স্বাস্থ্য কুশল

  তরুণদের মনোরোগ ও পরিবার

ফাহমিদা ফেরদৌস প্রকাশিত হয়েছে: ০৮-০৭-২০১৯ ইং ০০:৫৩:৫৯ | সংবাদটি ৫০ বার পঠিত

১৪ বছরের ৮ম শ্রেণীতে পড়–য়া একটি কিশোরকে তার ‘মা’ কিছুদিন আগে হাসপাতালে বহির্বিভাগে নিয়ে এসেছিলেন নিম্নোক্ত সমস্যা নিয়ে- পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ কারও কথাই সে শোনে না। স্কুলে যেতে চায় না। সারাদিন মোবাইল নিয়ে বসে থাকে। খেলতে গেলে বন্ধুদের সঙ্গে মারামারি করে। কিছু বন্ধুদের সঙ্গে নেশাজাতীয় দ্রব্য গ্রহণ করে। মাকে অপভাষা ব্যবহার করে প্রায়শই মায়ের গায়ে হাত তুলে।
ওইসব আচরণের জন্য পরিবারের (যৌথ পরিবার) অন্য সদস্যদের কোন আপত্তি ছিল না। বরাবরই পরিবারের অন্য সদস্যরা মাকে দোষারোপ করে আসছে- যে মা সন্তানকে প্রতিপালন করতে পারছে না।
প্রশ্ন করা হয়েছিল : কিশোরের (রোগীর) বাবাকে নিয়ে আসলেন না কেন?
মা উত্তর দিয়েছিলেন : ওর বাবা একটু অন্যরকম একটু গম্ভীর প্রকৃতির মানুষতো তাই আসেনি।
প্রশ্ন করা হয়েছিল : কিশোরের (রোগীর) বাবা গম্ভীর প্রকৃতির নাকি ‘বদরাগী’?
মা খুবই ক্ষীণ কণ্ঠে উত্তর দিয়েছিলেন ‘বদরাগী’।
কিশোরের বাবাও রাগ হলে তার (মা) গায়ে হাত তুলেন। ছোট বেলায় কিশোর যখন যা চাইত তখন তার দাদি চাচারা বিশেষ করে ফুফুরা তার আবদার পূরণ করতেন যখন কিশোরের মা প্রতিবাদ করতেন তখন কিশোরের সাহায্যে কিশোরের বাবার কাছে অভিযোগ করতেন এবং যখন কিশোরের বাবা বাসায় এলে তার শালিসের ব্যবস্থা করতেন। যতক্ষণ পর্যন্ত কিশোরের, কিশোরের মাকে মারধর না করতেন ততোক্ষণ পর্যন্ত পরিবারের সবার কাছে বিচার হতো না। কিশোরের বাবা বলতেন আমার ভাই বোন আমার সন্তানকে বেশি ভালোবাসে তাইতো সহ্য হয় না। কিশোরের মাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল কিশোরের চাচা ফুফুদের সংসাররের সিদ্ধান্ত কি আপনাকে অথবা আপনার স্বামীকে অন্তর্ভুক্ত করেন? কিশোরের মা জবাবে বলেছিলেন কখনই না। তবে যখন তাদের টাকার প্রয়োজন হতো তখন তারা তাদের বড় ভাইয়ের কাছ থেকে অর্থ হাসিলের জন্য বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করেন। তার মধ্যে অন্যতম ছিল তার ছেলেকে ব্যবহার করে সুবিধা নেয়া। মাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল একটু উদাহরণ দেবেন কি? তখন তিনি বলেছিলেন কিছুদিন আগে তার ছেলে টাচ মোবাইল কিনবে যেখানে বিভিন্ন গেম ডাউনলোড করে খেলা যায়। তখন মা সম্মতি দেয়নি। কিন্তু তার ফুফু তার মেয়েকে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে ভর্তির টাকা ভাইয়ের কাছ থেকে নেয়ার জন্য তার ছেলেকে একটি মোবাইল কিনে দিলেন। এতে কিশোরের বাবা এবং দাদি খুব খুশি হলেন এবং কিশোরের বাবা কিশোরের মাকে উদ্দেশ করে বলেছিলেন ‘দ্যাখ এবং শিখে নে আমার বোনের কাছ থেকে সন্তান কিভাবে মানুষ করতে হয়, তুইতো সারাদিন আমার সংসারে মাগনা থাকস আর খাস’।
-মনোরোগের ভাষায় কিশোরের এই রোগটিকে বলা হয় ‘কন্ডাক্ট ডিসঅর্ডার’।
-যা কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম এবং প্রধান কারণ হচ্ছে ‘প্যারেন্টিংয়ের সঠিক প্রয়োগের অভাব’। অর্থাৎ সন্তান প্রতিপালনের বাবা ও মায়ের সঠিক প্রয়োগের অভাব।
ব্যাখ্যা :
-তরুণটি শিশুকাল থেকেই দেখতে দেখতে বড় হয়েছে বাবা ও মায়ের মধ্যে নেতিবাচক সম্পর্ক অর্থাৎ মায়ের প্রতি বাবার নির্যাতন নিপীড়নের একটি অমানবিক চিত্র, যার দরুন পরবর্তীতে তরুণটি হয়ে উঠেছে হতাশাগ্রস্ত, অসামাজিক, সহিংস ব্যক্তিত্বে প্রতিফলিত হয়েছে অস্বাভাবিকতা। যে কোন মানুষের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের বৃদ্ধি হলো শারীরিক বিকাশ আর মানসিক অর্থাৎ মনের বিকাশ হলে আচার ব্যবহার, চিন্তাচেতনা, কথা বলা, অনুভূতি এবং ভাবের আদান প্রদানের ক্ষমতা অর্জন, যা একটি শিশু তার পরিবার পরিজনের কাছ থেকে দেখে শিখে থাকে যাকে আমরা বলি ‘অবজারভেশনাল লার্নিং’।
-পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা শিশুকাল থেকে কিশোরটিকে (রোগী) নেতিবাচক আচরণের প্রশ্রয় দিয়েছেন। নিজেদের স্বার্থের কারণে কিশোরটি (রোগী) যখন যা চেয়েছে তখন তাকে তাই দেয়া হয়েছিল। যেখানে মায়ের কোন মতামতের গুরুত্বই ছিল না।
-সুতরাং বাবা ও মায়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া কোনভাবেই শিশু মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষা সম্ভব নয় কারণ বাবা ও মায়ের আচরণ যে কোন শিশুর ব্যক্তিত্ব নিয়ন্ত্রণ করে। বিভিন্ন নেতিবাচক অবস্থার কারণে একটি শিশুর মানসিক বিকাশ ব্যাহত হয়।
শিশু বয়সের আক্রান্ত হলেও কিশোর বয়সে তা মারাত্মক আকার ধারণ করে। কিশোর/কিশোরী হয়ে ওঠে দুর্র্ধষ অপরাধী। এর বেশিরভাগ কারণই হলো প্যারেন্টিংয়ের সঠিক প্রয়োগের অভাব।
আজ আমাদের তরুণরা কেন এত বিপদগ্রস্ত হয়ে উঠছে এর পেছনের মূল কারণকে আমরা নির্ণয় করি। আসুন আমরা সকল বাবা ও মা উভয়ই শিশুদের সুস্থ মনের/মানসিক বিকাশের একে অপরের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হই। একটি সুস্থ সুন্দর তরুণ সমাজ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করি। কারণ আজকের তরুণরাই হবে পরিবার, সমাজ ও একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যত।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT