সাহিত্য

তাঁর নাম আহমদ ছফা

মুহাম্মদ ইয়াকুব প্রকাশিত হয়েছে: ০৭-০৭-২০১৯ ইং ০০:৪২:২৭ | সংবাদটি ১৮৭ বার পঠিত

প্রথাবিরোধী লেখক, চিন্তাবিদ ও গণবুদ্ধিজীবী আহমদ ছফা (৩০ জুন ১৯৪৩, ২৮ জুলাই ২০০১) বাংলা সাহিত্যের অনন্য উজ্জ্বল এক নাম। তাঁর বুদ্ধিবৃত্তির শিকড় হতে শিখরে ছড়িয়ে আছে এদেশের আপামর জনসাধারণের মুখের কথা, মনের কথা। ছফার সমগ্র জীবন ব্যয় হয়েছে মানুষ এবং মানবতার কল্যাণে। প্রত্যেক কার্যক্রমে তিনি দল, গোষ্ঠী বা ধর্মীয় মতাদর্শের চেয়ে মানবতাবাদকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন। তারুণ্যের রোল মডেল আহমদ ছফা যা বলেছেন আর যা করেছেন তা বলা বা করা সবার পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে না। অনেকে মনে করতে পারেন, ছফা খ্যাতির মোহে এমন কথা বলেছেন বা এমন কাজ করেছেন। কিন্তু আমৃত্যু অকৃতদার ছফাকে ভালোভাবে জানলে এই ভুল ধারণার অবসান হবে। তারুণ্যে ছফার মতো প্রভাব বিস্তারকারী সাহিত্যিক বাংলাদেশের জমিনে খুব কম জন্মগ্রহণ করেছেন।
আহমদ ছফা সত্য বলতেন দ্বিধাহীন চিত্তে, মানবতার কথা বলতেন বুক চেতিয়ে, অধিকারের দাবি উত্থাপন করতেন মাথা উঁচু করে। জাতির ক্রান্তিলগ্নে তিনি সত্য উন্মোচনের মাধ্যমে সংকট উত্তরণের পথ বাতলে দিতেন। জনসম্মুখে নিজের পরিচয় স্পষ্ট করে বলতেন, ‘আমি চাষার ছেলে’। বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্য, সংস্কৃতি, রাজনীতিতে আহমদ ছফার সৃষ্টিকর্ম কতটা প্রভাব বিস্তার করে তার বর্ণনা দিয়ে বুদ্ধিজীবী ফরহাদ মজহার লিখেছেন, ‘সে (ছফা) গাছবাড়িয়া গ্রাম থেকে আসা অতি সাধারণ একটি গ্রামের ছেলে। কিন্তু সাহিত্য, সংস্কৃতি, চিন্তা ও রাজনীতির জগতে সে যে উথালপাথাল ধাক্কা দিয়ে গেল তার ফলে বাংলাদেশের সাহিত্য বলি, সংস্কৃতি বলি, রাজনীতি বলি, বৈপ্লবিক কর্মকা- বলি তার সঙ্গে খোদ একটা বোঝাপড়া না করে কোনো ক্ষেত্রেই অগ্রসর হওয়া যাবে না।’ আহমদ ছফা সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শে বিশ্বাসী মানুষ ছিলেন। কিন্তু এদেশের সংখ্যাধিক্য গণমানুষের বিপরীত চিন্তা-চেতনার স্বপ্ন দেখা কথিত সাম্যবাদীদের তিনি সহ্য করতে পারতেন না। পাশাপাশি সমাজতান্ত্রিক চিন্তার বাঙালিদের চীন-রাশিয়ার লেজুড়বৃত্তিকে প্রচ- ঘৃণা করতেন। এ প্রসঙ্গে ছফার ভাষ্য হলো, ‘আমাদের দেশের অনেক বুদ্ধিজীবী নিজের দেশের ইতিহাসের বদলে চীন-রাশিয়ার ইতিহাস মুখস্থ করে। আসলে এটাও একটা পলায়নী মনোবৃত্তি, এ পলায়নী মনোবৃত্তি থেকেই রাজনীতি সংস্কৃতিতে লেজুড়বৃত্তির জন্ম। আগে আমরা লেজ না মাথা সেটিই ঠিক করতে হবে।’ (বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস-আহমদ ছফা, পৃষ্ঠা. ৯০)
যে কোনো মানুষের বিপদে আহমদ ছফা ছুটে যেতেন। ছফার মহাত্মায় মানবতাবোধ জাগ্রত থাকত সর্বাবস্থায়। ১৯৯১ সালে উপকূলীয় অঞ্চলে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। ত্রাণ বিতরণ হতে শুরু করে ঘরবাড়ি নির্মাণে সহযোগিতা করেছিলেন। রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর আকস্মিক মৃত্যুর পর তাঁর অপ্রকাশিত গ্রন্থগুলো প্রকাশের জন্য আহমদ ছফার তৎপরতায় কবীর চৌধুরী, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, অসীম সাহাদের নিয়ে সাব-কমিটি গঠিত হয়েছিল। মৃত্যু এবং জন্মবার্ষিকীতে ‘রুদ্রমেলা’র আয়োজন করা হয়েছিল। এক সাক্ষাৎকারে কবি হেলাল হাফিজকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘আহমদ ছফা নাকি তখন আপনাদের সবার গুরু ছিলেন?’ জবাবে হেলাল হাফিজ বলেছিলেন, ‘হ্যাঁ। ছফা ভাই আসলে প্রতিভা চিনতেন। যার ভেতর মেধা আছে তিনি তাদের নার্সিং করতেন। সময় দিতেন। আড্ডা দিতেন। বিভিন্ন প্রোগ্রামে ডাকতেন। কখন কোন বই পড়তে হবে বলতেন। তিনি আমাদের অনেক দিক দিয়ে হেল্প করতেন। এটা সবাই করতে পারে না। ছফা ভাই অনেক বড় হৃদয়ের মানুষ ছিলেন। লেখক হিসেবেও বড় মানের। ... ... ... অনেকের বইও নিজের পকেটের টাকা খরচ করে ছাপানোর ব্যবস্থা করতেন।’
কবি নির্মলেন্দু গুণ সামরিক সরকারের সময় গ্রেফতার হয়েছিলেন। অনেকেই তাঁকে দেখতে গিয়ে চিহ্নিত হয়ে যাবার ভয়ে নীরব ছিলেন। আহমদ ছফা ছুটে গিয়েছিলেন। সাংবাদিক রাজু আলাউদ্দিনকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে নির্মলেন্দু গুণ সেই ঘটনার স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘আহমদ ছফা আমাকে দেখতে গেছিলেন। তিনি আমার সম্পর্কে যা বলছিলেন, তা আমার বিপক্ষেই চলে গেছিলো। হা হা হা... তিনি পুলিশকে বলছিলেন, হায়, এরে ধরে নিয়ে আসছেন, তার সব আত্মীয়স্বজন তো ইন্ডিয়া চলে গেছে, সে একলা থাকে দেশে। ওকে দেখার কেউ নাই। আমরাই ওর দেখাশুনা করি। পুলিশের লোকরা তখন বললো, উনিই তো বললেন, তাঁর আত্মীয়স্বজন ইন্ডিয়াতে যায় নাই। আমি তো মিথ্যা বলছিলাম যাতে আমাকে সন্দেহ না করে।’
স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বেতার থেকে কবি ফররুখ আহমদকে চাকরিচ্যুত করা হলে আহমদ ছফা খেপে ওঠেন। অথচ আদর্শগতভাবে ফররুখ আর ছফা পরস্পর দুই মেরুর বাসিন্দা। লেখক সমাজের সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে ছফা ব্যক্তিগত আদর্শ বিবেচনা করতেন না। ১৬ জুন ১৯৭৩ সালে দৈনিক গণকণ্ঠে ‘কবি ফররুখ আহমদের কী অপরাধ?’ শিরোনামে তথ্য ও যুক্তিনির্ভর দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখলেন। প্রবন্ধটি এতই ধারালো ছিল যে, সরকার ফররুখকে চাকরিতে পুনর্বহাল করতে বাধ্য হয়। লেখাটি শুরু করেছেন এক হৃদয়গ্রাহী ঘটনার অবতারণার মাধ্যমে
‘খবর পেয়েছি বিনা চিকিৎসায় কবি ফররুখ আহমদের মেয়ে মারা গেছে। এই প্রতিভাধর কবি যার দানে আমাদের সাহিত্য সমৃদ্ধ হয়েছে- পয়সার অভাবে তাঁর মেয়েকে ডাক্তার দেখাতে পারেননি, ঔষধ কিনতে পারেননি। কবি এখন বেকার। তাঁর মৃত মেয়ের জামাই, যিনি এখন কবির সাথে থাকছেন বলে খবর পেয়েছি, তাঁরও চাকুরী নেই। মেয়ে তো মারাই গেছে। যাঁরা বেঁচে আছেন, কী অভাবে, কোন অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশার মধ্যে দিনগুলো অতিবাহিত করছেন, সে খবর আমরা কেউ রাখিনি। ... হয়ত একদিন সংবাদ পাব কবি মারা গেছেন, অথবা আত্মহত্যা করেছেন। খবরটা শোনার পর আমাদের কবিতাপ্রেমী মানুষের কী প্রতিক্রিয়া হবে? ... ... হয়ত ব্যথিতই হব এ কারণে যে, আজকের সমগ্র বাংলা সাহিত্যে ফররুখ আহমদের মতো একজনও শক্তিশালী ¯্রষ্টা নেই।’ নিবন্ধটির মাধ্যমে মহাত্মা ছফা ‘ফররুখ আহমদ সাহায্য তহবিল’ গঠন করার জন্য কবির অনুরাগীজন এবং দেশপ্রেমিক, সংস্কৃতি প্রেমিক জনগণের কাছে আবেদন রাখেন। সাহিত্য-সংস্কৃতির বিশুদ্ধ প্রহরী হিসেবে তিনি জাতিকে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করেছেন। সাহিত্য পত্রিকার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে তাঁর মত হলো, ‘যে দেশে পাঠযোগ্য সাহিত্য পত্রিকা তৈরী হয় না সেখানে গণতন্ত্র বা অন্য কোন দাবি অর্থহীন মনে হয়।’ ১৯৬৯ সালে তিনি নিজের সম্পাদনায় প্রকাশ করা শুরু করেছিলেন ‘স্বদেশ’ নামক সাহিত্য পত্রিকা। পত্রিকাটির সঙ্গে জড়িত ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম মন্ত্রীসভার সদস্য ড. মফিজ চৌধুরী, সরদার ফজলুল করিম, সত্যেন সেন, আহমদ শরীফ, মুনতাসীর মামুন, অসীম সাহাসহ বিশিষ্টজনরা। লেখক সমাজকে প্রতিবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধকরণ এবং লেখকস্বার্থ রক্ষার উদ্দেশ্যে ১৯৬৯ সালে প্রতিষ্ঠা করেন, ‘বাংলাদেশ লেখক শিবির’ নামক সাহিত্য সংগঠন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ছফার নিজের প্রতিষ্ঠিত সংগঠন থেকে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে স্বয়ং ছফাকেই বিতাড়িত করা হয়। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মুক্তি সংগ্রামের পক্ষে আহমদ ছফা কলকাতা থেকে ‘সাপ্তাহিক দাবানল’ নামক একটি পত্রিকা প্রকাশ শুরু করেছিলেন, যা স্বাধীন বাংলাদেশেও কিছুকাল চালু ছিল। স্বাধীনতা সংগ্রামকে বেগবান করার লক্ষ্যে কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয় তাঁর ‘জাগ্রত বাংলাদেশ’।
স্বাধীনতাপরবর্তী বাংলাদেশেও অন্যায়, অপকর্ম, অসঙ্গতির বিপক্ষে ছফা মুক্ত বিহঙ্গের মতো। কোনো ভয় বা শঙ্কা তাঁকে কখনো নিবৃত্ত করে রাখতে পারেনি। তাঁর সাহিত্যকর্মগুলোর বিষয়বস্তুও জাতীয় কল্যাণমূলক। তিনি যেটি ভালো মনে করতেন অকপটে প্রকাশ করতেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য ছিল, ‘বাংলার গত তিন হাজার বছরের ইতিহাসে তাঁর তুলনা নেই।’ আহমদ ছফা যেন অন্যসব মানুষের ধাতু দিয়ে গড়া মানুষ নন। তথাকথিত বুদ্ধিজীবী, কবি-সাহিত্যিক, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ভুতুড়ে নীরবতা পালন করছিলেন। তখন আহমদ ছফা বৈরী পরিবেশেও ‘হলিডে’ পত্রিকায় ১৫ আগস্টের নির্মমতার প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন।
মুখের কথা আর হাতের লেখার সঙ্গে যাপিত জীবনে অনন্য সমন্বয়ের নাম মহাত্মা আহমদ ছফা। ছফা বাংলাদেশের অবিস্মরণীয় এক সূর্যসন্তানের নাম। ছফারা মরেন না, বেঁচে থাকেন। যতদিন বাংলা ভাষা আর বাংলাদেশ থাকবে ততদিন ছফা প্রবহমান নদীর মতো জাতীয় জাগরণে সঞ্জীবনী উপাদান হিসেবে বেঁচে থাকবেন।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT