বিশেষ সংখ্যা

আমার লেখালেখি ও সিলেটের ডাক

মাজেদা বেগম মাজু প্রকাশিত হয়েছে: ১৮-০৭-২০১৯ ইং ০২:৪১:০৭ | সংবাদটি ১১৭ বার পঠিত

সময়কে তুলনা করা হয় নদীর ¯্রােতের সাথে। কারণ নদীর ¯্রােতের মতোই সময় কখনো বসে থাকে না গড়িয়ে চলে তার আপন গতিতে। আর এই গড়িয়ে চলা সময়ের সাথে সাথে মানুষের জীবনটাও চলতে থাকে তার আপন নিয়মে। সেখানে তাকে পেরিয়ে আসতে হয় কত ঘাত-প্রতিঘাত, চড়াই-উৎরাই, সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনা, শান্তি-অশান্তি, নীরবতা-কোলাহল সবকিছুর সংমিশ্রণের নামই জীবন। এক জীবনে কাউকে দেখা যায় পাওয়ার আনন্দে বিমোহিত আবার কেউবা না পাওয়ার বেদনায় মর্মাহত। কিন্তু এই এক জীবনে মানুষের চাওয়া-পাওয়ার হিসেব নিকেষে গরমিল থাকবেই। আর এর থেকে কারো জীবন যেমন ব্যতিক্রম নয় তেমনি আমারও।
সেই ছোটবেলা, যখন থেকে বুঝতে শিখি তখন থেকেই দেখে আসছি অন্য পত্রিকার সাথে আম্মা ও বড় বোনদের জন্য বাসায় সাপ্তাহিক ‘বেগম’ পত্রিকা রাখা হতো। লালরঙা উপর নীচ ও মাঝখানে আকর্ষণীয় ছবির প্রচ্ছদে পত্রিকাখানা নেড়েচেড়ে ও ছবি দেখতে ভালই লাগত। এর চেয়ে আরও দ্বিগুণ আকর্ষণীয় ছিল পত্রিকাটির ঈদ সংখ্যা। যখন পড়তে শিখলাম তখন থেকে ছোট ছোট লেখা ও কবিতা পড়তে শুরু করলাম। এক সময় যখন ‘কিশোর বাংলা’ প্রকাশিত হলো তখন ‘বেগম’ এর পাশাপাশি ‘কিশোর বাংলা’ও রাখা শুরু হলো। সেই থেকেই পত্রিকা পড়া ও লেখার সাথে সংখ্যতার শুরু। ‘কিশোর বাংলা’ যদিও ছোটদের জন্য রাখা হতো কিন্তু সবাই ছিলেন এর পাঠক, বিশেষ করে আম্মা। আম্মার এতো বেশি পড়ার নেশা ছিল যে রান্না করার ফাঁকে ফাঁকেও দেখতাম বই পড়ছেন। এমন কি যখন বিদ্যুৎ ছিল না তখন সবাই ঘুমিয়ে পড়লে হারিকেন জ্বালিয়েও আম্মা বই পড়তেন যা স্মৃতিতে আবছা আবছা মনে পড়ে।
ক্লাশ সিক্স অথবা সেভেনে পড়াকালীন ছোট্ট একটা কবিতা লিখে বেশ আনন্দই উপভোগ করলাম। সেই থেকেই লেখালেখির শুরু। তবে প্রকাশ্যে নয়। অবসর সময় অথবা পড়ার ফাঁকে ফাঁকে লুকিয়ে কবিতা লেখার চর্চা চলতে থাকল। মা একদিন দেখতে পেয়ে খুবই আনন্দিত হলেন কিন্তু অতি উৎসাহিত করলেন না পাছে পড়ালেখার ক্ষতি হয়। আর বাবাকেতো জানতেই দেয়া হলো না কারণ লেখালেখি করতে গিয়ে পড়াশুনা ভেস্তে যাবে এই আশংকায় বাবা মনঃক্ষুন্ন হবেন তাই। তারপর দিন যায়, মাস যায়, বছর যায় এভাবেই চলতে থাকে। সরকারি মহিলা কলেজে অধ্যয়নরত অবস্থায় কলেজ ম্যাগাজিনে প্রথম প্রকাশিত হয় একটি গল্প ও একটি কবিতা। সেই থেকে ছোটগল্প লিখা শরু। ছাপার অক্ষরে নিজের প্রকাশিত লেখা দেখার অনুভূতি কেমন সেটা কেবলমাত্র লেখকই উপলব্ধি করতে পারেন আর কেউ নয়। ব্যস, এই প্রকাশিত লেখার উপলব্ধিটুকু হৃদয়ে ধারণ করে লেখালেখির প্লাটফর্মে থমকে গেল আমার লেখক সত্তা, ঘটে গেল বিরাট এক ছন্দপতন। তারপর সময়ের ট্রেনখানি প্রলম্বিত হুইসেল বাজিয়ে একেবেঁকে তার নিজস্ব সর্পিল গতিতে চলে গেল দূ...র, র...হু...দূ...র। আমি ঠায় দাঁড়িয়ে রইলাম সেই জায়গায় যেখান থেকে তাকিয়ে দেখতে দেখতে ট্রেনখানি ধীরে ধীরে আবছা হতে হতে এক সময় হারিয়ে গেল দৃষ্টির অন্তরালে আর আমি পরিণত হলাম ছোট্ট এক অসাড় বিন্দুতে।
তারপর অতিক্রান্ত হলো আরো কতদিন, কত মাস কত বছর। জীবন নামক বোধিকৃক্ষের শাখা থেকে খসে পড়ল অনেকগুলো পত্রপল্লব, হাওয়ায় উড়িয়ে নিয়ে গেল অজানা-অচেনা গন্তব্যে যেখান থেকে কোনদিন এই ঝরাপাতাগুলোকে ফিরিয়ে এনে আর জড়ো করা সম্ভব নয়। এলো কত বর্ষা, কত শরৎ, শীত-বসন্ত। বর্ষার রিমঝিম পদাবলী, শরতের শিউলি ঝরা ভোর, শিশির ভেজা ঘাসে পা ডুবিয়ে অভিসিক্ত হওয়া অথবা কাশফুলের উদ্দামনৃত্য অবলোকনে হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো অবচেতন মনে কখন যে গুমরে কেঁদে মরেছে টেরই পাইনি। কুয়াশাঢাকা হিম হিম শীতের স্বর্ণালী সন্ধ্যা, ফাগুনে কোকিলের উদাস করা কুহুতানের সাথে আগুনরাঙা কৃষ্ণচূড়া মনকে নিরবে-নিভৃতে রাঙিয়ে দিয়ে চলে যেতে লাগলো একান্ত সংগোপনে। হৃদয়ের ছোট্ট কুঠুরিতে কোথায় যেন এক হাহাকারের প্রতিধ্বনি অনুরণিত হতে লাগল প্রতিনিয়ত-এর নামই বুঝি লেখক সত্তা। যোগ-বিয়োগ, পূরণ-ভাগের নিয়মে জীবনে ঘটে গেল অনেক কিছু। একে একে মা-বাবাসহ পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে গেলেন অনেকে। হঠাৎ একদিন মনে হলো আমি কি আর কোনদিন লিখতে পারব না? তবে চেষ্টা করে দেখতে অসুবিধা কোথায়, যেমনটি ভাবা ঠিক তেমনি কাজ। মাকে নিয়ে লিখে ফেললাম অনেক কিছু। এবারে মনে হলো লেখাটি সিলেটের ডাকে পাঠিয়ে দিলে কেমন হয়? এবারও ভাবনা থেকে কাজ। পাঠিয়ে দিলাম সিলেটের ডাকে। এতদিন পর লিখা মনে হলো না প্রকাশ করার মতো হয়েছে। কিন্তু না আমাকে অবাক করে দিয়ে মহিলা সমাজে লেখাটি প্রকাশিত হয়ে পুনরুজ্জীবিত হলো আমার লেখক সত্তা এবং সেই থেকে আবার শুরু। আত্মবিশ্বাস আবারও দৃঢ় হলো। মনে হলো আমি পেরেছি এবং ইনশাল্লাহ পারব।
দৈনিক সিলেটের ডাক। সিলেটের বহুল পঠিত ও জনপ্রিয় একটি দৈনিক পত্রিকা। এক নামেই যার পরিচিতি। ‘বৃক্ষ তোমার নাম কি, ফলে পরিচয়’-এই কথাটি এখানে যেন যথাযথভাবেই প্রযোজ্য। বৃহত্তর সিলেটের প্রত্যন্ত অঞ্চলসহ এমন কোন জায়গা নেই যেখানে এই প্রতিকার পাঠক খুঁজে পাওয়া যাবে না। সপ্তাহের প্রতিদিন নিয়মিত বিভাগের রমরমা আয়োজন, বিশেষ বিশেষ দিবসে বিশেষ সংখ্যা ও মানসম্মত লেখা প্রকাশ ইত্যাদি মূলত এর প্রধান আকর্ষণ যা খুব কম পত্রিকায় বিদ্যমান থাকে। দেশে পত্র-পত্রিকার অভাব নেই ঠিকই কিন্তু আপন সুনাম অক্ষুন্ন রেখে গৌরবের সাথে দীর্ঘদিন কোন পত্রিকার টিকে থাকা খুবই দুর্লভ একটি বিষয়। এই ক্ষেত্রে সিলেটের ডাক খুবই ব্যতিক্রমী একটি পত্রিকার নাম। যদিও পত্রিকাটি স্থানীয় কিন্তু এর রূপজৌলুস ও মর্যাদা জাতীয় পত্রিকা থেকে কোন অংশে কম নয়। জনপ্রিয়তার দিক দিয়ে সিলেটের প্রথম সারির একটি পত্রিকা সিলেটের ডাক একথা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কোনকিছুর শীর্ষস্থানে পৌঁছাতে হলে এককভাবে বা সম্মিলিতভাবে হোক কঠোর শ্রম ও উন্নত মেধার দরকার। সিলেটের ডাকও এর ব্যতিক্রম নয়। সিলেটের ডাককে এই পর্যায়ে নিয়ে আসার জন্য রয়েছেন পত্রিকার সাথে সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞ ও দক্ষ কলাকুশলী। পত্রিকাটির সাফল্যের অগ্রযাত্রার পিছনে তাদের শ্রম ও মেধা যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে সেটা নিঃসন্দেহে একটি অনস্বীকার্য বিষয়।
সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে পত্রিকাটির ভূমিকা অসাধারণ। পত্রিকাটির অন্যতম আকর্ষণ হচ্ছে বিভিন্ন বিভাগ। পাঠকের চাহিদা পূরণের জন্য সপ্তাহের প্রতিদিন ভিন্ন ভিন্ন আমেজে বিভাগগুলিতে প্রকাশিত হয় চমৎকার সব লেখা যেখানে রয়েছে নবীন-প্রবীন লেখকের সমাহার। নতুন লেখকদের লেখা প্রকাশ করে অনুপ্রাণিত করার মাধ্যমে লেখার সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে পত্রিকাটির আরেকটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য। যার ফলে নবরূপে আত্মপ্রত্যয়ীভাবে প্রকাশ ঘটছে অনেক নবীন লেখকদের যা তথ্য প্রযুক্তির এ যুগে খুবই ইতিবাচক ও সম্ভাবনাময় একটি বিষয়। বিশ্বায়নের যুগে তথ্য প্রযুক্তির উৎকর্ষ সাধনের ফলে তরুণ সমাজ যখন দিকভ্রষ্ট হয়ে অন্তর্জালের মোহে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন নেশায় ও অপরাধ জগতে, চারিদিকে যখন বিভিন্ন ধরনের সামাজিক অপরাধ মহামারি আকার ধারণ করছে ঠিক তখন বিজ্ঞ ও বিশিষ্ট লেখকদের পাশাপাশি সাহিত্য জগতে নতুনদেরকে উৎসাহিত করার ক্ষেত্রে পত্রিকাটির ভূমিকা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। এর ফলে বেরিয়ে আসছে প্রতিভাবান অনেক নবীন লেখক যাদের মধ্যে অনেকে আবার জাতীয়ভাবেও স্বীকৃত।
সপ্তাহের প্রতিদিনের বিভাগগুলো আলাদা হওয়ার কারণে প্রতিটি বিভাগগুলোতে লেখকদের লেখা ভিন্ন ভিন্নভাবে উপস্থাপনের সুযোগ রয়েছে। মহিলা সমাজে নারী লেখকদের লেখার সুযোগ থাকার কারণে আত্মপ্রকাশ ঘটছে অনেক নারী লেখকের-তন্মধ্যে আমিও একজন।
মাঝে মাঝে মনে হয় আমার পাঠানো লেখাটি যদি সিলেটের ডাকে প্রকাশিত না হতো তাহলে হয়তো আমার আর কোনদিনই লেখালেখি হতো না। ইতি হতো আমার লেখক জীবনের, অপমৃত্যু ঘটতো আমার লেখক সত্তার। কিন্তু সেই মৃতপ্রায় একটি লেখক সত্তাকে পুনঃজাগ্রত করার জন্য সিলেটের ডাকের অবদান এক বাক্যে অনস্বীকার্য। সেই জন্যে কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ ডাকের নির্বাহী সম্পাদক লেখক, গবেষক পরম শ্রদ্ধাভাজন আবদুল হামিদ মানিক ভাই, তৎকালীন সাহিত্য সম্পাদক কবি আব্দুল মুকিত অপি ভাই সহ সংশ্লিষ্ট সকলের কাছে।
‘ঘড়ঃযরহম রং ঃড়ড়ষধঃব রহ ষরভব’-‘খুব দেরি বলে জীবনে কিছুই নেই’ এ কথাটা মনে প্রাণে ধারণ করে এরপর থেকে নিয়মিত লেখার প্রচেষ্টায় নিয়োজিত আছি। নিরন্তর প্রকাশিত হচ্ছে জাতীয় পত্রিকাসহ বিভিন্ন ম্যাগাজিন, ছোটকাগজ, স্থানীয় ও অনলাইন পত্রিকায়। সাথে রয়েছে অগণিত পাঠকের ভালোবাসা। লেখা পাঠের পর যখন অনেক বড় জ্ঞানী-গুণী সম্মানিত বিজ্ঞজনেরা ফোনে অথবা ক্ষুদেবার্তায় আমার মতো নগন্য এক লেখকের কাছে তাদের সুন্দর-সুন্দর মন্তব্য ব্যক্ত করেন সেই মুহূর্তে মাঝে মাঝে ভীষণ আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ি। মনে হয় প্রত্যাশার চেয়ে প্রাপ্তিটা হয়তো একটু বেশিই হয়ে গেল। ছোট্ট এই লেখক জীবনে তখন অপূর্ণতা বলতে কিছু আছে বলে আর মনে হয় না। এবং আমার এই আত্মকথনের একমাত্র কারণই হলো সিলেটের ডাক।
প্রায় সেই জন্মলগ্ন থেকেই পত্রিকাটির একজন একনিষ্ঠ পাঠক, ভক্ত এবং শুভাকাংখী। সেই সাথে বর্তমানে একজন লেখকও বটে! কোন ভাল লাগার জিনিস আরো সুন্দর হোক, ভাল হোক, উন্নত হোক এই প্রত্যাশা যে কেউ করতে পারে। তেমনি রয়েছে সিলেটের ডাকের প্রতিও। উন্নত তথ্য প্রযুক্তির কল্যাণে বিশ্ব এখন হাতের মুঠোয়। যুগের সাথে সামঞ্জস্য বজায় রেখে চলতে হলে সবকিছুরই পরিবর্তন, পরিবর্ধন, পরিমার্জন একান্ত আবশ্যক। অন্যান্য আকর্ষণীয় বিভাগগুলির সাথে তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক আরেকটি বিভাগ চালু করা, অনলাইনের ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো কাটিয়ে সার্বক্ষণিক অনলাইন সংস্করণের ব্যবস্থা করা, ভিতরের পাতা রঙিন করে ছবির সাথে লেখাগুলোকে আরো আকর্ষণীয় ও প্রাণবন্ত করে তোলা এবং বর্ধিত কলেবরে ঈদসংখ্যা প্রকাশ করে সিলেটের ডাককে পাঠকের কাছে যুগোপযোগীভাবে আরো গ্রহণযোগ্য করে তোলা এখন অনেকটা যুগ এবং সময়ের দাবি। সেই সাথে আরো যে বিষয়গুলি কর্তৃপক্ষের বিবেচনাধীন রাখা প্রয়োজন বলে মনে হয় সেগুলি হলো লেখক, পাঠক ও পত্রিকার মধ্যে মেলবন্ধন সুদৃঢ় রাখার লক্ষ্যে মাঝে মাঝে মত বিনিময়ের আয়োজন করা ও লেখকদের জন্য একটি সম্মানী ভাতার ব্যবস্থা করা।
দৈনিক সিলেটের ডাক-পাঠকের অন্তর বিকশিত করে যুগ যুগ বেঁচে থাক-১৮ জুলাই পাঠকপ্রিয় পত্রিকাটির ৩৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। সকল বাধা বিঘœ অতিক্রম করে কাল পরিক্রমায় এগিয়ে যাবে অনেক দূর। পাঠক হৃদয়ে স্থায়ী আসনের সাথে সাথে সংবাদপত্রের ইতিহাসেও স্বমহিমায় আপন স্থান দখল করে নেবে এই প্রত্যাশায় গৌরবময় এই শুভদিনে ডাক ও ডাক পরিবারের জন্য রইলো বৃষ্টি¯œাত একরাশ ফুলেল শুভেচ্ছা।
লেখক : গল্পকার, প্রাবন্ধিক

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT