উপ সম্পাদকীয় খোলা জানালা

জগতের নাথ জগন্নাথ

সচ্চিদানন্দ কৃষ্ণ দাস প্রকাশিত হয়েছে: ০৭-০৭-২০১৯ ইং ০০:৩৭:০২ | সংবাদটি ১৬৬ বার পঠিত

জগন্নাথ শব্দটি তৎপুরুষ সমাস। এটি জগৎ এবং নাথ শব্দ দ্বয়ের সংমিশ্রণে গঠিত। এখানে জগৎ মূল ধাতু ‘গম’ থেকে এসেছে যার অর্থ যা কিছু চলমান এবং নাথ অর্থ প্রভু। তাই জগন্নাথ শব্দের অর্থ যিনি চলমান জগতের প্রভু। আবার সংস্কৃত ভাষায় জগৎ অর্থে বিশ্ব এবং নাথ অর্থে ঈশ্বর বোঝায়। সুতরাং জগন্নাথ শব্দের অর্থ জগতের ঈশ্বর বা জগদ্বীশ্বর। জগন্নাথ হলেন শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যখন বৃন্দাবন ত্যাগ করে দ্বারকালীলায় রত হবেন তখন ব্রজ গোপীগণ ভগবানকে তাঁর বাল্যলীলাস্থল বৃন্দাবনে ফিরিয়ে নিতে চেয়েছিলেন। গোপীগণ ভগবানকে রাজবেশে নয় ব্রজবেশে সাজিয়ে বলরাম সুভদ্রা মহারাণী সমেত রথে আরোহণ করে রথ টেনে বৃন্দাবনে গুন্ডীচা মন্দিরে নিয়ে চলেন। মূলত তখন থেকেই রথযাত্রার আরম্ভ হয়।
প্রতি বছর আষাঢ় মাসের পুষ্যা নক্ষত্রযুক্তা শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতে সনাতন ধর্মের বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব রথযাত্রা পালিত হয়। ঐদিন ভগবান শ্রীমন্দির ছেড়ে লোকালয়ে বেরিয়ে আসেন যাতে জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকলে তাঁর দর্শন লাভে বিশেষ কৃপা লাভ করতে পারে। বিশেষ করে যারা সময়ের অভাবে মন্দিরে গিয়ে ভগবান জগন্নাথদেবকে দর্শন করতে পারেন না, তাদের জন্য রথযাত্রা এক বিশেষ সুযোগ ভগবানকে রাস্তায় দর্শন করার।
ভগবানের যত শ্রীবিগ্রহ রয়েছে তন্মধ্যে জগন্নাথ বিগ্রহ বা ভগবানের জগন্নাথ রূপ সবচেয়ে বেশি কৃপালু। ভগবান জগন্নাথ অনায়াসে সকলকে কৃপা করে থাকেন। ভগবানের জগন্নাথ রূপই যে বেশি কৃপালু তার প্রমাণ সহজেই যে কেউ ভগবান জগন্নাথ দেবের শ্রীবিগ্রহ দর্শনে জানতে বা বুঝতে পারেন। আপনারা লক্ষ্য করলে দেখতে পারবেন ভগবান জগন্নাথদেবের বিগ্রহের নেত্রদ্বয় লাল রঙ্গে আবৃত। এর কারণ কারো যখন অনেক দয়া হয় তখন চোখ থেকে জল নির্গত হয় তখন চোখ লাল হয়ে যায়। জগন্নাথের আঁখিদ্বয় সর্বদাই লাল বর্ণের হয়। আরো লক্ষ্য করলে দেখতে পারবেন জগন্নাথের চক্ষুদ্বয়ে কোন পাপড়ি বা পর্দা নেই। অর্থাৎ ভগবান জগন্নাথদেব তাঁর চক্ষুদ্বয় দ্বারা নিষ্পলক বা পলকহীনভাবে চেয়ে সকলের উদ্দেশ্যে করুণা বর্ষণ করছেন।
শাস্ত্রে উল্লেখ্য ‘রথে চ বামনাং দৃষ্ট পুনর জন্ম ন বিদ্যতে’ অর্থাৎ যদি কেউ রথারূঢ় জগন্নাথকে একবার দর্শন করে বা রথের রশি (রথের রশির নাম বাসুকি) ধরে একবার টান দেয় তবে তার আর পুনর্জন্ম হয় না সে তৎক্ষণাৎ মুক্তি লাভ করে। স্কন্ধ পুরাণ মতে, যিনি রথারুঢ় ভগবানের শ্রীবিগ্রহের দর্শন লাভের সৌভাগ্য অর্জন করেছেন তিনি অশ্বমেধ যজ্ঞের ফল লাভ করে থাকেন।
বিশ্বের সর্ববৃহৎ রথযাত্রা মহোৎসব অনুষ্ঠিত হয় ভারতের উড়িষ্যার জগন্নাথ পুরীতে। ভারতের উড়িষ্যার পুরীর জগন্নাথের রথ ২০৬টি কাঠ দিয়ে তৈরি। যাহা বলা হয় মানব দেহের ২০৬টি হাড়ের অনুরূপ। রথের রয়েছে ১৬টি চাকা। যাহা ৫টি জ্ঞানেন্দ্রিয়, ৫টি কর্মেন্দ্রিয় এবং ৬টি রিপুর প্রতীক। তিনটি রথের আলাদা আলাদা নাম ও ধ্বজা/পতাকা রয়েছে। জগন্নাথ দেবের রথের নাম নন্দীঘোষ একে কপিধ্বজও বলা হয়। রথের আবরণের রং হলুদ। বলদেবের রথের নাম তালধ্বজ রথের আবরণের রং নীল। সুভদ্রা মহারাণীর রথের নাম দর্পদলন। রথের আবরণের রং লাল। একে পদ্মধ্বজও বলা হয়। পুরীর জগন্নাথের রথের অদ্ভুত দৃশ্য হল উল্টো রথযাত্রার পর ভগবান জগন্নাথদেব রথ থেকে নেমে যাওয়ার পর ঐ রথ আর ঠেলেও চালানো যায় না। কারণ ভগবান একবার রথ থেকে নেমে গেলে পরের বছর ঐ রথে আর আরোহন করেন না। তখন ঐ রথ ভেঙ্গে কাঠ জ্বালানী হিসেবে ভগবান জগন্নাথ দেবের ভোগ রান্নার কাজে ব্যবহার করা হয়। তাই জগন্নাথ পুরীতে প্রতিবছর নতুন রথ তৈরি করা হয়। এটা জগন্নাথপুরীর এক অলৌকিক দৃশ্য। জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা মহোৎসব সার্বজনীন এবং অসাম্প্রদায়িক। রথযাত্রা মহোৎসবে অংশগ্রহণে কোন জাতি ধর্ম গোত্রের ভেদাভেদ নেই সকলের অংশগ্রহণের সুযোগ রয়েছে। জয় জগন্নাথ।
লেখক : কলাম লেখক

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • সম্ভাবনার ক্ষেত্র এবং নতুন প্রযুক্তি
  • গণমানুষের মুখপত্র
  • জাহালম কি আরো আছে!
  • নারী নির্যাতন ও আমাদের বাস্তবতা
  • সিলেটের ডাক : কিছু স্মৃতি কিছু কথা
  • বর্ষাঋতুতে শিশুদের যত্ম
  • কোটি মানুষের মুখপত্র
  • ৩৬ বছরে সিলেটের ডাক
  • প্রত্যয়ে দীপ্ত ‘সিলেটের ডাক’
  • পাঠকের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি
  • এরশাদ : এক আলোচিত পুরুষের প্রস্থান
  • প্রাসঙ্গিক ভাবনায় ২০১৯-২০ অর্থ বছরের বাজেট
  • মেঘালয়ের মেঘমালা
  • পরিবেশ সংরক্ষণে সামষ্টিক উদ্যোগ
  • বর্ষা মানেই কি জলাবদ্ধতা?
  • শিষ্টাচার ও সৌজন্যবোধ
  • রেলের প্রতি জনগণের আস্থা বিনষ্ট করা যাবে না
  • প্রকৃতির দায় শোধে বৃক্ষ রোপণ
  • ঋণ দেয়া-নেয়ায় প্রাসঙ্গিক ভাবনা
  • কান্ডারী হুঁশিয়ার!
  • Developed by: Sparkle IT