ধর্ম ও জীবন

তাফসিরুল কুরআন

প্রকাশিত হয়েছে: ১৯-০৭-২০১৯ ইং ০০:৫৮:০২ | সংবাদটি ৯৯ বার পঠিত


সূরা : বাক্বারাহ
[পূর্ব প্রকাশের পর]
মু’জেযার অবস্থা এর বিপরীত। মু’জেযা প্রত্যক্ষভাবে আল্লাহ তা’আলার কাজ। এতে প্রাকৃতিক কারণের কোনো হাত নেই। ইবরাহীম (আ.) এর জন্যে নমরুদের জ্বালানো আগুনকে আল্লাহ তা’আলাই আদেশ করেছিলেন, ‘ইবরাহীমের জন্য সুশীতল হয়ে যাও।’ কিন্তু এতোটুকু শীতল নয় যে, ইবরাহীম কষ্ট অনুভব করে।’ আল্লাহর এই আদেশের ফলে আগুন শীতল হয়ে যায়।
ইদানিং কোনো কোনো লোক শরীরে ভেষজ প্রয়োগ করে আগুনের ভেতরে চলে যায়। এটা মু’জেযা নয়; বরং ভেষজের প্রতিক্রিয়া। তবে ভেষজটি অদৃশ্য, তাই মানুষ একে অলৌকিক বলে ধোকা খায়।
স্বয়ং কুরআনের বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায় যে, মু’জেযা সরাসরি আল্লাহর কাজ। বলা হয়েছেÑ
‘ওমা রামাইতা ইজ রামাইতা ওলাকিন্নাল্লাহা রা’মা।’ অর্থাৎÑ আপনি যে একমুষ্টি কঙ্কর নিক্ষেপ করেছিলেন, প্রকৃতপক্ষে তা আপনি নিক্ষেপ করেননি, আল্লাহ নিক্ষেপ করেছিলেন। অর্থাৎ, এক মুষ্টি কঙ্কর যে সমবেত সবার চোখে পৌঁছে গেল, এতে আপনার কোনো হাত ছিলো না। এটা ছিলো একান্তভাবেই আল্লাহর কাজ। এই মু’জেযাটি বদর যুদ্ধে সংঘটিত হয়েছিলো। রসুলুল্লাহ (সা.) এক মুষ্টি কঙ্কর কাফের বাহিনীর প্রতি নিক্ষেপ করেছিলেন যা সবার চোখেই পড়েছিলো।
মু’জেযা প্রাকৃতিক কারণ ছাড়াই সরাসরি আল্লাহর কাজ আর জাদু অদৃশ্য প্রাকৃতিক কারণের প্রভাব। এ পার্থক্যটিই মু’জেযা ও জাদুর স্বরূপ বোঝার পক্ষে যথেষ্ট। কিন্তু তা সত্ত্বেও এখানে একটি প্রশ্ন থেকে যায় যে, সাধারণ লোক এই পার্থক্যটি কিভাবে বুঝবে? কারণ, বাহ্যিক রূপ উভয়েরই এক। এ প্রশ্নের উত্তর এই যে, সাধারণ লোকদের বোঝার জন্যেও আল্লাহ তা’আলা কয়েকটি পার্থক্য প্রকাশ করেছেন।
প্রথমত : মু’জেযা ও কারামত এমন ব্যক্তিবর্গের দ্বারা প্রকাশ পায়, যাদের খোদাভীতি, পবিত্রতা, চরিত্র ও কাজকর্ম সবার দৃষ্টির সামনে থাকে। পক্ষান্তরে জাদু তারাই প্রদর্শন করে, যারা নোংরা, অপবিত্র এবং আল্লাহর যিক্র থেকে দূরে থাকে। এসব বিষয় চোখে দেখে প্রত্যেকেই মু’জেযা ও জাদুর পার্থক্য বুঝতে পারে।
দ্বিতীয়ত : আল্লাহর চিরাচরিত রীতি এই যে, যে ব্যক্তি মু’জেযা ও নবুওত দাবী করে জাদু করতে চায়, তার জাদু প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারে না। অবশ্য নবুওতের দাবী ছাড়া জাদু করলে, তা প্রতিষ্ঠা লাভ করে।
পয়গম্বরগণের উপর জাদু ক্রিয়া করে কি না? এ প্রশ্নের উত্তর হবে ‘ইতিবাচক’। কারণ, পূর্বেই বর্ণিত হয়েছে যে, জাদু প্রকৃতপক্ষে প্রাকৃতিক কারণের প্রভাব। পয়গম্বরগণ প্রাকৃতিক কারণের প্রভাবে প্রভাবান্বিত হন। এটা নবুওয়তের মর্যাদার পরিপন্থী নয়। সবাই জানেন, বাহ্যিক কারণ দ্বারা প্রভাবান্বিত হয়ে পয়গম্বরগণ ক্ষুধা-তৃষ্ণার কাতর হন, রোগাক্রান্ত হন এবং আরোগ্য লাভ করেন। তেমনিভাবে জাদুর অদৃশ্য কারণ দ্বারাও তারা প্রভাবান্বিত হতে পারেন। সহীহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত রয়েছে যে, ইহুদীরা রসুলুল্লাহ (সা.) এর উপর জাদু করেছিলেন এবং সে জাদুর কিছু প্রতিক্রিয়াও প্রকাশ পেয়েছিলো। ওহীর মাধ্যমে তা জানা সম্ভব হয়েছিলো এবং জাদুর প্রভাব দূরও করা হয়েছিলো। মুসা (আ.) এর জাদুর প্রভাবে প্রভাবান্বিত হওয়া কুরআনেই উল্লেখিত রয়েছেÑ জাদুর কারণেই মুসা (আ.) এর মনে ভীতির সঞ্চার হয়েছিলো।
শরীয়ত জাদু সম্পর্কিত বিধি বিধান :
পূর্বেই বর্ণিত হয়েছে, কুরআন ও হাদিসের পরিভাষায় জাদু এমন অদ্ভুত কর্মকা-, যাতে কুফর, শিরক এবং পাপাচার অবলম্বন করে জ্বিন ও শয়তানকে সন্তুষ্ট করে তাদের সাহায্য নেয়া হয়। কুরআন বর্ণিত বাবেল শহরের জাদু ছিলো তাই। -(জাস্সাস) এ জাদুকেই কুরআন কুফর বলে অভিহিত করেছে। আবু মনসুর (রহ.) বলেন, বিশুদ্ধ অভিমত এই যে, জাদুর সকল প্রকারই কুফর নয়; বরং যাতে ঈমানের পরিপন্থী কথাবার্তা এবং কাজকর্ম অবলম্বন করা হয়, তাই কুফর। (রূহুল আনী)
আয়াত দ্বারা বোঝা যায় যে, আপনার কোনো জায়েয কাজ থেকে যদি অন্যরা নাজায়েয কাজের আশকারা পায়, তবে সে জায়েয কাজটিও আপনার পক্ষ জায়েয থাকবে না। উদাহরণতÑ কোনো আলেমের কোনো জায়েয কাজ দেখে যদি সাধারণ লোকেরা বিভ্রান্ত হয় এবং নাজায়েয কালে লিপ্ত হয়, তবে সে আলেমের জন্য সে জায়েয কাজটিও নিষিদ্ধ হয়ে যাবে। তবে শর্ত এই যে, সংশ্লিষ্ট কাজটি শরীয়তের দৃষ্টিতে জরুরি না হওয়া চাই। কুরআন ও হাদিসে এর ভুরি ভুরি দৃষ্টান্ত রয়েছে।
[চলবে]

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT