শিশু মেলা

লাল ঘুড়ি

এম. আশরাফ আলী প্রকাশিত হয়েছে: ১১-০৭-২০১৯ ইং ০০:০৯:২২ | সংবাদটি ১৪৩ বার পঠিত

ভোরে উঠে অযুদের মনে পড়ল ঘুড়ির কথা। কোথায় ঘুড়ি? আপ্পু হেই আপ্পু। অনুচ্চস্বরে ডাকে সে। আপ্পু জবাব দেয় না। সে তখনও গভীর ঘুমে। মশারির বাইরে এসে কিছুক্ষণ এদিক ওদিক তাকালো সে অন্ধকারের মধ্যে কিছুই দেখল না। শুধু দরজার ফোকর গলে যে আলো আসছে তাতে সূর্য উঠেছে বলে মনে হয় না। তখনও আবছা অন্ধকার। অযুদ ভাবে, এখনও মনে হয় কেউ ওঠেনি। কোথাও কারও কোন সাড়া শব্দ না পেয়ে আবার মশারির ভিতর ঢুকে শুয়ে রইল সে। কিন্তু ঘুমালো না। আপ্পুর গা ঘেষে কাতুকুতু দিতে থাকল। হেই আপ্পু ওঠ। ওর বোন মিনা কাতুকুতু খেয়ে একটা আড়মোড়া দিল। অযুদ আবারও ডাকে আপ্পু হে.... হেই বলতে পারল না মিনা চেতে উঠে বলল-কি হয়েছেরে? ঘুমোতে দিচ্ছিস না কেন? অন্যদিনতো ডাকতে ডাকতে স্কুলের সময় পার হয়, তারপরও তোর ঘুম ভাঙে না। আজ ফযর হতে না হতেই ডাকাডাকি শুরু করলি যে? অনুচ্চ অথচ ঝাঝালো স্বরে মিনা কথাগুলো বলে। পাশের রুমে আব্বু-আম্মু যেন শুনতে না পায় সেজন্য সতর্কতা। অযুদ নাছোড় বান্দা। সে বলে আরে বাবা কিচ্ছু হয়নি। আমার ঘুড়িটা কোথায় রেখেছিস? সেটা বল। আর কিছু না বুঝলে?
তোর ঘুড়ি কোথায়, আমি কী বলব?
তোর হাতে না ঘুড়ি ছিল?
হ্যাঁ আমার হাতে ছিলইতো। কিন্তু, এখন খুঁজে পাচ্ছি না।
ঠিক আছে সবাই উঠুক। রাত পোহাক, তারপর দেখা যাবে। অযুদ আর কথা বাড়ায় না। বিরক্ত হয়ে, সে অন্যপাশে শোয়। একটু পরেই তো সবাই উঠবে। নিশ্চয়ই ঘুড়িটা আম্মু কোথাও রেখেছেন। ঘুম থেকে উঠলেই পাব। এরকম এপাশ ওপাশ করতে করতে বেশ বেলা হলো। দরজার ফাঁক দিয়ে অযুদ দেখল সূর্যের আলো এসে মশারির এক কোণে পড়েছে অনেকটা আগুনের ফুলকির মত। অযুদ ওঠে। তড়িঘড়ি মশারি ঠেলে বেরিয়ে এসে দরজা খুলে সে। ঘরের সামনে সুপারি গাছের সারিগুলোর লম্বা ছায়া পড়েছে বারান্দায়। হাঁস মোরগের কীর্তন চলছে ওদের কুঠরিতে। বেরিয়ে আসার কী আকুতি। তখনও মা ওঠেননি বলে তাদের দরজা এখনও বন্ধ। তাই দরজা খোল, দরজা খোল বলে মিছিল করছে হাঁস-মুরগী। মোরগটা আজানের আগেই কুককুরুতু কু-ডেকে উঠেছিল। আজ অযুদ শুনেছে সেটা। রোজই মনে হয় বড় মোরগটা এরকম ডেকে ওঠে। অযুদভাবে ওরা মোরগ মুরগী। কী করে বুঝে যে সকাল হয়েছে? নিশ্চয়ই আল্লাহর নাম জপে ওরা। মোরগের ডাক অনেক সময় আল্লাহু আকবারের মতই মনে হয়। ভোরে অজ¯্র অগণিত পাখি জানে কী করে, রাত পোহাল? কিচির মিচির শব্দে মুখর করে তুলে সারাটা গাঁ। মানুষ উঠার আগে যেন ওরাই ইবাদতে লেগে যায়।
ততক্ষণে মিনা উঠে মশারি খুলছে, বিছানা পরিপাটি করেছে। বাথরুম থেকে এসে অযুদ দেখল আম্মুও উঠেছেন। শহরতলীর গ্রামটি আস্তে আস্তে জেগে উঠছে। শীতের সকালতো। তাই লোকেরা ওঠে দেরিতে। অযুদভাবে আজ পহেলা মাঘ গতকাল পৌষের শেষ দিন ছিল। দাদু বলেছেন পৌষ মাসের শেষ তারিখে পুবের গাঁওয়ের মাঠে বারুণী বসে। বারুণী বা মেলায় সমস্ত এলাকার লোক জড়ো হয়। মাঠের পাশে একটা বট গাছ। এর গুঁড়িটা একটা ঢিবির মত। গাছটা নিখুঁতভাবে কে যেন বসিয়ে রেখেছে, যেন বাবরি চুলে গল্পের নায়ক। সেই গাছকেই কেন্দ্র করে মেলা বসে। গাছের মগডালে একটা লাল ন্যাকড়া কে যেন বেঁধে রাখে। পত পত করে উড়ে সেটি। সেই গাছের আশে পাশে বাস করে কয়েক হিন্দু পরিবার। মাছ ধরা তাদের পেশা? প্রতি বছরই এই তারিখে ওরা মেলার আয়োজন করে। মেলায় রথও টানা হয়। সেখানে কতকী আসে। চুড়িওয়ালা, লেইছ ফিতা, হরেক রকমের খইওয়ালা, চিড়া মুড়ি নাড়–, বাতাসাওয়ালা। এছাড়াও রয়েছে বাচ্চাদের জন্য সস্তা খেলনা। বাঁশি, বেলুন, ঘুড়ি, ঝুনঝুনি। সবচেয়ে মজার হচ্ছে বায়োস্কোপ। অযুদের মনে পড়ে কাল বায়োস্কোপ দেখেছিল সে, মাত্র দু’আনা দিয়ে। একটা লোক একটা হ্যান্ডেল ঘুরায় আর মুখ দিয়ে গান গায় কী চমৎকার দেখা গেল, আরেক ছবি আইসা পড়ল, রাজা-রাণীর বিয়ে হইল। কী চমৎকার দেখা গেল।’ বায়োস্কোপের সামনে লাগোনো দুটি গোল গ্লাস। সেই গ্লাস দিয়ে দু’জনে এক সাথে বসে বায়োস্কোপ দেখা যায়। ওর ভিতরটা একটা বাক্সের মত। বাক্সের ভিতর বেশ আলোকিত। হ্যান্ডেলের সাথে মনে হয় ছবিগুলো সেট করা। হ্যান্ডেল ঘুরালেই একটার পর একটা ছবি দেখা যায়। এক দেড় মিনিটেই শো খতম। আবার নতুন দুজন দেখতে বসবে। অযুদ জীবনের প্রথম এটা দেখে বেশ আনন্দিত হলো। গতকালের মেলায় আনন্দ ঘন মুহূর্তগুলো তার চোখের সামনে ভাসছে। সবচাইতে বড় মজার ব্যাপার হচ্ছে রথটানা। একটা কাঠের চৌকির নিচে লাগানো থাকে চারটি কাঠের চাকা। উপরে বেড়া দিয়ে গাড়ির মত বানানো হয় সেটি। একটা মূর্তি থাকে এর উপর। একজন লোক হরি হরি বলতে বলতে কলা তিলু বাতাসা ইত্যাদি জনতার উদ্দেশ্যে ছুড়ে মারতে থাকে আর রথ টানা হয়। রথ টানে হিন্দুরা আর দর্শকরা হুমড়ি খেয়ে পড়ে কলা, তিলু, বাতাসা ইত্যাদির উপর। লম্বা লোকেরা মাটিতে পড়ার আগেই লুফে নেয়। যেগুলো মাটিতে পড়ে ওগুলো নিতে গিয়ে একে অন্যের উপর পড়ে। অনেকের নাক-মুখ-ঠোঁট ফেটে রক্ত পড়ে। তারপরও আনন্দ।
অযুদের হঠাৎ মনে পড়ল ঘুড়ির কথা। গতকাল মেলা থেকে পছন্দ করে সে লাল ঘুড়িটা কিনেছিল। আব্বুর সাথে সে আর মিনা মেলায় গিয়েছিল। মিনা কিনেছিল রেশমী চুড়ি আর অযুদ কিনে ঘুড়ি। লাল ঘুড়িটা হাতে পেয়ে কী যে খুশি হয়েছিল সে তা বলে বুঝানো মুশকিল। তারা আরও কিনেছিল, ফু দিয়ে ফুলানো বেলুন। যেটি একটা বাঁশের চোঙ এর সাথে লাগানো থাকে। একটু ফুলিয়ে ফু দেওয়া বন্ধ করে দিলে ব্যা করে শব্দ করতে করতে বাতাস বেরিয়ে যায়। আরও কিনেছে লম্বা বেগুনের মত বিভিন্ন রঙের বেলুন। ওটা ফোলে থাকে অনেকটা রঙিন সাপের মত। হাত লাগিয়ে ঘসা দিলে শব্দ হয়। ওরা মেলায় ঘুরতে ঘুরতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। অযুদ ক্লান্ত হয়ে পড়ে। ওর বয়স মাত্র সাত আর মিনার বয়স নয়। অযুদ টুতে আর মিনা ফোরে পড়ে। ঘুড়ি আর বেলুন হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ ঘুরে আব্বুকে বলল আর হাঁটতে পারছি না আব্বু। আমাকে কোলে নেও। অযুদকে কাঁধে তুলে নিলেন তার বাবা।
মেলা থেকে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ি ফিরতে হয়। ধানি জমির মাঝখান দিয়ে মেঠো পথ বেয়ে। গাড়ি চলার কোন রাস্তা নেই। সবাই পায়ে হেঁটে আসে আবার পায়ে হেঁটেই যায়। মিনা ওর আব্বুর হাতে ধরে হাঁটছে আর অযুদ বাবার কাঁধে। তখনও সে ঘুড়ি, বেলুন শক্ত করে ধরে রেখেছে। অগ্রানের ধান অনেক আগেই কাটা শেষ। নাড়াগুলো পুড়িয়ে দিয়েছে কিষাণেরা। এরই মধ্যে যদি মাঘে মেঘে দেখা হয় তাহলে জমি তৈরি করতে লেগে যাবে কিষাণেরা। অন্য ফসল ফলানোর প্রস্তুতি শুরু হবে। মাঘ মাসে বৃষ্টি হবেই হবে। এটা হচ্ছে কৃষকদের বদ্ধমূল ধারণা। কাজেই ওরা মাঘ-আর মেঘের দেখা সাক্ষাতের অপেক্ষায় থাকে।
মিনা অযুদের আব্বু অনেক ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরলেন এক দিকে খরচাপাতি, অন্যদিকে অযুদ কাঁধে। ও আবার কখন কাঁধের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়েছে সে নিজেই জানে না। বাড়িতে ফেরার পরও অযুদের ঘুম ভাঙলো না। আর ঘুম ভেঙে তুললে অযুদ খেতে পারে না, কান্নাকাটি করে। তাই ওকে আর জাগানো হলো না। মেলায় খই, বাতাসা মিষ্টি ইত্যাদি খেয়েছে তাই মিনার আব্বু এহসান মিয়া স্ত্রী ফারহানাকে বললেন- বাদ দাও, ওকে জাগিও না। ওর বিছানায় শুইয়ে দাও ওকে। তাই তাকে আর জাগানো হয়নি। সকালে ঘুড়ির কথা মনে হতেই সে উশখুশ করতে লাগনো। আপ্পুকে জিজ্ঞেস করতে করতে যখন সে কুলকিনারা করতে পারল না তখন নীরবে দাঁড়িয়ে ছিল সে। ফারহানা বেগম যখন হাঁস মোরগের খুপড়ি খুলতে এলেন তখন অযুদ দৌড়ে গিয়ে বলল ‘আম্মু আমার ঘুড়ি কোথায়? খুপড়ির দরজা খুলতে খুলতে বললেন কোথায় ঘুড়ি? ঘুড়িতো দেখলাম না। সে দৌড়ে এসে আম্মুর হাত ধরে বলল- ‘আম্মু দেখনা আব্বু কোথায় রেখেছেন? আম্মু দাও না ঘুড়িটা। রাখ বাবা রাখ দেখি কোথায় ঘুড়ি রাতে তো খেয়াল করিনি। হেই মিনা, মিনা..... মিনা রান্না ঘর থেকে জবাব দিল জ্বী আম্মু। এদিকে আয়। মিনা আসলে তিনি ওর ঘুড়ির কথা জিজ্ঞেস করলেন।
মিনা বলল- ঘুড়িতো ওর হাতে ছিল। যখন সে আব্বুর কাঁধে চড়ে আসছিল ওর হাতে আমি ঘুড়ি দেখেছি।
ইতোমধ্যে এহসান মিয়া ঘুম থেকে ওঠে হাত মুখ ধুয়ে বসেছেন। ফারহানা বেগম জিজ্ঞেস করলেন হ্যাঁ- গো ওর ঘুড়ি কোথায়? সেই ভোর থেকে শুধু ঘুড়ি.... ঘুড়ি করছে।
সত্যিই তো। ওকে তো আমি লাল একটা ঘুড়ি কিনে দিলাম। ওটা তো ওর হাতেই ছিল। মেলা থেকে কেনা সব জিনিসই আছে; শুধু ঘুড়ি নেই। এহসান মিয়া বললেন মনে হয় ওর হাত ফসকে পড়ে গেছে। পাশে দাঁড়ানো ছিল অযুদ। ঘুড়ি হারানোর কথা শুনেই ভ্যা করে কেঁদে দিল। ওর কান্না দেখে এহসান মিয়া বললেন ‘কাঁদিস নে বাবা’ কাঁদিসনে। বিকেলে বাজার থেকে একটা তোকে কিনে দিব।’ ওকে হাত ধরে কাছে এনে মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করলেন। তোর ঘুড়ি তোর হাত থেকে পড়ে গেল, আমরা কী করব বল?
অযুদ কান্নাজড়িত কন্ঠে বলল- বিকেলেই কিনে দিতে হবে কিন্তু।
এহসান মিয়া বললেন-হ্যাঁ হ্যাঁ অবশ্যই কিনে দিব। এখন হাত মুখ ধুয়ে আয়। নাস্তা খেতে হবে। রাতে কিছুই খাসনি।
সারাটা দিন মাটি হয়ে গেল অযুদের। ঘুড়িটা নিয়ে তার কী স্বপ্ন ছিল। ঘুড়ির মাঝখানে সুতো বাঁধবে। লম্বা সুতো সে নাটাইয়ের মধ্যে পেছিয়ে রেখেছিল। ওটা আজ ঘুড়ির সাথে বেঁধে খোলা মাঠে ঘুড়ি ওড়াবে। রঙিন ঘুড়িটা অনেক উপরে উঠবে। অনেক...... উপরে। তার ঘুড়ির উপর আর কারও ঘুড়ি থাকবে না। ওর ঘুড়িই রাজত্ব করবে আকাশ জুড়ে। সবাই তাকে বাহবা দিবে আর গর্বিত হবে ঘুড়ির মালিক....।
গভীর রাতে এহসান মিয়া নিয়ে আসলেন একটা লাল ঘুড়ি। অযুদ বাবার অপেক্ষা করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছে সে। ভোরে সে যখন ঘুম থেকে উঠল তখন সকাল ৯টা। উঠেই চোখ রগড়াতে রগড়াতে আম্মু.. আম্মু.... বলে ফারহানা বেগমের কাছে গেল। বলল আমার ঘুড়ি এনেছে আব্বু? হ্যাঁ ঘুড়ি আনা হয়েছে। হাত মুখ ধুয়ে আয়, নাস্তা করবি। ঘুমের ভাব কোথায় যে হাওয়া হয়ে গেল সে নিজেই জানে না। তাড়াতাড়ি বাথরুমে ঢুকে হাত মুখ ধুয়ে আসল সে। রান্না ঘরের দরজার সাথে বাঁধা ঘুড়িটি পড়ল তার চোখে। হ্যাঁ এরকমই ঘুড়িটা গত দিন কিনেছিলাম। আব্বু ঠিকই পছন্দ করে এনেছে। কোন রকম নাস্তা সেরে বেরিয়ে পড়ল অযুদ। খাটের নিচ থেকে নাটাইটা নিয়ে জুড়ে দিল ঘুড়ির সাথে। এক দৌড়ে চলে এল মাঠে। ঘুড়ি ওড়াতে গেল কিন্তু ঘুড়িতো ওড়ছে না। অনেক চেষ্টা করল। কিন্তু পারল না। পাশের বাড়ির আবুল দেখছিল সে দৃশ্য। আস্তে আস্তে অযুদের কাছে এল সে। হেই অযুদ ঘুড়ি বাঁধা হয়নি। এদিকে আন, অযুদ আবুলের কাছে নিয়ে এলে সে নিজ অভিজ্ঞতা থেকে সুন্দর করে বেঁধে দিল। অযুদ খেয়াল করে আবুল সুতোটি ঘুড়িতে বাঁধা সুতোর ঠিক মাঝখানে বাঁধলো। আবুল বলল এবার নে, ওড়া। অযুদ সুতো ধরে টান দিতেই ঘুড়ি উপরে উঠতে লাগল পত পত করে। অযুদের সে কী আনন্দ। লম্বা সুতোয় অযুদের ঘুড়ি মেঘের দেশে উড়তে লাগলো। আকাশে ঘুড়িটাকে এক চিমটি লাল রঙের মতই মনে হলো। সূর্য তখন মাথার উপর গণগণে তাপ ছড়াচ্ছে। দরদর করে ঘাম ঝরছে অযুদের। সে দিকে তার কোন খেয়ালই নেই। গ্রামের, মিতুল, সবুজ ও সজীব দূরে ঘুড়ি ওড়াচ্ছে। ওরা ডেকে বলল- হেই অযুদ ঘুড়ি কাটাকাটি খেলবে। অযুদ এর আগে কোন দিন খেলেনি। সে বলল ঠিক আছে। খেল দেখি। ওরা অযুদ থেকে ৩-৪ বছরের বড়। ওদের ঘুড়ি ওড়ানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে। মিতুল টেনে টেনে তার ঘুড়ি অযুদের ঘুড়ির পাশে নিয়ে আসল। সুতোয় সুতোয় শুরু হলো ঘেষাঘেষি। অনেকক্ষণ ধরে চলল-এরকম। হঠাৎ অযুদের ঘুড়ির সুতো কেটে গেল। অযুদ টানে এক দিকে, কিন্তু ঘুড়ি যাচ্ছে অন্য দিকে। ওরা সবাই হাত তালি দিয়ে উঠল। হেই অযুদ তোর ঘুড়ি চলে যাচ্ছে রে। সবাই তাকে ব্যঙ্গ করতে লাগল। কিন্তু অযুদের সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। ঘুড়ি ওড়ে ওড়ে যেদিকে যাচ্ছে সেই দিকে ছুটছে অযুদ। অনেক দূরে এসে ঘুড়িটি একটি নাতিদীর্ঘ বটগাছের আগায় আটকে গেল। অযুদ দেখল-হ্যাঁ এই তো সুতো, ওই সুতো ধরতে পারলেই ঘুড়িটিকে আনা যাবে। সে সাতপাঁচ না ভেবেই গাছে চড়ল এবং ঘুড়ির সূতো নাগালের মধ্যে পেল। এইতো পেয়েছি। এবার ঘুড়িটাকে টেনে নামাবো। কিন্তু হায় টান দিতেই সুতো গেল ছিড়ে। কিন্তু ঘুড়ি ওড়ে গেল না সুতোটা একটা মগডালে পেছিয়ে গেছে। ওটাকে ঐ মগডাল থেকেই খুলে আনতে হবে। অযুদ গাছ বেয়ে একেবারে মগডালে চলে এল। যেই ঘুড়ি ধরতে যাবে- অমনি গেল পা ফসকে। আর যায় কোথায়? ডান হাতে যে ডালটি ধরেছিল ওটাও গেল ভেঙ্গে। অযুদ চোখ বন্ধ করে ফেলল। কী ঘটতে যাচ্ছে সে বুঝতে পারল না। একটা বড় ডালের মধ্যে বাড়ি খেয়ে এসে পড়ল নিচে। জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়ে রইল সে।
পাশের বাড়ির লুকন মাঠে গিয়েছিল গরু আনতে। সে অযুদকে গাছের তলে পড়ে থাকতে দেখে অযুদের বাড়িতে খবর দিল। অযুদের বাবা এহসান মিয়া বাড়িতেই ছিলেন। খবর শুনে দৌড়ে আসলেন বট গাছ তলায়। অযুদের এই অবস্থা দেখে কাঁধে তুলে নিলেন তাকে। বাড়িতে নিয়ে নাকে মুখে পানির ঝাপটা দিলেন। হুশ হলো তার। উঠতে গেল সে। কিন্তু উঠতে পারল না। ডান পায়ে ভীষণ ব্যথা অনুভূত হলো। ততক্ষণে এহসান মিয়া কবিরাজ ডেকে পাঠিয়েছেন। কবিরাজ পা হাতড়ে বলল ওর ডান পা ভেঙ্গে গেছে। এহসান মিয়া নিজেকে বেশ অপরাধী ভাবলেন। ছেলের কথায় যদি ওরকম ঘুড়ি কিনে না দিতেন তাহলে হয়ত তার পা ভাঙতো না। পাড়ার ছেলেরা বলাবলি করল-দেখ দুপুর বেলা কালা চান্দের গাছে ওঠেছে। জ্বীন পরি ধাক্কা দিয়ে হয়ত ওকে ফেলে দিয়েছে। আমরা এত বড় হয়েছি এরকম সাহস করিনি। অযুদের এই দুর্ঘটনার পর ডান পা নিয়ে ভুগলো সে অনেক দিন। তিন মাস সে স্কুলেই যেতে পারল না। নাওয়া, খাওয়া গোলস, বাথরুম ইত্যাদি ছোট ছোট কাজ তার কাছে পাহাড় সমান মনে হলো। সে বুঝতে পারল পা ভাঙ্গার কী কষ্ট। তার বয়সী অনেক ছেলে মেয়ে তার সামনে দিয়ে দৌড়ে দৌড়ে স্কুলে যায় আর সে চেয়ে চেয়ে দেখে। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে। ভাল হলে আর এরকম দস্যিপনা করব না। তার মনের অজান্তে দু’ফোটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে গাল বেয়ে...।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT