ধর্ম ও জীবন

জাতীয়তা ও ভ্রাতৃত্বের মূল ভিত্তি

 আখতার হোসাইন প্রকাশিত হয়েছে: ১২-০৭-২০১৯ ইং ০১:৪১:৫৯ | সংবাদটি ১০০ বার পঠিত

আব্দুল করিম শাহবেস্তানী প্রণীত মিলাল ওয়ান নিহাল গ্রন্থে বলা হয়েছে, প্রথম দিকে যখন পৃথিবীর জনসংখ্যা খুব কম ছিল তখন বিশ্বে প্রাচ্য, পাশ্চাত্য, দক্ষিণ ও উত্তর এ চারদিকের ভিত্তিতে জাতীয়তা জন্মলাভ করে। প্রতিটি দিকের লোকজন নিজেদেরকে এক জাতি আর অন্যদেরকে অন্য জাতি বলে মনে করত এবং এর ভিত্তিতে পরস্পর সাহায্য ও সহযোগীতার ভিত্তি রচিত হত।
এর পর যখন জনসংখ্যা বাড়ল তখন বংশ ও গোত্রের ভিত্তিতে জাতীয়তার ধারণা বদ্ধমূল হতে থাকে। আরবের সমস্ত ব্যবস্থা এর উপরই প্রতিষ্ঠিত ছিল। বনু হাশিম এক জাতি বনু তামিম অন্য জাতি এবং বনু খোযায়াহ স্বতন্ত্র একটি জাতি ছিল। হিন্দুদের মধ্যে উচ্চজাত ও নীচ জাত আজ পর্যন্ত অব্যাহত রয়েছে।
আধুনিক ইউরোপীয়রা নিজেদের বংশতো বিসর্জন দিয়েছেই, অন্যান্যদের রক্ত ধারাকেও তারা মূল্যহীন প্রতিপন্ন করেছে। কে কার বাবা আর কে কার সন্তান তা বুঝার কোন উপায় রাখেনি। তারা বংশগত ও গোত্রগত জাতীয়তা ও বিভাগকে নিশ্চিন্ন করে আঞ্চলিক, প্রাদেশিক এবং দেশ ও ভাষার ভিত্তিতে মানব জাতিকে খন্ড-বিখন্ড করে পৃথক-পৃথক জাতি দাড় করে দিয়েছে। আজ প্রায় সারা বিশ্বেই ভাষা এবং অঞ্চল ভিত্তিক জাতীয়তা চালু হয়ে গেছে। এমনকি মুসলিমরাও এ যাদুর পরশ থেকে মুক্ত নয়। আরবী, তুর্কী, ইরাকী আর সিন্ধীর বিভাগই নয়; বরং তাদের মধ্যেই ভাগফলকে ভাগ করে মিশরী, সিরীয়, হেজাযী, নজদী, পাঞ্জাবী, বাঙালি, হিন্দী ইত্যাদি পৃথক-পৃথক জাতি জন্ম লাভ করেছে। ফলে আঞ্চলিকতা ভিত্তিক বিদ্ধেষ জনগণের শিরা উপশিরায় ঢুকে পড়েছে।
পবিত্র জীবন বিধান পুনরায় মানুষকে সেই ভুলে যাওয়া সবক স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলছে, হে মানব মন্ডলী! মনে রেখ, তোমরা সবাই এক পিতা ও মাতার সন্তান। (সূরা নিসা,আয়াত নং-১-৩) মানবতার নবী বিদায় হজ্জের ভাষণে বলে গিয়েছেন যে, কোন আরবের অনারবের উপর অথবা কোন শেতাঙ্গের কৃষাঙ্গের উপর কোন শ্রেষ্ঠত্ব নেই। তিনি বলেন: সৎকর্ম ও তাক্বওয়া-ই শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মাপকাঠি ।
‎‎প্রত্যেক মু‘মিন ভাই ভাই বলে, পবিত্র জীবন বিধান মহাগ্রন্থ আলকুরআন ঘোষণা দিয়েছে যে, জাতীয়তা ও ভ্রাতৃত্বের ভিত্তি এভাবে রচনা হবে যে, যারা আল্লাহ ও তার রাসুলের সুন্নাহর পূর্ণ অনুসরণ করে তারা একদল, একজাতি। আর যারা আল্লাহ ও তার রাসুলের সুন্নাহর পূর্ণ অনুসরণ করেনা তারা ভিন্ন জাতি।
জাতীয়তার এ ভিত্তিই আবু জেহেল, আবু লাহাব এর পারিবারিক সম্পর্ক রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। ইসলাম বলে এরা রাসুলের কেউ নয়। অন্য দিকে আল্লাহ ও তার রাসুলের সুন্নাহর পূর্ণ অনুসরণ করার কারণে হাবশী বেলাল ও ছোহায়েব রোমীর সম্পর্ককে রাসুলের সাথে জুড়ে দিয়েছে। পবিত্র জীবন বিধান মহাগ্রন্থ আলকুরআনে এসেছে : সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টি অর্জন করতে হলে তার রাসুলের সুন্নাহর পূর্ণ অনুসরণ করতে হবে। (সূরা আল ইমরান,আয়াত নং-৩১)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন : কিয়ামতের ময়দানে বানি ইসরাঈল তেহাত্তর আর আমার উম্মত হবে বাহাত্তর দলে বিভক্ত। তন্মধ্যে একদল হবে জান্নাতি। (সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৭৬)
হাসান বসরা থেকে, বেলাল হাবসা থেকে এবং ছোহাইব রোম দেশ থেকে এলেন অথচ মক্কার পবিত্র মাটি থেকে সৃষ্টি হল আবু জেহেল। পবিত্র কুরআনে এসেছে,আল্লাহ তা‘য়ালা তোমাদের সবাইকে সৃষ্টি করলেন অতঃপর তোমরা নিজেরা মনগড়াভাবে কিছুু কাফির আর কিছু মু‘মিন এ দু‘ভাবে বিভক্ত হয়ে পড়লে।
বদর, ওহুদ, আহযাব ও হোনাইনের যুদ্ধে এ বিষয়টি প্রত্যক্ষ করা গেছে। বংশগত ভাই আল্লাহ ও তার রাসুলের আনুগত্যের বাইরে চলে যাওয়ায় মুসলিম ভাইদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেল। এবং সে তরবারীর নীচে এসে পড়ে গেল।
এর পরিস্কার অর্থ হল যে,যদি কোন মুসলিম ভাই ও ন্যায়ের বিরুদ্ধে এবং অন্যায় ও উৎপীড়নের পথে চলে তবে এ অন্যায় কাজে তাকে সাহায্য করা যাবেনা বরং অন্যায় পথ থেকে তাকে ফিরিয়ে আনার পূর্ণ চেষ্টা করতে হবে। যাতে এ পাপে তার ইহ ও পরকাল নষ্ট না হয়। এটাই হবে তার প্রতি প্রকৃত সাহায্য এবং ঈমানী দায়িত্ব। এ শিক্ষাই হল প্রকৃত সৎকর্ম ও মুত্তাকী মানুষের আসল মাপকাঠি।
মুুসলিম জাতি এ ভিত্তির উপর জাতীয়তাবাদের ভিত্তি খাড়া করেছে। এবং এর ভিত্তিতেই পারস্পরিক সাহায্যে ও সহযোগিতার আহবান জানিয়েছে। ইসলাম বলেছে, সৎকর্ম ও ন্যায় কাজে তোমরা একে অপরকে সাহায্য কর। আর সাবধান! অন্যায় কাজে কাউকে কোন সাহায্য-সহযোগিতা করবেনা। (সূরা মায়িদা আয়াাত নং-২)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন : যে ব্যক্তি কাউকে কোন সৎ কর্মের পথ বলে দেয়, সে ব্যক্তি এর বদলে ততটুক সাওয়াব বা প্রতিদান পাবে যতটুকু সে নিজে এ সৎ কর্মটি করলে পেত ।
পক্ষান্তরে, যে ব্যক্তি অসৎ কর্ম বা কোন অন্যায় কাজের প্রতি কাউকে আহবান করে তার এ আহবানে যতলোক কিয়ামত পর্যন্ত এ পাপকাজ করবে তাদের সমান শাস্তি সেও পাবে। (ইবনে কাসির, সহীহ বুখারী,হাদসি নং-৯৮)
তিনি আরো বলেন : যদি কেউ ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক কোন কাজে অথবা কোন অত্যাচারীর সাথে তার সাহায্যার্থে বের হয়, তাহলে সে আর মুসলিম থাকেনা। এই নীতির ভিত্তিতে পূর্ববর্তী মনীষীগণ অত্যাচারী বাদশাহ এর চাকুরী পদ গ্রহণ করতেন না। কারণ, এতে অত্যাচারে সাহায্য করা হয়। নিন্মোক্ত আয়াতের তাফসিরে একটি হাদীসে নবীজী বলেন : কিয়ামতের দিন অত্যাচারী ও তাদের সাহায্যকারীরা কোথায় আছ? বলে ডাক দেয়া হবে। অতঃপর যারা তাদের দোয়াত-কলম ঠিক করে দিয়েছে তাদেরকেও একটি লৌহ শবাধারে একত্রিত করে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত করা হবে। (রুহুল মা‘আনী,সূরা ন,আয়াত নং-৭৮)
আল্লাহ তা’য়ালার সর্বশেষ নির্দেশনা মহাগ্রন্থ আল কুরআনের সৎকর্ম ও তাক্বওয়া অর্জনের এ জ্ঞান শিক্ষা দেয়া হয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোতে। কিন্তু বিভিন্ন শাসকের শাসনে আমাদের এ বাংলায় সাধারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোতে এ শব্দগুলো অপরিচিত আর ইসলামী শিক্ষালয়গুলোতে এগুলো পড়াশুনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এর কোন অনুশীলন হয়না। তাই বিশ্বজুড়ে আজ অশান্তির আগুন। এর কারণ দু‘টি।
প্রথমত: প্রচলিত সরকারগুলো জীবন বিধানের ব্যবস্থা থেকে বহু দূরে রয়েছে, ক্ষমতাসীন লোকেরা সৎকর্ম ও তাক্বওয়ার মূলনীতি অনুসরণ করতে দ্বিধাবোধ করেন। যদি ও এটা না করার কারণে অনেক দুঃখবোধ করতে হচ্ছে। কিন্তু তারা যদি এ সিষ্টেমকে পরীক্ষা করার জন্য তিক্ত ঢোক মনে করে হলেও কলার ভিতরে করে একবার গিলে ফেলতেন, তাহলে দেখতেন কীভাবে জীবনে সুখ-শান্তি, আরাম-আয়েশ, ¯েœহ-ভালবাসা আনন্দের ¯্রােতধারা বয়ে যায়।।
দ্বিতীয়ত: জনগণ মনে করে নিয়েছেন যে,অপরাধ-প্রবণতা বন্ধ করার দায়িত্ব শুধুমাত্র সরকারের। এটা আমাদের হাতে তুলে নেয়া বিশাল অন্যায়। শুধু তাই নয়, তারা পেশাদার অপরাধীদের অপরাধ গোপন করে রাখেন। আর সত্য সাক্ষ্য দেয়ার রীতি একেবারে উঠে গেছে। তীর যেভাবে তার ধনুক থেকে দূরে চলে যায়, আমরা জনগণ সেভাবে ইসলামী বাস্তবতা থেকে দূরে চলে এসেছি। এটাই সবচেয়ে বড় অন্যায় যা আমরা করে চলেছি। “আল্লাহ তায়ালা বলেছেন : তোমরা অন্যায় কাজে কখনো সাহায্য সহযোগীতা করনা”। এটা এ আয়াতের বিরুদ্ধে আমাদের যুদ্ধ ঘোষণা করার শামিল। (সূরা মায়িদাহ, আয়াত নং-২) সম্মানিত পাঠক আসুন আমরা একসাথে বলি “প্রভু হে! তুমি আমাদের জীবন বিধান অনুযায়ী জীবন পরিচালনার তাওফিক দাও। (আমিন)

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT