উপ সম্পাদকীয়

মানবতার আহবানে জেগে ওঠো অনির্বাণে

মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন খন্দকার প্রকাশিত হয়েছে: ১০-০৭-২০১৯ ইং ০০:১১:২৫ | সংবাদটি ১৫৫ বার পঠিত

মানব সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকে মানবাধিকারের বিষয়টি বার বার উপেক্ষিত। দিন যত গড়াচ্ছে মানুষের অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে চক্রবৃদ্ধি হারে। যারা সভ্যতার রাজমুকুট পরে আছে, তারা নিত্যনতুন কৌশল অবলম্বন করে মানব হত্যায় মেতে উঠছে। রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য যারা মানুষ হত্যা করে, তাদের দ্বারা মানবাধিকার রক্ষা হবে এমন প্রত্যাশা চাঁদের দেশে বসবাসের স্বপ্ন দেখার শামিল। পৃথিবীর পথে-ঘাটে মানবতা লঙ্ঘনের আহাজারিতে হিমালয়ের বরফ গলা শুরু হয়েছে। তারপরও বোধোদয় হচ্ছেনা বিশ্ববাসীর। পৃথিবীর সব প্রান্তে দুর্বলের উপর সবলের অত্যাচার, বর্ণ বৈষম্যের হুংকার। গণতন্ত্রের আড়ালে স্বৈরতন্ত্রের মহোৎসব। একের পর এক নৃশংস ঘটনা জনমনে ভীতির সঞ্চার করছে। মানবাধিকার কর্মীর জোর গলার আওয়াজ কর্ণপাত করছে না অত্যাচারী শাসক গোষ্ঠী। সিরিয়ায় বাশার বাহিনীর শিশু হত্যা, ইসরাইলের দ্বারা ফিলিস্তিনিদের উপর নির্বিচারে গণহত্যা, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের কথায় কথায় অবরোধ ও যুদ্ধের হুমকি, কাশ্মীরের স্বাধীনতাকামী মানুষের উপর ভারতীয় সেনাদের বর্বর নির্যাতন, চীনের উইঘুর মুসলমানদের বন্দীদশা, মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের উপর গণহত্যা ইত্যাদি।
বহির্বিশ্বের পাশাপাশি বাংলাদেশে যেভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে তা দেখে জাতি খুবই শঙ্কিত। বিশ্বজিৎকে কুপিয়ে হত্যার বিভীষিকাময় দৃশ্য, গুলশান হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলা, বগুড়ায় ধর্ষণের বিচার চাওয়ায় মা-মেয়ের মাথা ন্যাড়া করে দেওয়া, সিলেটে শিশু রাজন হত্যা, এম. সি কলেজের পুকুর পাড়ে খাদিজাকে কুপিয়ে হত্যা চেষ্টা, কিশোরগঞ্জে চলন্ত বাসে চালক এবং হেলপার দ্বারা নার্স তানিয়া ধর্ষণ ও হত্যা, ফেনীতে লম্পট শিক্ষকের যৌন হয়রানির বিচার চাওয়ায় মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যা, জামালপুরে দুই সন্তানের গলায় ছুরি ধরে মাকে ধর্ষণ, চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির পূর্ব ফরহাদাবাদে চাচা কর্তৃক নয় মাস বয়সী আপন ভাতিজি ধর্ষণ, বরগুনায় স্ত্রীর সামনে প্রকাশ্য দিবালোকে শত শত মানুষের সামনে রিফাত শরীফকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা, সামাজিক অধ:পতনের কয়েকটি খন্ডচিত্র। এছাড়া পর্দার অন্তরালে রয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার ঘটনা। লোকলজ্জা ও সামাজিক মর্যাদা ক্ষুন্ন হওয়ার ভয়ে অনেকে ঘটনা প্রকাশ করে না।
দেশে ক্রমাগত ধর্ষণ, গুম, হত্যা, সন্ত্রাস ও দুর্বৃত্তপনা চরম আকার ধারণ করেছে। পিতৃতুল্য শিক্ষকের কাছে নিরাপদ নয় ছাত্রী। শিক্ষক দ্বারা ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে অহরহ। সিদ্বিরগঞ্জের অক্সফোর্ড স্কুলের দুই শিক্ষক দ্বারা ব্ল্যাকমেইলিং করে বিশ জনের বেশি ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনায় জাতি বড়ই লজ্জিত এবং অভিভাবকরা মেয়েদের নিয়ে শংকিত। এদেশের সংস্কৃতি এমনভাবে গড়ে উঠেছে অনেক ক্ষেত্রে ঘটনা দলীয়করণ এবং রাজনীতিকরণের সংজ্ঞায় ফেলে ঘটনাকে ভিন্নদিকে প্রবাহিত করা হয়। ফলে মূল দুর্বৃত্তরা পার পেয়ে যায়, পুনরায় সন্ত্রাসী কাজে লিপ্ত হয়। কোন একটি মর্মান্তিক, লোমহর্ষক, হৃদয় বিদারক ঘটনা ঘটলে সবাই সোচ্ছার হই। পরবর্তীতে আরেকটি নতুন ঘটনা ঘটলে আগেরটি ভুলে যাই। যখন কোন অপরাধ সংঘটিত হয় তখন অপরাধীকে দ্রুত বিচারের মুখোমুখি করে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করলে অপরাধ করার প্রবণতা হ্রাস পাবে এবং দুর্বৃত্তরা নিবৃত্ত হবে।
প্রসঙ্গক্রমে বলা যায়, নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর সন্ত্রাস দমনে কার্যকরী পদক্ষেপ উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। গত পনের মার্চ জুমার নামাজে উগ্র ডানপন্থী শ্বেতাঙ্গ সন্ত্রাসী ব্রেন্টন ট্যারান্ট ক্রাইস্টচার্চের আল-নূর এবং লিনউড মসজিদে ব্রাশ ফায়ার করে ঊনপঞ্চাশ জন মুসল্লি হত্যা করে যে ভিডিও প্রকাশ করেছিল তা দেখে বিশ্ববাসীর হৃদয়ে রক্তক্ষরণ শুরু হয়েছিল। পরক্ষণে নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডার্ন সময় উপযোগী এবং নির্ভেজাল নানা কার্যক্রমের কারণে বিশ্ববাসীর হৃদয় জয় করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘যে আঘাত হানা হয়েছে তোমাদের উপর তা লেগেছে আমার গায়েও। আর সন্ত্রাসীদের কোন ধর্ম নেই। হামলাকারী ধর্মীয় বিশ্বাসে খ্রিষ্টান হলেও বর্ণবাদই তার হামলার প্রধান কারণ। এসব চরমপন্থীর শুধু নিউজিল্যান্ডেই নয়, তামাম জাহানে কোন স্থান নেই’। তার দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হোক সে চায়নি। তার কাছে ধর্ম বড় হয়ে দেখা দেয়নি। তার কাছে বড় ছিল মানবতা। তিনি আরো বলেন, ‘মানুষ নয়, মানুষের হৃদয় জয় করতে হবে। পারমানবিক অস্ত্র সঠিক পথ দেখাবে না, সঠিক পথ দেখাবে প্রেম, ভালবাসা, সৌহার্দ্য ও মানবিক গুণ’। এজন্য সারা বিশ্বে তার কার্যক্রম প্রশংসিত হয়েছিল। অপর দিকে রোহিঙ্গা মুসলমানদের উপর নির্যাতন বন্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নেওয়ার কারণে শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অং সাং সুচি পৃথিবীব্যাপী নিন্দিত হয়েছিল। দেশে এতসব অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পেছনে কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞদের অভিমত-রাষ্ট্রীয় আইন প্রয়োগের ব্যর্থতা, মাদকের প্রভাব, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা, পারিবারিক শিক্ষার অভাব, ধর্মীয় এবং সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, পর্নোগ্রাফির ছড়াছড়ি, ইন্টারনেটের অপব্যবহার, অসৎ সঙ্গ, বিদেশী সংস্কৃতির কু-প্রভাব, পিতা মাতার দায়িত্বে অবহেলা, ক্ষমতা ও অর্থের লোভ ইত্যাদি। এ বিপর্যস্ত পরিবেশ থেকে আমাদেরকে বেরিয়ে আসতে হবে। মানুষের মৌলিক অধিকার সমুন্নত রেখে বসবাসের উপযোগী আদর্শ সমাজ গড়ে তুলতে হবে। তার জন্য প্রয়োজন-সামাজিক সচেতনতা, দৃঢ় পারিবারিক বন্ধন, আতœশুদ্ধি, ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা, অপরাধীর দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। মানুষের জীবন, অধিকার, সমতা এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবন যাপনের দায়িত্ব নিতে হবে সরকারকে, সহযোগিতা করতে হবে সবাইকে।
লেখক : কলামিস্ট।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • কিশোর-কিশোরীদের হালচাল
  • বলকানস : ইউরোপের যুদ্ধক্ষেত্র
  • সন্তানের প্রতি অভিভাবকের দায়িত্ব
  • শিক্ষার হার এবং কর্মসংস্থান প্রসঙ্গ
  • শিক্ষার রাজ্যে এক বিস্ময়
  • ডেঙ্গু ও বানভাসি মানুষ
  • শিল্প-সাহিত্যে ১৫ আগস্ট
  • ইমাম-মুয়াজ্জিন সার্ভিস রোলস-এর প্রয়োজনীয়তা
  • বাঙালির মুক্তিসনদ ঐতিহাসিক ৬ দফা
  • শিশুদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশে পরিবেশ
  • তিনি কোন দলের নয়, সমগ্র বাঙালির
  • ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম অধ্যায়
  • বঙ্গবন্ধুর ফিরে আসা
  • শিক্ষা ও নৈতিকতা
  • কুরবানির সূচনা
  • কুরবানি ও আমাদের করণীয়
  • উন্নয়নের মানবিকতা বনাম গতানুগতিকতা
  • বিশ্বাসের উপলব্ধি
  • নিরাপত্তাহীনতায় নারী
  • স্বাগতম ঈদুল আযহা
  • Developed by: Sparkle IT