উপ সম্পাদকীয়

পুরনো গীত নতুন সুরে

ইনাম চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ০৭-০৭-২০১৯ ইং ০০:৫৩:৪১ | সংবাদটি ১৯৭ বার পঠিত

বিগত পঁচিশে জুন, মঙ্গলবার গিয়েছিলাম সিলেট মহানগরীর চৌহাট্টাস্থিত টেলিটক নামক মুঠোফোন কোম্পানীর কার্যালয়ে। চমৎকার সহায়তা করেছেন তারা। আমার ফোনটির আদ্যোপান্ত তালাশ করে বের করে এনেছেন সব তথ্য উপাত্ত আর পরামর্শ দিয়েছেন কিভাবে সেটিকে আমি নিরাপদ রাখতে পারবো অযাচিত আর অবাঞ্চিত ব্যবহারকারীদের কবল থেকে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থাটি এককালে গণমাধ্যমকর্মীদের প্রধান ভরসাস্থল ছিলো বলে শুনে থাকি। বর্তমানে নানা ধরনের বিকল্প ব্যবস্থা, আকাশ সংযোগ ব্যবস্থাবলী চালু হওয়ায় সেটি যেন কেমন আড়াল হয়ে পড়েছে। টেলিটক মোবাইল ফোন ব্যবস্থা এখনোও টিকে আছে। আমি নিজেও এটি ব্যবহার করি মাঝে মাঝে। এককালের নামি এই গণমাধ্যম সহায়ক প্রতিষ্ঠানটিতে যখন আমি বসেছিলাম তখন কথা হলো স্বল্প সংখ্যক কর্মকর্তার সাথে। তারা নিয়মিত সংবাদপত্র পাঠ করেন কিনা জিজ্ঞাসা করলে প্রধান ব্যক্তিটি বেশ বিব্রত কণ্ঠে উত্তর দিলেন নেতিবাচকভাবে। বললেন সেটি আর পড়া হয় না। প্রশ্ন জাগলো এককালে যাদের মাধ্যমে সংবাদের সকল খুঁটিনাটি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে প্রেরিত হতো আজ তারাই যদি সংবাদপত্র পাঠে বিমুখ হয়ে উঠেন তাহলে বাকি পাঠকরা যাবে কোন দেশে। এই মোবাইল ফোন ব্যবস্থাটি সম্বন্ধেও নানা কথা শোনা যায়, তারপরও আমি বলবো সরকারি ব্যবস্থাপনায় এই সেবাটি ভালোই চলছে। প্রতিযোগিতার বিশ্বে আপন কর্মতৎপরতা আর যোগ্য পরিচালনার মারফত সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতার দৌড়ে টিকে থাকতে হবে। অন্যদিকে সংশ্লিষ্টদের সকল ব্যাপারেই চোখ কান খোলা রাখতে হবে। সারাবিশ্বের তথ্য, যোগাযোগ, অর্থনীতি, রাজনীতি সহ সমুদয় বিষয়াবলী একমাত্র ধারণ করে থাকে একটি সংবাদপত্র। টেলিটক কর্তৃপক্ষ নয় সবাইকেই চোখ কান খোলা রাখতে হবে সার্বক্ষণিক এবং সর্বাবস্থায়।
ইদানীং বৃহত্তর সিলেটবাসী নিজেদের একেবারে অসহায় ভাবতে শুরু করেছে। বরমচাল রেলস্টেশনে ট্রেন দুর্ঘটনা আবার ব্রাহ্মণবাড়ীয়া এলাকার সরাইলে সড়ক সংযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় অত্র অঞ্চলের মানুষের জাকান্দানী অবস্থা ছিলো বর্ণনাতীত। কর্তৃপক্ষ বলছেন বিকল্প সড়ক ব্যবহার করতে। অর্থাৎ সত্তুর কিলোমিটার গ্রাম্য সড়কে ঘুরপথে যেতে গিয়ে যানবাহনসমূহ নতুন করে গ্যাড়াকলে পড়ে। সুর বদলায় কর্তৃপক্ষ বেইলী সেতু ব্যবহার করতে পরামর্শ দেয় আধাখেচড়া ব্যবস্থায়। তারপরে জানায় ভেঙ্গে পড়া সেতুটির একাংশ দিয়ে নাকি হালকা বাহন চলাচল করতে পারবে। সব ব্যবস্থারই ফলাফল হলো দীর্ঘ যানজট। হয়েছিল তাই-ই।
বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলবাসীদের প্রধান নগরীর উদ্দেশ্যে যাত্রা যেন আর শেষ হয় না। সকল সরকারি বেসরকারি কার্যালয়সমূহের প্রধান কেন্দ্রটি রাজধানী শহরটিতে তাই সেখানে ছুটতেই হয়। দেখা যায় একটি নথি স্থানীয় পর্যায়ে সমাপ্ত হলো তারপরে বাকি রইলো প্রধান কার্যালয়ের অনুমোদন। সেটি শুধুমাত্র একটি স্বাক্ষর বৈ আর কিছু নয়। দৌড়াও রাজধানীভিমুখে। আজকালকার প্রযুক্তির যুগে বিভাগীয় সদরসমূহে রয়েছে আঞ্চলিক কার্যালয়সমূহ। এই সকল আঞ্চলিক কার্যালয়সমূহ মুহূর্তেই কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের অনুমতি আদায় করে নিয়ে চূড়ান্ত মতামতটি দিয়েই দিতে পারে। বাস্তবে তারা সেটি না করে সবাইকে দৌড়ের উপরে রাখতে চায়। কোন সরকারি বেসরকারি অথবা আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠানই জনবান্ধব পদ্ধতি গ্রহণ করতে একেবারেই নারাজ। সকল মানুষ দৌড়াচ্ছে ঢাকায়, রাজধানীতে। ভীড় ভাড়াক্কা, যানজট, লক্ষ লক্ষ কর্মঘন্টার হানি তারপরও ঢাকায় দৌড়াতে হয় আপন দায়িত্ব বা কর্তব্য পালনের উদ্দেশ্যে। অন্যদিকে এতো কিছুর কারণে রাজধানী ঢাকা মহানগরটি বিশ্বের অন্যতম বসবাস অযোগ্য নগরীর তালিকায় নিজের স্থানটি করে নিয়েছে ইচ্ছেয় হোক বা অনিচ্ছেয় হোক।
আমি জনবান্ধব পদ্ধতি বলতে বুঝাতে চাইছি স্থানীয় বা আঞ্চলিক পর্যায়ের বিভিন্ন সরকারি বা আধা-সরকারি দফতর সমূহ যদি কেন্দ্রীয় দফতর এর প্রতিনিধিত্বকারী হতে পারতো আর সেমত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার ক্ষমতা রাখতো তাহলে বোধহয় মানুষের জিল্লতি কমে আসতো। অন্যদিকে বিভিন্ন বিভাগ এর প্রধান কার্যালয়সমূহকে যদি বিকেন্দ্রীভূত করা যেতো অবশ্যই রাজধানী নগরীটি জনভারে পিষ্ঠ হতো না। বাংলাদেশ রেলবিভাগের প্রধান দফতরটিকে যদি চট্টগ্রামে স্থানান্তরিত করা যেতো কারণ সেখানেই পূর্ব থেকেই সব ধরনের অবকাঠামোগত সুবিধা রয়েছে। সে হিসাবে রেলবিভাগে কোন ব্যক্তিকে দৌঁড়াতে হলে ঢাকার বদলে চট্টগ্রাম যেতে হতো। আবার বাংলাদেশ আভ্যন্তরীণ জলপরিবহন সংস্থাটির প্রধান কার্যালয় বরিশালে স্থানান্তরিত করতে পারলে অবশ্যই সুবিধাজনক হতো সকল ধরনের ভোগান্তির শিকার মানুষদের।
বেশ কয়েক বছর আগে দেশের সর্বোচ্চ আদালতকে বিকেন্দ্রীকরণ এর মাধ্যমে কয়েকটি জেলায় স্থানান্তরিত করা হয়েছিল। বর্তমানে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, মামলা মোকদ্দমার চাপ বৃদ্ধি জাতীয় কর্মকান্ডের জন্য প্রতিটি বিভাগীয় প্রধান নগরীতে যদি সর্বোচ্চ আদালত এর প্রতিষ্ঠা করা যায় তাহলে জনদুর্ভোগ যেমন লাঘব হবে তেমনি রাজধানী মহানগরী ঢাকা নিশ্চয়ই তিলোত্তমা হিসাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করবে স্বল্প সময়ে। সারা দেশবাসীর ঢাকামুখী যাত্রা প্রবণতাটিকে রুখতে হবে অচিরেই, নচেৎ সেই নগরটিতে জনবিস্ফোরণ ঘটার সমূহ সম্ভাবনা দেখা দেবে।
এ জাতীয় কর্মউদ্যোগ এর জন্য অবশ্যই বাজেট বরাদ্দের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। নানা প্রকার সৌন্দর্য বর্ধন প্রক্রিয়ার আওতাধীন বিভিন্ন প্রকল্পে যেভাবে অর্থ বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে অনুরূপভাবে এ জাতীয় বিকেন্দ্রীকরণ প্রক্রিয়ায় বরাদ্দ দেয়া যেতে পারে। রাজধানী নগরীর সৌন্দর্য যেমন বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে অন্যান্য নগরীতেও একই প্রক্রিয়ায় সৌন্দর্য বর্ধন সম্ভব। জনস্বার্থ বিবেচনায় আর জনদুর্ভোগ লাঘবে এ জাতীয় বিষয়ে অচিরেই পদক্ষেপ নেয়া উচিত বলে আমার প্রতীতি জন্মেছে।
যখনই অর্থ বরাদ্দের ব্যাপারটি আসে বাজেট বিষয়ক চিন্তা মাথায় ভর করে। এই কয়েকদিন আগে আমাদের মাননীয় অর্থমন্ত্রী সাহেব চলতি অর্থবছরের জন্য বাজেট ঘোষণা (জাতীয়) করেছেন। শান্ত সাগর জলের উপরিভাগ যেমন নিস্তরঙ্গ থাকে কিন্তু গভীরজলে আবার থাকে উথাল পাতাল জল প্রবাহ তেমনি এবারকার বাজেটটি অনুরূপ অবয়বে উপস্থাপিত হয়েছে বলে মনে হয়। কোন কিছুতেই আচড় পড়ছে না, কোন বড় ধরনের পরিবর্তন চোখে পড়ছে না কিন্তু বাজেটটির আকার হয়েছে বিশালাকায়। এটি আঘাত করেছে একেবারে গভীরতর কোণে। অবসর ভোগী বা কর্মহীন বয়স্কদের জন্য যে সকল সরকারি বিনিয়োগ সুবিধা সে সকল জায়গায় উৎসে কর আরোপ করা হয়েছে। ভেবে নেয়া হয়েছে এ সকল নিরুপায় বিনিয়োগকারী আর চিল্লাবেই বা কতোটুকু। অন্যান্য খাতে কর আরোপ করা হয়েছে হালকাভাবে কিন্তু সেগুলির সম্পর্ক সাধারণ মানুষের লেনদেনের সাথে। তাই আয়ের অংকটি হবে অবশ্যই বিরাট। সরকারি কোষাগার হবে পূর্ণ আর পকেট খালি হবে সাধারণ ভোক্তা শ্রেণির। যে শ্রেণিকে আমরা মধ্যবিত্ত বলে জানি এদের অস্তিত্ব নিয়ে পড়বে টানাটানি।
জাতীয় বাজেট ঘোষণাকালে মাননীয় অর্থমন্ত্রী মহোদয় কয়েকজন ঋণখেলাপীর নামের তালিকাও নাকি প্রকাশ করেছেন। এদের নাম বোধহয় আগে পত্র-পত্রিকায় আসে নাই তারা এ ব্যাপারটি নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করে থাকতে পারেন। আজকাল ঋণখেলাপীরা একটি শ্রেণি হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে আবার গরীবের অর্থ লুণ্ঠন করে নিজের বিত্তবৈভব বাড়ানোটা একটি সংস্কৃতিতে রূপান্তর ঘটাতে সক্ষম হয়েছে। ভিনদেশে একাধিক প্রাসাদ বানাতে না পারলে নাকি একজন বিশিষ্ট ঋণ খেলাপী হিসাবে স্বীকৃতি পাওয়া যায় না। হরিলুট বলতে যা বুঝায় সবকিছুই আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে অবাধে চলতে দেয়ার রীতি বহাল রাখতেই যেন বছর বছর জাতীয় বাজেট ঘোষণা। খেলাপী ঋণ আদায়ে যখন সকল আইন প্রয়োগ ব্যর্থ হয়, সরকারি কর্তৃপক্ষ অসহায় হয়ে পড়ে তখন একটি সুষম ও স্বাস্থ্যবান অর্থনীতি আছে বলে স্বীকার করাই কষ্টকর হয়ে পড়ে। কয়েক বছর আগে জাতীয় অর্থনীতির কোমর ভেঙ্গে দেয়ার মতো ব্যাপার ঘটে শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারীর দ্বারা। শোনা গেল বিহিত ব্যবস্থা নেয়া হবে। ক্ষতিগ্রস্তরা আর্থিক প্রণোদনা পাবেন কিন্তু বাস্তবে কোন কিছুই ঘটে নাই। খড়গ কৃপান দরিদ্র জনগোষ্ঠীর উপরই পড়েছে আবার এদেরই অর্থে ঘাটতিটুকু পূরণ হয়েছে। শর্ষেতে ভূত রয়েছে বলতে হবে না। বৃহস্পতিতে ক্ষৌরকর্ম নাস্তি।
লেখক : কলামিস্ট।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT