মহিলা সমাজ

মায়ের কথা

মানষী চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ০৯-০৭-২০১৯ ইং ০০:৩৫:১৭ | সংবাদটি ১৮৬ বার পঠিত


মায়ের কষ্টের তীব্রতা যে এতোটাই বেশি কষ্ট কর, ব্যথাময় একজন মায়ের অতীত বা স্মৃতি তা শুধুমাত্র বুঝতে পারেন মা নিজেই। তেমনই এক মায়ের কথা তুলে ধরতে চাই। একজন মানুষ ৪৫ ইউনিট ব্যথা সহ্য করতে পারে কিন্তু একজন মা সন্তানের ০.৫ ইউনিট ব্যথা সহ্য করতে পারে না। একজন মায়ের সন্তানের জন্ম দেওয়ার সময় যতোটুকু কষ্ট হোক না কেন সন্তানের মুখ দেখার পর সে কষ্ট হয় তার কাছে তুচ্ছ। তখন সেই মা শুধুই চেয়ে থাকতে চায় তার সন্তানের দিকে যেন সে সব সুখ সব আনন্দ সব খুশি খুঁজে পায় তার সন্তানের সোনা মুখ আবেগ ভালোবাসা আদর নিসৃত হয় তার হৃদয় থেকে সন্তানের মাঝে।
জন্মের পর থেকে শুরু হলো তার আলাদি বায়না যা মেটাতে গিয়ে হিমশিম খান মা। তবুও যেন কোনো ক্লান্তির ছায়া নেই মার চোখে মুখে। যতো কষ্ট হোক মেনে নেন সবই হাসি মুখে। অক্লান্ত পরিশ্রমের পর যখন ঘুমাতে যান মা রাতে তখন আবার শুরু হয় সন্তানের যন্ত্রনা। কিন্তু মায়ের কাছে এ যেন তার সন্তানের আনন্দ-হাসি বা খুশির বেলা। হয়তো সে সন্তান সারাদিনের একাকি সময় কাটানোর পরে তার মা’কে কাছে পেয়েছে বলেই বা মায়ের যাদুর পরশ পেয়েছে বলেই তার মনে তার খুশির মেলা।
একটু একটু করে এগিয়ে যায় সন্তান জীবনের পথে, তার জীবনের রেল গাড়ি যেন ছুটতে থাকে প্রবল বেগে। আর তারই সাথে বাড়ে মায়ের কষ্ট। পিছনে ছুটতে থাকেন মা সন্তানের, তবুও ক্লান্তি ছুতে পারে না মাকে। মাঝে মাঝে বিরক্ত হন ঠিকই কিন্তু সব ভুলে যান সন্তানের মুখের আদর ভরা মা ডাক শুনে। ছুটে যান তার কাছে আর ভাবেন ওনার থেকে সুখি আর কে সত্যিই তো মায়ের কাছে সব থেকে আনন্দের মুহূর্তে হচ্ছে তার সন্তান যখন মা বলে ডাকে। তারপর শুরু হলো স্কুলে যাওয়া। বাড়লো হাজারও চাহিদা, তখন মা মিথ্যা ও সত্যিকে এক জায়গায় জড় করে তৈরি করতেন এক অজুহাত। কারণ তখন নিরুপায় থাকতেন মা।
স্কুলে পড়ার সময় অনেক বন্ধু ছিলো অনেক রকম। অন্যরা যখন টিফিন খেতো ভালো দামি, তখন হয়তো সে মা দিতে পারতেন না অন্যের সমান টিফিন। অন্যের টিফিন আর নিজের টিফিন সমান হতো না বলে সন্তান বলতো মাকে মা ওরা কী খায় আমি তো খাইনি কোনোদিন। তখন মুচর দিতো মায়ের হৃদয়। তখন মা মিথ্যা আবার অজুহাত দিতেন। বলতেন বাবা এসব খাওয়া ঠিক না। শরীর খারাপ করবে এ শুনে চুপ করে যেত সন্তান। একটু একটু করে বুঝতে শিখল সব, এক সময় আর নিজের বাসা থেকে নিয়ে যাওয়া টিফিন বের করতো না। লজ্জা পেত, তাই টিফিন খেতো না। আর ভয় পেতো যদি বন্ধুরা বলে তুই রোজ একই টিফিন আনিস। আর তোর মা কিছু বানাতে জানেন না বা কেনই বা দেন না। এই প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়া থেকে বাঁচার জন্য বের করতো না টিফিন। তবুও বন্ধুরা বলতো কি রে আজ টিফিন খাবি না। আর সন্তান অন্যের টিফিন খাওয়া চেয়ে দেখতো। আর বাসায় এসে মাকে বলতো মা ওরা ব্রেডে কালো কালো কী যেন লাগিয়ে খায়। আমারও খুব ইচ্ছে মা, হৃদয় ফাটা ব্যথা নিয়ে মা বলতেন আচ্ছা খাওয়াব একদিন। তখন সন্তানের মুখে কী যেন খুশির ঝলক।
কিন্তু মা কী করবেন, কীভাবে কিনে দেবেন সে চিন্তায় চিন্তিত। তখন ভাবলো কতোই পথ, আর তখন বেছে নিলো এমন এক পথ যা খুবই ব্যথাদায়ক। ভাবলেন মা নিজের রক্ত থেকেও অনেক দামি সন্তানের মুখের হাসি, মনের খুশি। তারপর মন স্থির করলেন রক্ত বিক্রি করবেন। সন্তানের খুশির জন্য তারপর একদিন লুকিয়ে রক্ত বিক্রি করে সন্তানকে কিনে দিলেন তার চাহিদা মতো ব্রেড আর নসিলা। এছাড়াও সন্তানের হাজারও চাহিদা মা বুঝতেন কিন্তু খেয়াল করে চলতেন না। কারণ জানেন সব চাহিদা মেটাতে পারবেন না। আর এর মাঝে কষ্ট করে যেগুলো নিয়ে এসেছিলেন তাতে সন্তান ছিলো খুব খুশি, না দেখলে হয়তো তা কেউ বিশ্বাস করতে পারেন না। মাকে বলল, মা কাল আমাকে ওইগুলো টিফিন দিও। আর কেউ বলতে পারবে না মা তুমি কিছু বানাতে জানো না। হাসি মুখে মা বললেন আচ্ছা। সকাল হলো মা ডাক দিলেন বাবা আমার সোনা আমার ওরে আমার পাখি সকাল হলো ওঠরে এ বার নেই যে আর বাকি। খুশি ভরা মন আর চোখে নিয়ে ঘুম উঠলো সন্তান। তারপর স্কুলে যাবে এখন মাকে বলল, মা দিয়েছে তো, তখন মা বলেন হুম। তখন কতো খুশি মনে গেল সে স্কুলে আর মায়ের বুকে যে কতোই আনন্দ। আর ভাবেন আজ কতোই আনন্দে সবার সাথে এক বেঞ্চে টিফিন খাবে।
তারপর আরও বড় হলো। কোনো চাহিদার কথাই বলতো না মাকে, বুঝতে শিখেছিলো সব। বুঝতে পারলো মা’র চাহিদাগুলো মেটাবার মতো সাধ্য নেই। কিন্তু মা তো অন্তরযামী। বুঝতে পারেন সন্তানের চাহিদা। কোনোভাবেই সে প্রকাশ করতো না। মা নিজেই বলতেন, খাবি বাবা এটা কিংবা এই খেলনাটা কিনবি। তখন সবসময়ই সন্তানের কাছ থেকে উত্তর আসতো, না মা ভালো না এগুলো। মা বুঝতেন কেন সে না করছে। কিন্তু কিছু বলতেন না শুধু এটুকুই বলতেন হুম ভালো না। খুব কষ্ট হতো মা’র। হৃদয় তখন যেন কেউ পাথর চাপা দিতো। পরিবারের নানা অশান্তির মাঝে থাকতেন মা। মানসিক অবস্থাও ভালো না, তাই বিনা দোষেও বকা দিতেন ও মারধর করতেন সন্তানকে। তিনি মারতেন হয়তো সন্তানের গায়ে, কিন্তু তার থেকেও বেশি আঘাত হতো মায়ের মনে। আর নিরবে কান্না করতেন। যদি সন্তান দেখতে পেতো মায়ের চোখের জল তবে প্রশ্ন করতো কী হয়েছে মা তোমার। তখন আবার সেই মিথ্যে কথা, কই বাবা চোখে যেন কিছু পড়েছে। বলতো, দেখি মা। মা বলতেন না বাবা এমনিই ঠিক হয়ে যাবে।
মাকে ভালোবাসার কারণে পরিবারের সবার কাছে সে অবুঝও ছিলো অনাদরে। সবার চোখের শত্রু ছিলো আর মায়ের একমাত্র সন্তান। সন্তানকে কেউ যখন ভালোবেসে টাকা-পয়সা দিতো, তখন পরিবারের সদস্যরা সেই টাকা নিয়ে নিতো। যদি কেউ দেখতে পেতো না তবে তার মাকে বলতো মা তুমি নিয়ে নাও, কেউ দেখেনি। মা মাথায় হাত বুলিয়ে বলতেন, না বাবা কেউ কিছু দিলে তা সবাইকে বলতে হয়। যদি না বলো ঈশ্বর রাগ করবেন। আরও বলতেন, চুরি ও মিথ্যা কথা বলতে পারে না। কারণ ঈশ্বর রাগ করবেন। সন্তান বলতো, ঈশ্বর রাগ করলে কি হবে মা? বলতেন, তোমার মাকে নিয়ে যাবেন। তখন তুমি কাকে মা বলে ডাকবে। বাবা বকা দিলে কার কাছে এসে কান্না করবে। এই কথা শুনে খুব কান্না শুরু করলো যা বলে বোঝাতে পারবো না। মা বললেন, তুমি এসব খারাপ কাজ করো না তাহলে আর তোমার মাকে নিবে না।
আজ সে অনেক বড় তবুও সেই কথা বিশ্বাস করে। যখন তার মন খারাপ থাকে তখন চুপটি করে থাকে। মাকে কিছু বলে না। জানে মা কষ্ট পাবে। কিন্তু মাকে কি কিছু লুকানো যায়। তখন মা বলতেন কি হয়েছে বাবা তোর, আর সে বলতো না কিছুই না। মা মুচকি হেসে বলতেন সবাইকে লুকানো যায় কিন্তু মাকে কখনোই কিছু লুকানো যায় না। মা মুখ দেখলে বুঝতে পারেন আর দূর থাকলেও অনুভব করতে পারেন তার সন্তানের কষ্ট বা মনের অবস্থা। মা চান সব মানুষের প্রশংসার পাত্র হয়ে থাকুক তার সন্তান। আর বেড়ে উঠুক মানুষের মতো মানুষ হয়ে। ভালো থাকিস বাবা সর্বদা। ঈশ্বরের কাছে করি এই প্রার্থনা।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT