উপ সম্পাদকীয়

সিলেট প্রেসক্লাব : সাংবাদিকদের প্রাণের সংগঠন

সেলিম আউয়াল প্রকাশিত হয়েছে: ১০-০৭-২০১৯ ইং ০০:১২:০৫ | সংবাদটি ১১৯ বার পঠিত

বাংলা ভাষায় সংবাদপত্র প্রকাশের ৫৮বছর পর ১৮৭৬ খ্রিষ্টাব্দের ১ জানুয়ারি সিলেটের প্রথম সংবাদপত্রের পথচলা। হাতে গোনা ক’জন সাংবাদিক। সমাজে তাদের পরিচিতি মিশনারি মানুষের মতো। সাংবাদিকতা তাদের কাছে পেশা নয়, নেশা। তাদের উত্তরসূরীদের সেই নেশা আজো কতোটুকু কেটেছে, কে জানে।
সিলেটে সংবাদপত্রের যাত্রা শুরুর প্রায় শতবর্ষ পর, ১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দে সিলেটের সাংবাদিকরা সংগঠিত হবার প্রয়াস নেন। তাদের প্রথম সংঘবদ্ধ প্রয়াস সিলেট জেলা প্রেসক্লাব নামে সিলেট প্রেসক্লাবের গোড়াপত্তন। সিলেটে প্রেসক্লাব শুধুমাত্র রিক্রিয়েশন ক্লাবের রূপ গ্রহণ না করে সিলেটের সাংবাদিকতার বিকাশ, সাংবাদিকদের উন্নয়ন-পেশাগত উৎকর্ষ সাধন, অধিকার আদায়, মর্যাদা সমুন্নত রাখাসহ সার্বিক কল্যাণের লক্ষ্যে সিলেট প্রেসক্লাব গড়ে উঠে। শুধু যে সাংবাদিকদের কল্যাণে কাজ করছে, এভাবে সুনির্দিষ্ট ফ্রেমে সিলেট প্রেসক্লাবের কার্যক্রমকে আবদ্ধ করা যায় না। সিলেটের সংবাদপত্র যেমন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতার আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধে গৌরবের ভূমিকা পালন করেছে, তেমনি প্রয়োজনে সাংবাদিকরাও নেমে এসেছেন জনগণের কাতারে। ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামে সিলেটের সাংবাদিকরা অবদান রেখেছেন, তারা সোচ্চার ছিলেন স্বৈরাচার আইয়ুব খানের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে। উনসত্তরের গণ অভ্যূত্থান, '৭০-এর নির্বাচন, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা পরবর্তী স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রক্ষার আন্দোলন, এমন কি সিলেটকে বিভাগে পরিণত করার আন্দোলনেও সিলেটের সাংবাদিকরা পালন করেছেন দায়িত্বশীল ভূমিকা। একথা অস্বীকার করার উপায় নেই-আঞ্চলিক উন্নয়ন ছাড়া জাতীয় উন্নয়ন সম্ভব নয়। এই দায়িত্ববোধ থেকে সিলেটের পত্র-পত্রিকাগুলো আঞ্চলিক উন্নয়ন বিশেষ করে সিলেটবাসীর ন্যায্য দাবী দাওয়া আদায়েও সবসময় রয়েছে তৎপর। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন ও নব্বইয়ের গণ অভ্যুত্থানে সিলেট প্রেসক্লাব সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। স্বৈরাচারের ‘জরুরি অবস্থা’ উপেক্ষা করে ক্লাবের সদস্যরা রাজপথে নেমে আসেন। এমনকি সিলেটের সংবাদপত্রগুলো ঢাকার সংবাদপত্রের সাথে সংহতি প্রকাশ করে দীর্ঘদিন সংবাদপত্র প্রকাশনা বন্ধ রেখেছিল। ‘এখানে যে কথাটি না বললে নয় সেটি হচ্ছে, সিলেটে প্রথমবারের মতো জরুরি আইন ভঙ্গ করে মিছিল করেছিলেন সিলেটের সাংবাদিকরা। ’৯৬-এর ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনকালে উত্তপ্ত বাংলাদেশের জনগণের সেন্টিমেন্টের পক্ষে সিলেটের সাংবাদিকরা রাস্তায় নেমে এসেছিল।
সিলেটকে বিভাগ করার দাবী সিলেটবাসীর অনেক দিনের। সাপ্তাহিক যুগভেরী সিলেটকে প্রদেশ করার যৌক্তিকতা তুলে ধরে ১৯৬৯ সালের ৮ অক্টোবর একটি বিশেস সংখ্যা প্রকাশ করে। বিশেষ করে সিলেট বিভাগের দাবীতে ৯২ সালের ১লা অক্টোবর থেকে গড়ে উঠা আন্দোলন এবং সেই আন্দোলনকে চুড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে সিলেটের পত্র-পত্রিকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
প্রকৃতির রতœভান্ডার আখ্যায় সিলেটের নামডাক। সিলেট জাতীয় জীবনের সকল ক্ষেত্রে সম্পদ, মেধা, অবদানের নিরিখে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও উন্নয়নের সকল ক্ষেত্রে ন্যায্য হিস্যা পাবার বেলায় বঞ্চিত। সেই বঞ্চনার অবসানে, সিলেটবাসীর ন্যায্য দাবী আদায়ের জন্য এবং এই দাবীর যৌক্তিকতা যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরতে, জনমত সৃষ্টিতে সিলেটের সংবাদপত্রগুলো জোরালো ভূমিকা পালন করছে। আঞ্চলিক উন্নয়নের মাধ্যমে জাতীয় উন্নয়ন সাধিত হবে এবং জাতীয় উন্নয়নে সিলেটের সংবাদপত্র পালন করছে ও অতীতের ন্যায় পালন করবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। মানবতার কল্যাণে সিলেটের পত্রপত্রিকা দৃঢ়চিত্তে তার অঙ্গীকার পালন করবে, বিগত ইতিহাস-ঐতিহ্যের আলোকে এ কথা বলা যায় নিঃসন্দেহে। এইসব দিক বিবেচনায় সিলেট প্রেসক্লাব তার প্রতিষ্ঠা থেকেই সিলেটের সাংবাদিকদের পেশাগত ঐক্যের প্রতীক এবং একই সাথে সিলেটের মানুষের আশা ভরসার স্থল।
সিলেটে সাংবাদিকদের সংগঠন সিলেট প্রেসক্লাব গড়ে উঠে ১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দে, তখনো সিলেট বিভাগ হয়নি। সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভিবাজার, সুনামগঞ্জ নিয়ে সিলেট জেলা। এজন্যে জেলা শহরের প্রেসক্লাব হিসেবে পরিচিতি তুলে ধরার জন্যে নাম রাখা হয়েছিলো ‘সিলেট জেলা প্রেসক্লাব’। ১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ জুলাই ‘সিলেট জেলা প্রেসক্লাব’ নামে সিলেটের সাংবাদিকদের প্রেসক্লাব গড়ে উঠে। তখন তো আজকের মতো এতো সাংবাদিক নেই, হাতে গোনা কিছু মানুষ সাংবাদিকতা করেন। বলা যায় মিশনারি কাজ, ওই যে নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর মতো অবস্থা। সেই সময়ে গড়ে উঠা প্রেসক্লাবের প্রথম কমিটির একমাত্র রফিকুর রহমান লজুর সাথে আমাদের যোগাযোগ করা সম্ভব হয়। তিনি জানালেন প্রথম কমিটির তিনি আর এম. শহীদ লোহানি ছাড়া আর কেউ বেঁেচ নেই। রফিকুর রহমান লজুর বয়েস হয়েছে আগের মতো সবকিছু মনে নেই। বললেন, সিলেটে প্রেসক্লাব গঠনের প্রথম সভাটি হয়েছিলো চৌহাট্টায়। আজ যেখানে ভোলানন্দ নাইট স্কুল, সেই স্কুলের বিপরীতে এখন যেখানে মানরু সপিং কমপ্লেক্স; সেখানে ছিলো রেডিও পাকিস্তান-এর সংবাদ বিভাগের অফিস। তখন রেডিও পাকিস্তান সিলেট-এর সহকারী সংবাদ সম্পাদক ছিলেন সুলতান আলী। তার চৌহাট্টা অফিসকক্ষেই প্রেসক্লাব গঠনের সভাটি অনুষ্ঠিত হয় এবং সেই সভায় গঠন করা হয় ‘সিলেট জেলা প্রেসক্লাব’। সেই সময়ের (১৪ জুলাই ১৯৬৫) সাপ্তাহিক জনশক্তি পত্রিকায় ‘সিলেটে প্রেসক্লাব গঠিত’ শিরোনামে সংবাদে উল্লেখ করা হয়Ñ‘গতকল্য বিকাল ৫ ঘটিকার সময় সিলেটস্থ রেডিও পাকিস্তানের সহকারী সংবাদ সম্পাদক মিঃ সুলতান আলীর চৌহাট্টাস্থিত অফিসে প্রবীণ সাংবাদিক জনশক্তি সম্পাদক মিঃ নিকুঞ্জ বিহারী গোস্বামীর সভাপতিত্বে এক সভায় ‘সিলেট জেলা প্রেসক্লাব’ গঠন করা হয়।’ আজকে সিলেট প্রেসক্লাবের যে প্রাতিষ্ঠানিকতা, নি:সন্দেহে সেই আলোকে শুরু হয়নি সিলেট প্রেসক্লাবের যাত্রা। প্রচুর সীমাবদ্ধতা ছিলো, সাংবাদিক ছিলেন হাতে গোনা, বসার মতো একটি স্থানও ছিলো না। তবুও একটি বিষয় স্বীকার করতে হবে, ১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দে ‘প্রেসক্লাব’ শব্দটি নিয়ে গুটি কয়েক মানুষ পথচলা শুরু করেছিলেন। সিলেটের সেই সময়ের সাংবাদিকতার একটি চিত্র ফুটে উঠেছে সাপ্তাহিক জনশক্তি পত্রিকার (১৪ জুলাই ১৯৬৫) ‘প্রেসক্লাব’ শিরোনামে সম্পাদকীয়তেÑ‘শ্রীহট্টের সাংবাদিকগণ সম্প্রতি সম্মিলিতভাবে প্রেসক্লাব নামে একটি সাংবাদিক সংস্থা গড়িয়া তুলিতে উদ্যোগী হইয়াছেন দেখিয়া আমরা আশা ও আনন্দ বোধ করিতেছি।...অধুনা শ্রীহট্টে যে ক’খানি সাপ্তাহিক পত্রিকা আছে তাহাদের হাতেও দেশের বহু ভাঙ্গাগড়ার ইতিহাস রচিত হইয়াছে। সাপ্তাহিক পত্রিকাগুলির মধ্যে জনশক্তি ১৯২১ সালে, যুগভেরী ১৯৩২ সালে, ইস্টার্ন হেরাল্ড ১৯৩৯ সালে এবং আওয়াজ পত্রিকা ১৯৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। আল ইসলাহ পত্রিকাখানিও ৩০ বৎসরের ঐতিহ্যের---(লেখা অস্পষ্ট)। সম্প্রতি জেলা কাউন্সিলের পরিচালনায় জালালাবাদ ও সিটিজেন নামে দুইখানি পত্রিকা এবং হবিগঞ্জ হইতে নবারুণ, মৌলবী বাজার হইতে অগ্রদূত এবং সুনামগঞ্জ হইতে সুরমা নামে কয়েকখানি পত্রিকা সাপ্তাহিক ও মাসিক পর্য্যায়ে প্রকাশিত হইতেছে। উপরোক্ত পত্রিকাগুলির কর্ম্মী ও পরিচালক ভিন্ন শ্রীহট্টে ঢাকার প্রখ্যাত দৈনিক পত্রিকাসমুহের নিজস্ব সংবাদদাতা, এ,পি,পি ও ইউ,পি,পি’র প্রতিনিধি এবং রেডিও পাকিস্তানের বার্ত্তা প্রতিনিধি রহিয়াছেন। এই সমস্ত সাংবাদিকদের মতবাদ, দলীয় আনুগত্য ও দৃষ্টি ভঙ্গির মধ্যে হয়ত: পার্থক্য রহিয়াছে কিন্তু আমরা মনে করি যে একটি স্থানে আমাদের মধ্যে একটা মিলও রহিয়াছে। তাহা হইতেছে আমরা সকলেই সাংবাদিকতার মধ্য দিয়াই দেশের সেবা করিতে চাই এবং দেশের সুখ, দুঃখ, ব্যথা, বেদনা, আশা-আকাঙ্খাকে নিজস্ব দৃষ্টিকোণ হইতে রাষ্ট্র ও দেশের সম্মুখে তুলিয়া ধরিতে চাই। সত্য ও নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশনই আমাদের কাজ।’
১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দের সিলেট প্রেসক্লাবের প্রথম কমিটিতে ছিলেন, সভাপতি আমীনূর রশীদ চৌধুরী (যুগভেরী, ইস্টার্ন হেরাল্ড); সহ-সভাপতি নিকুঞ্জবিহারী গোস্বামী (জনশক্তি) ও মুহম্মদ নূরুল হক্ (আল ইসলাহ); যুগ্ম-সম্পাদক হিমাংশু শেখর ধর (যুগভেরী) ও আবদুল মন্নান (আওয়াজ); কোষাধ্যক্ষ এম.এ. নূর (ইউনিটি); সদস্য সুলতান আলী, শামসুজ্জামান সুফী, রফিকুর রহমান লজু, আর তালুকদার, এ.জি. শামসুল আলম, সি এম হায়দর, এম শহীদ লোহানী, সুধীন্দ্রবিজয় দাস, নন্দগোপাল চৌধুরী ও রজিউর রহমান। সেই সময়ের সকল দল-মতের মানুষ ছিলেন সেই কমিটিতে। প্রথম কমিটি গঠনের সাথে সাথে হিমাংশু শেখর ধরকে আহ্বায়ক, এ.জে. শামসুল আলম, এম শহীদ লোহানী, সুলতান আলী, নিকুঞ্জ বিহারী গোস্বামী ও রজিউর রহমানকে সদস্য করে গঠিত হয় ‘গঠনতন্ত্র প্রণয়ন উপ-কমিটি’।
১৯৬৫ সালে কমিটি গঠনের পর থেকেই প্রেসক্লাবের কাজকর্ম শুরু হয়। প্রেসক্লাবের নিজস্ব অফিস ছিলো না। এজন্যে সুলতান আলীর চৌহাট্টাস্থ অফিস কক্ষ, সিলেট পৌরসভার সভাকক্ষ, পাঠাগার, বর্তমান শহিদ সুলেমান হল, জিন্দাবাজারস্থ জেলা জনসংযোগ কার্যালয়, আম্বরখানাস্থ জ্যোতি মঞ্জিল ও যুগভেরীর অফিসসহ বিভিন্ন স্থানে প্রেসক্লাবের কাজকর্ম চালানো হয়। ১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দের দিকে সারদা হল-প্রাঙ্গনের জেলা জনসংযোগ বিভাগের পাঠাগারের একটি অংশ সিলেট প্রেসক্লাবের অফিস হিসেবে ব্যবহারের জন্য সেই সময়ের জেলা প্রশাসক ব্যবস্থা করে দেন। এভাবে ’৭১ পর্যন্ত ক্লাবের কার্যক্রম চলে।
১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবরে সিলেট প্রেসক্লাব পুনর্গঠিত হয়। ১৯৭২-এর ৮ অক্টোবর সিলেট পৌরসভার সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত সভায় ‘ফুলস্ক্যাপ কাগজের পাঁচ পৃষ্ঠায় লিখিত’ একটি গঠনতন্ত্র অনুমোদন করা হয়। এই গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ৮ অক্টোবর ’৭২ থেকে ১৮ অক্টোবর ’৭৭ পর্যন্ত এই কমিটি কাজ করে। ১৯৬৫ থেকে ১৯৭৭Ñএই সময়টিতে সিলেট প্রেসক্লাব খুব একটা সংগঠিত ছিলো না। ’৬৫-র পাক-ভারত যুদ্ধ, উনসত্তরের গণ অভ্যূত্থান, সত্তরের নির্বাচন, তারপর মুক্তিযুদ্ধÑএইসব ঘটনা সিলেট প্রেসক্লাবকে বিকশিত হতে দেয়নি। তারপর পঁচাত্তরে সরকার চারটি পত্রিকা রেখে সবগুলো পত্রিকা বন্ধ করে দিলো, যেখানে সাংবাদিকদেরই অস্তিত্ব বিপন্ন, সেখানে প্রেসক্লাব চলবে কিভাবে। স্বাভাবিকভাবেই পঁচাত্তরের পরে সিলেট প্রেসক্লাবের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়ে। এই অবস্থায় ৬৫-র নেতৃত্ব সেই সময়ের বাস্তবতার আলোকে সময়োপযোগী পদক্ষেপ বা কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়ায় সিলেটের সাংবাদিকতায় আসা অপেক্ষাকৃত তরুণদের মধ্যে এক ধরনের ক্ষোভের সৃষ্টি হয়, তাদের ক্ষোভ এতোই প্রবল ছিলো আমরা দেখতে পাই ’৬৫-র কমিটির লোকজনকে রেখেই সেই সময়ের তরুণরা বোরহান উদ্দিন খানের নেতৃত্বে গড়ে তুলেন সিলেট প্রেসক্লাব। পুরনো প্রেসক্লাবকে এক ধরনের অস্বীকার করে তারা একটি গঠনতন্ত্র প্রস্তুত করে তাদের পথচলা শুরু করেন। শুধু তাই নয় সেই গঠণতন্ত্রে সিলেট প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে নিজেদেরকে ঘোষণা দেন। ১৯৭৭ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ অক্টোবর একটি সভায় তারা মিলিত হন। সেই সভার একদিন পর ২০ অক্টোবর আরেকটি সভায় তারা অংশ নেন। আবদুল মালিক চৌধুরীর সভাপতিত্বে ১১ জন সাংবাদিকের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত সভায় ১৮ অক্টোবর ’৭৭ সালের সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী একটি গঠনতন্ত্র অনুমোদিত হয়। ১৯৭৭-৭৮ সেশনের কার্যকরী কমিটি সংস্থার রেজিস্ট্রেশনের জন্য গঠনতন্ত্র জমা দেন এবং উক্ত ১১ জনকে পরবর্তীকালে প্রতিষ্ঠাতা-সদস্য হিসেবে উল্লেখ করেন। এখানে একটি বিষয় সুস্পষ্ট ১৯৭৭ খ্রিষ্টাব্দের নতুন গঠণতন্ত্র অনুযায়ী সিলেটে ১৯৭৭ খ্রিষ্টাব্দে একটি নতুন প্রেসক্লাবের যাত্রা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দলিলাদি পর্যবেক্ষণ করলে এটা স্বীকার করতেই হবে ১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দে গঠিত প্রেসক্লাব ও ১৯৭৭ খ্রিষ্টাব্দে গঠিত প্রেসক্লাব দুটো পৃথক প্রেস ক্লাব। কারন ১৯৭৭ সালের গঠণতন্ত্রে পূর্বতন কমিটিকে অস্বীকার করে নতুন ১১ জনকে প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে দেখানো হয়েছে।
সিলেট প্রেসক্লাবের একটি অমীমাংসিত বিষয় হচ্ছে সিলেট প্রেসক্লাবের ইতিহাস রচনা। বার বার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে এবং উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছে। ১৯৮৯’র ১০ মার্চ অনুষ্ঠিত কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় সিলেট প্রেসক্লাবের ইতিহাস প্রণয়নের জন্য মুহাম্মদ ফয়জুর রহমানকে আহবায়ক, মাহবুবুর রহমান ও আবদুস সাত্তারকে সদস্য করে একটি কমিটি গঠন করা হয়। ৭ অক্টোবর ১৯৮৯ অনুষ্ঠিত সভায় মুহাম্মদ ফয়জুর রহমান তার প্রস্তুতকৃত সিলেট প্রেসক্লাবের ইতিহাস পড়ে শোনান। সেই সভায় তার রচিত ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করার জন্য কমিটিকে আরো ৬ মাস সময় দেয়া হয়। সেই ইতিহাস প্রণয়ন কমিটিতে আবদুল মালিক জাকা ও আল আজাদকে অন্তর্ভূক্ত করা হয়। তারপর বিভিন্ন সভায় ইতিহাসের বিষয়টি উঠেছে, আবার সময় বাড়ানো হয়েছে। ৩১ ডিসেম্বর ১৯৯২ ক্লাবের দ্বি-বার্ষিক সাধারণ সভায় আল আজাদকে ইতিহাস প্রণয়নের দায়িত্ব দেয়া হয়। ‘তিনি (আল আজাদ) প্রচুর পরিশ্রম করে ‘সিলেট প্রেসক্লাব: এগিয়ে চলার ২৮ বছর’ নামে একটি খসড়া নিবন্ধন করেন।’ কিন্তু সেটিও আলোর মুখ দেখেনি, তার লেখা ইতিহাস নিয়ে নানাজন নানা মত পরিবেশন করেন সেই সভায়। ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করার জন্যে আবার বাড়ানো হয় সময়। কিন্তু আজো প্রেসক্লাব কর্তৃক অনুমোদিত ক্লাবের কোন ইতিহাস গ্রন্থ বেরোয়নি। এমন কী এ নিয়ে তথ্যসমৃদ্ধ বড়ো আকারের কোন প্রবন্ধও বের হয়নি। অনেকের কাছে এর বড়ো কারন মনে হয়েছে সিলেট প্রেসক্লাবের ইতিহাস রচনায় আবেগ আর বাস্তবতা ছিলো প্রবল, দুটোই ছিলো পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী। আজকের সাংবাদিকদের পূর্বসূরীদের হাত দিয়ে একদিন সিলেটে প্রেসক্লাবের যাত্রা শুরু হয়েছিলো, কিন্তু নানা কারনে তাদের প্রয়াস একটি পর্যায়ে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয় আর পূর্বসূরীদের রেখে যাওয়া ধ্বংসস্তুপের উপর নতুন করে ১৯৭৭ খ্রিষ্টাব্দে গড়ে উঠে সিলেট প্রেসক্লাব। দুটোই বাস্তবতা। পূর্বসূরীদের স্মৃতিকে অস্বীকার করতে আবেগ বাধ সাধে, কারন তারা আমাদের শহরে সিলেট প্রেসক্লাবের জন্ম দিয়েছিলেন। আবার বিলীন হতে যাওয়া ‘সিলেট প্রেসক্লাব’ শব্দ দুটো টিকে গেলো একটি এন্টি-এস্টাবলিশমেন্ট মনোবৃত্তিধারী একদল তরুণের কারনে। তারা পুরনোদেরকে অস্বীকার করে নতুন করে গঠণতন্ত্র তৈরীর মাধ্যমে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠাতা ঘোষণা করে গড়ে তুললেন সিলেট প্রেসক্লাব। তারা সেই সাতাত্তরে নতুন আবেগে-নতুন উদ্যমে সিলেট প্রেসক্লাব গড়ে না তুললে, একটি পূর্ণাঙ্গ-অগ্রসর সিলেট প্রেসক্লাবের জন্যে আমাদেরকে কতোকাল অপেক্ষা করতে হতো, কে জানে? নগরীর সুবিদ বাজারে বর্তমান সিলেট প্রেসক্লাবটি দালিলিকভাবে তাদের হাতে গড়া নতুন একটি প্রেসক্লাব এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করতেও আবেগ বাধ সাধে। এই পর্যায়ে নির্মোহভাবে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করলে দেখা যায় ১৯৬৫ সালের প্রেসক্লাবের ধারাবাহিকতায় ১৯৭৭ সালের প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠা। সাতাত্তরের প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠাতারা পয়ষট্টিকে পুরোপুরি অস্বীকার করে বসে থাকলে পারতেন। কারন গঠনতন্ত্র আলাদা, নেতৃত্ব নতুনÑকারো কিছু বলার থাকতো না। বিভিন্ন সময় এইভাবে নানা স্থানে গড়ে উঠেছে নানা সংগঠন। তবে এখানে নতুন নেতৃত্বের নস্টালজিক মানসিকতা, উদারতাও পরিলক্ষিত হয়। ১৯৮৮-র ৩০ ডিসেম্বর স্বয়ং বোরহান উদ্দিন খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ক্লাবের দ্বি-বার্ষিক সাধারণ সভার শোক প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়Ñ‘প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মরহুম আমীনূর রশীদ চৌধুরী

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • কিশোর-কিশোরীদের হালচাল
  • বলকানস : ইউরোপের যুদ্ধক্ষেত্র
  • সন্তানের প্রতি অভিভাবকের দায়িত্ব
  • শিক্ষার হার এবং কর্মসংস্থান প্রসঙ্গ
  • শিক্ষার রাজ্যে এক বিস্ময়
  • ডেঙ্গু ও বানভাসি মানুষ
  • শিল্প-সাহিত্যে ১৫ আগস্ট
  • ইমাম-মুয়াজ্জিন সার্ভিস রোলস-এর প্রয়োজনীয়তা
  • বাঙালির মুক্তিসনদ ঐতিহাসিক ৬ দফা
  • শিশুদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশে পরিবেশ
  • তিনি কোন দলের নয়, সমগ্র বাঙালির
  • ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম অধ্যায়
  • বঙ্গবন্ধুর ফিরে আসা
  • শিক্ষা ও নৈতিকতা
  • কুরবানির সূচনা
  • কুরবানি ও আমাদের করণীয়
  • উন্নয়নের মানবিকতা বনাম গতানুগতিকতা
  • বিশ্বাসের উপলব্ধি
  • নিরাপত্তাহীনতায় নারী
  • স্বাগতম ঈদুল আযহা
  • Developed by: Sparkle IT