ঝুঁকি নিবেন না। ঘটতে পারে আনন্দের বদলে বেদনা। যে বেদনা আপনাকেও আপনার পরিবারকে ঠেলে দিতে পারে শোক সাগরে।
মনের আনন্দ উচ্ছাসে এতোটাই মগ্ন ছিলাম বুঝতে পারিনি, আছরের আযান হয়ে গেছে। হঠাৎ রেলওয়ে বাংকারের দিক চোখ পড়ল, দেখি দুইজন মুসল্লি পাথরের উপর কাপড় বিছিয়ে জামাআতের সাথে নামায আদায় করছেন। নিজেকে দোষী ভেবে চিন্তা করলাম আযানটা শুনলে হয়তো নামায আদায় করা যেতো। ব্যস্, একে অপরকে বললাম। বাড়ি যেতে হবে আর দেরী করা যাবে না। তাড়াতাড়ি ওঠে রেডি হও। মাঝি ভাইকে ফোন দিলাম, ও বলল কিছু যাত্রী নিয়ে বিজিবি গেইট যাচ্ছি। আপনারা রেডি হন আমি আসছি। ২০-২৫ মিনিট পর নৌকা পৌঁছে গেল ভোলাগঞ্জ জিরো পয়েন্টে। সবাই আধা ভেজা কাপড় পরিধান অবস্থায় নৌকায় উঠলাম আর বলতে লাগলাম আসবো আবারও ফিরে তোমার কোলে। প্রশান্তির ছোঁয়া নিতে। অন্ধকার জেঁকে বসার আগেই তাই সেই অসম্ভব সুন্দরকে বিদায় জানাই!
একটা বিষয় খেয়াল রাখবেন আপনার বা আপনার ভ্রমণ সঙ্গীদের দ্বারা পরিবেশ হুমকিতে পড়ে এমন কোনো কিছু অবশ্যই করা চলবে না, পলিথিন, প্লাস্টিকের বোতল, শিশুদের ব্যবহৃত পাম্পপাসসহ পরিবেশ বিপন্ন হয় তেমন কিছু ফেলে আসবেন না।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT