সাহিত্য

মায়ের বুক

শামীম আজাদ প্রকাশিত হয়েছে: ০৭-০৭-২০১৯ ইং ০০:৩৯:২৯ | সংবাদটি ৫৯ বার পঠিত

হায়রে, আমার এক জোড়া প্রত্যঙ্গ নিয়ে ঘানা বংশোদ্ভূত শান্ত দর্শন নার্সটির কি যে একটা হাতাহাতি! মানুষের দেহাংশ আর যন্ত্রের দেহাংশের মধ্যে একটা সমঝোতা এনে ছবি তোলার জন্য তার এ কুস্তি বুঝি! কারণ এ টা টা করা হাত বা নৃত্য পরয়ন পা নয় যে আলাদা করে ছবি তোলা যাবে। এ হচ্ছে স্তন যুগল। যৌবনে নারীর সৌন্দর্য সুষমা, প্রেম শয্যায় কুসুম ও সন্তান জন্মের পর তার অন্নজল। বুকে বসা এক অত্যাশ্চর্য লেডিবার্ড। কিন্তু যদি তাতে কর্কট কামড় পড়ে তখন আমরা ধমাধম মরি। এখন তো তা এক মহামারী। প্রায় প্রতি ১০ জনে একজনের স্তন ক্যান্সার হচ্ছে। আপনিও অন্তত তিন থেকে পাঁচজন আক্রান্তের কথা বলতে পারবেন। আজ আমি এসেছি বার্ট হাসপাতালে।
আসতেই মনে হলো ব্রেস্ট ক্যান্সার আক্রান্ত বাধ্য হয়ে সুইডেনে বসবাসরত এক প্রিয়জনের কথা। তার দুটি অপ্রাপ্ত বয়সী কন্যা। একটি নিজের অন্যটি দত্তক নেওয়া। নিজের মেয়ের নিজ বাবা বেঁচে থেকেও তাদের জীবনে কোনো ভূমিকাই রাখে না। জন্মযোদ্ধা সাংবাদিক ও লেখক এ নারী এখন বিদেশ-বিভুঁইয়ে প্রিয়জনহীন ওই কন্যাদ্বয়ের জন্য কি যে সংগ্রাম করে যাচ্ছেন! প্রাথমিক অবস্থায় শনাক্ত করায় অস্ত্রোপচার সফল হয়েছে।
আমি ভালো আছি। তবু ব্রিটেনে বিনামূল্যে ভ্রাম্যমাণ ব্যবস্থাদিতে নিয়মিত স্তন পরীক্ষা হয়। বুকে, বগলে যেখানেই মাংসের গুটলি হবে তাকে ফোঁড়া না ভেবে তক্ষুনি জিপির কাছে যেতে হয়। আর জিপির সিস্টেমে এর জন্য আছে বিশেষ ব্যবস্থা। তিনি তখন সমস্ত নিয়ম উপেক্ষা করে দ্রুত ম্যামোগ্রামের ব্যবস্থা করেন। সেই সদ্য উপসর্গ নিরাপরাধ ফুষ্কুড়ি বা বিনাইন হতে পারে আবার তা রাগী উন্মুখ বা ম্যালিগন্যান্টও হতে পারে- হতে পারে ভয়াবহ ক্যান্সারাস। তা হলে দেহ পেতে দিতে হবে ফালি করার জন্য! তাতে আয়ুটা পেরুলেও বড় অস্ত্রপচারে দেহ হয়ে যায় ভিন্ন। মন হয়ে যায় উদ্দমহীন, চোখজোড়া সন্ধ্যার মতো ঘোলা। জীবন সীমিত হয়ে আসে বাথরুম আর বিছানায়। আমার পরম স্নেহের স্বল্পভাষিণী ছোটবোনের মতো দীপাকে দেখে তাই মনে হয়েছিল। প্যাট্রিসিয়া ও দীপা আমারই সঙ্গে এ দেশে শিক্ষকতা করতে এসেছিল। তারা দুজনই কর্কট কামড় থেকে জীবন নিয়ে ফিরে আসতে পারেনি। কেউ নেই!
কথা হলো লক্ষণ না দেখা গেলেও নিয়মিত বক্ষ পরীক্ষা করতে হয়। যার জন্য আজ এ আব্রু খোলা-এই অজানা অচেনা নারীর কাছে দেহখানি তুলে ধরা। এ নিয়ে লজ্জার কিছু নেই। মনে রাখতে হবে-পাগলের বিষ নেই, রোগীর নেই পর্দা আর মৃতের নেই কোনো মতামত। আমি তাই মনে করে মনে মনে বিরক্ত হয়ে শাহ আবদুল করিমের সুরে গান ধরি, ও আমার কৃষ্ণবরণ কইন্যারে এই দুই খ- মেদ নিয়া কর তোমার মনে যাহা লয় আর দ্রুত ছুটি দাও।
ভালো অসুখ বলে কোনো কথা নেই। তবু এই স্তন-কর্কট রোগের ভালো দিক এই যে-প্রথম অবস্থায় ধরা পড়লে মানুষ বেঁচে যায়। আমার প্রিয়জনদের দু’তিনজন ছাড়া কেউই প্রথম অবস্থায় টের পায় না। স্তন ক্যান্সারে প্যাট্রিসিয়া, দীপা ও দুর্দান্ত সাহসী সুন্দরী বহুগুণে গুণান্বিতা শেলীকে ওই দুষ্ট ব্যাধির জন্য চলে যেতে হয়েছে। ওরা প্রত্যেকেই বিলেতে বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের জন্য ছিল এক একটি রতœ বিশেষ। ওদের হারিয়ে বুঝেছি আমাদের কত ক্ষতি হলো আর ব্যক্তিগতভাবে এমন ভয় পেয়েছি যে, স্তন পরীক্ষার সমন পেলেই পুতুর পুতুর করে দৌড় দিই। বাঁচতে হলে এ পরীক্ষা অপরিহার্য। তাই লজ্জা লুকিয়ে নিজেকে নার্সের সঙ্গে অত্যন্ত স্বাভাবিক গলায় নিজের বেকুব চেহারায় চালাক ভাব আনার চেষ্টা করি। মেশিন কি আর মন বোঝে? তার ওপরে যা ঠেসে ধরা হবে তার ভেতরে জোনাক জ্বেলে ছবি তুলবে। কিন্তু জোরে আকর্ষণ করলেই কি তা তো আর দেহের দরজার বাইরে যেতে পারে না। বরং স্তনে টান পড়লে পুরো বুক বাহু এমনকি দেহও সঙ্গে রওনা দেয়।
কিন্তু মমতাময়ী ঘানা রমণীর কৌশল জানে। স্ক্যান করার জন্য কীভাবে এই শীতল ও শক্ত বেকুব মার্কা যন্ত্রে হেলে পড়তে হয়, হাত তুলে সারেন্ডার ভঙ্গিতে দাঁড়াতে হয়, হাত বদলে ব্যালে ড্যান্সের মতো ভঙ্গি করতে হয় সব সব। মেটালের ওপর আমার মেদখ- চেষ্টা করতে থাকলাম। তার কথায় একবার হাত পিছাই তো আরেক বার ঘাড়। এক সময় তা শেষ হলো। তিনি ওই অদ্ভুত অবস্থায় বসিয়ে পরীক্ষা করতে গেলেন-ছবি ঠিক এসেছে কি না। ঘরের নীল অন্ধকার দেখি আর ঠান্ডা মিসেস আজাদ, ইউ মে ড্রেস আপ নাউ। পোশাক পরতে পরতে মনে পড়ে ক’বছর আগে একবার এরকম একটি ভ্রাম্যমাণ পরীক্ষা কেন্দ্রে এসেছিলাম। তখন কানাডা থেকে কবি ফেরদৌস নাহার লন্ডনে এসেছেন তার এক বান্ধবীর কাছে। বেরিয়েই ফোন দেব। ওর সঙ্গে দেখা হবে মনে আমার আনন্দ অপার।
বাইরে বেরিয়ে দেখি তাজ্জব কান্ড ! যে চেরী ব্লসমের নিচে রেখেছিলাম আমার গাড়ি তাতে স্ট্রবেরি আইস্ক্রিম রঙা পাপড়ি পড়ে ঢেকে গেছে আমার রুপালি রাজহাঁস। মহাআনন্দে গাড়িতে বসে চাবি ঘোরাতেই রেডিও এফএমে জনি ক্যাশ তার গলায় বাজাতে থাকেন দুনিয়ার গয়না। আহা আহা! পাপড়ি রাস্তায়, গাড়ির শুঁড়ে। বাতাসে তা সেখান থেকে উড়ে যেতে শুরু করে। নিজেকে রানী রানী লাগতে থাকে। আজ আমি ফুলের ওপর দিয়ে ভাসব। কিন্তু তার আগে ফেরদৌস ফেসবুকে আমাকে যে একটা মোবাইল নম্বর দিয়েছিল তাতে ফোন করা দরকার।
কবি, কোথায়? কিন্তু উত্তর দিল ভিন্ন এক রিন রিনে কণ্ঠস্বর। আমি বলি, কি নাম তোমার কন্যা, কোথায় তোমার ঘর, এত সুন্দর তোমার স্বর। মন ভালো থাকলে আমি অমন রঙ্গ করি। অন্যপ্রান্তে হেসে সে মেয়ে আমার আকাশে হৈ হৈ এনে দেয়।
-ফেরদৌস আপা এখন একটু বাইরে। অহ। শামীম আপা আপনি কিন্তু ভারি অহংকারী। কেন? ফেসবুকে আপনাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট করেছিলাম আপনি অ্যাক্সেপ্ট করেননি। অ। আমি মহা অপ্রতিভ। কিন্তু সে না। সে হাসে সেই কাপ পিরিচের আর মেঘের হৈ চৈয়ের হাসি। এমন মেয়েকে আমি কষ্ট দিলাম? এ তো সহজিয়া নারী! তারপর আমি গাড়ি থামিয়ে দিলাম। ওর সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছা করছিল। -দেখো, ঠিক চলে আসব একদিন।
-আপা, আসতে হবে না। আমি ব্রেস্ট ক্যান্সারের শেষ পর্যায়ের পেশেন্ট এ কথা শুনে স্তব্ধতার পরে আর যদি কিছু থাকে সে স্তর থাকে তাতে পড়ে যাই। আপা, মন খারাপ করবেন না। আপনি খালি দোয়া করবেন আমার একটি ছয় বছরের ছেলে। ওর বাবা থেকেও নেই। আমরা দুজন ফাইট করছি একসঙ্গে। ফেরদৌস আপা এজন্যই আমাকে দেখতে এসেছে।
তারপর প্রায় আধ ঘণ্টা ওর সঙ্গে কথার শেষে গাড়িতে চাবি ঘোরাই। চোখের সামনের সব রং নাই হয়ে গেছে, উড়তে থাকা সব পাপড়ি রংহীন। এক কৌণিক পৃথিবী নেমে এসে আমাকে খেজুর কাঁটার মতো কেচাতে থাকে। কান্না আসে। মনের শূন্যস্থানে না দেখা এই ক্রুনি মায়ের চেহারা দেখি। মনে পড়ে আমার সে চাচির কথা, কন্যার পরীক্ষাটা পার করে তবে ডাক্তার দেখাতে গিয়ে শোনেন তার স্তন ক্যান্সার স্তর লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে চতুর্থ পর্ব পার করে ফেলেছে। মনে পড়ে অসাধারণ মানবিক গুণের অধিকারিণী ও শিক্ষক বন্ধু প্যাট্রিসিয়ার হস্পিসের শেষ দিনগুলোর কথা। কিছুই যখন মুখে রোচে না আমি ওর কথামতো মাখা মাখা করে কাঁচকি মাছ আর রসুনের ফোঁড়নে লালশাক ও আতপ চালের ভাত রান্না করে নিয়ে গেছি। আমি ওর মুখে নলা তুলে দিচ্ছি তখনই দেখি বাড়ি থেকে ওর কিশোর পুত্র আকাশ এসেছে। মাকে দেখে স্কুলের কি একটা কার্যক্রমে যাবে। প্যাট্রিসিয়া আমাকে থামিয়ে বলে, আপা ওরে দেন খাক, অনেক আনছেন তো। বাবা, খাবি একটু? শামীম আপা, আমি তো নাই ছেলে দুইটা কি খায় না খায়। স্যামুয়েল কি আর পারে?
আহারে মায়ের জান! মনে পড়ে যায় হ্যান্স ক্রিস্টিয়ান অ্যান্ডারসনের সেই বিখ্যাত গল্প। ছেলেটি প্রেমিকার জন্য মাকে হত্যা করে তার কথামতো মায়ের হৃদয় হাতে নিয়ে ছুটে যাওয়ার সময় উষ্ঠা খেয়ে পড়ে গেলে মা’র রক্তাক্ত হৃদয় বলে, বাবা ব্যথা পাসনি তো? প্রতি অঙ্গে এমনকি আঙ্গুলেও জীবন আটকে রাখার যন্ত্রপাতি প্যাট্রিসিয়ার, সে যেকোনো মুহূর্তে চলে যাবে-আর কিনা ভাবছে তার ছেলে খেয়েছে কিনা! সে দিন আমি বাড়ির পথ ধরে জারে জার হয়ে কাঁদতে থাকি। হায় ঈশ্বর, মা জাতির এত প্রয়োজনীয় অঙ্গে তুমি এত বিষ কী করে দাও, কেন দাও।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT