উপ সম্পাদকীয়

প্রাকৃতিক দুর্যোগ : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

মাওলানা আব্দুল হান্নান তুরুকখলী প্রকাশিত হয়েছে: ০৮-০৭-২০১৯ ইং ০০:৪৪:৪৯ | সংবাদটি ৬৫ বার পঠিত

বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ দেশ। ভৌগলিক অবস্থান ও জলবায়ুর কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগ এদেশের একটি পরিচিত দৃশ্যপট। তীব্রতা ও ক্ষয়ক্ষতির ব্যাপকতায় বাংলাদেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগ বর্তমানে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি লাভ করেছে। প্রায় প্রতি বছরই এদেশে কোনো না কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দেয়। এর ফলে জনগণ চরম দুর্ভোগ পোহায়, ব্যক্তি ও পরিবারের সম্পদ বিনষ্ট হয়, বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস হয়, দেশ ও জাতির উন্নয়নের ধারা বিঘিœত হয়। এবং পরিবেশের দ্রুত অবনতি ঘটে। বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগের রূপ অত্যন্ত ভয়াবহ। এ দেশে প্রধান প্রধান প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে রয়েছে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, টর্ণেডো, বন্যা, খরা, নদী ভাঙন, ভূমিকম্প, আর্সেনিক দূষণ ইত্যাদি। প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস ও নদী ভাঙনে। এক হিসাবে দেখা গেছে, বিগত ১৩১ বছরে এ অঞ্চলে সংঘটিত বড় বড় ১০টি ঘূর্ণিঝড়ের মধ্যে ‘সিডর’ এর মাত্রা ছিল অত্যন্ত ভয়ংকর। ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর ঘটে যাওয়া এ ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২.৩ মিলিয়ন ডলার নিহতের সংখ্যা দশ সহ¯্রাধিক এবং উপকূলীয় প্রায় ২২টি জেলায় এর প্রভাব পড়েছিল। ১৯৬০ সালের মাঝামাঝি থেকে ১৯৯৭ সালের জুন পর্যন্ত এদেশে ছোট ও বড় ধরনের ঘূর্ণিঝড়, টর্নেডো, জলোচ্ছ্বাস ও কালবৈশাখীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬৭টি এবং এর মধ্যে ১৫টি ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। এ সকল প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রাণহানির সংখ্যা ছিল ৬ থেকে ৮ লক্ষ এবং ৩০ হাজার কোটি টাকার সম্পদের ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, তিস্তা ইত্যাদি নদীতে ভাঙনের ফলে দেশের হাজার হাজার লোক গৃহহীন হয়ে পড়েছে। এ সকল প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাংলাদেশের উন্নয়নের অগ্রযাত্রাকে অনেকাংশে পিছিয়ে দিয়েছে।
নদীমাতৃক বাংলাদেশের প্রধান প্রাকৃতিক দুর্যোগ হচ্ছে বন্যা। ভৌগোলিক অবস্থান, ভূতাত্ত্বিক কাঠামো, অতিমাত্রায় বৃষ্টিপাত, একই সময়ে প্রধান নদীসমূহের পানি বৃদ্ধি, নদীতে পলল সঞ্চয়ন, পানি নিষ্কাশনে বাধা, ভূমিকম্প, নির্বিচারে বৃক্ষনিধন ইত্যাদির কারণে প্রায় প্রতি বছরই এ দেশে বন্যা হয়ে থাকে। বিগত দশকসমূহের মধ্যে ১৯৫২, ১৯৫৪, ১৯৬৮, ১৯৭৪, ১৯৮৭, ১৯৮৮, ১৯৯৮ ও ২০০৪ সালে এ দেশে ভয়াবহ বন্যা হয়েছে। বর্তমানে এ দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের প্রধান অন্তরায় হিসেবে বন্যা আবির্ভুত হয়েছে। বন্যাজনিত ক্ষয়ক্ষতি এতই ব্যাপক যে, স্বল্প পরিসরে তা আলোচনা করা কঠিন। বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় জমির ফসলের। বন্যায় হাজার হাজার কোটি টাকার ফসলহানি ঘটে। বন্যায় হাজার হাজার গাছপালা ও ঘরবাড়ি বিনষ্ট হয়। রাস্তাঘাট ও সেতু ধ্বংস হয়। শহর-বন্দর ডুবে যাওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্যের বিপুল ক্ষতি হয়। বন্যার সময় মহামারিসহ বিভিন্ন ধরনের স্থাস্থ্য সমস্যা দেখা দেয়। বন্যার পানিতে পরিবেশ দুষণ মারাত্মক আকার ধারন করে। এক কথায়, বন্যা মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও উন্নয়নের ধারাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে।
বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগের একটি হচ্ছে খরা। সাধারণত বৃষ্টিপাত কম হওয়ার কারণে খরা পরিস্থিতি ঘটে থাকে। খরার প্রভাবে খরা পীড়িত এলাকার শস্যাদি পানির অভাবে শুষ্ক হয়ে লালবর্ণ ধারণ করে এবং গাছপালা শুকিয়ে যেতে থাকে। মাঠের ফসলের জমিতে ফাটল দেখা দেয়। মাটির রস শুকিয়ে যায় এবং ভূগর্ভস্থ পানির লেভেল নিচে নামতে থাকে। নদী-নালা, খাল-বিল, পুকুর-হাওর ইত্যাদিতে অন্যান্য বছরের তুলনায় খরার সময় পানি অস্বাভাবিকভাবে কমে যায় অথবা সম্পূর্ণ শুকিয়ে যায়। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এবং প্রাকৃতিক কারণে পানির চাহিদা অত্যন্ত প্রকট হওয়া সত্ত্বেও শুষ্ক মৌসুমে বৃষ্টিপাত কম হয়। আবার গ্রীষ্ম-বর্ষাকালে আশানুরূপ বৃষ্টিপাত না হলে সেচ, কৃষি, ফসল উৎপাদনসহ বিভিন্ন পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিদারুণ সংকটসহ দেশে খাদ্য ঘাটতি দেখা দেয়। সার্বিক অবস্থা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বাংলাদেশে যখনই খরা হয় তখন কম বৃষ্টিপাতের কারণে পর্যাপ্ত পরিমাণ ফসল উৎপাদনে চরম বিঘœ ঘটে; ভূগর্ভস্থ পানি পুনর্বভরণ হ্রাস পায়; খাল-বিল-পুকুর ইত্যাদিতে পূর্বের চেয়ে কম পানি থাকে। এমনকি ভূ-উপরিস্থ অধিকাংশ জলাশয় শুকিয়ে যায় এবং গৃহস্থালী কাজে পানির সংকট দেখা দেয়, উষ্ণ আবহাওয়া বিরাজ করে এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। এক কথায়, খরা বাংলাদেশের জনজীবনে মারাত্মক দুর্ভোগ ডেকে আনে।
বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান প্রাকৃতিক দুর্যোগ হচ্ছে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস। এ দেশে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে জীবন সম্পদ ও পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হয়। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস বাংলাদেশে নিয়মিত আঘাত হানে। ১৯৬০ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত প্রায় ৫০টি ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস বাংলাদেরশ আঘাত হেনেছে। এতে লক্ষ লক্ষ মানুষ ও পশুপাশি নিহত হয়েছে। কোটি কোটি টাকার সম্পদ বিনষ্ট হয়েছে। প্রাকৃতিক বন সুন্দরবন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রবল ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে প্রচুর বৃক্ষ সম্পদ ধ্বংস হয়, বন্যপ্রাণী ও গবাদি পশু মারা যায়, ব্যাপক আবাদি জমিতে লোনা পানি ঢুকে পড়ে, ফলে বিপুল পরিমাণ ফসল ধ্বংস হয়। মানুষের ঘরবাড়ি ও অন্যান্য অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কালবৈশাখী বাংলাদেশের আরেকটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ। কালবৈশাখী প্রতি বছরই এদেশে আঘাত হানে। সাধারণত চৈত্র-বৈশাখ মাসে কালবৈশালীর প্রচন্ড থাবা শুরু হয়। এ সময় হঠাৎ দেখা যায় দুপুরের পর আকাশ ঘন কালো মেঘে ঢেকে যায়। এবং উত্তর-পশ্চিম দিকে প্রচন্ড বেগে ঝড় বইতে থাকে। এর সঙ্গে শুরু হয়ে যায় বজ্র বিদ্যুৎসহ বৃষ্টিপাত, কখনো বা শিলাবৃষ্টি। কালবৈশাখীতে বনজসম্পদ, ঘরবাড়ি, গবাদিপশু, ফসল, জীবন ও অন্যান্য সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি হয়।
সীমিত ভৌগোলিক আয়তনের এই বাংলাদেশে নদীভাঙন একটি মারাত্মক প্রাকৃতিক দুর্যোগ। দেশের প্রায় সব অঞ্চলে কম-বেশি নদীভাঙন চলছে। নদীর পানির প্রবাহপথ সংকুচিত হবার ফলে ¯্রােতের তীব্রতা বেড়ে যাওয়া এবং নির্বিচারে বৃক্ষনিধন ও নদীর গতিপথ পরিবর্তনসহ অন্যান্য কারণে দেশের প্রায় সকল নদীতে ভাঙন দেখা যায়। প্রতি বছর বিশেষ করে বন্যা মৌসুম ও সন্নিহিত সময়ে নদী ভাঙন বাংলাদেশের প্রায় ৪০টি প্রধান ও অপ্রধান নদীতে অবধারিত ঘটনা হিসেবে দেখা দেয়। নদী ভাঙনের ক্ষয়ক্ষতি অপরিসীম। এর আর্থ-সামাজিক প্রতিক্রিয়াও অত্যন্ত মারাত্মক ও ভয়াবহ। নদী ভাঙনের ফলে প্রতি বছর প্রায় ২০০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়। প্রতি বছর প্রায় ১০ লক্ষ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নদীভাঙন জনিত প্রতিক্রিয়ার শিকার হচ্ছে। কেবল জীবননাশই নয়, বসতবাড়ি, গো-সম্পদ, গাছপালা, মূল্যবান চাষযোগ্য জমি এবং অন্যান্য পারিবারিক সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়াও নদীভাঙনের সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি। নদী ভাঙনের ফলে অনেক পরিবার তাদের সামাজিক মান-মর্যাদা ও অর্থনৈতিক মান রক্ষায় বিপর্যস্ত হচ্ছে, মধ্যবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্তদের মাঝে অনেকের লেখাপড়া, ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হয়ে গেছে এবং অনেকের পেশাগত পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। মোটকথা, নদীভাঙন বাংলাদেশের মানুষের স্বাভাবিক জীবনধারায় অপরিসীম ক্ষয়ক্ষতি সৃষ্টি হচ্ছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে ভূমিকম্পও বহু শতাব্দী ধরে বাংলাদেশে আঘাত হানছে। ভূতাত্ত্বিকরা বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলেকে ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ ও রংপুর এই এলাকার আওতাভুক্ত। ভূমিকম্পের ফলে বাড়িঘর, দালানকোঠা চুর্ণবিচুর্ণ হয়ে যায়, গাছপালা ও নদীর পাড় ভেঙ্গে পড়ে, নদীর বাঁধ জলাধার ক্ষতিগ্রস্ত হয়, বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় বিঘœ ঘটে, মাটিতে ফাটল দেখা দেয়, পাহাড়ে ধস নামে, নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়। অতীতে বাংলাদেশে প্রচন্ড ভূমিকম্প হয়েছে। এর মধ্যে ১৮৬০ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত ২০টি ভয়াবহ ও উল্লেখযোগ্য ভূমিকম্পের রেকর্ড রয়েছে। ১৭৬২ সালে বাংলাদেশে যে ভূমিকম্প হয় তাতে মধুপুরের গড় ও সিলেটের হাওর সৃষ্টি হয় বলে ধারণা করা হয়। ১৭৮৭ সালের ভূমিকম্পে তিস্তা নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়। ১৮৮৭ সালের ভূমিকম্পের প্রভাবে বাংলাদেশে ব্রহ্মপুত্র নদের গতিপথ পরিবর্তিত হয়। এছাড়াও ১৮৮৫ সালের বেঙ্গল ভূমিকম্প, ১৯১৮ সালের শ্রীমঙ্গলের ভূমিকম্প, এবং ১৯৩০ সালের ধুবরীর ভূমিকম্পে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে। বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে ৩০ থেকে ৩৫টি মৃদু ভূমিকম্প হয়। জাতিসংঘ প্রণীত ‘ভূমিকম্প বিপর্যয়ের ঝুঁকি সূচকে’ (আর্থকোয়েক ডিজাস্টার রিক্স ইনডেক্স সংক্ষেপে ইডিআরআই) বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিূুর্ণ ২০-টি শহরের মধ্যে এক নম্বরে রয়েছে ঢাকা শহর। এর একমাত্র কারণ এখানকার বাড়িঘরের নি¤œমান।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সমস্যা। যদিও এই প্রাকৃতিক দুর্যোগকে কখনো স্তব্দ করা যাবেনা, তবুও উন্নত দুর্যোগ প্রতিরোধ পরিকল্পনা গ্রহণ করলে এর দ্বারা ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে আনা সম্ভব। এ ব্যাপারে আমাদের দেশে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
লেখক : কলামিস্ট।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • সম্ভাবনার ক্ষেত্র এবং নতুন প্রযুক্তি
  • গণমানুষের মুখপত্র
  • জাহালম কি আরো আছে!
  • নারী নির্যাতন ও আমাদের বাস্তবতা
  • সিলেটের ডাক : কিছু স্মৃতি কিছু কথা
  • বর্ষাঋতুতে শিশুদের যত্ম
  • কোটি মানুষের মুখপত্র
  • ৩৬ বছরে সিলেটের ডাক
  • প্রত্যয়ে দীপ্ত ‘সিলেটের ডাক’
  • পাঠকের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি
  • এরশাদ : এক আলোচিত পুরুষের প্রস্থান
  • প্রাসঙ্গিক ভাবনায় ২০১৯-২০ অর্থ বছরের বাজেট
  • মেঘালয়ের মেঘমালা
  • পরিবেশ সংরক্ষণে সামষ্টিক উদ্যোগ
  • বর্ষা মানেই কি জলাবদ্ধতা?
  • শিষ্টাচার ও সৌজন্যবোধ
  • রেলের প্রতি জনগণের আস্থা বিনষ্ট করা যাবে না
  • প্রকৃতির দায় শোধে বৃক্ষ রোপণ
  • ঋণ দেয়া-নেয়ায় প্রাসঙ্গিক ভাবনা
  • কান্ডারী হুঁশিয়ার!
  • Developed by: Sparkle IT