ধর্ম ও জীবন

বন্যার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো ইবাদত

মুহাম্মদ মর্তুজা প্রকাশিত হয়েছে: ১৯-০৭-২০১৯ ইং ০০:৫৮:২৫ | সংবাদটি ১০৫ বার পঠিত

বৃষ্টি মহান আল্লাহর রহমত। এর মাধ্যমে জমিনের বুক চিরে সবুজ বৃক্ষের জন্ম দেন। পৃথিবীকে উপহার দেন নানা রকম ফল ও ফসল। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যে পবিত্র সত্তা তোমাদের জন্য ভূমিকে বিছানা এবং আকাশকে ছাদস্বরূপ স্থাপন করে দিয়েছেন, আর আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করে তোমাদের জন্য ফল-ফসল উৎপাদন করেছেন তোমাদের খাদ্য হিসেবে। অতএব, আল্লাহর সঙ্গে তোমরা অন্য কাউকে সমকক্ষ কোরো না। বস্তুত এসব তোমরা জানো।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২২)
কখনো কখনো এই বৃষ্টির মাধ্যমেই মহান আল্লাহ তার বান্দাদের পরীক্ষা করেন। টানা বৃষ্টির কারণে পানিবন্দি হয়ে পড়ে লাখ লাখ মানুষ। ঘরহারা, ভিটাহারারা আশ্রয় নেয় কোনো উঁচু স্থানে। আবার কাউকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় সাগর-নদীতে উঠে আসা রাক্ষুসে জোয়ার। মানুষের মাঝে বিরাজ করে আতঙ্ক। ক্ষুধা ও ধন-সম্পদ হারানোর গ্লানি। এ বিষয়ে পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, ‘নিশ্চয়ই আমি (আল্লাহ) তোমাদের ভয়, ক্ষুধা এবং ধন-সম্পদ ও ফল-ফসলের ক্ষয়ক্ষতি দিয়ে পরীক্ষা করব। (হে রাসুল!) আপনি ধৈর্যশীলদের শুভ সংবাদ প্রদান করুন।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৫৫)
গত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে বন্যার পানি। এর প্রভাবে দেশের অন্যান্য এলাকা থেকে যোগাযোগবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে পার্বত্য জেলা বান্দরবান। গত শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত নীলফামারীতে তিস্তা নদীর পানি বিপৎসীমার ২০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। যমুনার পানিবৃদ্ধির কারণে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে টাঙ্গাইলের একটি ওয়ার্ড। পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে গাইবান্ধার বিভিন্ন পয়েন্টে তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনায়। নেত্রকোনায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ। বন্যার প্রভাবে পাঠদান বন্ধ হয়ে গেছে দেড় শতাধিক স্কুলে। মেঘনার ভাঙনে বিলীন হয়ে যাচ্ছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরের চকবাজার। বিভিন্ন স্থানে বানভাসি মানুষ সীমাহীন দুর্ভোগে পড়েছে। সাঙ্গু নদ ও মাতামুহুরী নদীর পানি বেড়ে বিপদসীমার ৮০ থেকে ৯০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ভারি বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বন্যার কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক ও রেল যোগাযোগ ব্যাহত হচ্ছে। বন্যাদুর্গতদের জন্য দেশের বিভিন্ন এলাকায় খোলা হয়েছে আশ্রয়কেন্দ্র। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই অবস্থা।
এই বিভীষিকাময় পরিস্থিতির মাধ্যমে মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে পরীক্ষা করছেন। যারা বন্যায় আক্রান্ত তাদের পরীক্ষা করছেন ক্ষুধা, ভয় ও সম্পদহানির মাধ্যমে। আর আমাদের পরীক্ষা করছেন বন্যাকবলিতদের বিপদে আমরা কী পদক্ষেপ নিচ্ছি তা দিয়ে।
হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) সূত্রে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেন, ‘দয়াশীলদের ওপর করুণাময় আল্লাহ দয়া করেন। তোমরা দুনিয়াবাসীকে দয়া করো, তাহলে যিনি আসমানে আছেন তিনি তোমাদেরকে দয়া করবেন।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯৪১)
তা ছাড়া মহান আল্লাহ সমগ্র মুমিন জাতিকে এক দেহের মতো বানিয়েছেন। ফলে দেহের কোনো অংশ আক্রান্ত হওয়া মানে গোটা দেহ আক্রান্ত হওয়া। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘মুমিনদের উদাহরণ তাদের পারস্পরিক ভালোবাসা, দয়ার্দ্রতা ও সহানুভূতির দিক থেকে একটি মানবদেহের ন্যায়; যখন তার একটি অঙ্গ আক্রান্ত হয়, তখন তার সমস্ত দেহ ডেকে আনে তাপ ও অনিদ্রা।’ (মুসলিম, হাদিস : ৬৪৮০)
তাই আমরা আমাদেরই বন্যাকবলিত ভাই-বোনকে বিপদের মধ্যে রেখে স্বস্তিতে থাকতে পারি না। এটা মুমিনের বৈশিষ্ট্য নয়। আমাদের প্রত্যেকেরই দায়িত্ব বন্যাদুর্গতদের সাহায্যে এগিয়ে আসা। যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী চেষ্টা করা। তাদের জন্য প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী, খাদ্য, বস্ত্র, ওষুধ, খাবার স্যালাইন ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে তারা যেন পরিবার নিয়ে পর্দা রক্ষা করে নিরাপদে থাকতে পারে, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। এখনই তো সময় আখিরাতের জন্য বিনিয়োগ করার। মানুষের বিপদে এগিয়ে এসে তার জন্য খরচ করাকে মহান আল্লাহ বিনিয়োগ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এবং তা তিনি বহুগুণ ফেরত দেওয়ার ওয়াদা করেছেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর সালাত কায়েম করো, জাকাত দাও এবং আল্লাহকে উত্তম ঋণ দাও। আর তোমরা নিজদের জন্য মঙ্গলজনক যা কিছু অগ্রে পাঠাবে তোমরা তা আল্লাহর কাছে পাবে প্রতিদান হিসেবে উৎকৃষ্টতর ও মহত্তররূপে। আর তোমরা আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও। নিশ্চয় আল্লাহ অতীব ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৪৫)
উপরোক্ত আয়াতে আল্লাহকে ঋণ দেওয়ার অর্থ হলো তাঁর পথে খরচ করা। গরিব, অসহায় ও বিপদগ্রস্তদের সাহায্য করা। একে ঋণ বলা হয়েছে রূপকার্থে। কেননা এর বিনিময় দেওয়া হবে সওয়াবরূপে। অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, ‘নিশ্চয় দানশীল পুরুষ ও দানশীল নারী এবং যারা আল্লাহকে উত্তম করজ (ঋণ) দেয়, তাদের জন্য বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হবে এবং তাদের জন্য রয়েছে সম্মানজনক প্রতিদান। (সুরা : হাদিদ, আয়াত : ১৮)
তাই আসুন, আমরা প্রত্যেকেই যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী বন্যাদুর্গতের পাশে দাঁড়াই। জাতিকে এই মহাবিপদ থেকে রক্ষা করতে নিজেদের কৃত গুনাহ থেকে বেশি বেশি তাওবা করি। আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাওফিক দান করুন। আমিন।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT