সাহিত্য

লাল কাতান : সমাজ-পরিবারের রংধনু

মিহিরকান্তি চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ১৪-০৭-২০১৯ ইং ০১:১৬:১৮ | সংবাদটি ১২৩ বার পঠিত

ছোটগল্প কথাসাহিত্যের একটি বিশেষ ধারা। বাংলা সাহিত্যে এর আবির্ভাব উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে হয়েছে বলে ধরে নেওয়া হয়। সাধারণত ছোটগল্প বলতে তাকেই বোঝায় যা আধঘণ্টা থেকে এক বা দুঘণ্টার মধ্যে এক নাগাড়ে পড়ে শেষ করা যায়। তবে আকারে ছোট হলেই তাকে ছোটগল্প বলা যাবে না। কারণ ছোটগল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এতে বিন্দুতে সিন্ধুর বিশালতা থাকতে হবে, অর্থাৎ অল্প কথায় অধিক ভাব ব্যক্ত করতে হবে। উপন্যাসের সঙ্গে এর মৌলিক পার্থক্য এখানেই। ছোটগল্পে উপন্যাসের বিস্তার থাকে না, থাকে ভাবের ব্যাপকতা। উপন্যাস পড়ে পাঠক পরিতৃপ্তি লাভ করে, কিন্তু ছোটগল্প থেকে পায় কোনো ভাবের ইঙ্গিতমাত্র। ক্ষুদ্র্র কলেবরে নিগূঢ় সত্যের ব্যঞ্জনায়ই এর সার্থকতা।
প্রকৃত অর্থে বাংলা সাহিত্যে সার্থক ছোটগল্পকার হলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁর প্রথম গল্প ‘ভিখারিণী’ ১৮৭৪ সালে ভারতী পত্রিকায় প্রকাশিত হলেও ‘দেনা-পাওনা’ (১৮৯০) গল্পটিই প্রথম সার্থক ছোটগল্প। ১৮৮৪-৮৫ সময়ের মধ্যে প্রকাশিত হয় তাঁর ‘ঘাটের কথা’, ‘রাজপথের কথা’ ও ‘মুকুট’। গল্পগুচ্ছ, সে, তিনসঙ্গী প্রভৃতি গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের সংখ্যা ১১৯টি।
ছোটগল্প সাহিত্যের আধুনিকতম শিল্পকর্ম । বাংলা সাহিত্যে ছোটগল্প এসেছে খুব বেশি দিন হয়নি। মাত্র এক শত বছরের কাছাকাছি সময় । ছোটগল্প আকৃতিতে ছোট ও প্রকৃতিতে গল্প হলেও সাহিত্যের একটি বিশেষ শিল্প প্রকরণ। ছোটগল্পের সাথে উপন্যাস বা নাটকের তুলনা চলে না, বরং একাঙ্কিকার একমুখীনতা ও গীতিকবিতার ভাবব্যঞ্জনার কিছুটা সাধর্ম্য চোখে পড়ে। ছোটগল্পের স্বতন্ত্র প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে বহু জন বহু আলোচনা-সমালোচনা করেছেন। তবে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘সোনার তরী’ কাব্যগ্রন্থের ‘বর্ষাযাপন’ কবিতাটিতে ছোটগল্পের চরিত্র সম্পর্কে যা বলেছেন, অমন সর্বকালীন উৎকৃষ্ট কাব্যিকপ্রকাশ বা ছোটগল্প সম্পর্কে অমন সার্থক সংজ্ঞা বোধ করি আর কিছু হতে পারে না :
‘ছোট প্রাণ, ছোট ব্যথা ছোট ছোট দুঃখকথা/ নিতান্তই সহজ সরল,/ সহ¯্র বিস্মৃতিরাশি প্রত্যহ যেতেছে ভাসি/ তারি দু’চারিটি অশ্রুজল।/ নাহি বর্ণনার ছটা ঘটনার ঘন ঘটা/ নাহি তত্ত্ব নাহি উপদেশ।/ অন্তরে অতৃপ্তি রবে, সাঙ্গ করি মনে হবে/ শেষ হয়ে হইল না শেষ ।’
ঘটনার জটিলতা, চরিত্রের বাহুল্য, তত্ত্ব-তথ্য ও উপদেশের গুরুভার বহনে ছোটগল্পের লঘুকলেবর একেবারেই অক্ষম । বহুব্যাপ্ত জীবনের খ-াংশ ছোটগল্পের উপকরণ । ‘শেষ হয়ে হইল না শেষ’- এই ইঙ্গিতমূলক পরিসমাপ্তি, তার বিশেষ শিল্প-বৈশিষ্ট্য । চলমান ঘটনার মধ্যে মহামুহূর্তটি জীবনের গভীর রহস্যকে ব্যঞ্জনাময় করে পাঠককে ‘বিন্দুর মধ্যে সিন্ধু’ দর্শন করিয়ে দেয়, এটিই ছোটগল্পের শ্রেষ্ঠ শিল্পকৃতিত্ব ।
১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা লাভের পরে ছোটগল্পে অনিবার্যভাবে যুক্ত হয় মুক্তিযুদ্ধের বিষয়টি। যুদ্ধ এবং যুদ্ধপরবর্তী বাস্তবতার আলোকে রচিত হয় বিপুলসংখ্যক ছোটগল্প। তবে ষাটের দশকের ছোটগল্পে আঙ্গিক ও ভাষার ক্ষেত্রে যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলেছিল, সত্তরের দশকে তা লক্ষিত হয় না। মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে ছোটগল্পে সর্বাধিক লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে এর বিষয় বৈচিত্র্য। অন্তিম সত্তর থেকে আশির দশকের এবং সাম্প্রতিক বাংলা গল্পে বিষয়বস্তু, প্রকাশভঙ্গি ও ভাষার ক্ষেত্রে বেশ পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। এমনকি কোনো কোনো গল্পকারের গল্পকে ছোটগল্পের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিকও বলা চলে। আবু হাসান শাহরিয়ার, অনামিকা হক লিলি, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, বিশ্বজিত চৌধুরী, মহীবুল আজিজ, ওয়াহিদ রেজা, আনিসুল হক, মনির জামান, মামুন হুসাইন, সেলিম মোরশেদ, হুমায়ুুন মালিক, সেলিম মোজাহার, শাহনাজ মুন্নী, রাজীব নূর, ফাহমিদুল হক, অদিতি ফাল্গুনি, আহসান ইকবাল, প্রশান্ত মৃধা প্রমুখ সত্তরের শেষ থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক ধারা পর্যন্ত সৃষ্টিশীল গল্পকার হিসেবে খ্যাত। এই দলে জামান মাহবুব একটি অত্যাবশ্যক নাম।
জামান মাহবুবের ‘লাল কাতান’ একটি ছোটগল্পগ্রন্থ । জামান মাহবুব মূলত গল্পকার । কিশোর বয়স থেকেই লেখালেখি করে আসছেন। প্রকাশনা জগতে নবীন। তবে তাঁর সম্পাদনায় ও ভিন্ন লেখকের সাথে যৌথ সম্পাদনায় বেশ কয়েকটি সংকলন প্রকাশিত হয়েছে যার শুরু স্বাধীনতাপরবর্তী সময়ে ১৯৭২ সালে। সরকারি চাকুরিতে থাকার সময় পেশাগত দায়িত্বে তিনি এতই নিষ্ঠাবান ছিলেন যে গল্পগ্রন্থ প্রকাশের মতো বিষয়ে মনোনিবেশ করতে পারেননি। অবসর গ্রহণের পর তিনি মনোযোগী হয়েছেন এ বিষয়ে- তা আমাদের উৎসাহিত করে। গল্পগুলো পাঠকের কাছে পৌঁছেছে, আশা করা যায় সেগুলো কাক্সিক্ষত পাঠকপ্রিয়তা পাবে। তাঁর গল্পের বিষয়বস্তুগুলো সমাজ ও পারিবারিক জীবনের সাধারণ, অতি পরিচিত ঘটনা অথচ একই সাথে অসাধারণ । গল্পগুলোতে আছে মুক্তিযুদ্ধের কথা ও সমাজ জীবনসংশ্লিষ্ট মানবমনের স্বাভাবিক ও একই সাথে বিচিত্র প্রকাশ। পাঠক লেখকের ছোটগল্পের মূল্যায়ন করবেন তাঁদের নিজস্ব ভাবধারায় । পাঠকই হচ্ছেন লেখকের শ্রেষ্ঠ বিচারক।
আমাদের দৈনন্দিন মধ্যবিত্ত সমাজ জীবনের অবস্থা ও পরিবেশ অনেক গল্পেই উঠে এসেছে এবং সবটাই বিন্যস্ত হয়েছে লেখকের স্বকীয় বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী । শিল্পের প্রতি অঙ্গিকার নিয়ে জামান মাহবুব তাঁর গল্পগুলোকে পরিচালিত করেছেন সেভাবেই। দেখা যায় যে গল্পের মধ্যকার উত্থান-পতন বা ঘূর্ণাবেগ যতটা না প্রধান তার চেয়ে বেশি ধরা পড়ে জীবনের প্রতিচ্ছবি। ভাগ্য ও দুর্ভাগ্য, বিস্তর অভাব অভিযোগের মধ্যে বসবাসরত এক একজন মানুষ এক একটা গল্পে অনেকটাই অকৃত্রিমভাবে রূপায়িত হয়েছে। বিভিন্ন বিষয়কে অবলম্বন করে তাঁর গল্প তৈরি হয়েছে।
মোট ৩৪টি গল্প দিয়ে সাজানো হয়েছে ‘লাল কাতান’। প্রতিটি গল্পই ভিন্ন আঙ্গিকের। গল্পগুলোর শিরোনামগুলো অসাধারণ। দৈনন্দিন জীবন থেকে বেছে নেয়া। শিরোনামগুলো মনকে আচ্ছন্ন করে। নামগুলো সুন্দর যেমন- ‘বিবর্ণ বিকেল’, ‘প্রতিধ্বনি’, ‘আশ্রয়’, ‘হৃদয়বান’, ‘বন্ধন’, ‘ডিটেকটিভ’, ‘প্রতীক্ষার স্টেশনে’, ‘বিনিময়’, ‘রাজা আসেনি’, ‘অতিথি’, ‘সংবর্ধনা’, ‘বিভ্রান্তি’, ‘প্রতিদান’ প্রভৃতি। গল্পের ভাষা খুবই সহজবোধ্য। পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করবে বলে আশা করা যায় । তবে লেখক স্বকীয় বৈশিষ্ট্য অক্ষুণœ রেখেছেন । নিজস্ব ধারার লেখার ব্যাপারে প্রকৃতপক্ষে তিনি খুবই সচেতন ।
বিভিন্ন গল্পের মধ্যে গুণগত পার্থক্য খুব বেশি দেখা না গেলেও রয়েছে বৈচিত্র্য। এ ব্যাপারটি লেখকের সচেতন শিল্পী সত্ত্বা ও আত্মবিশ্বাসকে নির্দেশ করে। মনে হয় প্রথম থেকেই তিনি নির্ধারণ করেছেন গল্পের ভঙ্গিটি কেমন হবে, কেমন হওয়া দরকার এবং কতদূর কীভাবে অগ্রসর হতে হবে, পরিণতিটি কী হবে। এ ব্যাপারে তাঁর স্বচ্ছ ধারণা তৈরি হয়েছিল সূচনালগ্নেই । তার প্রকাশিত গল্পগুলো এ রকমই প্রমাণ দেয়। ছোটগল্পে পরিবেশের বৈচিত্রের ছবি আঁকার সুযোগটা অনেকটাই সীমিত, সেই বিশুদ্ধতা অনেকটা সার্থকভাবেই তিনি তুলে ধরতে পেরেছেন তাঁর ছোটগল্পে।
‘লাল কাতান’ ছোটগল্পগ্রন্থের গল্পগুলো বিগত পাঁচ দশকে বিভিন্ন সাহিত্য পত্রিকা, দৈনিকের সাহিত্যপাতা ও সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। এগুলোর একটি সার্থক সংকলন। ‘লাল কাতান’ ছোটগল্পগ্রন্থে ‘লাল কাতান’ শীর্ষক একটি গল্প আছে, গ্রন্থের প্রথম গল্প। এই গল্পে নগর ও গ্রাম্য জীবনের যুগপৎ এক চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক। ‘বিবর্ণ বিকেল’ গল্পটি প্রেমের গল্প যেন ভালোবাসার দীপ্ত আলোয় উদ্ভাসিত। ‘প্রতিধ্বনি’ গল্পে লেখক শহুরে এলাকার গার্মেন্টস শিল্পের নিরাপত্তাহীনতার কথা তুলে ধরেছেন। ‘থুতু’ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের গল্প। ‘আশ্রয়’ ও ‘বক্তৃতা’ গল্প দুটি মুক্তিযুদ্ধের গল্প। ‘কুস্তি’ গল্পে দেখা যায় কীভাবে স্থুল বিষয়ও সিরিয়াস হতে পারে। ‘প্রতিশ্রুতি’ গল্পে দুর্বলের প্রতি সবলের চিরায়ত উপেক্ষার বিষয়টি ফুটে উঠেছে। ‘হৃদয়বান’ গল্পে ছাত্র রাজনীতির ঠোটখাঠো অথচ স্পর্শকাতর বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি দেয়া হয়েছে। অন্যান্য গল্পেও রয়েছে বিষয় ও মেজাজের বৈচিত্র্য।
জামান মাহবুবের প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ বা ছোটগল্পগ্রন্থ বা অন্য যেকোনো সাহিত্য মাধ্যমের গ্রন্থ সংখ্যা বা প্রকাশনার সংখ্যা দিয়ে গল্পকার হিসেবে তাঁকে বিচার করা সমীচীন হবে না। তিনি প্রকৃতপক্ষেই একজন ছোটগল্প লেখক। লেখার মান, বৈশিষ্ট্য একজন জাত ছোটগল্প লেখকের। লেখকের মেজাজটাই আসল। ‘ছোটগল্প পাঠকের প্রস্তুতি’ শীর্ষক প্রবন্ধে হামীম কামরুল হক যথার্থই বলেছেন, ‘লেখক হুট করে জন্ম নেয় না । একই কথা পাঠকের ক্ষেত্রে । যারা লেখেন তারা সবাই যেমন লেখক নন, হালি গ-া বই প্রকাশ করেও নন, তেমনি শত শত বই পড়েও পাঠক হয়ে উঠতে পারেন না অনেকে । একটা পর্যায়ে রয়ে যান । সময় কাটাতে এরা কেবল পড়ে যান, বা বলা যায় নেশার মতো পড়ে যান, কিন্তু পাঠকের প্রকৃত সত্তাটি অর্জন করতে পারেন না । এই সত্তা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিণত হয়ে ওঠে, ম্যাচুরিটি অর্জন করে ...।’
‘লাল কাতান’ ছোটগল্পগ্রন্থটি ২০১৮ সালে একুশে বইমেলা উপলক্ষে প্রকাশিত। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘চৈতন্য’ কর্তৃক প্রকাশিত গ্রন্থটির বিনিময় মূল্য ১৭৫ টাকা। লেখকের সহধর্মিনী রোশনা চৌধুরীকে উৎসর্গকৃত গ্রন্থটির বহুল প্রচার কামনা করি।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT