বিশেষ সংখ্যা

আমার ‘সিলেটের ডাক’

ব্রজেন্দ্র কুমার দাস প্রকাশিত হয়েছে: ১৮-০৭-২০১৯ ইং ০২:৩৯:৫৯ | সংবাদটি ৪৬ বার পঠিত

দিরাই এর সুয়াতিয়র গ্রামের আবুবকর চৌধুরী অর্থাৎ সবার প্রিয় লেবু ভাই তদ্বীয় ভ্রাতা আবুল খয়ের চৌধুরী (লন্ডন প্রবাসী), আবু আব্দুল্লা চৌধুরী মাসুদ (জেলা পরিষদ সদস্য) ওনাদের কাছে আমি এবং আমার সহধর্মিনী এতোটাই ঋণী যে এমন ঋণ জীবনে কখনো পরিশোধযোগ্য নয়। আর পরিশোধের চিন্তা করাটাও এক ধরনের ঔদ্ধত্য বৈ কিছু নয়। ওনাদের সাথে আমার আত্মীয়তার সম্পর্কটা মিষ্টিমধুর কিন্তু কখনো কখনো তেতু। আমাদের উদ্দেশ্যে তাদের মুখ নিঃসৃত শব্দ দু’টি ‘জামাইবাবু’ আর ‘দিদি’ হৃদয় ছুঁয়ে যায়। বারবার ভাবি বাঙালি সংস্কৃতি কতই না হৃদয়গ্রাহী-আবেগঋদ্ধ। ‘হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল’। মনে পড়ে কবি গুরুর সেই কথা-‘সংসারে আপন পর কেহই নাই। যে আপন মনে করে সেই আপন-যে পর বলিয়া জানে সে আপন হইলেও তাই।’
০৩.০৭.২০১৯ তারিখ সকালে মোবাইলটা বেজে উঠলো। ভেসে এলো মধুমাখা সেই ‘দিদি, জামাইবাবু’ শব্দ দু’টি। বুঝতে অসুবিধে হলো না-লেবু ভাই! বল্লেন-জামাই বাবু’ আপনার ‘সিলেটের ডাক’ পড়লাম। ভদ্রলোকের কথায় মনে হলো ‘সিলেটের ডাক’ বুঝি একান্তভাবেই আমার। সিলেটের ডাক তো কোটি কোটি সিলেটবাসীর। তারপরও লেবু ভাই এর কাছে কেন সিলে্েটর ডাক আমার হয়ে গেলো এর তো তাৎপর্য অবশ্যই রয়েছে। এমনি এমনি একটা কিছু বলে দেয়ার মানুষ তো তিনি নন। আসলে লেবু ভাই আমার মনের কথাটিই বলেছেন। এখানেও সেই ঋণের কথা। ‘সিলেটের ডাক’ এর কাছে আমার ঋণ যা কখনো পরিশোধ করা যাবে না। যা নিয়ে মনে মনে শুধু কৃতজ্ঞতা প্রকাশই করা যায় মাত্র। আর এটা যে শুধুই আমার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য তা কিন্তু নয়। আমার কথাই যদি বলি আমি যা লিখি তা বিজ্ঞ পাঠক সমাজের কাছে বিন্দুমাত্র গ্রহণযোগ্য বা পছন্দসই যে নয় তা আমি জানি-বুঝি। তা একান্তই পিচ্ছি কোন ছোকরার আবুল-তাবুল কর্মকান্ড মাত্র। এ সমস্ত কাজ শুধুই অভ্যাসের কারণে। এই কাগজ-কলমের অপচয় এর পেছনে কোন অর্থলোভ, যশলোভ নয়। শুধুই এক ব্যাকুলতা, নিজে যা বিশ্বাস করি তা অন্যকে বলা, মানুষের কাছে প্রকাশের এক যন্ত্রণা। দিনের পর দিন যন্ত্রণায় কাতর হয়েছি। চোখের সামনে আমার সন্তানসম লিখাগুলো উইপোকার আক্রমণে ক্ষত বিক্ষত হতে দেখেছি। কখনো বা বিশ্বাস হারিয়েছি নিজের ওপর। নিজের বিভিন্ন লেখার ওপর। কতো জায়গায় ধর্না দিয়েছি সেকি আর বলতে! কিন্তু আমার লেখাগুলোকে উইপোকা মুক্ত করতে পারিনি।
সেকি এক হৃদয় বিদারক যন্ত্রণা!
তারপর একদিন যন্ত্রণার অবসান। ‘সিলেটের ডাক’ এসে পাশে দাঁড়ালো। ভয়ে পালালো ধ্বংসকারী উইপোকার দল। ধীরে ধীরে আমার পরম শ্রদ্ধেয় সম্মানিত পাঠক সমাজের উঠুনে স্থান পাবার সৌভাগ্য হলো। গৃহ প্রবেশের যোগ্যতা অর্জন করতে না পারলেও সুহৃদ পাঠকগণ আমাকে তাদের বারান্দায় ঠাঁই দিয়েছেন বলেই আমার মনে হয়। আর হেসে-খেলে-আনন্দে বারান্দায় ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ করে দিয়েছে আমার ‘সিলেটের ডাক’। এ সুযোগ পাবার সৌভাগ্য যে শুধু আমারই হয়েছে তা কিন্তু নয়। আমার মতো অনেক ক্ষুদে লেখকই এ সুযোগ থেকে ‘সিলেটের ডাক’ বঞ্চিত করেনি। অনেক সৎ চিন্তার সৎ পত্রিকা অনেক অতি সাধারণ লেখককে তিল থেকে তাল বানিয়েছে। পাকিস্তান আমলে দৈনিক ইত্তেফাকের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, দৈনিক সংবাদ পত্রিকার খায়রুল কবির তাদের পত্রিকার মাধ্যমে কতো প্রতিভাবান লেখককে প্রতিভার বিকাশ সাধনের সুযোগ করে দিয়েছেন, কতো অখ্যাতকে বিখ্যাতে পরিণত করেছেন সে হিসেব আমরা ক’জন রাখি। তাঁদের ঋণের কথা ক’জনের স্মৃতিপটে আজো ভেসে বেড়ায়? জীবনে পাওয়ার হিসাব না করে শুধুই না পাওয়ার দুঃখ-বেদনায় পুড়ে মরি, পাওয়ার শান্তি থেকে বঞ্চিত হই। সেটা অর্থ-বিত্ত-সম্পদ-যশ-খ্যাতি লেখক বা সাংবাদিক জীবনকে ঘিরেও হতে পারে। লেখালেখির জগতে ‘সিলেটের ডাক’ জাতীয় পর্যায়ে ক’জনকে প্রতিষ্ঠা লাভে সহায়তা করেছে সে পরিসংখ্যান আমার কাছে অজানা থাকলেও ক’জনকে যে পাঠক সমাজের চিন্তার বারান্দায় খানিকক্ষণ বসার সুযোগ করে দিয়েছে সে হিসেব অবশ্যই ভুক্তভোগীদের কাছে অজানা থাকার কথা নয়। আমার ‘আপনার চেয়ে আপন’ পাঠক লেবু ভাইয়ের মতো অনেক পাঠক মহোদয় হয়তো তাদের আপনজনের উদ্দেশ্যে বলে থাকেন-‘আপনার সিলেটের ডাক’ পড়েছি। তাইতো বলি ‘সিলেটের ডাক’ শুধুই আমার নয়। সবার।
সাংবাদিকতা জগতে ‘ইয়েলো জার্নালিজম’বলে একটা কথা প্রায় সময়ই বলা হয়ে থাকে। এও বলা হয়ে থাকে যে কোনো পত্রিকা বা সংবাদপত্রকে পাঠক সমাজের কাছে সুস্থ ধারায় টিকে থাকতে হলে তাকে অবশ্যই ‘হলুদ সাংবাদিকতা’ অর্থাৎ ‘Yellow Journalism’ ’ পরিহার করেই চলতে হয়।
নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করি সাংবাদিকতাতো কোন জড়বস্তু নয়, রং থাকবে। তাও আবার হলুদ বা পীত রং। অগত্যা শরণাপন্ন হতে হলো কলকাতার সুধীর চক্রবর্তী সম্পাদিত ‘ধ্রুবপদ’ বার্ষিক সংকলন ৪, ২০০০-এ সুমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায় এর ‘ইয়েলো জার্নালিজম’ প্রবন্ধের। এতে তিনি লিখেন, বেপরোয়া কায়দায় চমকপ্রদ খবর ছাপিয়ে পাঠকদের মনে সুড়সুড়ি দেওয়ার প্রবণতা, বা তাদের কোন কুসংস্কারে ক্রমাগত ইন্ধন যুগিয়ে উত্তেজিত করার প্রবৃত্তিকে ‘পীত সাংবাদিকতা’ আখ্যাদানের পিছনে একটি ইতিহাস রয়েছে’।
কি সে ইতিহাস? ইতিহাসটি হলো-নিউইয়র্কে ‘ওয়ার্লড’ ও ‘জার্নাল’ নামে দু’টি খবরের কাগজ ছিল। ১৮৮৯ সাল থেকে ‘ওয়ার্লড’-এ কৌতুক চরিত্র ছাপা হতে থাকে। ‘ওয়ার্লড’ এ Richard F. outcault নামে একজন ব্যাঙ্গ চরিত্র রচয়িতা ছিলেন। তিনি Hogan’s Alley বা ‘হোগানের গলি’ নামে একটি ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশ করেন। ছবিটির বিষয়বস্তু ছিল শহরের জনাকীর্ণ অঞ্চলের বসতবাড়িগুলির জীবনযাত্রা, আর মূল চরিত্র ছিল-আল খাল্লা পরিহিত একটি ফোকলা শিশু। কে বা কারা ঐ শিশুটির আল খাল্লায় একটু হলুদ রঙের ছোপ লাগিয়ে দেয়। এই শিশুটির চিত্র নিয়ে ‘ওয়ার্লড’ প্রকাশিত হলো তখন এর বিক্রি হু হু করে বেড়ে গেল। সেই থেকে শিশুটি Yellow Kid of Hogan’s Alley বা ‘হোগানের গলির হলুদ বাচ্চা’ নামে পরিচিত হয়ে গেল। ‘ওয়ার্লড’ এর বিক্রি বেড়ে যাওয়ায় জার্নাল (Journal) ও এর সাথে প্রতিযোগিতায় নেমে যায়। এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন সস্তা চটুল উত্তেজক খবর প্রচার করতে থাকে। এতে দেশ জুড়ে কতই না অঘটন ঘটতে থাকে। কমিউনিস্ট বিরোধী প্রচারের ফলে ভিয়েতনামে মার্কিনী সশস্ত্র হস্তক্ষেপের সমর্থনে যুক্তরাজ্যে জনমত তৈরি হয়েছিল। যা ছিল খুবই দুঃখজনক। ‘ওয়ার্লড’ ও ‘জার্নাল’ দুই সংবাদপত্রের প্রতি বিরক্ত হয়ে ‘প্রেস’ (Press) নামক একটি কাগজের সম্পাদক ‘ওয়ার্লড’ ও জার্নাল’কে ‘Yellow Press’ নামে নিন্দা করেন। হোগানের গলির হলুদ বাচ্চাকে নিয়েই সব কিছু শুরু হয়েছিল বলে Yellow কথাটির ব্যবহার। আর সেই থেকে বিশ্বজুড়ে Yellow Journalism বা হলুদ সাংবাদিকতা নামক শব্দ দু’টির অনাকাঙ্খিত জন্ম বা উৎপত্তি।
বলছিলাম কেমন করে সিলেটের ডাক আমার হয়ে গেল তা নিয়ে। ‘সিলেটের ডাক’ শুধু আমার নয় সবার ‘সিলেটের ডাক’ হয়ে উঠার পেছনে আরো একটি অন্যতম কারণ হলো, ‘সিলেটের ডাক’ এর কাছে এই Yellow Journalism বা হলুদ সাংবাদিকতা সব সময়ই নিন্দিত-ঘৃনিত। দেখতে দেখতে ১৮ই জুলাই হাঁটি হাঁটি পা পা করে ‘সিলেটের ডাক’ ৩৬ বছরে পা রাখলো। বয়সের বিবেচনায় যৌবনের শেষ প্রান্তে। বার্ধক্যের পদধ্বনি হয়তো কানে বাজে। কিন্তু চিন্তা-চেতনা-মননে-মনে যৌবনের কথাই বলে।
নাট্যকার ফিলিপ ম্যাসিঞ্জারের ভাষায় সে কথাটি হলো-যে মনের দিক থেকে বৃদ্ধ নয়, বার্ধক্য তার জীবনে আসে না। লেবু ভাইয়ের ভাষায় ‘আপনার সিলেটের ডাক’ ‘আমার সিলেটের ডাক’ হয়ে থাকাটাই আমার ঋণ পরিশোধের প্রকৃষ্ট উপায়। বিশ্বাস আমার মনের দিক থেকে সহজে বৃদ্ধ হবেনা আমার ‘সিলেটের ডাক’।
লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, কলামিস্ট, সাবেক ব্যাংকার।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT