সাহিত্য গ্রন্থালোচনা

স্রষ্টা, বিজ্ঞান ও ধর্ম

নাজমুল আনসারী প্রকাশিত হয়েছে: ১৪-০৭-২০১৯ ইং ০১:১৫:৪৮ | সংবাদটি ১১৯ বার পঠিত

প্রফেসর মো. আজিজুর রহমান লসকর একজন প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ, নন্দিত চিত্রশিল্পী, নিভৃতচারী উদ্ভিদ বিজ্ঞানী। উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিষয়ে তাঁর মৌলিক রচনা Encyclopedia of flora and fanna of Bangladesh -এ স্থান পেয়েছে। তিনি একজন শক্তিমান লেখক। ইতোমধ্যে একটি ইংরেজি পুস্তকসহ তাঁর বেশ কয়েকটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে, যা বিদগ্ধ পাঠক মহলে বিপুলভাবে সমাদৃত হয়েছে।
¯্রষ্টা, বিজ্ঞান ও ধর্ম প্রফেসর লসকরের অন্যতম মৌলিক গ্রন্থ। পা-ুলিপি প্রকাশন কর্তৃক সম্প্রতি প্রকাশিত তিনশ পৃষ্ঠার এ পুস্তকে লেখক জ্ঞান জগতের খুবই গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক অনেকগুলো বিষয় তথ্য ও তত্ত্বের সংমিশ্রণে অত্যন্ত নির্মোহভাবে নিখাঁত যুক্তির মাধ্যমে স্বার্থকভাবে উপস্থাপন করেছেন। কতকগুলো সর্বজনীন বিষয় লেখক তথ্য, যুক্তি ও উদাহরণ দিয়ে শক্ত ভিত্তির উপর এমনভাবে দাঁড় করিয়েছেন, যা ইতিপূর্বে বিশে^ কেউ করেছেন বলে জানা যায়নি। যেমনÑ ১) প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে মানুষের বর্তমান জ্ঞান পূর্ণাঙ্গ নয় ২) সকল বিষয়ে বিশুদ্ধতার জন্য বিজ্ঞান অপরিহার্য ও ৩) ¯্রষ্টা নির্ধারিত ধর্ম সমগ্র মানব জাতির জন্য অভিন্ন। লেখকের বিশদ ব্যাখ্যাকৃত বিষয়ের সংক্ষিপ্ত চুম্বক পয়েন্টগুলো নি¤েœ উল্লেখ করা হলোÑ
১) লেখক বর্তমান বিজ্ঞান সম্পর্কে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ কিছু মৌলিক বিষয়ের অবতারণা করেছেন। তাঁর মতে, প্রাকৃতিক বিজ্ঞান বিষয়ে মানুষের বর্তমান জ্ঞান পূর্ণাঙ্গ নয়। বিজ্ঞান হচ্ছে কোনো বিষয়ে নির্ভুল জ্ঞানের সমষ্টি। কোনো বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান অর্জিত হয়েছে বলে দাবি করা যেতে পারে তখনই, যখন সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সকল যৌক্তিক প্রশ্নের জবাব তা থেকে পাওয়া সম্ভব হবে। অর্জিত বৈজ্ঞানিক জ্ঞান থেকে যদি যৌক্তিক কোনো প্রশ্নের জবাব না মিলে, তাহলে বুঝতে হবে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান পূর্ণাঙ্গ নয়। এ প্রসঙ্গে লেখক প্রায় ডজনখানেক উদাহরণ বিশদভাবে আলোচনা করেছেন। তা থেকে মহাবিশ^ সৃষ্টির বিগ ব্যাং তত্ত্বটি এখানে উল্লেখ করা হলো। এ তত্ত্ব বলে যে, শুরুতে যখন কিছুই ছিল না, তখন একটি আদি বস্তুপি-ের আবির্ভাব ঘটে। পি-টি প্রচ- চাপে পতিত হয় এবং তাপমাত্রা অত্যধিক বেড়ে যায়। ফলে বিগ ব্যাং নামক মহা বিস্ফোরণ ঘটে। অতঃপর দীর্ঘ সময়ব্যাপী সংঘটিত পরিবর্তনের ফলে মহাবিশে^র সৃষ্টি হয়। অনেক বিজ্ঞানী বিগ ব্যাং তত্ত্ব সমর্থন করেছেন ।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছেÑ ১) বিগ ব্যাং এর পূর্বে আদি বস্তুপি-টি কোথা থেকে কিভাবে উপস্থিত হয়েছিল? ২) বিগ ব্যাং সংঘটনের জন্য কোথা থেকে কিভাবে প্রচ- চাপ ও তাপের উদ্ভব হয়েছিল? ৩) অনেক বিজ্ঞানী বিগ ব্যাং Ñকে একটি দুর্ঘটনা বলে ধারণা করে থাকেন। কিন্তু একটি দুর্ঘটনা থেকে কিভাবে অত্যন্ত সুসংগঠিত মহাবিশে^র আবির্ভাব হলো এবং পৃথিবীতে মানুষসহ অসংখ্য প্রাণী ও উদ্ভিদ সৃষ্টি হলো? উপরোক্ত যৌক্তিক প্রশ্নগুলোর জবাব আধুনিক বিজ্ঞান দিতে পারে নাই । তাই আধুনিক বস্তুবাদী বিজ্ঞান পূর্ণাঙ্গ বিজ্ঞান নয়। কিন্তু আমাদের পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের জন্য উপরোক্ত যৌক্তিক প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া আবশ্যক। প্রশ্নগুলোর জবাব নিহিত রয়েছে সর্বশক্তিমান আল্লাহর ও তাঁর অসীম ক্ষমতার স্বীকৃতির মধ্যে। আসলে মহান আল্লাহর ইচ্ছার আদি বস্তুপি-ের সৃষ্টি, প্রচ- চাপ ও তাপের উদ্ভব, অতঃপর বিগ ব্যাং নামক মহাবিস্ফোরণ ইত্যাদি ঘটেছিল।
অধিকন্তু বিগ ব্যাং কোনো দুর্ঘটনা নয়। এটি হচ্ছে সর্বশক্তিমান আল্লাহর ইচ্ছায় মহাবিশ^ সৃষ্টি প্রক্রিয়ায় একটি গুরুক্তপূর্ণ ঘটনামাত্র। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনের সূরা আম্বিয়ার ৩০ নং আয়াতে ইঙ্গিত রয়েছে। “আকাশম-লী ও পৃথিবী মিশে ছিল ওতপ্রোতভাবে; অতঃপর আমি উভয়কে পৃথক করে দিলাম।”
প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে মহাবিশ^ সৃষ্টি ছাড়াও নানা বিষয়ে অসংখ্য প্রশ্ন রয়েছে, যেগুলোর যথাযথ জবাব না দিয়ে বস্তুবাদী বিজ্ঞানীরা বলে থাকেন, “তা প্রাকৃতিকভাবে হয়” তা প্রকৃতির নিয়ম ইত্যাদি। কিন্তু প্রকৃতি এমন কোন সত্ত্বা নয়, যার সৃষ্টির পরিকল্পনা গ্রহণ, বাস্তবায়ন ও সৃষ্টি সংরক্ষণ করার ক্ষমতা রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে মহাবিশ^ সৃষ্টি, জীবের অনুকূলে পৃথিবীর সৃষ্টি, উদ্ভিদে ফটোসিন্থেসিস প্রক্রিয়ায় খাদ্য উৎপাদন, জীবের বংশবিস্তার প্রাণীজগতে মায়া-মমতা ইত্যাদিতে সর্বশক্তিমান স্রষ্টার কর্তৃত্বের স্বীকৃতি প্রধান আমাদের পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক জগতের জন্য অপরিহার্য। বিজ্ঞানের সংশ্লিষ্ট পুস্তকে তা যথাযথভাবে উল্লেখ করা উচিত। বিজ্ঞানের পুস্তকগুলোয় তা উল্লেখ না থাকায় আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষ ¯্রষ্টা বিমুখ ও নাস্তিক হচ্ছেন , এবং এর গুরুতর প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে ব্যক্তি, সমাজ ও সভ্যতায়। প্রফেসর লসকরের অপর গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য হচ্ছে, বিজ্ঞান কেবল পদার্থ বিদ্যা, রসায়ন শাস্ত্র, হিসাববিজ্ঞান, গণিত ইত্যাদিতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং বিজ্ঞানের ক্ষেত্র সর্বত্র। বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের ব্যাপক উপস্থিতির কারণে আধুনিক অর্থনীতিকে বিশে^র অনেক বিশ^বিদ্যালয়ে বিজ্ঞান অনুষদে রাখা হয়েছে।
ইতিহাসের অন্যতম শাখা প্রতœতত্ত্ববিদ্যা বিজ্ঞানের সাহায্য ছাড়া অচল। ললিতকলার বিশেষ শাখা সংগৃহীত। সংগীতের অত্যাবশ্যকীয় বস্ত বাদ্যযন্ত্র বিজ্ঞানের উপহার। ললিতকলার অপর শাখা চিত্রশিল্পের অপরিহার্য উপাদান রংতুলি, ক্যানভাস ইত্যাদি বিজ্ঞানের দান। সকল ভাষার ব্যাকরণ বিজ্ঞানের উপর প্রতিষ্ঠিত। অতএব বিজ্ঞানের উপস্থিতি যে সর্বত্র তা অস্বীকার করা যায় না। ধর্মেও বিজ্ঞান রয়েছে। অনেক ধর্মে বিরাজমান ভ্রান্ত বিশ^াস, কুসংস্কার ও মানব উদ্ভাবিত রীতিনীতি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বিশ্লেষণ করে ধর্মকে বিশুদ্ধ করা যায়। কিন্তু ধর্মীয় ব্যাপারে মানুষ অত্যন্ত সংবেদনশীল থাকায় তা অধিকাংশ ক্ষেত্রে সম্ভব হয় না। প্রফেসর লসকরের অপর তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য হচ্ছেÑ দৈহিক গঠন বর্ণ, ভাষা ও সংস্কৃতিতে পার্থক্য থাকলেও জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সমগ্র বিশে^র মানুষ একই প্রজাতিভুক্ত, Home sapiens তাই মানবজাতির ধর্মও অভিন্ন হওয়াই স্বাভাবিক। প্রচলিত বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থগুলোতে বিদ্যমান মৌলক বিষয়ের সাদৃশ্যে এর যথার্থ প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রায় সোয়া লক্ষ নবী-রাসূল ভিন্ন ভিন্ন ধর্ম নয়, বরং একই ধর্ম প্রচার করে গেছেন।
গ্রন্থের শেষ অধ্যায়ে লেখক পৃথিবীর প্রধান ধর্মসহ প্রায় ডজনখানেক ধর্মের নির্ভুল বর্ণনা দিয়েছেন। যা পাঠকবৃন্দের জন্য এক বিরাট প্রাপ্তি। চতুর্দশ অধ্যায় ইসলাম ধর্মের সাথে অন্যান্য ধর্মের বস্তুনিষ্ঠ তুলনা তাৎপর্যপূর্ণ। এটি সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, গ্রন্থটি রচনায় লেখক যথেষ্ট পরিশ্রম করেছেন। অনেক ক্ষেত্রে তিনি পবিত্র কুরআন, বাইবেল, তাওরাত ও হিন্দুধর্মের বিভিন্ন গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন। বস্তুজগৎ ও আধ্যাত্মিক জগতের সমন্বয় সাধন এবং বিজ্ঞান ও ধর্মের দূরত্বের অবস্থানে প্রফেসর লসকরের সার্থক প্রচেষ্টা এ গ্রন্থের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
¯্রষ্টা, বিজ্ঞান ও ধর্ম গ্রন্থটি বর্তমানে আধুনিক শিক্ষিত মানুষের পাঠ করা একান্ত প্রয়োজন। কারণ বইটিতে ¯্রষ্টা, বিজ্ঞান ও ধর্ম সম্পর্কিত অনেক প্রশ্নের উত্তর লেখক তাঁর প্রজ্ঞা, যুক্তি ও তথ্যের মাধ্যমে উপস্থাপন করেছেন, যা অনুসন্ধিৎসু পাঠকের জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করবে বলে আমাদের দৃঢ় বিশ^াস। আমরা বইটির ব্যাপক পাঠ ও প্রচার কামনা করি।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT