উপ সম্পাদকীয় খোলা জানালা

পরিবেশ ও খাদ্য উৎপাদন

লোকমান হেকিম প্রকাশিত হয়েছে: ১০-০৭-২০১৯ ইং ০০:০৮:৪৬ | সংবাদটি ৫৩ বার পঠিত

বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। এ দেশের মোট জনসংখ্যার ৮০ ভাগ এবং শ্রমশক্তির ৬০ ভাগ কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত। বিবিএস- এর জরিপ মতে, ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে দেশে মোট শ্রমশক্তি ছিল ৬.৩৫ কোটি। এই মোট শ্রমশক্তির ২.৪৭ কোটিই কৃষি কাজে নিয়োজিত ছিল। আমাদের জিডিপিতে কৃষিখাতের অবদান ২৩%। তাই কৃষিখাতের উন্নয়ন ব্যতিরেকে দেশের উন্নয়ন অসম্ভব। তবে বর্তমান সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টায় দেশে কৃষির অভূতপূর্ব উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। গত ১০ বছরে দেশে খাদ্যশস্যের উৎপাদন বেড়েছে ৩০ গুণ। প্রতিবছর জমির পরিমাণ ১% হারে কমা সত্ত্বেও গত ৪৬ বছরে দেশে ধানের উৎপাদন বেড়েছে ৩ গুণেরও বেশি। সরকারি হিসেব মতে- ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশে চাল উৎপাদন হয়েছে ৩ কোটি ৩৮ লাখ ২ হাজার টন। কিন্তু আমাদের চাহিদা ছিল ৩ কোটি ২০ লাখ ৮৩ হাজার টন। সে হিসেবে আমাদের উদ্বৃত্ত ছিল ১৭ লাখ ১৯ হাজার টন। এসবই সম্ভব হয়েছে আমাদের কৃষকদের নিরলস পরিশ্রম এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নত গবেষণার কারণে।
আমাদের দেশে ১৯৫০ এর দশকে সারের ব্যবহার শুরু হয়। ওই সময় রাসায়নিক সারের কথা শুনলেই এদেশের কৃষকগণ আঁৎকে উঠতেন। কারণ রাসায়নিক সারে মাটি নষ্ট হয়ে যায় এমন একটা ভয় কাজ করছিল। সর্বপ্রথম এমোনিয়াম সালফেট দিয়ে এদেশে রাসায়নিক সার ব্যবহারের যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে পৃথিবীর মাটি, বায়ু ও পানি বিশুদ্ধ রেখে খাদ্য উৎপাদনের জন্য জৈব পদ্ধতিতে অর্থাৎ অর্গানিক ফার্মিং পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে। অর্গানিক ফুড বা জৈব পদ্ধতিতে উৎপাদিত খাদ্যের প্রতি সারা পৃথিবীর মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। অর্গানিক ফার্মিং থেকেই অর্গানিক ফুড বা জৈব খাদ্য তৈরি হয়। রাসায়নিক সার, রাসায়নিক কীটনাশক, গ্রোথ হরমোনসহ যে কোনো রাসায়নিক পদ্ধতি ছাড়া জৈবসার ও জৈব কীটনাশক দিয়ে পরিবেশ বান্ধব উপায়ে ফসল উৎপাদন করাই হচ্ছে অর্গানিক ফার্মিং বা জৈব কৃষি। রাসায়নিক সার দিয়ে ফসল চাষাবাদ পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। ফসল উৎপাদন খরচও বেশি হয়। জৈব সার দিয়ে ফসল চাষাবাদ পরিবেশ সম্মত ও উৎপাদন খরচ কম হয়। উৎপাদিত খাদ্য স্বাস্থ্যসম্মত।
বাংলাদেশে শাকসবজি উৎপাদনে প্রচুর রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করায় ইউরোপের দেশগুলো এদেশ থেকে শাকসবজি ক্রয়ে অনীহা প্রকাশ করেছে। জৈব উপায়ে খাদ্যশস্য ও শাকসবজি উৎপাদন খরচ কম অথচ বেশি দামে দেশে ও বিদেশে বিক্রির যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। রাসায়নিক সার পরিমাণে কম লাগে, সহজলভ্য ও দ্রুত কাজ করে। মাটির উর্বরতা সাময়িক বাড়লেও পরে ক্ষতি করে। রাসায়নিক সারে খরচ বেশি, মাটি, পানি ও বাতাস দূষিত করে এবং মাটির জীবাণু ও কেঁচো মারা যায়। মাটিতে জটিল যৌগ সৃষ্টি করে যা গাছ গ্রহণ করে পারে না। গাছে বিষাক্ততা সৃষ্টি করে। একটু বেশি হলে গাছ মারা যায়। ঝুঁকি বেশি। প্রয়োগ পদ্ধতি সঠিক না হলে কার্যকারিতা নষ্ট হয়। একটি সারে ২ থেকে ৩টি পুষ্টি উপাদান থাকে। একটি জৈব সারে ৮ থেকে ১০টি পুষ্টি উপাদান থাকে। রাসায়নিক সার জমিতে অল্প কিছু দিন স্থায়ী হয় এবং প্রয়োগের পর অপচয় বেশি হয়। দেশে প্রতি বছর গড়ে ৩০ থেকে ৩২ লাখ টন রাসায়নিক সার ব্যবহার হচ্ছে। যা পরিবেশকে দূষণ করছে। রাসায়নিক সার উৎপাদনে গ্যাস, বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান লাগছে, যা পরিবেশ দূষণ করছে। কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে পরিবেশ দূষণের কথা চিন্তা করে রাসায়নিক সার উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। অথচ দেশে প্রতি বছর শতকরা ২০ ভাগ রাসায়নিক সারের ব্যবহার বাড়ছে। জৈব সার মাটিতে পানি ও পুষ্টি ধারণক্ষমতা বাড়ায়, মাটিকে উর্বর করে, মাটির কণাগুলো ফসলের উপযোগী করে, মাটির ছিদ্র বাড়ায় ফলে বায়ু ও পানি চলাচলে সুবিধা হয়। জৈব সার মাটির তাপমাত্রা ও অম্লত্ব-ক্ষারত্ব নিয়ন্ত্রণ করে। জৈব সার গাছে পুষ্টি পরিশোষণে সহায়তা করে, মাটির লবণাক্ততা হ্রাস করে। বেলে মাটিকে দোআঁশ মাটিতে রূপান্তরিত করে। মাটিতে অনুজীব ও কেঁচোর সংখ্যা বাড়ায়। জটিল যৌগকে সরল দ্রব্যে পরিণত করে। পারিবারিক খামারে বিষমুক্ত পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য উৎপাদন করে বিশ্বের সব মানুষের ক্ষুধা নিবারণ ও খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনের প্রচেষ্টা বিশ্ব খাদ্য দিবসের মাধ্যমে বাস্তবায়ন সফল হোক এটাই আমাদের কাম্য।
লেখক : কলামিস্ট।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • কিশোর-কিশোরীদের হালচাল
  • বলকানস : ইউরোপের যুদ্ধক্ষেত্র
  • সন্তানের প্রতি অভিভাবকের দায়িত্ব
  • শিক্ষার হার এবং কর্মসংস্থান প্রসঙ্গ
  • শিক্ষার রাজ্যে এক বিস্ময়
  • ডেঙ্গু ও বানভাসি মানুষ
  • শিল্প-সাহিত্যে ১৫ আগস্ট
  • ইমাম-মুয়াজ্জিন সার্ভিস রোলস-এর প্রয়োজনীয়তা
  • বাঙালির মুক্তিসনদ ঐতিহাসিক ৬ দফা
  • শিশুদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশে পরিবেশ
  • তিনি কোন দলের নয়, সমগ্র বাঙালির
  • ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম অধ্যায়
  • বঙ্গবন্ধুর ফিরে আসা
  • শিক্ষা ও নৈতিকতা
  • কুরবানির সূচনা
  • কুরবানি ও আমাদের করণীয়
  • উন্নয়নের মানবিকতা বনাম গতানুগতিকতা
  • বিশ্বাসের উপলব্ধি
  • নিরাপত্তাহীনতায় নারী
  • স্বাগতম ঈদুল আযহা
  • Developed by: Sparkle IT