বিশেষ সংখ্যা

সাফল্য ও অগ্রগতির ৩৫ বছর

এ এইচ এম ফিরোজ আলী প্রকাশিত হয়েছে: ১৮-০৭-২০১৯ ইং ০২:৩১:৪৪ | সংবাদটি ৫৭ বার পঠিত

১৮ জুলাই। ‘দৈনিক সিলেটের ডাকের জন্মবাষির্কী। পত্রিকাটি ১৯৮৪ সালের ১৮ জুলাই যাত্রা শুরু করেছিল। আঞ্চলিক এ পত্রিকাটি তার গুণগত মান বজায় রেখে জাতীয় পত্রিকার মত প্রশংসা কুড়িয়েছে। পত্রিকাটি এক নাগাড়ে সাড়ে ৩ দশক যাত্রা অব্যাহত রাখবে, এ কথা কারো কল্পনায় ছিলনা। সিলেটে অনেক দৈনিক পত্রিকা যাত্রা শুরুর পর অল্প সময়ে বন্ধ হয়েছে। দানবীর ড. রাগীব আলী ও তাঁর সহধর্মিনী মরহুমা রাবেয়া খাতুন চৌধুরীর পরিশ্রম ও ব্যয়বহুল পত্রিকা চালানোর দৃঢ় মনোবলই হচ্ছে ডাকের সাফল্যের মূল কারণ। অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজ মরহুম আব্দুল হান্নান চৌধুরী পত্রিকাটির ব্যবস্থাপনা ও শৃংখলা সৃষ্টি করে রেখে গিয়েছেন। এ কারণে বলা হয় সিলেটের ডাক বেঁচে থাকাটা স্বার্থক। দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় অনেক বাঁধা- বিপত্তি, ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করে শুধু জনপ্রিয়তা নয়, জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জনে সক্ষম হয়েছে এ পত্রিকাটি। রাজনীতি, অর্থনীতি, কৃষি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, শিল্প ও ব্যবসা বাণিজ্য প্রকৃতি পরিবেশ বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলের অবকাঠামোগত উন্নয়নে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করছে সিলেটের ডাক। সিলেটবাসীর যে কোন দুর্দিনে পাশে ছিল পত্রিকাটি।
আমি পত্রিকাটির সাফল্য, অগ্রগতি, সুখ, দুঃখ, ঘাত-প্রতিঘাত খুব কাছ থেকে দেখেছি। দীর্ঘ সময়ের অভিজ্ঞতায় আমার বিশ্লেষণে পত্রিকাটি কখনও কারো পক্ষে-বিপক্ষে একপেশে হয়নি, কিংবা মালিকপক্ষের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে চিন্তা করা হয়নি। পত্রিকাটির মূলনীতি সিলেট তথা দেশবাসীর স্বার্থ এবং মানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা ও নিরপেক্ষতার ক্ষেত্রে শতভাগ স্বচ্ছ ও সঠিক। নীতি-নৈতিকতা পেশার শৃংখলা বা ব্যবস্থাপনা নিজস্ব মান-মর্যাদা রক্ষা করে পত্রিকাটি অনেক দূর এগিয়ে আছে। জাতীয়-আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ কাভার করে পত্রিকাটি জাতীয় পর্যায়ে অনেক সুনাম অর্জন করেছে। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতসহ এশিয়ার অনেক দেশের কূটনৈতিক পত্রিকাটির অফিস পরিদর্শন করে ব্যবস্থাপনাসহ সার্বিক সাফল্য দেখে ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।
পত্রিকাটির সাথে আমার জীবনের না বলা অনেক স্মৃতি জড়িত। তথ্য প্রযুক্তির এ সময়ে লেখালেখি এখন একেবারে সহজ। কিন্তু তখন ছিল খুবই কঠিন। কঠিন এ কাজের জন্য কঠোর পরিশ্রম করতে হতো। অনেক প্রতিকূল অবস্থা উপেক্ষা করে পায়ে হেঁটে, বাসে কিংবা, ট্রেনে সংবাদ সংগ্রহ করে অফিসে নিয়ে হাজির হয়েছি। মাঝে মধ্যে বাসের ড্রাইভার কিংবা হেলপারের কাছে নিউজপ্রিন্টে লেখা কাগজ পাঠালে তা হেরেও যেতো। জরুরি সংবাদের বেলায় বিশ্বনাথ থানা সদরে গিয়ে এনালগ টেলিফোনে নিউজ প্রেরণ করতে হতো। সবদিন আবার পত্রিকা পড়া ছিল কঠিন। আমার গ্রামের পাশে রাজাগঞ্জ বাজার পোস্ট অফিসের মাধ্যমে প্রতিদিন আমার নামে একটি পত্রিকা পাঠালে সেই কপি ৩-৪ দিন পরে পাওয়া যেত। এতে ব্যবসায়ী ছাত্র শিক্ষকরা পালাক্রমে পত্রিকাটি পড়তেন। এখন এ অঞ্চলে স্থানীয়-জাতীয় দৈনিকের শতাধিক পাঠক রয়েছেন। এটাও দৈনিক সিলেটের ডাকের অবদান।
বিশ্বনাথ উপজেলার রাস্তাঘাট, স্কুল-কলেজ, মাদরাসা-মসজিদ, হাটবাজার, নদী খাল এবং কৃষির সমস্যা ও সম্ভাবনা লিখেছি। জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান অসহায় মুক্তিযোদ্ধাদের অভাব অনটন দুঃখ দুর্দশা এবং বীরত্বগাঁথা লিখেছি। যেসব গ্রামে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নেই, সেখানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন এবং যে সকল প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকারীকরণ হয়নি, সে ব্যাপারেও কলম ধরেছি। সিলেট ও বিশ্বনাথের যানজট নিরসনে বাইপাস সড়কের কথা লেখালেখি করায় অনেকগুলো বাইপাস সড়ক নির্মিত হয়েছে। অনেক দিন সকালে বাড়ি থেকে বের হয়ে সারা দিন খেয়ে না থেকে নিউজ সংগ্রহ করে পত্রিকা অফিসে জমা দিয়ে গভীর রাতে বাড়িতে পৌঁছে ভাত খেয়েছি।
আমাদের জাতীয় রাজনীতিতে সিলেটের কৃতি সন্তান যারা ছিলেন, সবসময় তাদের পাশে থেকেছে দৈনিক সিলেটের ডাক। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদ, স্পীকার হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী, ভাটি বাংলার সিংহ পুরুষ সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক দেওয়ান ফরিদ গাজি, প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী এসএম কিবরিয়া, এম সাইফুর রহমান, সদ্য বিদায়ী অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত, পীর হবিবুর রহমান, বরুণ রায়সহ এসব জাতীয় নেতারা সিলেটে আসলেই সিলেটের ডাক পত্রিকা পাঠ না করে ভোরের চা পান করতেন না। পত্রিকাটির প্রতি তাদের অনেক আস্থা ও বিশ্বাস সৃষ্টি হয়েছিল। ২০০৪ সালে সিলেটে এসে ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক মরহুম আব্দুর রাজ্জাকসহ কয়েকজন জাতীয় নেতা। সিলেট সার্কিট হাউসে আমি তাজ উদ্দিন খান শিশু, আবুল লেইছ (যাকে লেইছ ভাই নামে সকলে চিনেন) আমরা কয়েক জন তাদের খাবার পরিবেশনের দায়িত্বে ছিলাম। হঠাৎ আব্দুর রাজ্জাক আমাকে বলেছিলেন, ‘তোমাদের সিলেটের একটি দৈনিককে ইত্তেফাক বলে ডাকা হয় কেন? দেখি নিয়ে আসো, আমাদের কী কাভারেজ করেছে? আমি সাথে সাথে দুটি সিলেটের ডাক পত্রিকা তাঁর হাতে তুলে দেয়ায় তিনি জনসভার সচিত্র প্রতিবেদন দেখে মুগ্ধ হয়ে ডাক পত্রিকার প্রশংসা করেছিলেন।
এরশাদ সরকারের আমলে সিলেটের ছাত্ররাজনীতি যখন উত্তপ্ত ছিল, তখন সিলেটের ছাত্র আন্দোলনের পাশে ছিল পত্রিকাটি। কখন, কোথায়, কোন ছাত্রদের প্রেফতার কিংবা অত্যাচার নির্যাতন করা হচ্ছে কিনা খুঁজে খুঁজে নিউজ করতো পত্রিকাটি। আন্দোলনের এক পর্যায়ে এরশাদ সিলেটের ছাত্রনেতাদের সাথে গোপনে আপোস করেন। এ সুযোগে কেউ কেউ বিদেশেও ভ্রমণ করেন। ছাত্রনেতাদের একটাই দাবি ছিল যে, সিলেটে একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিলে এরশাদ সিলেটে জনসভা করতে পারবেন। এ প্রস্তাবে রাজি হয়ে এরশাদ সিলেটের শাহী ঈদগাহ ময়দানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের ঘোষণা দেন। আজকের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় সিলেটের ছাত্র আন্দোলনের ফসল। এ আন্দোলনে আমি নিজে একজন কর্মী হিসেবে ছিলাম। এরশাদ সরকারের পুলিশের মারপিট খেয়ে অনেক ছাত্র পঙ্গু জীবনযাপন করছেন। এর মধ্যে জাসদ ছাত্রলীগের জাকির হোসেন। বর্তমানে তিনি কোথায় আছেন জানিনা। এসময় আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে ছিলেন মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ (এডভোকেট), মোস্তাক আহমদ (এডভোকেট), বিজিত চৌধুরী, এটিএম ফয়েজ (এডভোকেট), তাজ উদ্দিন খান শিশু, সুজাদ আলী রফিক, আসাদ উদ্দিন। অন্যদের মধ্যে ছিলেন, আবুল লেইছ, মরহুম রাজন ভাই, আশফাক আহমদ সহ আরো অনেকই ছিলেন যাদের নাম আমি এ মুহূর্তে স্মরণ করতে পারছিনা বলে দুঃখ প্রকাশ করছি। আমার কলেজের সহপাঠি ধর্মদা গ্রামের খলিল আহমদকে এসময় এইচএসসি ফাইনাল পরীক্ষার পূর্বে পুলিশ ধরে নিয়ে যাওয়ায় সে পরীক্ষা দিতে পারেনি। এতে দীর্ঘদিন জেলে থাকায় তার শিক্ষাজীবন আর অগ্রসর হতে পারেনি।
শুরু থেকে এ পর্যন্ত ডাক পরিবারে যারা ছিলেন, তাদের সকলের শ্রম মেধার অবদান অনস্বীকার্য। এ পত্রিকায় কর্মরত ছিলেন আব্দুস সাত্তার ও ইকবাল সিদ্দিকী, এনামূল হক জুবের, আব্দুল মালিক জাকা, মাহবুবুর রহমান মাহবুব, গোপেন দেব, সাব্বির আহমদ, রিয়াজ উদ্দিন ইসকা, শাহ জাহান (যাকে সবাই মামা বলে ডাকতেন), জামাল আহমদ, আশিক মোহাম্মদ, সায়েদ আহমদ, লুৎফুর রহমান, সালেহ আহমদ খান, মো: জুবায়ের, আব্দুর রাহমান, মঈনুদ্দীন মজনু, খালেদ আহমদ, সামসুল আলম, আব্দুল ওয়াহিদ রাজু এবং পুরাতনদের মধ্যে বর্তমানে কর্মরত আছেন, সমরেন্দ্র বিশ্বাস, আব্দুস সবুর মাখন, সিরাজুল ইসলাম, এম আহমদ আলী সহ একঝাক তরুণ সাংবাদিক। নির্বাহী সম্পাদক আবদুল হামিদ মানিক দিবানিশি পরিশ্রম করে পত্রিকাটি পরিচালনা করছেন। দীর্ঘদিন পত্রিকাটির ব্যবস্থাপনা সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন দেওয়ান তৌফিক মজিদ লায়েক। তিনি ছিলেন আমার কলেজ জীবনের সহপাঠি। পত্রিকার জন্য তার পরিশ্রমও অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই। দানবীর ড. রাগীব আলীর নির্দেশনায় বিশাল এক প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছে দৈনিক সিলেটের ডাক। আজকের এই শুভ দিনে সকলকে জানাই শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। সিলেটের ডাক এদেশের অসহায় গরীব দুঃখী মানুষের পক্ষে কথা বলুক, এটাই প্রত্যাশা।
লেখক : কলামিস্ট

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT