উপ সম্পাদকীয়

পারিবারিক-সামাজিক মূল্যবোধ এবং বৃদ্ধকাল

পিযুষ চক্রবর্তী প্রকাশিত হয়েছে: ০৭-০৭-২০১৯ ইং ০০:৫১:৪৫ | সংবাদটি ১৬১ বার পঠিত

মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব এবং সঙ্ঘবদ্ধ প্রজাতি। প্রয়োজনের তাগিদেই মানুষ পরিবার গঠন করে। পরিবার একটি আদি প্রতিষ্ঠান যা গড়ে ওঠে রক্তের সম্পর্ক ও মানবিক বন্ধনের মধ্য দিয়ে। কথায় আছে Man Cannot live alone So he need accompany. মানুষ সঙ্ঘবদ্ধ, সু-শৃঙ্খল ও বুদ্ধিবৃত্তি সম্পন্ন প্রাণী। বুদ্ধির বলেই মানুষ প্রকৃতিকে জয় করছে এবং সৃষ্টিশীলতার দিকে ছুটছে। মুখের আহার সংগ্রহ থেকে শুরু করে সামাজিক উপায়ে বৈধ সম্পর্কের মধ্য দিয়ে সন্তান উৎপাদন, পরিবার গঠন, সামাজিক সু-সম্পর্কসহ নানাবিধ অগ্রযাত্রায় একমাত্র মানুষই ¯্রষ্টার সৃষ্টি জগতে উত্তম। Man is the best creature and rational being of god. মানুষ অজেয়কে জয় করতে এবং অজানাকে জানতে উদ্গ্রীব ছিল, আছে এবং থাকবে। জীব বৈচিত্রের প্রকৃতির রাজ্যে মেধা-শ্রম ও সময়কে কাজে লাগিয়ে মানুষ সমুদ্র বিজয় থেকে শুরু করে মহাকাশ বিজয়েও সফলতা অর্জন করছে। বর্তমান যুগ তথ্যপ্রযুক্তির ও ডিজিটাল সম্পন্ন। পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে মানুষের মধ্যে মানব প্রেম, ভালোবাসা, মূল্যবোধ ও দায়িত্ব-কর্তব্য চরিতার্থ ছিল মানুষের মধ্যে। আজ মানব প্রেমের পাশাপাশি যন্ত্রপ্রেমী, কর্মমুখী ও উপার্জনমুখী হয়ে উঠছে মানুষ। সময় গতিশীল মানুষ পরিবর্তনশীল। উন্নয়নকামীতা মানুষের সহজাত প্রবৃদ্ধির অন্তর্গত। তবে উন্নয়ন ও সভ্যতার নামে মানবপ্রেম, মূল্যবোধ ও রক্তের সম্পর্কের সুদৃঢ় বন্ধনগত দায়িত্ব-কর্তব্য ও অধিকার থেকে দূরে সরলে কী মনুষ্যত্ববোধ চর্চা হবে? মান-হুঁশে মানুষ। অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া এবং বঞ্চিত করা দু’ই পাপ। কথায় আছে লোভে পাপ পাপে মৃত্যু। তাহলে কি মানুষ উন্নয়নের ও সভ্যতার নামে যন্ত্রপ্রেমী, কর্মমুখী, আত্মকেন্দ্রিক এবং দিন দিন স্বার্থপর হয়ে উঠবে? প্রত্যেকেই তার মূলের দিকে তাকায়, এটাই তো নিয়ম। কিন্তু আজকাল শহুরে প্রভাবে মানুষ যৌথ পরিবার ভুলতে শিখেছে, শিখেছে আত্মকেন্দ্রিকতা এমনকি ভুলতে শিখেছে তার মূলকে। (মা, বাবা ও পরিবার)
মা-বাবা, ভাই-বোন, দাদা-দাদী, কাকা-কাকী, জ্যেঠা-জ্যেঠি ও কাজিন নিয়েই ছিল মমত্ববোধ সম্পন্ন পরিবার। কালের আবর্তে উন্নতির কথা ও সুবিধার দিক মনে করে মানুষ পরিবারকে ছোট করছে কারণে অকারণে। যৌথ পরিবারকে দূরে ঠেলে মানুষ পছন্দ করতে শুরু করে একক পরিবারকে। যেখানে মা-বাবা এবং ভাই-বোন থাকে, একান্ত বাধ্য হলেই দাদা-দাদীও থাকেন। মানুষ জন্মগতভাবেই স্বাধীন কিংবা স্বাধীনতাকামী এবং শৃঙ্খলিত সর্বত্র। বংশ পরম্পরা মানুষের রক্তের সম্পর্কের মধ্য দিয়ে পারিবারিক বন্ধন। সাথে সাথে মানুষ সামাজিক বন্ধনেও ছিল সুদৃঢ়। পরিবার ছাড়া যেমন একজন মানুষ একা, দুর্বল ও হতাশাগ্রস্থ ঠিক তেমনি সমাজ ছাড়া একটি পরিবার চলতে পারে না সুস্থ সুন্দর উপায়ে। মানুষ স্বভাবতই সঙ্ঘবদ্ধ পারিবারিক ও সামাজিক জীব। মা-বাবার বিবাহ বন্ধনের মধ্য দিয়েই সন্তানের উৎপত্তি। আর এই মা-বাবা কোথা থেকে আসলেন, ঠিক তাদের ও মা-বাবা ছিলেন যারা দাদা-দাদী হিসেবে পরিচিত যারা রক্তের সম্পর্কের মধ্য দিয়ে পারিবারিক বন্ধনে অটল। সবাই জন্মগ্রহণ করেন ভূমিষ্ট ও শিশু হয়ে এবং স্বাভাবিক মৃত্যু বা চিরবিদায় হয় বৃদ্ধ-বৃদ্ধা হয়ে। বৃদ্ধ বা বয়োজ্যেষ্ঠদের সমাজে ও পরিবারে সবাই সম্মানের দৃষ্টিতে দেখেন এবং দেখবেন এটাই স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু আজকাল এর ব্যতিক্রম ঘটছে অনেকের ক্ষেত্রেই। বৃদ্ধ মা-বাবা ও দাদা-দাদীকে গ্রামের বাড়িতে রেখে অনেকেই কর্মস্থলে বিশেষ করে শহরে বসবাস করেন নিজের স্ত্রী ও বাচ্চাদের নিয়ে, এতে অনেকটাই মায়ার বন্ধন কমতে শুরু করে। ছেলে-বৌ এবং নাতি-নাতনীর সংস্পর্শে থাকলে পরষ্পরের প্রতি ভালবাসা ও কর্তব্য কর্ম ঘটে। অন্যথায় নানা অনিয়মও কষ্ট করতে হয় বুড়ো বয়সে মা-বাবা ও দাদা-দাদীকে।
সময় হলে সবাই বুড়ো/বৃদ্ধ-বৃদ্ধা হতে হবে এটাই চিরসত্য। বৃদ্ধকালের স্বজনকে সবার উচিত সহযোগিতা করা এবং সম্মানসহ ভালোবাসা দেখানো। আমার মনে পড়ে ঠাকুর মা (প্রিয়লতা চক্রবর্তী) ও দাদু দিদিমার উপদেশমূলক কথা। জীবনবোধ, আচার-আচরণ, ভালো-মন্দের ব্যবধান ও দিক নির্দেশনামূলক কথা। বিশেষ করে ঠাকুর মা নৈতিক শিক্ষা ও আচার-আচরণ সম্পর্কে সচেতনমূলক কথা বলতেন। এছাড়া প্রথাগত শিক্ষা সম্পর্কে উৎসাহ প্রদান করতেন যে, তোর দাদা ছিলেন হাইস্কুলের শিক্ষক, জ্ঞানী, সু-দর্শন এবং মানুষের নিকট শ্রদ্ধা ও সম্মানের ব্যক্তি। এই সম্মানের ঐতিহ্যকে মনে ধারণ করে সামনের দিকে এগিয়ে যা। দুর্ভাগ্যজনক দাদাকে আমি দেখিনি, আমার জন্মের অনেক পূর্বেই তিনি পরধামে চলে যান। আজ মানুষের মুখে মুখে বিশেষ করে বর্তমানে মুরব্বীয়ান ব্যক্তিদের কাছ থেকে প্রায়শই দাদার সম্পর্কে গল্প শুনি। তারা বলেন আমার দাদার নিকট চিঠিপত্র পড়ানোর ও লেখানোর জন্য অনেকেই আসতেন। তিনি তা করে দিতেন। জীবন প্রণালী সম্পর্কে ও সাংসারিক জীবন সম্পর্কে দায়িত্বশীল কথা-বার্তা সহ সৎ উপদেশ দিতেন। এছাড়া তিনি ছিলেন সজ্জন ব্যক্তিত্ব। বর্তমানে বাবা কানাইলাল চক্রবর্তীও প্রায় বৃদ্ধ। পরিবারে সবাই একসাথে চলা ও বন্ধনের মধ্য দিয়ে চলা সম্মানের, সুবিধার এবং মানবতার। প্রায়শই কিছু লোক জিজ্ঞেস করে আপনারা কি একান্নে ভাই-বোন সবাই। আমি উত্তরে বলি হ্যাঁ। কেন? না এখন তো সবাই শৃঙ্খলা ও সুবিধা করে বউ বাচ্চা নিয়ে চলে। উত্তরে বলি All are not alike. সবার দৃষ্টিভঙ্গি সমান না। কর্মের জন্যে কেউ কেউ শহরে এবং কেউ কেউ গ্রামে বসবাস করি। আবার একত্রে চলাফেরা করি। তাই বলে অসময়ে আত্মকেন্দ্রিকতা, সংকীর্ণমনা ও স্বার্থপরতা পরিবার থেকে শিখিনি এবং প্রয়োজনবোধ মনে করিনা।
আজকাল মানুষ নিজের উন্নতির কথা ভেবে বর্তমানকে রেখে ভবিষ্যৎকে নিয়ে হতাশায় ভোগে এবং অতীতকে ভুলে যায়, এমনকি দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে উদাসীন হয়ে ওঠে। স্বার্থান্বেষী, আত্মকেন্দ্রিকরা ভুলে যায় অতীত থেকেই বর্তমান এবং বর্তমান থেকেই ভবিষ্যতের জয়গান। প্রবীনদের কাছ থেকে যে দায়িত্ব ও কর্তব্য পেয়ে আমরা বড় হয়েছি তাদের প্রতিও আমাদের রয়েছে দায়িত্ব ও কর্তব্য। দাদা থেকেই বাবার জন্ম, বাবা থেকেই আমার জন্ম, এটাই তো জীবের বংশগতির ধারা। কিন্তু আজকাল রক্তের বন্ধন ও মানবিকতার আদি প্রতিষ্ঠানের বেহাল অবস্থা। অপরদিকে সামাজিক মূল্যবোধ থেকেও মানুষ সরে যাচ্ছে। যেমন প্রতিবেশী মুরব্বী ও গণ্যমান্য ব্যক্তি দেখলে শ্রদ্ধাবোধ দেখানোর স্থলে নাতির বয়সী ছেলেরা বা বাবার বয়সী লোকদের সম্মুখে অশালীন কথা-বার্তা বলছে নির্দ্বিধায়। এমনকি সিগারেট পান করে ধোঁয়াটুকু বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মুখে ছাড়তে দ্বিধাবোধ করছে না। এটা খুবই দুঃখজনক ও সমাজের শৃঙ্খলাবোধ নষ্ট করছে। Man is born free but everywhere he is chaine. মানবজীবনের প্রতিটি ধাপ শৈশব, কৈশোর, যৌবন, প্রৌঢ় ও বৃদ্ধকাল গুলো অতিক্রম করতে হয় নারী-পুরুষ নির্বিশেষে। এটাইতো চিরায়ত নিয়ম। বড়-ছোটদের কাছ থেকে শ্রদ্ধা পাবেন এবং ছোটকে ¯েœহ করবেন বড়রা। এতে শান্তি, শৃঙ্খলাসহ সুন্দর সমাজ ব্যবস্থায় এগিয়ে যাবে মানবজাতি। ইতিহাস-ঐতিহ্য, অতীত ও পূর্বতনকে নিয়েই সমাজ ব্যবস্থা ও পরিবার এমনকি মানব সভ্যতা। মানব সভ্যতা টিকে আছে পরিবার ও সমাজ ব্যবস্থার জন্যই।
পরিবার মানুষের আপন ঠিকানা। পারিবারিক শিক্ষা যার যত বেশি বলিষ্ঠ তার মানবিক বিকাশ ও সামাজিক সচেতনতা সহজেই বোধগম্য ঘটে। পারিবারিক মমত্ববোধ নিয়ে বেড়ে উঠলে শিশু আদব কায়দা সহজে বুঝতে পারে এবং সামাজিক মূল্যবোধ ও অনুশাসন মেনেই চলে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আজকাল সমাজে প্রতিনিয়ত যা ঘটছে তার বেশির ভাগই অমানবিক ও সমাজগর্হিত। যেমন খুন, হত্যা, লুন্ঠন, ধর্ষণ, জবরদখল, ছিনতাই, ঘুষ, দুর্নীতি, খাদ্যে ভেজাল মিশ্রণ, সু-শিক্ষা ও সু-চিকিৎসার অভাব স্বাভাবিক ভাবে পরখ করলেই দেখা যাবে। পারিবারিক, সামাজিক, ধর্মীয় অনুশাসনসহ মুরুব্বীদের উপদেশ মেনে চললেই সমাজে অনিয়ম, অশান্তি ও অস্থিরতা কমে আসবে।
লেখক : কলামিষ্ট ও প্রাবন্ধিক

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • বিশ্ববিদ্যালয়ে রেগিং প্রসঙ্গ
  • মানব পাচার মামলা নিষ্পত্তি প্রসঙ্গ
  • মধ্যপ্রাচ্য, পারস্য উপসাগর ও বৃহৎ শক্তির রাজনীতি
  • বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌথ ভর্তি পরীক্ষা
  • হিমশীতল মৃত্যু উপত্যকা
  • আমাদের ও এই গ্যাংরিনাক্রান্ত সমাজকে তুমি ক্ষমা করো আবরার
  • টেকসই উন্নয়ন ও পরিবেশ
  • শতবর্ষী রিক্সা এবং প্রাসঙ্গিক কিছু কথা
  • দেশের অর্থনীতিতে ইলিশের সম্ভাবনা
  • কোন পথে ছাত্ররাজনীতি
  • আর নয় ছাত্র হত্যা
  • সত্যবাদিতা জাতীয় উন্নতির সোপান
  • ওষুধ নকলের প্রবণতা : কারণ ও প্রতিকার
  • ক্ষমা করে দিও আবরার
  • অনুভূতিতেই হোক প্রকাশ
  • মাওলানা শুয়াইবুর রহমান বালাউটি
  • ভূগর্ভস্থ পানির বিকল্প উৎস
  • জেগে ওঠো স্বউদ্যোগী বাংলাদেশ
  • আত্মহত্যা ও আত্মঘাতী হামলার ভয়াবহ পরিণাম
  • নদীদূষণ বন্ধে সচেতন হোন
  • Developed by: Sparkle IT