ধর্ম ও জীবন

আল্লামা মুশাহিদ বাইয়মপুরী (রহ.)

মুহাম্মদ আব্দুল গফুর শরিষপুরী প্রকাশিত হয়েছে: ১৯-০৭-২০১৯ ইং ০০:৫৯:৫১ | সংবাদটি ১৬৬ বার পঠিত

শায়খুল হাদীস আল্লামা মুশাহিদ বাইয়মপুরী এক মহাপুরুষ ছিলেন। তিনি স্বীয় ইলমে ওহীর শিক্ষা, বয়ান-বক্তৃতা, কিতাব রচনা ও আল্লাহ প্রদত্ত আধ্যাতিক শক্তি দ্বারা দ্বীন ইসলামের প্রতি মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছেন। তিনি ১৩২৭ হিজরীর মহরম মাসে জু’মার দিনে সিলেট জেলার কানাইঘাট থানার অন্তর্গত বাইয়মপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৩৯০ হিজরীর ঈদুল আযহার রাত্রি আড়াইটায় ৬৩ বৎসর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। এবারের ঈদুল আযহা অর্থাৎ ১৪৪০ হিজরীর ১০ই জিলহজ তাঁর ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী।
১৩৫৬ হিজরীর জমাদিউচ্ছানী মাসের ১২ তারিখে তিনি বিশ^ বিখ্যাত ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দারুল উলুম দেওবন্দ মাদ্রাসায় ভর্তি হন এবং রেকর্ড সংখ্যক নাম্বার পেয়ে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। দেওবন্দ হতে প্রত্যাবর্তনের পর সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা, গাছবাড়ী আলিয়া মাদ্রাসা, দারুল উলুম কানাইঘাট মাদ্রাসা, আসামের বদরপুর মাদ্রাসা এবং যুক্ত প্রদেশের রামপুর জামেয়া ইসলামিয়া মাদ্রাসায় ইলমে দ্বীনের খেদমত করেন। এ সব মাদ্রাসাগুলোতে শায়খুল হাদীসের পদে ইলমে হাদীসের দরস দেন।
১৯৬২ সালে তিনি পাকিস্তানের মেম্বার অব ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি (এমএনএ) নির্বাচিত হন। আরবী, বাংলা ও উর্দু ভাষায় তাঁর মূল্যবান অনেক গ্রন্থ রয়েছে। হাদীস, তাফসীর, তারিখ, ফেকাহ ইত্যাদি বিষয়ে তাঁর অগাধ পা-িত্য এবং দ্বীনদারী, তাকওয়া- তাহারত ও আধ্যাত্মিক সাধনায় উঁচু মাকাম রয়েছে। নি¤েœ কয়েকটি কাহিনী তাঁর উক্ত বিশেষণের স্বাক্ষ্য বহন করে।
তাঁর ইন্তেকালের সপ্তাহ দিন পর সিলেট শহরের জামে-মসজিদে এক শোকসভা অনুষ্ঠানে শায়খুল মাশায়েখ হাফিজ মাওলানা আব্দুল করিম শায়খে কৌড়িয়া (রহ.) বলেছেন, ‘সিলেট জেলায় যত আলিম রয়েছেন সবার ইলম একত্রিত করলে মাওলানা মুশাহিদ বাইয়মপুরী (রহ.) এর ইলমের সামনে এই বলা চলে যে, মাওলানার হাঁটু পানিতে সবাই সাতাঁর কাটতে পারবেন।’ তিনি বলেন, ‘একবার আমরা একত্রে হজে গিয়েছিলাম। সেখানে একদিন হরম শরীফের মসজিদে একজন বড় আলিম ওয়াজ করতে ছিলেন। মসজিদে অনেক বড় সভা ছিল। সেখানে আমি, মাওলানা মুশাহিদ (রহ.) এবং আমাদের দেশের নেতৃস্থানীয় কয়েকজন আলিম ছিলেন। ঐ মাওলানা আরবী ভাষায় বয়ান করছিলেন। তিনি ছিলেন শাফী মাযহাবের অনুসারী। কথা বলতে বলতে এক পর্যায়ে তিনি হানাফী মাযহাবের বিরুদ্ধে কী যেন একটা কথা বলে ফেলেন। সাথে সাথেই মাওলানা মুশাহিদ (রহ.) দাঁড়িয়ে গেলেন এবং ঐ মাওলানার কথার জবাব দিতে শুরু করলেন। এত সুন্দর আরবী ভাষায় কথা বলতে লাগলেন যেন একজন আরবী ভাষার লোক কথা বলছিল। প্রায় এক ঘন্টা শুধু হানাফী ফেকাহর প্রশংসা করে হানাফী ফেকাহকে সব ফেকাহর উর্ধ্বে স্থান দান করে বসেন। ঐ মাওলানা অবাক হয়ে গেলেন এবং মাওলানার কাছে হার মানতে বাধ্য হলেন।’
তার প্রিয় ছাত্র দারুল উলুম কানাইঘাট মাদ্রাসার মুদাররিস মাওলানা আব্দুল আলিম (রহ.) বলেন, হযরতুল উস্তাদ একদিন বূখারী শরীফ সম্পর্কে বলেন, ‘আমি বূখারী শরীফকে এত ভালোবাসার কারণ হচ্ছে, এক রাত্রিতে স্বপ্নে দেখি রাসুল (সা.) আমাকে বলছেন, কিতাব আনো, তোমাকে পড়াবো, আমি তখন আবুদাউদ শরীফ নিয়ে আসলাম, রাসুল (সা.) বললেন এটা নয়, আমার কিতাব আনো। আমি তখন বুখারী শরীফ নিয়ে আসলাম। রাসুল (সা.) বললেন, হাঁ এটা আমার কিতাব। ইহা পড়, আমি পড়লাম। রাসুল (সা.) আমাকে পড়ালেন।’
মাওলানা আলিম উদ্দিন আরো বলেন, ‘একবার দু’তিন দিন ছাত্রদের হাদীস পড়ানো বন্ধ করে তিনি স্বীয় কক্ষে দরজা লাগিয়ে শুধু কাঁদতেছিলেন। খাওয়াদাওয়া প্রায় বন্ধ ছিল। ছাত্ররা কাছে গেলে সরিয়ে দিতেন। দু’তিন দিন পর আবার পড়ানো শুরু করলেন। ছাত্ররা কারণ জানতে চাইলে উত্তরে বলেন, ‘দেখ আমি একটা বড় বেআদবী করেছিলাম। যার কারণে হুজুর (সা.) আমাকে ধমক দেন। তাই আমি দরজা বন্ধ করে কান্না কাটি করে সেটা মাফ করিয়েছি। বেআদবী হলো, তোমাদের হাদীস পড়াতে আবুহুরায়রা (রা.) এর নাম উচ্চারনের সময় ‘রাজি আল্লাহু আনহু’ বলি নাই। রাত্রে স্বপ্নে দেখি হুজুর (সা.) আমাকে বললেন তোমার মত একজন মুহাদ্দিস আমার এত সম্মানিত একজন সাহাবীর নাম আদবের সাথে নিতে পারলে না? এটা তো মোটেই সমীচীন নয়। প্রিয় ছাত্ররা দেখ এ রকম বেআদবী তোমরা কোনোদিন করোনা।’
বিশিষ্ট আলিমে দ্বীন মাওলানা আব্দুল করিম ছত্রপুরী (রহ.) একদিন স্বপ্নে দেখেন, ‘স্বয়ং রাসুল (সা.) আল্লামা মুশাহিদ বাইয়মপুরী (রহ.) এর কবরের সম্মুখে দাঁড়িয়ে জিয়ারত করছেন।’ (আল্লামা মুশাহিদ বাইয়মপুরী (রহ.) এর জীবন ও চিন্তাধারা )
আমি (লেখক) শায়খুল হাদীস আল্লামা নূর উদ্দীন আহমদ গহরপুরী (রহ.) কে একাধিক সভায় বলতে শুনেছি, ‘আমি (নূর উদ্দীন) সায়্যিদুল মুহাদ্দিসীন আল্লামা মুশাহিদ বাইয়মপুরী (রহ.) কে প্রশ্ন করেছিলাম, হযরত হাদীস সহীহ ও জয়ীফ কী করে নির্ণয় করি? তিনি উত্তরে বললেন, যদি হাদীসের পাঠদান কালে রাসুল (সা.) এর চেহারা হাস্যোজ্জ্বল দেখ, তাহলে হাদীস সহীহ। আর যদি মলিন দেখ তাহলে হাদীস জয়ীফ।’
সুবহানাল্লাহ! উনাদের মাকাম কত যে উঁচু। তাছাড়া কিতাব পড়াশোনা করা আল্লামা মুশাহিদ বাইয়মপুরী (রহ.) এর আত্মার প্রধান খোরাক ছিল। জীবনে বহু জায়গায় সফর করেছেন, তিন বার হজ করেছেন। যেখানেই বড় বড় কুতুব খানার সন্ধান পেয়েছেন, সেখানে গিয়ে কিতাব দেখেছেন। তাঁর ব্যক্তিগত বড় একটি কুতুবখানা ছিল। দিন রাত কিতাব পড়াশোনায় তিনি মগ্ন থাকতেন। আল্লাহ পাক তাঁকে জান্নাতে উচ্চ মাকাম দান করুন এবং আমাদেরকে তাঁর রূহানী ফয়েজ দিয়ে মুস্তাফিজ নসিব করেন। আমিন

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT