ধর্ম ও জীবন

তাফসিরুল কুরআন

প্রকাশিত হয়েছে: ১২-০৭-২০১৯ ইং ০১:৪০:৩৪ | সংবাদটি ১১১ বার পঠিত

সূরা : বাক্বারাহ
[পূর্ব প্রকাশের পর]
৩. সবকিছু জানা সত্ত্বেও ইহুদীরা আমল বা কাজ করত, ‘এলম’ বা জানার বিপরীত এবং এ ব্যাপারে তারা মোটেও বিচক্ষণতার পরিচয় দিতো না। তাই আয়াতে প্রথমে তাদের জানার সংবাদ দেয়া হয়েছে এবং পরিশেষে ‘যদি তারা জানত’। বলে না জানার কথাও বলা হয়েছে। কারণ, যে জানার সাথে তদনুরূপ কাজ ও বিচক্ষণতা যুক্ত হয় না, তা না জানারই শামিল।
৪. ঠিক কখন, সে সম্পর্কে সুনিশ্চিত তথ্য জানা না থাকলেও এক সময়ে পৃথিবীতে বিশেষ করে বাবেল শহরে জাদু-বিদ্যার যথেষ্ট প্রচলন ছিলো। জাদুর অত্যাশ্চর্য ক্রিয়া দেখে মুর্খ লোকদের মধ্যে জাদু ও পয়গাম্বরগণের মু’জেযার স্বরূপ সম্পর্কে বিভ্রান্তি দেখা দিতে থাকে। এই বিভ্রান্তি দূর করার উদ্দেশ্যে আল্লাহ তা’আলা বাবেল শহরে ‘হারুত’ ও ‘মারুত’ নামে দু’জন ফেরেশতা প্রেরণ করেন। তাদের কাজ ছিলো জাদুর স্বরূপ ও ভেল্কিভাজি সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করাÑযাতে বিভ্রান্তি দূর হয় এবং জাদুর আমল ও জাদুকরদের অনুসরণ থেকে তারা বিরত থাকতে পারে। পয়গম্বরগণের নবুওয়তকে যেমন মু’জেযা ও নিদর্শনাদি দ্বারা প্রমাণ করে দেয়া হয়, তেমনি হারুত ও মারুত যে ফেরেশতা, তার উপর যুুক্তি-প্রমাণ খাড়া করে দেয়া হলো, যাতে তাদের নির্দেশাবলী জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়।
এ কাজে পয়গম্বরগণকে নিযুক্ত না করার কারণ এই যেÑ
প্রথমত : এত পয়গম্বর ও জাদুকরদের মধ্যে পার্থক্য ফুটিয়ে তোলা উদ্দেশ্য ছিলো। এদিক দিয়ে তারা যেন ছিলেন একটি পক্ষ। কাজেই উভয়পক্ষকে বাদ দিয়ে তৃতীয় পক্ষকে বিচারক নিযুক্ত করাই বিষয়।
দ্বিতীয়ত : জাদুর বাক্যবলী মুখে উচ্চারণ ও বর্ণনা ব্যতিত এ কাজ সম্পন্ন করা সম্ভবপর ছিলো না। যদিও ‘কুফরের বর্ণনা কুফর নয়, এই স্বীকৃতি নীতি অনুযায়ী পয়গম্বরগণ তা করতে পারতেন, তথাপি হেদায়েতের প্রতীক হওয়ার কারণে একাজে তাঁদের নিযুক্তি সমীচীন মনে করা হয়নি। এ কাজের জন্য ফেরেশতাই মনোনীত হন। কারণ, সৃষ্টি জগতে ফেরেশতাদের দ্বারা এমন কাজও নেয়া হয়, যা সামগ্রিক উপযোগিতার দিক দিয়ে ভালো, কিন্তু অনিষ্টের কারণে স্বতন্ত্র দৃষ্টিতে মন্দ। যেমন, কোনো হিং¯্র ও ইতর প্রাণীর লালন-পালন ও দেখাশুনা করা। সৃষ্টিগত দৃষ্টিভঙ্গিতে একাজ সঠিক ও প্রশংসনীয়, কিন্তু জাগতিক কল্যাণ আইনের দৃষ্টিতে অঠিক ও নিন্দনীয়। পক্ষান্তরে পয়গম্বরগণকে শুধু জাগতিক কল্যাণমূলক আইন তদারকের কাজেই নিযুক্ত করা হয়Ñযা সাধারণত ভালো কাজেই হয়ে থাকে। উপরোক্ত জাদুর উচ্চারণ ও বর্ণনা উদ্দেশের দিক দিয়ে জাগতিক কল্যাণমূলক কাজ হলেও জাদুর আমলে লিপ্ত হয়ে পড়ার (যেমন, বাস্তবে হয়েছে) ক্ষীণ সম্ভাবনার পরিপ্রেক্ষিতে পয়গম্বগণকে এ থেকে দূরে রাখাই পছন্দ করা হয়েছে।
জাদু ও মু’জেযার পার্থক্য : পয়গম্বরদেরকে মু’জেযা ও ওলীদের কারামাত দ্বারা যেমন অস্বাভাবিক ও অলৌকিক ঘটনাবলী প্রকাশ পায়, জাদুর মাধ্যমেও বাহ্যত তেমনি প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়। ফলে মূর্খ লোকেরা বিভ্রান্তিতে পতিত হয়ে জাদুকরদেরকেও সম্মানিত ও মাননীয় মনে করতে থাকে। এ কারণে এতদুভয়ের পার্ধক্য বর্ণনা করা দরকার।
বলাবাহুল্য, প্রকৃত সত্তার দিক দিয়ে এবং বাহ্যিক প্রতিক্রিয়ার দিক দিয়ে এতদুভয়ের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। সত্তার পার্থক্য এই যে, জাদুর প্রভাবে সৃষ্ট ঘটনাবলীও কারণের আওতাবহির্ভুত নয়। পার্থক্য শুধু কারণটি দৃশ্য কিংবা অদৃশ্য হওয়ার মধ্যে। যেখানে কারণ দৃশ্যমান, সেখানে ঘটনাকে কারণের সাথে সম্পৃক্ত করে দেয়া হয় এবং ঘটনাকে মোটেই বিস্ময়কর মনে করা হয় না। কিন্তু যেখানে কারণ অদৃশ্য, সেখানেই ঘটনাকে অদ্ভুত ও আশ্চর্যজনক মনে করা হয়। সাধারণ লোক ‘কারণ’ না জানার দরুন এ ধরণের ঘটনাকে অলৌকিক মনে করতে থাকে। অথচ বাস্তবে তা অন্যান্য অলৌকিক ঘটনারই মতো। কোনো দুরপ্রাচ্য থেকে আজকের লেখা পত্র হঠাৎ সামনে পড়লে দর্শকমাত্রই সেটাকে অলৌকিক বলে আখ্যায়িত করবে। অথচ জ্বিন ও শয়তানরা এ জাতীয় কাজের ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়েছে। মোটকথা এই যে, জাদুর প্রভাবে দৃষ্ট ঘটনাবলীও প্রাকৃতিক কারণের অধীন তবে কারণ অদৃশ্য হওয়ার দরুন মানুষ অলৌকিকতার বিভ্রান্তিতে পতিত হয়।
[চলবে]

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT