উপ সম্পাদকীয়

স্পীকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী

মোঃ রফিকুল হক প্রকাশিত হয়েছে: ১২-০৭-২০১৯ ইং ০১:৩০:৩১ | সংবাদটি ১০৭ বার পঠিত

সিলেট বিভাগ তথা বাংলাদেশের প্রবাদ পুরুষ সাবেক সফল কূটনীতিবিদ ও বাংলাদেশ সরকারের সাবেক স্পীকার আলহাজ্ব হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর ১৮তম মৃত্যু বার্ষিকী ১০ জুলাই ২০১৯ ইং। তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী প্রাক্কালে তাঁকে গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি। তিনি সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার দরগাপাশা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাংলাদেশের অহংকার কৃতি পুরুষ তার জীবিতকালীন ৭৩ বৎসরের বর্ণাঢ্য জীবনের কর্মযজ্ঞ জাতি কৃতজ্ঞতাভরে স্মরণ করছে। তাঁর পিতা-মাতাও তৎকালীন সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপদে আসীন ছিলেন।
১৯৮৩ সালে তাঁরই প্রচেষ্টায় কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। ১৯৮৫ সালে সাবেক রাষ্ট্রপতি হোসাইন মুহাম্মদ এরশাদকে নিয়ে তিনি সিলেট জেলার কোম্পানীগঞ্জ আসেন। তিনি এই উপজেলাকে নিজের উপজেলা হিসেবে ঘোষণা দেন। সেই থেকে তিনি কোম্পানীগঞ্জবাসীর সুখে দুঃখে একজন সত্যিকার অভিভাবক হিসাবে আবির্ভুত হন। বীর মুক্তিযোদ্ধা ইয়ামিন চৌধুরী এ ব্যাপারে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন। ১৯৮৬ সালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে তিনি জাতিসংঘের ৪১তম অধিবেশনের সভাপতির পদ অলংকিত করে, বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল করেন। তিনি জাতিসংঘের সভাপতি নিযুক্ত হওয়ার পর এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “আমি এমন এক নির্বাচনী এলাকা থেকে নির্বাচিত হয়ে এসেছি, যেখানে আজ পর্যন্ত আধুনিক সভ্যতার ছোঁয়া লাগেনি। আমি সেই কোম্পানীগঞ্জবাসীর সর্বাত্মক উন্নতি কামনা করছি। যা নিয়ে আজও কোম্পানীগঞ্জবাসী গর্ববোধ করে। সেই মহান মানুষকে সংসদীয় এলাকার জনপ্রতিনিধি হিসেবে পেয়ে ধন্য হয়েছিল কোম্পানীগঞ্জবাসী।
মরহুম স্পীকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী অক্লান্ত প্রচেষ্টায় রাস্তাঘাট, ব্রীজ-কালভার্ট, বিদ্যুৎ, কলেজ, স্কুল, মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠাসহ অনেক যুগান্তকারী কাজ শুরু করেছিলেন, যা তাঁর মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত কোম্পানীগঞ্জবাসীর জন্য অব্যাহত রেখেছিলেন। তার ধারাবাহিকতায় আজকের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা। তাঁর স্মৃতি বিজড়িত উপজেলার সকল স্তরের মানুষ তাঁকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছে। মানুষ মরণশীল। মানুষ মরে যায় বটে, কিন্তু সে অমর হয়ে থাকে, তাঁর কীর্তির মাধ্যমে। সিলেট সদর-১ আসন থেকে ১৯৯৬ সালে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। মহান জাতীয় সংসদের স্পীকার নিযুক্ত হন।
সিলেটবাসীর নানাবিধ সমস্যা সমাধানে যুগান্তকারী পদক্ষেপ শুরু করেন। প্রথমেই তিনি সিলেটের রেলস্টেশনকে আধুনিক রেলস্টেশনে রূপান্তরের কাজ শুরু করেন। সিলেট বাইপাস রোড, শাহজালাল ৩য় সেতু নির্মাণ, কীনব্রীজের সৌন্দর্যবর্ধনের মাস্টারপ্ল্যান হাতে নেন এবং যথাসময়ে তা বাস্তবায়িত হয়। বন্ধ হয়ে যাওয়া সিলেটের টেক্সটাইল মিল পুনরায় চালু করে এই প্রতিষ্ঠানকে বাঁচিয়ে রাখেন। সিলেটের প্রাণের দাবি ওসমানী বিমানবন্দর রানওয়ে সম্প্রসারণের জন্য জায়গা অধিগ্রহণসহ সিলেট-সালুটিকর-কোম্পানীগঞ্জ-ভোলাগঞ্জ রাস্তার বাইপাস সড়ক নির্মাণ করে ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। ভোলাগঞ্জকে একটি পর্যটন এলাকায় রূপান্তরের ঘোষণা দিয়েছিলেন। বিশেষ করে কোম্পানীগঞ্জের উন্নয়নের ব্যাপারে তাঁর হাত ছিল অত্যন্ত প্রসারিত। যখনই তিনি সিলেট সফরে আসতেন এয়ারপোর্ট থেকে নেমে সোজা কোম্পানীগঞ্জ চলে যেতেন। বিভিন্ন বড় বড় প্রকল্পের কাজ বিশেষ করে চেঙ্গের খাল ও কাটাখাল ব্রীজের নিজে তদারকি করতেন। এ দু’টি ব্রীজ উদ্বোধন করেন নির্ধারিত সময়ের ৬ মাস পূর্বেই। তিনি কথা দিয়েছিলেন জননেত্রী শেখ হাসিনাকে কোম্পানীগঞ্জ নিয়ে আসবেন মটরযোগে। তিনি তা করেছিলেন এবং সেখানে বিশাল জনসভায়ও করেছিলেন।
সিলেট সদরের সাথে কোম্পানীগঞ্জের সড়ক যোগাযোগ স্থাপনে তার অবদান রয়েছে। তখন সিলেট থেকে কোম্পানীগঞ্জ পৌঁছতে সময় লাগত ৪৫ মিনিটের মত। বিদ্যুৎ ব্যবস্থা উন্নতিকল্পে উপজেলায় পল্লীবিদ্যুৎ সমিতি সিলেট-২ স্থাপনের মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেন। প্রথমে ভোলাগঞ্জ বিওপিতে বিদ্যুৎ উদ্বোধন করে বলেছিলেন, ‘আজকে যে বিজলী দিয়ে গেলাম, তার জন্য কোম্পানীগঞ্জ সারা বাংলাদেশের মানুষকে ব্যবসা-বাণিজ্যে আকর্ষণ করবে। আজ বাস্তবে তাই হলো। কোম্পানীগঞ্জ বর্তমানে শিল্পনগরীতে পরিণত হয়েছে। তিনি যদি বেঁচে থাকতেন, তাহলে তাঁর স্বপ্নের উপজেলার ব্যবসা-বাণিজ্য কেন্দ্র দেখে যেতে পারতেন। তিনি কোম্পানীগঞ্জ উপজেলাকে ১ম শ্রেণীর পৌরসভার সৃষ্টির উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর অকাল মৃত্যুতে তা আর হয়ে ওঠে নাই। ছাতক-কোম্পানীগঞ্জ রাস্তা নির্মাণে তাঁর অক্লান্ত প্রচেষ্টায় বাস্তবে রূপ নিয়েছে। এর জন্য সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মরহুম হাজী মদরিছ আলীকে স্মরণ করতে হয়। এ কারণে তিনিও ইতিহাসে স্বাক্ষী হয়ে থাকবেন।
মরহুম স্পীকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী আরও একটি কারণে ইতিহাস হয়ে থাকবেন, তাহলো শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা। পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হোসাইন মুহাম্মদ এরশাদকে দিয়ে নানাভাবে নানা কৌশলে কাজটি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। যার জন্য ইতিহাসে তাঁর নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তার মৃত্যুর পর এমন কোন স্মৃতিফলক নেই যে, কারণে নতুন প্রজন্মরা তাঁকে স্মরণ করবে শুধু মাত্র হুমায়ুন রশীদ স্কয়ার ছাড়া। আসলে সিলেটবাসী দাবি রাখে সিলেটের আধুনিক রেলস্টেশনটি তাঁর নামানুসারে করা হউক।
তিনি ১৯২৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মৃত্যুকাল ছিল ২০০১‘ সালের ১১ই জুলাই। ক্ষণজন্মা প্রাণপুরুষটি তাঁর ৭৩ বছরের আলোকিত জীবনে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কূটনৈতিক মিশনে কাজ করেছেন। সর্বোপরি মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি মুজিবনগর প্রবাসী সরকারকে সমর্থন ও সহযোগিতা করার জন্য ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্ধিরা গান্ধীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। বিশ্বের সকল শান্তিকামী রাষ্ট্রের সমর্থন পাওয়ার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করেছিলেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদান জাতি চিরদিন স্মরণ করবে। ১৯৭৫ সালে জার্মানিতে রাষ্ট্রদূত থাকা অবস্থায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানাকে আশ্রয় দিয়েছিলেন। তাদের মহাবিপদে পিতার ন্যায় বুকে আগলে রেখেছিলেন।
ব্যক্তি জীবনে তিনি অনেকবার মক্কা-মদীনা শরীফ তাওয়াফ ও জিয়ারত করেছিলেন। তার সুযোগ্য মেয়ে নাসরিন রশীদ চৌধুরী ৫ বৎসর পূর্বে দুরারোগ্যে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। পরবর্তীতে তাঁর ছেলে নোমান রশীদ স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তার স্ত্রী মেহজাবিন চৌধুরী এ বৎসর বার্ধক্যজনিত রোগে মারা যান। সকলের আত্মার শান্তি কামনা করছি।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • কিশোর-কিশোরীদের হালচাল
  • বলকানস : ইউরোপের যুদ্ধক্ষেত্র
  • সন্তানের প্রতি অভিভাবকের দায়িত্ব
  • শিক্ষার হার এবং কর্মসংস্থান প্রসঙ্গ
  • শিক্ষার রাজ্যে এক বিস্ময়
  • ডেঙ্গু ও বানভাসি মানুষ
  • শিল্প-সাহিত্যে ১৫ আগস্ট
  • ইমাম-মুয়াজ্জিন সার্ভিস রোলস-এর প্রয়োজনীয়তা
  • বাঙালির মুক্তিসনদ ঐতিহাসিক ৬ দফা
  • শিশুদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশে পরিবেশ
  • তিনি কোন দলের নয়, সমগ্র বাঙালির
  • ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম অধ্যায়
  • বঙ্গবন্ধুর ফিরে আসা
  • শিক্ষা ও নৈতিকতা
  • কুরবানির সূচনা
  • কুরবানি ও আমাদের করণীয়
  • উন্নয়নের মানবিকতা বনাম গতানুগতিকতা
  • বিশ্বাসের উপলব্ধি
  • নিরাপত্তাহীনতায় নারী
  • স্বাগতম ঈদুল আযহা
  • Developed by: Sparkle IT