শিশু মেলা

অর্ণ বর্ণ পুচ্ছ

আসাদ জোবায়ের প্রকাশিত হয়েছে: ১৮-০৭-২০১৯ ইং ০২:২২:২৫ | সংবাদটি ১১৯ বার পঠিত

ঘুড়ির সঙ্গে বন্ধুতা করে উড়ে বেড়াতে বেশ লাগে অন্তুর। শূন্য বাতাসে হাত-পা ছড়িয়ে উড়ে বেড়ানোর মতো রোমাঞ্চ কি আর হয়? উড়তে উড়তে দেখা হয়ে যায় মেঘদের সঙ্গে।
ও মেঘ ভাই, তুমি কি এখন বৃষ্টি হয়ে ঝরবে? গরমে যে মানুষ বড় হাঁপিয়ে উঠেছে।
মুচকি হেসে একদলা মেঘ বলে- না ভাই, আমি এখনো অনেক হালকা। তোমার মতো দেশ-বিদেশ উড়ে বেড়ানোর শখ নেই বুঝি আমার? দখিনা বাতাসে হেলান দিয়ে আরেকটু ঘুরে বেড়াতে চাই। তবে আমার ওজন বেড়ে গেলে ঝরে পড়ব ঠিকঠিক।
অন্তু বলে- ঝরে পড়ার আগে আমাদের বলো। না হলে যে ভিজে যাব। মা বকবেন খুব। তাছাড়া জ্বর আসতে পারে।
হো হো করে হেসে ওঠে মেঘের দলাটা। বলে- পাগল তুমি একটা। বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ার আগে তো আমরা কত ডাকাডাকি করি, আমাদের গা বিদ্যুতায়িত হয়ে বিজলি চমকানি হয়। এসব দেখনি বুঝি তুমি?
দেখেছি তো। তবে অনেক সময় কিছু না বলেই বৃষ্টি হয়। তাই বললাম আর কি।
মেঘের সঙ্গে কথা বলতে বলতে আবার নিজের ঘরে ফিরে আসে অন্তু। ঢাকার পূর্ব রামপুরায় ৫ তলা একটি বাড়ির তিন তলায় থাকে অন্তুরা। এই বাড়ির পাশে বড় বড় দালান উঠে গেছে। আলো-বাতাস নেই বললেই চলে। অন্তুর ঘরের জানালা বরাবর একটি চারতলা বাড়ির ছাদের ওপর দিয়ে এক টুকরো আকাশ দেখতে পায় অন্তু। সেই আকাশের দিকে তাকিয়ে পুরো বিকেল কাটিয়ে দেয় অন্তু। সন্ধ্যার ঠিক পরপরই বাসায় টিচার আসে। টিচারের পড়া, স্কুল ও কোচিংয়ের পড়া বিকেলেই সেরে ফেলতে হয় তাকে।
বিকেলে একা একা পড়তে পড়তে আনমনে এক টুকরো আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে অন্তু। সেখানে ভেসে বেড়ায় কয়েকটা লাল-নীল ঘুড়ি। কারা উড়ায় জানে না অন্তু, তবে ঘুড়িগুলো বেশ চেনা। প্রতিদিন ওদের দেখতে দেখতে আপন করে নেয় অন্তু। নাম দেয়
একেকটার। একটা লাল ঘুড়ির নাম দেয় অর্ণ। নীল ঘুড়ির নাম দেয় বর্ণ। সাদা রংয়ের লেজওয়ালা ঘুড়ির নাম পুচ্ছ। অন্তু ফিসফিস করে চিৎকারের ঢঙে বলে-
অর্ণ বর্ণ পুচ্ছ-
তোমাদের আমি বন্ধু
কী বলেছি বুঝছো?
অর্ণ ও বর্ণকে একটু অহঙ্কারী মনে হয়। কেমন ঠোঁট উঁচু করে উড়তে থাকে। তবে লেজওয়ালা ঘুড়ি অন্তুর দিকে হেলে আসে। লেজ দুলিয়ে বলে- হ্যাঁ বুঝেছি তো বন্ধু। তুমিও এসো না আমাদের সঙ্গে? বাতাসে ভর দিয়ে উড়ে বেড়ানোয় কত্ত মজা, আসলেই দেখতে পাবে।
অন্তু চোখ বন্ধ করে বড় একটা নিশ^াস নেয়। তারপর কল্পনার পাখনা মেলে দেয় দুই পাশে। জানালার ফাঁক গলে উড়ে যায় নীলের দেশে।
উড়তে উড়তে অহঙ্কারী ঘুড়ি অর্ণ ও বর্ণর কাছে যায় অন্তু। বলে- কী ভাই, তোমরা কি আমার সঙ্গে কথা বলবে না? অর্ণ ও বর্ণ আরো উপরে উড়ে যায়। মন খারাপ
হয়ে যায় অন্তুর। পুচ্ছ তাকে সান্ত¡না দেয়। বলে- মন খারাপ করো না বন্ধু। তুমি আমাদের সঙ্গে উড়তে থাকো। দেখবে এক সময় ঠিক সবাই তোমার বন্ধু হয়ে যাবে।
এমন সময় একটা কালো রংয়ের ঘুড়ি দ্রুতগতিতে অর্ণ ও বর্ণর দিকে ছুটে যায়। পুচ্ছ চিৎকার বলে- অন্তু ভাই, ওই কালো ঘুড়িটা আমাদের শত্রু। বারবার আমাদের সুতো কেটে দেয়ার চেষ্টা করছে। এখন সে অর্ণ ও বর্ণর সুতো কাটার চেষ্টা করবে। তুমি যদি কালো ঘুড়িটার ঘাড় মটকে দিতে পার, তবে অর্ণ ও বর্ণ ঠিক তোমার বন্ধু হয়ে যাবে।
অন্তু দ্রুত উড়ে গেল কালো ঘুড়ির দিকে। গিয়ে গলা চেপে ধরল। কালো ঘুড়িটা বলল- ভাই, মাফ করে দাও। আমি আর কারো সঙ্গে হিংসা করব না। কারো সুতো কেটে বিপদে ফেলে দিব না। গলাটা ছেড়ে দাও ভাই, নিশ^াস না নিতে পারলে যে আর বাঁচি না আমি।
অন্তু কালো ঘুড়ির গলা ছেড়ে দেয়। সাঁই সাঁই করে ঘুড়িটা অন্যদিকে উড়ে যায়। এরপর অর্ণ ও বর্ণ চলে আসে অন্তুর কাছে। বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেয়। অর্ণ, বর্ণ, পুচ্ছ ও অন্তু- ওরা এখন চার বন্ধু। উড়ে বেড়ায় আকাশে। উড়তে উড়তে মেঘেদের বাড়ি যায়। দলা দলা একেকটা মেঘের সঙ্গে গল্প করে ওরা। বৃষ্টির কথা, বিজলি চমকানোর কথা ওরা জেনে নেয়। জমাট বাঁধা মেঘের ঘর্ষণে বিদ্যুৎ তৈরি হয়। মেঘের উপরের দিকে পজেটিভ আর নিচের দিকে নেগেটিভ বিদ্যুৎ জমা হতে থাকে। এক সময় নিচের দিকের নেগেটিভ বিদ্যুৎ পৃথিবীর পজেটিভ কোনো বস্তুর দিকে যখন ছুটে আসে তখনই বিজলি চমকায়, বজ্রপাত হয়। মেঘেদের কাছ থেকে এসব তথ্য জেনে নেয় অন্তুরা চার বন্ধু।
হঠাৎ মায়ের ডাকে চমকে ওঠে অন্তু। চোখ মেলে দেখে সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। মা ঘরের আলো জ্বেলে দিয়ে বলেন- আমি নামাজে দাঁড়ালাম। তোমার টিচার এলে দরজা খুলে দিও। অন্তু আবার সেই ছকবাঁধা রুটিনের জালে বন্দি হয়ে যায়। কাল বিকেল পর্যন্ত চলবে সেই রুটিন।
কাল বিকেলে আবার দেখা হবে প্রিয় বন্ধু অর্ণ, বর্ণ ও পুচ্ছর সঙ্গে। ভাবতে ভাবতে জানালা বন্ধ করে দেয় অন্তু।
ক’দিন পরেই শুরু হয় দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষা। পরীক্ষা শেষে কোচিং হয়ে বাসায় আসতে আসতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। অর্ণ, বর্ণ ও পুচ্ছর সঙ্গে আর দেখা হয় না। সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে অন্তু। ঘুড়িবন্ধুদের জন্য মন কেমন কেমন করে।
একদিন পরীক্ষা শেষ হয়। তাড়াতাড়ি অন্তু বাসায় ঢোকে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়। অন্তু জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু ঘুড়িবন্ধুদের দেখা মেলে না। সন্ধ্যার কালো চাদরে ঢেকে যায় বিকেল। অর্ণ, বর্ণ ও পুচ্ছর দেখা নেই। চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ে দুই গাল বেয়ে। গাল মুছে আম্মুর মোবাইল নিয়ে হোমটিচারের কাছে কল দেয় অন্তু- স্যার, কাল একটু আগে আসতে পারবেন? আপনাকে নিয়ে একটু বের হবো। ঠিক আছে স্যার, আমি বিকেলে রেডি থাকব। পরদিন বিকেলে টিচারকে নিয়ে বের হয় অন্তু। কোথা থেকে ঘুড়িগুলো ওড়ানো হচ্ছিল, তাই খুঁজতে থাকে তারা। খুঁজতে খুঁজতে বনশ্রীর ওদিকটাতে চলে যায় তারা। সেখানে তারা খেয়াল করে একটা ফাঁকা জায়গায় খোঁড়াখুঁড়ি চলছে। ভবন নির্মাণের জন্য।
পাশের এক দোকানদারের কাছ থেকে অন্তুরা জেনে নেয় এখানেই ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা খেলাধুলা করত, ঘুড়ি উড়াতো। এখন এখানে ভবন নির্মাণ হবে, তাই খেলাধুলা বন্ধ।
দোকানদারের কথায় খুব কষ্ট পায় অন্তু। ছোটদের খেলার জায়গা এভাবেই কমে যাচ্ছে। আরো ছোট হয়ে যাচ্ছে অন্তুর আকাশ।
দোকানে কয়েকটা ঘুড়ি ঝুলে থাকতে দেখে এগিয়ে যায় অন্তু। টিচারের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে তিনটি ঘুড়ি কেনে- লাল, নীল ও সাদা রংয়ের।
এরপর বাসায় এসে তিনটি ঘুড়িই দেয়ালে আঠা দিয়ে ঝুলিয়ে দেয়। নিচে মার্কারি কলম দিয়ে লিখে দেয়- অর্ণ, বর্ণ ও পুচ্ছ।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT