ধর্ম ও জীবন

নারী জীবনে পর্দার গুরুত্ব

মাওলানা আব্দুল হান্নান তুরুকখলী প্রকাশিত হয়েছে: ১৯-০৭-২০১৯ ইং ০০:৫৯:২৪ | সংবাদটি ১৬৩ বার পঠিত

আল্লাহপাক অপূর্ব নৈপুণ্যে নারীর অবয়বে দৈহিকভাবে যে সৌন্দর্য, আকর্ষণ, লাজুকতা ও পবিত্রতার মহাসম্পদ দান করেছেন, সে মূল্যবান সম্পদকে অন্য পুরুষের কুদৃষ্টি, কুৎসিত কামনা-বাসনা এবং অশ্লীল ময়লা আবর্জনা হতে রক্ষা করার জন্য আল্লাহপাক একটি অনন্য বিধান দান করেছেন, সেই অনন্য ও সর্বজনীন বিধান হচ্ছে পর্দার বিধান। নারী পুরুষের অবাধ মেলামেশার কারণে সমাজ জীবনে যে অশান্তি ও অরাজকতা সৃষ্টি হয়, তা দূর করার জন্যই পর্দার বিধান। নারীর মান-সম্মান, ইজ্জত আবরু ও মর্যাদা রক্ষায় পর্দার গুরুত্ব অপরিসীম। নারীদেরকে পর্দার নির্দেশ দিয়ে আল্লাহপাক ইরশাদ করেনÑ ‘মুমিন নারীদেরকে বল, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে অবনত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হেফাজত করে। তারা যেন যা সাধারণত প্রকাশমান, তা ছাড়া (বাহ্যিক-আত্মিক) সৌন্দর্যগুলো প্রদর্শন না করে এবং তারা যেন তাদের মাথার ওড়না বক্ষ দেশে ফেলে রাখে’ (সুরা : নুর, আয়াত : ৩১)
অন্য আয়াতে ইরশাদ হচ্ছে ‘তোমরা (নারীরা) স্বগৃহে অবস্থান করবে। জাহেলী যুগের নারীদের মতো (বেপর্দাভাবে) নিজেদেরকে প্রদর্শন করবে না’ (সূরা : আহযাব, আয়াত : ৩৩)
আল্লাহপাক আরো ইরশাদ করেনÑ ‘হে নবী! তুমি তোমার স্ত্রীগণকে, কন্যাগণকে এবং মুমিনদের স্ত্রীগণকে বল, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের উপর (মাথা হতে মুখমন্ডলের উপর) টেনে দেয়, ইহাতে তাদেরকে চেনা দুষ্কর হবে; ফলে তাদেরকে উত্ত্যক্ত করা হবে না। আল্লাহ ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু’ (সুরা : আহযাব, আয়াত : ৫৯)
পর্দার বিধান আল্লাহপাক মানুষের সার্বিক কল্যাণের জন্যই উপহার প্রদান করেছেন। ইরশাদ হচ্ছেÑ এটা (পর্দার বিধান) তোমাদের ও তাদের অন্তরের জন্য অধিকতর পবিত্রতার উপায়’ (সুরা : আহযাব, আয়াত : ৫৩)
পর্দা প্রকৃতির একটি গুণ। প্রকৃতি নিজে এবং তার আশেপাশের সব কিছুই আপন আপন নিয়মে পর্দা করে থাকে। পাখিরা তাদেরকে ঢেকে রাখে ডানা ও পালক দিয়ে। বৃক্ষরাজি তাদের সৌন্দর্যকে ঢেকে রাখে ছাল ও লতাপাতার সাহায্যে। পর্দাই হচ্ছে প্রকৃতির বৈশিষ্ট্য। সুতরাং প্রকৃতিতে বেঁচে থাকতে হলে পর্দার কোনো বিকল্প নেই। কলা যতোক্ষণ খোসার আবরণে থাকে, ততোক্ষণই তার মূল্য থাকে কিন্তু খোসা ছিঁড়ে ফেললেই তা ডাস্টবিনের মাছির খাবারে পরিণত হয়ে যায়। পর্দাহীন নারীর অবস্থাও অনুরূপ। পর্দাহীনতার কারণেই এরা মূল্যহীন হয়ে পড়ে। নানা স্থানে এরা নির্যাতিত হয়ে থাকে। পক্ষান্তরে যারা ইসলামের পর্দার বিধান মেনে চলে, এসব নারীর বিয়ে সমস্যা, তাদের মুখে এসিড নিক্ষেপ বা তাদের চরিত্র হরণের চেষ্টা করা হয়েছেÑএমন নজির আমাদের সমাজে খুবই কম।
নারী জীবনে পর্দার গুরুত্ব অপরিসীম। ‘হেমলিয়ান স্ট্যানব্যারী’ নামক বিখ্যাত আমেরিকান অমুসলিম লেখিকা আরব বিশ্বে এক মাস অবস্থান করে মুসলিম সমাজ ব্যবস্থায় নারীর মর্যাদা ও ন্যায্য অধিকারে মুগ্ধ হয়ে যে বিবৃতি দিয়েছেন তাতে সমগ্র পশ্চিমা জগত কেঁপে উঠেছে। তিনি পরিস্কার ভাষায় বলেছেনÑ ‘মুসলিম সমাজ ব্যবস্থা একটি বিশুদ্ধ ও পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা। মুসলিম নারীরা দৈহিকভাবে ও আত্মিকভাবে স্বাধীন ও সুখের স্বর্গে বাস করেন। তাই পশ্চিমাদের উচিত, মুসলিম নারী-পুরুষের সুন্দর জীবন সংরক্ষণে পর্দার যে বিধান রয়েছে, কালবিলম্ব না করে দৃঢ়তার সাথে তা অবলম্বন করা। মুসলিম সমাজেই নারীদের পূর্ণ নিরাপত্তা ও পূর্ণ অধিকার দেয়া হয়েছে। তিনি আরো বলেনÑ মুসলিম সমাজের পর্দার বিধান ধর্ম, বর্ণ, দলমত নির্বিশেষে সর্বকালের সকল মানুষের জন্যই অত্যন্ত উপযোগী এবং সার্বিক কল্যাণকর।’ সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের সর্বশেষ প্রেসিডেন্ট মিখাইল গরভাচেভ রচিত ‘প্রেস্ত্রোইকা’ নামক প্রসিদ্ধ গ্রন্থের ‘স্টেটাস অব উমেন’ নারীর মর্যাদা বা নারীর স্থান শিরোনামে তিনি স্পষ্ট ভাষায় লিখেছেনÑ ‘আমাদের পাশ্চাত্যের পরিবেশে সমাজে নারীদেরকে নগ্নভাবে ঘর থেকে বের করে আমরা জীবিকা উপার্জনে উপকৃত হয়েছি বটে কিন্তু নারীদের পর্দাহীনতার কারণে আমাদের পারিবারিক শান্তি-শৃঙ্খলা যে নষ্ট হয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আমি ‘প্রেস্ত্রোইকা’ উৎপাদনের নামে সোভিয়েত ইউনিয়নে একটি আন্দোলন শুরু করতে যাচ্ছি, যার মৌলিক উদ্দেশ্য হলোÑ যেসব নারী পর্দাহীন হয়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেছে তাদেরকে ঘরে ফিরিয়ে এনে পারিবারিক ও জাতীয় জীবনে শান্তি স্থাপন করা’। পর্দাহীনতার কারণে ইউরোপ-আমেরিকার নারীদের অবস্থা অত্যন্ত করুণ। এক জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ১৬/১৭ বছর বয়সী প্রায় ৯৮% নারী অসতী। যারা চাকুরিজীবি নারী তাদের মধ্যে সৎ বা সতী কাউকে খুঁজে পাওয়া যায় না। কেউ সতী থাকলেও তারা তাদের পরিচয় গোপন রাখে। কারণ সৎ বা সতী নারী হিসাবে পরিচয় দেয়া তাদের সমাজে একটা লজ্জাজনক ব্যাপার। জনৈক ফরাসী দার্শনিক বলেন, পর্দাহীনতার কারণে ইউরোপ-আমেরিকার নারীদের অবস্থা এমন লক্ষ লক্ষ ডলার পুরস্কার ঘোষণা করেও ১৫/১৬ বছর বয়সের একজন সতী কুমারী খুঁজে পাওয়া যায়নি। পর্দাহীনতার কারণে ¯্রষ্টার শ্রেষ্ঠ সম্পদ নারী আজ পরিণত হচ্ছে লোভী-পাপী পুরুষদের একমাত্র ভোগের সামগ্রীতে। মিশরের প্রখ্যাত দার্শনিক আন্তর্জাতিক ইসলামী চিন্তাবিদ আহমদ আমীর ‘জুহুরুল ইসলাম’ নামক প্রসিদ্ধ গ্রন্থে লিখেছেন ‘পশ্চিমাদের নগ্ন সভ্যতায় এমন অমানবিক জীবন শুরু হয়েছে যে, স্বামী যখন কর্মস্থল থেকে ঘরে ফেরেন তখন তার সাথে থাকে এক যুবতী বান্ধবী। অনুরূপ স্ত্রীও যখন কর্মস্থল থেকে ঘরে ফেরেন তার সাথেও থাকে যুবক বন্ধু। ফলে স্বামী-স্ত্রীর দাম্পত্য জীবনের মধুময় ভালোবাসা ও প্রেমপ্রীতি নষ্ট হয়ে পারিবারিক জীবনে নেমে আসে অশান্তির বন্যা’। ইউরোপ-আমেরিকার নারীদের এই করুণ অবস্থা পর্দাহীনতারই ফল।
বিশ্ব আজ এমন এক বিপর্যয়ের সম্মুখীন যা ভাবতে গেলে গা শিউরে ওঠে। বিশ্বের অনেক দেশে আজ আধুনিকতার নামে নারী-পুরুষের যে অবাধ মেলামেশা আর উশৃঙ্খলতা ও নগ্ন বেহায়াপনা চলছে যেকোনো মানুষ তাকে সভ্যতার আচরণ বলবে না। বিশেষ করে পাশ্চাত্য দেশগুলোর দিকে তাকালে আমাদেরকে লজ্জা আর ঘৃণায় চোখ বন্ধ হয়ে যায়। এসব দেশের নারীদের দৈনন্দিন আচার-আচরণ, পর্দাহীনতা এবং নগ্ন পোশাকে বেহায়াপনা এতোই তীব্র যে, এদেরকে দেখলে আমরা অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হই। তারা সংস্কৃতির নামে আধুনিক ধারায় যেভাবে নাচছে গাইছে, বিনোদনে মেতে উঠেছে তা দেখে গোটা নারী জাতি আজ নৈতিক চরিত্র হারাতে বসেছে। এসব পর্দাহীনতার, নগ্নতা ও বেহায়াপনা কেবল নারীদের ধ্বংসই ডেকে আনবে। ইসলামই নারীর অধিকার সুনিশ্চিত করেছে। ইসলামই নারীকে দিয়েছে রাণীর অধিকার। নারী নির্যাতন বন্ধের জন্য, নারীদের ইজ্জত-আবরু রক্ষার জন্য ইসলামে পর্দার বিধান প্রবর্তন করা হয়েছে। নারীদের সৌন্দর্য প্রদর্শনের সর্বোত্তম অলংকার হচ্ছে পর্দা। পর্দা নারীত্বের অহংকার।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT