বিশেষ সংখ্যা

বিবর্ণ আলো

আব্দুস সবুর মাখন প্রকাশিত হয়েছে: ১৮-০৭-২০১৯ ইং ০২:৩৩:২৪ | সংবাদটি ১৪২ বার পঠিত

‘একটা চাকরী আমার একান্ত প্রয়োজন স্যার! না হলে যে আমার রুগ্ন বাবা ওষুধের অভাবে ধুকে ধুকে নিঃশ্বেষিত হয়ে যাবেন, চাকরী না হলে যে দীপা-শান্তানুর পড়া ...!’ শায়লার আকুল আকুতিতে বাধা দিলেন কবির সাহেব। ‘বসুন’! ধীর স্বরে বললেন শায়লাকে।
কলেজে যে ছিলো দুরন্ত-চঞ্চলা-চপলা বালিকা, যে কলেজ ছাত্রসংসদে সর্বদাই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতো; মেধাবী ছাত্রী পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধার সন্তান শায়লা সুলতানা আজ আল্ট্রা ইলেকট্রনিক্স কোম্পানীর ডাইরেক্টার কবির সাহেবের সামনে চেয়ারে বসতে দ্বিধা সংকোচে জড়সড়। হাজার লোকের সামনে যে হাত নেড়ে বক্তৃতা করতে একটুও ভয় পেতোনা, আজ সেই শায়লা অসহায়-ভীরু একটা মেয়ে।
শায়লা কবিতা লিখতো। পত্রিকায় ছাপা হতো কবিতা। তার এক দল ভক্ত পাঠকও ছিলো। রাজনীতি; জীবন, মানুষের অব্যক্ত অনুভূতিগুলোই ছিলো তার কবিতার বিষয়। সে স্বপ্ন দেখতো রঙিন ভবিষ্যতের। ‘জীবন’ তাকে দেখাতো ভবিষ্যতের আলোকোজ্জ্বল রাজপথ। মসৃন সুন্দর সেই পথ জুড়ে কেবলই তাদের দু’জনের হেঁটে চলা হাতে হাত ধরে; আর পথের শেষে ছোট্ট একটা ঘর, যেখানে একজোড়া কপোত-কপোতির বসবাস।
কিন্তু শায়লা এখন আর সেই স্বপ্ন দেখেনা; স্বপ্নের সেই রঙিন বেলুন উড়ে গেছে অজানায়। স্বপ্ন রঙিন রাতের শেষে ভোর আসে, আকাশ ফর্সা হয়না, সূর্য ওঠে না। ধুলোয় ধূসর কঠিন পথ ধরে এখন দিবানিশি চলতে হচ্ছে শায়লাকে। জীবনের কঠিন বাস্তবের মুখে এসে একটা চাকুরীর সন্ধানে হন্যে হয়ে ঘুরতে ঘুরতে শেষে কবির সাহেবের মুখোমুখি হয়েছে শায়লা। চাকরী নামক বস্তুটা এমনই এক দুর্লভ ব্যাপার, যেখানে শত কাকুতি মিনতিই কাজে আসেনা। আর তো ‘মামা ভাগ্নের’ কান্ড। হাজার ইন্টারভিউ দিয়েও শেষ পর্যন্ত ঐ নির্ধারিত ব্যক্তিটিকেই নিয়োগ দেয়া হয়। শায়লাদের মতো ইন্টারভিউ প্রদানকারীরা কেবল বুকভরা আশা নিয়ে চাতকের মতো বসে থাকে। আশা নিরাশার দোলাচলে দোল খায় শায়লা অহর্নিশ। তবুও সে এসেছে বিরাট এক কোম্পানীর পরিচালক কবির সাহেবের সামনে। অথৈ সাগরে ডুবতে বসা কোন ব্যক্তি সামান্য খড় কুটোর কাছেও যেমন আশ্রয় খুঁজে তেমনি শায়লা কবির সাহেবের মুখোমুখি চেয়ারে বসে আছে। অপেক্ষা করছে কবির সাহেবের মুখ থেকে যদি কোন আশার বাণী বের হয়, তার জন্য।
হাত ঘড়িতে চেয়ে দেখে বিকেল পাঁচটা বেজে গেছে। অস্বস্থি উৎকণ্ঠায় আড়ষ্ট হয়ে পড়ে শায়লা। নিজেকে বড়ই অসহায় মনে হচ্ছে। নানা ভাবনা এসে ভীড় করেছে মাথায়; একে দুশ্চিন্তাও বলা যায়। অজানা ভয় ঘিরে ধরেছে তারে।-‘আচ্ছা, কতোটুকু পড়েছেন?’ কবির সাহেবের কথায় চমকে ওঠে সে। ফিরে আসে ভাবনার রাজ্য থেকে। ... জ্বি এবছর দ্বিতীয় বিভাগে বি.কম পাস করেছি’। -‘তারপর?’ কিছুটা উৎসুক্য কবির সাহেবের চোখ। মাথা তুলে কবির সাহেবের চোখে চোখ রাখে। মুহূর্তকাল। নামিয়ে নেয় চোখ। কবির সাহেবের তীক্ষ্ম চাহনী তার মনের কষ্ট বাড়িয়ে দেয়। কী জবাব দেবে ভেবে পায়না। বলে-‘লেখাপড়া কি আর সম্ভব স্যার? এতোদিন মা’র দেয়া খরচে লেখাপড়া চালিয়েছি; এক মাস আগে মা-ও মারা গেলেন। আর এখানেই আমাকে লেখাপড়ায় ইতি দিতে হয়েছে। সাথে সাথে বন্ধ হতে চলেছে ছোট দুটো ভাইবোনের লেখাপড়া। আর পঙ্গু বাবাতো প্রায় মৃত্যু পথযাত্রী।’ ... শায়লার দুই চোখের কোণে অশ্রু জমে। হাতের আঙ্গুলে চোখ মুছে। তার সুনিপুণ হাত, হাতের পাতা, জলে ভেজা মসৃণ কপোল, চোখ জোড়ানো মনকাড়া মুখাবয়বে চেয়ে থাকে এক দৃষ্টিতে কবির সাহেব। শায়লা চোখ নামায় না। কবির সাহেবের বিষমাখা দৃষ্টিকে উপেক্ষা করে বলে-‘আমার একটা চাকরী একান্ত না হলে নয় স্যার। বাবাকে বাঁচাতে, ভাইবোনের লেখাপড়ার জন্য ...।’
ঃ আপনার নাম কিী যেন বলছিলেন?
ঃ শায়লা সুলতানা। বিন¤্র চিত্তে জবাব দেয় শায়লা। তারপর আবার নীরবতা।
কেটে যায় অনেকক্ষণ। তার ধৈর্য্যরে বাধ ভেঙে যায়। তবু কিছু বলতে পারেনা। উঠতে চায় শায়লা। অফিসের সবাই চলে গেছে। কেবল বারান্দায় দু’তিনজন পিয়ন-বেয়ারার বিচরণ লক্ষ করা যাচ্ছে। ঘনিয়ে এসেছে আঁধার। জানালা দিয়ে দেখছে শায়লা দূরে নিয়ন বাতিগুলো জ্বলছে। শহরের বড় রাস্তাগুলো আলোয় আলোয় ভরে গেছে। আলোর বন্যায় যেন ভেসে যায় পলকেই। খুলে যায় তার জীবনখাতার হারিয়ে যাওয়া অধ্যায়। মনে পড়ে যায় ‘জীবনের’ কথা। এরূপ আলোকজ্জ্বেল সন্দর পথের কথাই বলতো জীবন শায়লাকে। মুগ্ধ হয়ে সেসব কথা শুনতো শায়লা। জীবন বলতো-‘যদি শত দুঃখ আসে, আসে যদি ঝড়-তবু আমরা হালছাড়া হবোনা শায়লা। তোমার পাশে পাশে রবো।’-আর ভাবতে পারে না সে। তার চোখ জলে ভিজে যায়। অভিমান, ক্ষোভ, ঘৃণা জমে জীবনের প্রতি। নিজের অজান্তেই বিড়বিড় করতে থাকে ‘না-না জীবন, সব মিথ্যা বলেছো। এতোদিন, তুমি প্রতালক মিথ্যাবাদী। তুমি শুধু অভিনয় করেছো আমার সাথে।’ ভেজা চোখ মুছে। বদলে গেছে চোখের রং। পটলচেরা ডাগর চোখে রঙিন আভা। ‘রাত ঘনিয়ে এসেছে, এখন উঠি স্যার?’ বলেই উঠে গেলো শায়লা চেয়ার থেকে।
ঃ আরে বসেন বসেন। সন্ধ্যে তো হলো মাত্র, চাকরী করবেন আর একটু বসতেও সহ্য হয় না?
ঃ না, মানে ...
ঃ মানে টানে কিছু না। এতোক্ষণে চেয়ার ছেড়ে উঠলেন কবির সাহেব।
ঃ আসেন।
ঃ কোথায়? –বিস্মিত শায়লা।
ঃ না না, ওই তো সামনের রুমে। এখানে বসে না হয় গল্প করা যাবে। ভয়ে, শংকায় সংকোচিত শায়লা।
ঃ আজ না হয় যাক। অন্যদিন গল্প করা যাবে। দুষ্টুমি হাসি কবির সাহেবের ঠোঁটে।
ঃ আপনি তো দেখছি কিছ্ইু বুঝেন না, এতো সময় আপনাকে কেন বসিয়ে রেখেছি বলতে পারেন? ক্ষণিকের জন্য হলেও কিছু আনন্দ, কিছু ফুর্তি, সুখের অনুসন্ধান; এটাই তো জীবন। কী বলেন?
যে ছিলো জীবনের স্বপ্নের রাণী, যাকে নিয়ে সে ঘর বাধবে বলে কল্পনার জাল বোনে আসছে, মাস দুই দেখা হয়নি বলে বাসা থেকে এখানকার খোঁজ নিয়ে এসেছে সেই শায়লার। সে এখন হিং¯্র বাঘের থাবার সামনে ভীত সন্ত্রস্ত বনো হরিণী। যেমন করে জলসা ঘরে মদের খালি পাত্র নিয়ে ভীরু সাকী কেবলই অসহায় কাঁপতে থাকে, সেই অবস্থা এখন তার। পালাতে চাইছে। কিন্তু চারদিকে বাধার কঠোর দেয়াল। নিস্তব্দ ঘরে প্রতিধ্বনিত হয় শায়লার কাকুতি মিনতি। জীবন শুনতে পায় তার সবচেয়ে প্রিয় পরিচিত কণ্ঠের কাঁপা কাঁপা শব্দগুলো। শুনতে পায় অচেনা পুরুষ কণ্ঠ-‘চাকরীটা তোমারই হবে’।
শায়লার জীবন যেখানে মৃত্যুর কাছাকাছি, যেখানে নিজের মুখচ্ছবি সমাজের সামনে নিয়ে আসতে তার বার বার যেন একটা প্রাচীরে আটকা পড়ছে, সেখানে কবির সাহেবের মুখ থেকে অতি আখাংকিত কথাটি শুনে আধারের বুক চিরে আলোর ঝলকানি দেখতে পেলো। যেন খুঁজে পেলো জীবনের মুখ থেকে উচ্চারিত কল্পিত সেই ‘আলোকিত রাজপথের বাস্তব রূপ’।
... তবে সত্যিই কি শায়লা ...!’ জীবন ভাবে অনেক কিছু। তারপরে ভাবনার দরজাও বন্ধ হয়ে যায়। কবির সাহেবের টেবিলের মুখোমুখি যে চেয়ারটিতে বসেছিলো শায়লা, সেখানেই বসে বসে গুনতে থাকে মিনিট সেকেন্ড! ... তখনই জীবনের সামনে এসে দাঁড়ায় শায়লা। সে তখন নিথর-নিস্তব্ধ পাথরের মূর্তি।

 

শেয়ার করুন
বিশেষ সংখ্যা এর আরো সংবাদ
  • সিলেট ও রবীন্দ্রনাথ
  • দার্শনিক রবীন্দ্রনাথ
  • রবীন্দ্রনাথ ও মাছিমপুরের মণিপুরী বিষ্ণুপ্রিয়া
  • রবীন্দ্রনাথের হাতে ১২শ’ টাকার চেক দিয়েছিলেন এক সিলেটি
  • বাঙালির শোক ও বেদনার দিন
  • ইতিহাসের চোখে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড
  • দাবায়ে রাখতে পারবা না
  • কুরবানি : ইতিহাসের আলোকে
  • রক্তিম সূর্য
  • খুঁজে ফিরি সেই লেইছ ফিতা
  • কুরবানি ও কয়েকটি মাসআলা
  • সত্য ও ন্যায়ের পক্ষেই আমাদের দৃঢ় অবস্থান
  • আমার লেখকস্বত্তার অংশীদার
  • এই জনপদে ঐতিহ্যের ধারক সিলেটের ডাক
  • প্রিয় কাগজ, সাহসী কাগজ
  • পাঠকের প্রিয় সিলেটের ডাক
  • পাঠকনন্দিত সিলেটের ডাক
  • সিলেটের ডাকের তিন যুগ
  • সিলেটের ডাকের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে
  • সিলেটের ডাক : আলোর দিশারী
  • Developed by: Sparkle IT