ধর্ম ও জীবন

শিশুদের প্রতি মহানবী (সা.) এর ভালোবাসা

মো. আব্দুশ শহীদ নেগালী প্রকাশিত হয়েছে: ১২-০৭-২০১৯ ইং ০১:৪৩:২৩ | সংবাদটি ১৩০ বার পঠিত

সাবালক হবার পূব পর্যন্ত ছেলে-মেয়েদেরকে শিশু বলা হয়। শিশুরা মাতা-পিতা, ভাই-বোন, বা স্বজনদের প্রাণের চেয়ে প্রিয় এবং নয়নের জ্যোতি। শিশুরা হচ্ছে সমাজের প্রাণ। আনন্দমুখর পরিবেশ তৈরিতে শিশুদের অবদান অপরিসীম। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহপাক বলেনÑ সম্পদ ও সন্তান হচ্ছে পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য বিশেষ। (সূরা : কাহাফ, সূরা : ৪৬)
বুলগিয়তের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছা পর্যন্ত সকল শিশুরাই নিষ্পাপ যদিও তাদের এ বয়সে কিছু অপরাধ সংঘটিত হয়েই যায়, সে অপরাধ মহান আল্লাহপাক ক্ষমার নয়নে দেখেন। মুসলিম শিশুরা শিশু বয়সে ইন্তেকাল করলে নিঃসন্দেহে ওরা জান্নাতি। এমন কি অমুসলিম শিশুরাও যদি শিশু বয়সে মারা যায়। তাহলে বিশুদ্ধ মতে তাদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে না। একটি অভিমতে দেখা যায় যে, জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যবর্তি ‘আরাফ’ নামক স্থানে তাদেরকে রাখা হবে। কারণ হক্ব-বাতিল ও পাপ পুণ্য অনুধাবনের পূর্বে ওরা মারা যাবার কারণে। ভাবতে অবাক লাগে। বর্তমান যুগে শিশুরাই সবচাইতে বেশি নির্যাতিত। মুক্তিপণের টাকার লোভে শিশু জবাই, শিশুদেরকে হত্যা করে মাটিচাপা দিয়ে লাশ গুম, শিশু ধর্ষণের পর হত্যার মতো রোমহর্ষক ঘটনা অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে চলছে। তার সাথে তাল মিলিয়ে চলছে শিশু পাচারের মতো মর্মান্ত ঘটনা। নির্যাতন হত্যা আর অপরাধ প্রবণতা এতো মহামারি আকার ধারণ করার কতেকটি কারণের মধ্যে একটি কারণ হচ্ছে বিচার কাজে ধীর গতি। আমরা জেনে নেই আমাদের প্রিয়নবী (সা.) শিশুদেরকে কিভাবে ভালোবেসেছেন।
রাসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি ছোটদের প্রতি দয়া করে না এবং বড়দের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে না, সে আমার দলভুক্ত নয়। আমরা লক্ষ্য করলে দেখি ছোটদের প্রতি দয়ার পরিবর্তে তাদের উপর চলছে পৈশাচিক নির্যাতন। যেভাবে হিং¯্র পশু নিরিহ পশুর ঘাড় মটকায়ে। প্রিয়নবী (সা.) আরও বলেছেনÑ ‘আল আত্বফালু দা আমীছুল জান্নাহ’ শিশুরা হচ্ছে বেহেস্তের প্রজাপতি। জান্নাতিদের প্রাণ জুড়ানো আনন্দের কারণ হবে শিশু কিশোরেরা। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহপাক বলেনÑ (জান্নাতিদের) কাছে ঘোরাফেরা করবে চির কিশোরেরা। পান পাত্র ও খাঁটি সূরা পূর্ণ পেয়ালা হাতে নিয়ে। যা পান করলে তাদের শীর পীড়া হবে না এবং বিকারগ্রস্তও হবে না। (সূরা : ওয়াক্বেয়া, আয়াত : ১৮-২০)
মহানবী (সা.) আরও বলেছেনÑ‘আছ ছিবইয়ানুমির রাইহানিল্লাহ’। অর্থ- শিশুরা হচ্ছে আল্লাহর ফুল (বোখারী)
প্রিয় নবী (সা.) এর আলোকদীপ্ত হৃদয় মোবারক জুড়ে ছিলো শিশুদের প্রবল ভালোবাসা। শিশুরা সাধারণত আমোদ প্রিয়। খেলাধুলা তাদের কাছে খুবই আকর্ষণীয়। হযরত আনাস (রা.) বলেনÑ আবু উমাইব নামে আমার ছোট একটি ভাই ছিলো। নুগাইর নামে তার একটি পোষা পাখি ছিলো। পাখিটি নিয়ে সে সর্বদা খেলা করতো। একদা পাখিটি মারা গেলে সে খুব বেশি দুঃখ পায় এবং তাতে সে মন খারাপ করে বসে থাকতো। রাসুলে কারীম (সা.) তার মনের দুঃখ দূর করার জন্য কবিতার সুরে বললেনÑ‘ওহে আবু উমাইর’ কি হলো তোমার নুগাইর’। একথা শুনে সে অট্টহাসি দিয়ে দৌড়ে গেলো। তাকে খুশি করাই ছিলো প্রিয়নবী (সা.) এর উদ্দেশ্য। একদিন এ বেদুঈন মহানবী (সা.) এর নিকট এসে জিজ্ঞেস করলো আপনারা কি শিশুদেরকে চুম্বন করেন। আমরা কিন্তু তাদেরকে চুমা দেই না। তখন মহানবী (সা.) বললেন আল্লাহপাক যদি তোমাদের অন্তর থেকে রহমত ছিনিয়ে নিয়ে যান, তখন আমি তার কি করতে পারি। (বোখারী)
হাসি-খুশির শিশুরা কখনও দুঃখের অংশিদার হতে জানে না। বড়দের কাছ থেকে সোহাগ, ¯েœহ-মমতা, আর উপদেশ পাবার আকাক্সক্ষা নিয়ে ওরা বড় হতে চায়। হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেনÑ রাসুল (সা.) কিছু সংখ্যক বালকদের পাশ দিয়ে যাবার বেলায় তাদেরকে সালাম দিয়েছেন। (বোখারী)
বিভিন্ন সময় শিশুরা বিভিন্নভাবে আমাদেরকে সেবা দিয়ে থাকে। শিশুরা হচ্ছে বড়দের খাদেম। জীবনে চলার পথে বহুভাবে আমরা তাদের সহযোগিতা পেয়ে থাকি। ওরা পূত পবিত্র একঝাঁক প্রজাপতি। নির্যাতিত বা নিপিড়ীত হলে অঝোর ধারায় চুখের পানি ঝরাতে জানে, কিন্তু তার প্রতিবাদ করতে জানে না। হযরত আনাস বিন মালেক (রা.) বলেন যে, আমি প্রায় দশ বছর যাবৎ নবী করীম (সা.) এর খেদমত করেছি। তখন আমি বালক ছিলাম। সকল কাজ তিনি আমাকে দিয়ে যেভাবে করাতে চাইতেন, আমি তাহা সেভাবে করতে পারতাম না। তিনি তাতে আমার প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করেন নি এবং এমন কথাও বলেন নি যে, তুমি কাজটি এভাবে করলে না কেন? হযরত আনাস (রা.) আরও বলেন যে, রাসুলে করীম (সা.) তাঁর একটি প্রয়োজনে আমাকে এক জায়গায় পাঠালেন। আমি পথিমধ্যে বাজারে একদল লোককে খেলাধুলায় মশগুল দেখলাম। আমিও তাদের সাথে খেলায় যোগ দিলাম। আমার ফিরে আসতে বিলম্ব হওয়ায় নবী করীম (সা.) আমার খুঁজে বের হলেন। পিছন দিক থেকে এসে রাসুলে করীম (সা.) আমার ঘাড়ে হাত মোবারক রাখলেন। আমি ছিনে ফিরে চেয়ে দেখি তিনি হাসতেছেন আমাকে বললেনÑহে উনাইস! তোমাকে যেখানে যেতে বলেছি সেখানে যাও। তিনি আমার এ ত্রুটির জন্য আমাকে অভিযুক্ত করেন নি। (আবু দাউদ)
হযরত আনাস (রা.) বলেনÑযে আমি আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) কে মক্তবে পাঠরত শিশুদেরকে সালাম দিতে দেখেছি। (আদাবুল মুফরাদ)
হযরত আনাস বিন মালেক (রা.) বলেনÑরাসুলুল্লাহ (সা.) খেলাধুলায় মশগুল কতিপয় বালকের কাছে এলেন এবং তাদেরকে সালাম দিলেন। (আবু দাউদ)
প্রিয়নবী (সা.) বলেছেন কোনো লোক যদি এতিম শিশুর মাথায় হাত বুলায় তাহলে তার হাতের নিচে যে পরিমাণ চুল থাকবে, সে পরিমাণ নেকি তার আমল নামায় প্রদান করা হবে। হযরত জাবির বিন আব্দুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসুলে কারীম (সা.) বলেছেন আল্লাহ তা’আলা সে ব্যক্তির প্রতি অনুগ্রহ করেন না যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি অনুগ্রহ করে না। (বোখারী)
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত নবী করীম (সা.) বলেছেনÑযদি ঘরসমূহে স্ত্রীলোকগণ এবং সন্তান-সন্তুতী (শিশুগণ) না থাকতো, তাহলে আমি জামাত কায়েম করতাম এবং যুবকদেরকে বলে দিতাম তাদের ঘরে যা কিছু আছে সব কিছু যেন তারা আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয় যারা জামাতে নামাযে আসে না। (আহমদ)
হাদিসের সারমর্ম হচ্ছেÑ স্ত্রীলোকদের উপর জামাতে নামায ওয়াজিব নয় এবং শিশুরা হচ্ছে নিষ্পাপ ওরা কষ্ট পাবে। তাদের প্রতি দয়াপরবশ হয়েই আমি এরূপ করতে যাই না। ইসলামের দৃষ্টিতে শৈশব হচ্ছে সৌন্দর্য, স্বপ্ন, সৌভাগ্য ও ভালোবাসায় পরিপূর্ণ এক চমৎকার জীবন। এ জীবনের নিরাপত্তা, মূল্যায়ন আমাদের ঈমানী দায়িত্ব। শিশু ধর্ষণ ও নির্যাতনের মতো ন্যাক্কারজনক অপরাধের দরুণ হযরত লুত (আ.) এর ক্বউমকে মহান আল্লাহপাক জমিন ওলট-পালট করে ধ্বংস করেছিলেন। শিক্ষার সুযোগ লাভ করা শিশুদের অন্যতম মৌলিক অধিকার এ আওয়াজ টি সবার মুখে। কিন্তু শিশুদের জানমাল সম্ভ্রম রক্ষা করা এটা কি মৌলিক অধিকারের বহির্ভুত? বিচারে দীর্ঘসূত্রতা আর প্রভাবশালীদের হুমকি ধমকির কারণে সময়মতো বিচার পাচ্ছে না। বিভিন্ন সূত্রে পার পেয়ে যায় অপরাধীরা। যার দরুণ উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মতো জঘন্য অপরাধ। রাষ্ট্র কি দর্শকের ভূমিকা পালন করবে। এটাই সাধারণ মানুষের প্রশ্ন।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT