উপ সম্পাদকীয় খোলা জানালা

ছেলেমেয়েদের বন্ধু নির্বাচনে বাবা মায়ের সতর্কতা

মো. আবদুল আউয়াল প্রকাশিত হয়েছে: ১১-০৭-২০১৯ ইং ০০:০৮:৪৩ | সংবাদটি ১০৫ বার পঠিত


মানব সভ্যতা শুরু হয়েছে সংঘবদ্ধভাবে জীবন যাপন করার মধ্য দিয়ে। তাই মানুষ স্বভাবতই চলার পথে বন্ধু খুঁজে। কারণ, মানুষ সামাজিক জীব। তাই সঙ্গত কারণে বন্ধু বা সঙ্গ ছাড়া কোন মানুষই চলতে পারেনা। বলতে গেলে ব্যক্তি জীবন সৎ সাহচর্যের মধ্য দিয়ে পরিপূর্ণ বিকাশ ও সার্থকতা লাভ করে। সেহেতু বিশেষ করে বিদ্যার্থী ছেলেমেয়েরা অনেকে একত্রে মিলে মিশে বিদ্যালয়ে গমন করে। তাতে রাস্তা অতিক্রমের সময়টুকু পরস্পর সতর্কতা ও আনন্দের সংমিশ্রণে কেটে যায়। কোন ক্লান্তিবোধ করেনা কেউই। তাছাড়া খেলার মাঠে, হাটে বাজারে বা কোন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যাবার বেলায় সবাই সঙ্গী খোঁজে। আসলে এটাই এ বয়সের ছেলেমেয়েদের স্বাভাবিক নিয়ম। তবে এখানে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে যে, ছেলেমেয়েরা যে সব বন্ধু বান্ধবদের সঙ্গে এমনিভাবে নিত্য চলাফেরা করছে তাদের স্বভাব চরিত্র যদি পবিত্র ও সুন্দর হয়, তাহলে তাদের সঙ্গই সৎসঙ্গ এবং বন্ধু নির্বাচন সঠিক বলে বিবেচিত হয়।
অপরপক্ষে, যদি কোন বন্ধু বান্ধবের প্ররোচনায় চলার পথে রাস্তার পাশের কোন আম-জাম কিংবা বরই গাছে ঢিল ছুড়ে কিংবা বাগানের ফুল ছিড়ে অথবা সহপাঠীদের নিয়ে স্কুল ফাঁকি দিয়ে সিনেমায় চলে যায় এমন চরিত্রের বন্ধু বান্ধব কখনো বন্ধু হিসেবে কারো কাম্য হতে পারে না। সৎসঙ্গী বলতে বোঝায় উত্তম ও নিষ্কলুষ চরিত্রের বন্ধু বান্ধব-যাদের প্রভাব ও আদর্শে নিজের জীবন সুন্দর ও নিখুঁতভাবে গড়ে তোলা যায়। তাই উল্লিখিত সবগুলো বিষয়ের প্রতি বাবা মায়ের সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে যাতে করে ছেলে মেয়েদের বন্ধু নির্বাচনে কোনভাবেই ত্রুটি বিচ্যুতি না ঘটে।
ভাল বন্ধু নির্বাচনের গুরুত্ব মানব জীবনে অপরিসীম। কারণ, কোন আদর্শ সামনে না রেখে কেউ নিজের জীবন গড়তে পারেনা। ইংরেজিতে একটি কথা আছে-‘A man without aim in life is like that of a ship without its rudder অর্থাৎ উদ্দেশ্যবিহীন জীবন আর কান্ডরী বিহীন নৌকা বা জাহাজের ঠিক একই অবস্থা। তাই স্থিতিশীল মন নিয়ে জাগতিক কর্মকান্ডে যে কোন বিষয়ে অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে হলে সৎসঙ্গী পরামর্শ গ্রহণ করতে হয়। এবং জীবন চলার পথে সুখে-দুঃখে অনুপ্রেরণা লাভ করতে হয়। বাস্তবতার আলোকে বলতে গেলে সৎসঙ্গীর প্রভাবও প্রশ্নাতীতভাবে সীমাহীন। কারণ এটা মানুষ চেনার একটি শ্রেষ্ঠ উপায়। তাই সঙ্গত কারণে মানুষ যেরূপ বন্ধু বান্ধবের সাথে একান্তভাবে চলাফেলা করে তার আচার-আচরণ এবং চাল-চলনও সেরূপ হয়ে থাকে। এটা অকাট্য, চিরন্তন এবং তর্কাতীতভাবে সর্বজন স্বীকৃত। ইংরেজিতে একটি কথা আছে-‘A man is known by the company he keeps.’ তাই সুশীল ও সুবোধ বন্ধুদের সংস্পর্শে থেকে অনেক দুশ্চরিত্র ব্যক্তিও সাধু, সৎ ও মহান হওয়ার মত দুর্লভ গুণের অধিকারী হয়, আবার অসৎ সংস্পর্শে অনেক সৎ ব্যক্তিও পশুর চেয়েও অধম হয়ে যায়। সে কারণে যুগ যুগ ধরে শুধু ছেলে-মেয়েরাই নয় বরং সকল বয়সের মানুষই সৎ সঙ্গের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব মর্মে মর্মে উপলব্ধি করে এসেছে এবং জীবনের সুষ্ঠু-সুন্দর বিকাশে তার ভূমিকার গুরুত্ব ও অক্ষরে অক্ষরে প্রমাণিত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে শেখ সাদী (রহ:) এর একটি বিখ্যাত উক্তি উল্লেখ করা হয়েছে, যেমন-‘সৎসঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎসঙ্গে সর্বনাশ।’ সৎসঙ্গের প্রভাবে ব্যক্তির চরিত্র নির্মল হয় এবং স্বতঃস্ফূর্তভাব ব্যঞ্জনায় আরও বিকশিত হবার সুযোগ পায়। মানুষ যেহতেু সামাজিক জীব, সেহেতু সে একা বাস করতে পারে না। সমাজবদ্ধ জীবন যাপনের ক্ষেত্রে তাকে অন্যের সাহচর্য ও সান্নিধ্য গ্রহণ করতে হয় বিধায় বন্ধু নির্বাচনের গুরুত্বও অস্বীকার করার কোন জো নেই।
এ সংসারে ভালোবাবার পাশাপাশি মন্দ লোকেরও অভাব নেই। সৎসঙ্গ ও অসৎসঙ্গ এই পার্থক্যের কথা বিবেচনা করেই মানুষের জীবনে সৎসঙ্গের প্রয়োজনীয়তা স্বীকৃত হয়েছে এবং অসৎসঙ্গ পরিবারের চেষ্টা অনিবার্য হয়ে ওঠেছে। মানুষের শিশুকাল থেকে এ সম্পর্কে সচেতন হওয়া অবশ্য কর্তব্য। জীবনের প্রাথমিক পর্যায়ে যদি সঠিক গতিপথ নির্ধারণ করা যায় তাহলে ভবিষ্যৎ কখনও বিফলে যায় না। তাই ছোটবেলা থেকেই অসৎসঙ্গ সর্বোতভাবে পরিহার করে সৎসঙ্গ গ্রহণ করতে হয়। একজন উত্তম বন্ধু যেমন জীবনের গতি আমূল পরিবর্তন করে দিতে পারে, তেমনি একজন অসৎ বন্ধুও জীবনকে পৌঁছে দিতে পারে ধ্বংসের চূড়ান্ত সীমানায়। এ জন্যে প্রবাদ রয়েছে-‘সঙ্গদোষে লোহা জলে ভাসে।’ পরশ মনির ছোয়ায় লোহা যেমন স্বর্ণে রূপান্তরিত হয়, তেমনি সৎ চরিত্রের প্রভাবে মানুষের পশুর প্রবৃত্তি ঘুচে যায়, জন্ম নেয় সৎ, সুন্দর ও মহৎ জীবনের আকাক্সক্ষা। তাই বন্ধু নির্বাচনে ছেলেমেয়েরা যাতে করে অসৎ প্রকৃতির সমবয়স্কদের সংশ্রবে না মিশতে পারে সে দিকে বাবা মায়েদের তীক্ষ্ম দৃষ্টি রাখা একান্ত আবশ্যক।
কাজেই সৎসঙ্গের উপকার এবং অসৎসঙ্গের অপকারের কথা বিবেচনায় রেখে আমাদের প্রত্যেকের কোমলমতি ছেলেমেয়েরা সঙ্গী নির্বাচন করা পবিত্র দায়িত্ব ও কর্তব্য। কারণ, এ কথা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, সঙ্গ দোষের মত খারাপ জিনিস এ জগতে আর কিছুই নেই। ইহা মানুষকে পশুর কাতারে নিয়ে যায়। বিষয়টি দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আজকাল আমাদের অধিকাংশ ছেলেমেয়েরাই একমাত্র সঙ্গদোষে প্রভাবিত ও প্রতারিত হয়ে কুপথে ধাবিত হচ্ছে। তারা বিপথগামী বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে মিশে অশ্লীল বই পড়ে, নাটক, থিয়েটার ও সিনেমা দেখে, সিডি-ভিসিডি দেখে, টেলিভিশনে অশালীন চিত্র সম্বলিত বই দেখে অতি অল্প বয়সেই চরিত্র নষ্ট করে ফেলে।
এ জন্য তাদের অভিভাবকদেরও দায়িত্ব এড়াবার সুযোগ নেই। কারণ, অভিভাবকগণ সন্তানের প্রতি অতিশয় মমতাশীল হয়ে ছেলেমেয়েদের প্রতি শৈশবে কড়া দৃষ্টি রাখেন না। কাজেই এ হেন পরিস্থিতির কবল থেকে অব্যাহতি পাওয়ার লক্ষ্যে ছেলেমেয়েরা জীবনের ঊষালগ্ন থেকেই সৎ ও আদর্শ বন্ধু নির্বাচনের ব্যাপারে অত্যন্ত সচেতন থেকে স্ব-স্ব নৈতিক দায়িত্ব পালন করা অবশ্য কর্তব্য। একইভাবে প্রত্যেকের বাবা মায়েরাও অতন্দ্র প্রহরীর ন্যায় সতর্ক সৃষ্টি রাখবেন যাতে করে আপনাদের ছেলে মেয়েরা আদর্শ মানুষ হয়ে দেশ ও জাতির সেবায় অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারে।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • কিশোর-কিশোরীদের হালচাল
  • বলকানস : ইউরোপের যুদ্ধক্ষেত্র
  • সন্তানের প্রতি অভিভাবকের দায়িত্ব
  • শিক্ষার হার এবং কর্মসংস্থান প্রসঙ্গ
  • শিক্ষার রাজ্যে এক বিস্ময়
  • ডেঙ্গু ও বানভাসি মানুষ
  • শিল্প-সাহিত্যে ১৫ আগস্ট
  • ইমাম-মুয়াজ্জিন সার্ভিস রোলস-এর প্রয়োজনীয়তা
  • বাঙালির মুক্তিসনদ ঐতিহাসিক ৬ দফা
  • শিশুদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশে পরিবেশ
  • তিনি কোন দলের নয়, সমগ্র বাঙালির
  • ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম অধ্যায়
  • বঙ্গবন্ধুর ফিরে আসা
  • শিক্ষা ও নৈতিকতা
  • কুরবানির সূচনা
  • কুরবানি ও আমাদের করণীয়
  • উন্নয়নের মানবিকতা বনাম গতানুগতিকতা
  • বিশ্বাসের উপলব্ধি
  • নিরাপত্তাহীনতায় নারী
  • স্বাগতম ঈদুল আযহা
  • Developed by: Sparkle IT