পাঁচ মিশালী

লজিং জীবন-৯

সৈয়দ আহমদ প্রকাশিত হয়েছে: ২০-০৭-২০১৯ ইং ০০:৪৭:২৯ | সংবাদটি ২৪৬ বার পঠিত

লজিং অভিভাবকের ভাতিজা আং ছত্তার যেদিন থেকে লন্ডনে (বৃটেন) পৌঁছালো সেদিন থেকেই আমি যতদিন তাদের বাড়িতে লজিং ছিলাম ততদিন (১৯৬৯-১৯৭৩) পর্যন্ত আমাকেই তাদের সকল চিঠিপত্রের আদান প্রদানসহ চিঠি লিখা ও পড়ে শুনানো ছিল আমার দায়িত্ব। প্রায় প্রতি সপ্তাহে একটি করে চিঠি লিখতে হতো। তাদের কথা ও বক্তব্যগুলো গুছিয়ে লিখে, তা আবার তাদেরকে পড়ে শুনানোর পর চিঠিগুলো গোবিন্দগঞ্জ পোস্ট অফিসে পোস্ট করা পর্যন্ত কাজটুকু আমাকেই করতে হতো। তখনকার সময় মোবাইলতো দূরের কথা সিলেট জিলা সদর ছাড়া আর কোথাও টেলিফোনের ব্যবস্থা ছিল না ফলে বিদেশ থেকে সরাসরি আত্মীয়-স্বজনের সাথে কথা বলার কোনো মাধ্যম ছিল না। যেহেতু লন্ডলী আব্দুস ছত্তার নিজেই লেখাপড়া জানতো না তাই প্রতি মাসে একটি চিঠি সেখানকার পরিচিত কারও কাছ থেকে লেখানোর পর পাঠাতেন, সেক্ষেত্রে চিঠি পাঠাতে দেরি হলে উনার মা এবং চাচি (শাশুড়ি) অত্যধিক চিন্তিত হতেন এবং আমাকে বারবার চিঠি আসতে দেরি হওয়ার কারণ জিজ্ঞেস করতেন এবং পোস্ট অফিসে খোঁজ খবর নিতে তাগিদ দিতেন। তখনকার সময় চিঠি আদান প্রদান ছাড়া আর কোনো যোগাযোগের মাধ্যম না থাকায় মায়ের যে কী আকুতি তা আমি তাদের মা ও চাচীর আহাজারিতে অনুভব করতাম। আসলে আমরা বড় হয়ে মা-বাবাকে কষ্ট দেই, তাদের কথা শুনতে চাইনা, মান্য করিনা, অশুভ আচরণ করি অথচ সন্তান যদি মায়ের চোখের সম্মুখ থেকে দূরে কোথাও যায় তখন মায়ের যে কি আকুতি, অনুশোচনা ও আহাজারি তা ভোক্তভোগী মা ছাড়া অন্য কেউ বুঝতে পারে না। চাতক পাখি যেমন পানি বা বৃষ্টির জন্য আকাশের দিকে চেয়ে থাকে তদ্রুপ মা সন্তানের ফিরে আসার জন্য ছটফট করতে থাকেন এবং রাতদিন সন্তানের মঙ্গলের জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে দোয়া করতে থাকেন। তাইতো বিশ্বনবী বলেছেন, ‘মায়ের পদতলে সন্তানের বেহেস্ত।’
আমার চাকুরি জীবনের একটি ঘটনা শুনে আমি নিজেই সেদিন পিতামাতার প্রতি শ্রদ্ধায় আপ্লুত হয়ে চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি। শিক্ষিত চাকুরীজীবী ছেলে তার স্ত্রী সন্তানকে নিয়ে কর্মস্থলে থাকেন এবং প্রতি মাসে পিতামাতার জন্য কিছু টাকা পাঠান। এক মাসে অভাবের তাড়নায় টাকা পাঠাতে দেরি হওয়ায় পিতা টেলিফোন করে ছেলের অসুবিধার কথা শুনে বলেছিলেন, ‘বাবা তোমার সংসারের সমস্যা বেশি থাকলে এখন নয়, যখন তোমার হাতে টাকা হবে তখন দিও, এখন কষ্ট করে টাকা পাঠানোর দরকার নেই। আমি ও তোমার মা সর্বদা তোমার জন্য দোয়া করছি। ইনশাল্লাহ অসুবিধা দূর হয়ে যাবে।’ ছেলে পিতার কথা শুনে কাঁদো কাঁদো স্বরে পিতাকে শান্তনা দিয়ে বলেছিল, ‘বাবা আমার মত শিক্ষিত চাকুরীজীবী ছেলে জীবিত থাকতে তোমরা টাকার জন্য না খেয়ে থাকবে তা হতে পারে না। আমি আজই অসুবিধা থাকলেও তোমাদের জন্য কিছু টাকা পাঠালাম।’ এ মাসে শেষ সম্বল কিছু টাকা ছিল তাও আজ পিতামাতার জন্য পাঠিয়ে সে ভীষণ চিন্তায় পড়ল মাসের বাকী দিনগুলো কিভাবে চলবে। কিন্তু পিতামাতার দোয়া যে সন্তানের জন্য আশীর্বাদ তা সে কিছুক্ষণ পর হাড়ে হাড়ে টের পেল। দুপুরের দিকেই একটি টেলিফোন রিসিভ করলে অপর প্রান্ত থেকে তাকে জানিয়েছিল ভাই আপনি গত মাসে আমাদের অফিসে যে কাজটি করেছিলেন সে কাজের কারণে মালিকের অনেক লাভ হয়েছে তাই মালিক খুশি হয়ে আপনাকে দশ হাজার টাকা দেওয়ার জন্য আমাকে বলেছেন, আপনি অনুগ্রহ করে বিকেলেই আমাদের অফিস থেকে টাকা নিয়ে যাবেন। হয়তো পিতামাতার দোয়ার বরকতেই মালিক আমাকে এতগুলো টাকা বকশিশ হিসাবে দিয়েছে ফলে আমার অভাবের খানিকটা পূরণ হয়েছে। লোকটি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেই কথাগুলো আমাকে বলেছিল।
লজিং অভিভাবক মরহুম হরমুজ আলীর ভাতিজা মোঃ আব্দুস ছত্তারকে লন্ডনে পাঠানোর পর হতে আমার চিঠি লিখা শুরু হয়েছিল। বড় ভাই আব্দুল জলিল, মা, চাচি ও চাচার নির্দেশক্রমে চিঠি লিখা, চিঠি পড়ার যে কি উৎকণ্ঠা ও আগ্রহ তা নিজে লিখে, পড়ে শুনিয়ে তাদের আগ্রহ উৎকণ্ঠার কথাগুলো অনুভব করেছিলাম। মা-বাবাসহ ভাইবোন, আত্মীয়-স্বজনদের কাছে চিঠির যেকি কদর ছিল তা-না দেখলে এখনকার প্রজন্মের যুবক যুবতীদের বিশ্বাস করাতো দূরের কথা অনুমান করাও কঠিন। তাছাড়া দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে সিলেট সদরে এসে টেলিফোনে সরাসরি যোগাযোগ ও কথা বলায় কি আগ্রহ ও হৃদয় বিদারক ঘটনা ঘটতো তা না দেখলে ভাষায় প্রকাশ করা নিতান্তই কঠিন। সে সময় আমি নিজে অনেক লন্ডনীর আত্মীয়-স্বজনকে বৃটেনে টেলিফোনে যোগাযোগ করানোর জন্য সিলেটস্থ সুরমা মার্কেটের পাশে অবস্থিত টিএন্ডটি এক্সচেঞ্জ অফিসে নিয়ে এসে আলাপ করানোর ব্যবস্থা করেছি, তা এখন শুধুই স্মৃতি।
রেজিস্টারী অফিসের বিপরীতে টিএন্ডটি অফিসে দিনরাত লাইন ধরে উৎকণ্ঠিত স্বজনরা তাদের ¯েœহাশীষ সন্তানের সাথে একটু সরাসরি কথা বলার সময় যে আবেগ আপ্লুত পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো দৃশ্যপটে না থাকলে তা অনুভব করা কঠিন এবং ভাষায় ব্যক্ত করা দুরূহ।
বর্তমান ডিজিটাল যুগের নেট দুনিয়ায় আগের মত চিঠি নিয়ে চালাচালি, দৌড়াদৌড়ি, ঠেলাঠেলি মারামারি নেই, নেই কবিতা, প্রবন্ধ, গান, গল্প ও প্রেম কাহিনী। এখন মোবাইল ফোনের মাধ্যমে, ইন্টারনেট, ই-মেইল, স্কাইপি, ফেইসবুক ও অনলাইনের মাধ্যমে ঘরে বসে মুখামুখী সরাসরি হচ্ছে যোগাযোগ, আলাপ আলোচনা, জটিল সমস্যার সমাধানসহ ব্যবসা বাণিজ্য ও উন্নত যোগাযোগ। শুধু তাই নয়, স্কাইপির মাধ্যমে হচ্ছে প্রেম বিনিময়, ভাব বিনিময়, মত বিনিময়, বরকন্যা দেখাশুনাসহ বিবাহ শাদি। প্রেম ভালোবাসাতো এখন সাধারণ ব্যাপার। যোগাযোগ সৃষ্টি হচ্ছে দেশ বিদেশের আবাল-বৃদ্ধ বণিতা সহ জাতিতে জাতিতে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন, প্রযুক্তির উৎকর্ষ সাধন, উন্নত প্রযুক্তির বিনিময় ও পৃথিবীকে টিকিয়ে রাখার সম্মিলিত প্রচেষ্টা এবং নিজেদেরকে উন্নত জাতি হিসাবে বিশ্বে পরিচিত করে তোলার স্বপ্রণোদিত প্রাণান্ত প্রয়াস ও প্রচেষ্টা।
১৯৭১ সাল ইতিমধ্যে আমরা ৮ম শ্রেণী থেকে ৯ম শ্রেণীতে উন্নীত হয়েছি। বছরের শুরু থেকেই আন্দোলন সংগ্রাম, হরতাল অবরোধ, ছাত্র ধর্মঘটসহ অসহযোগ আন্দোলনের কারণে তখনও সঠিকভাবে ক্লাশ করা সম্ভব হচ্ছিল না। বয়স, বুদ্ধি, দক্ষতা, সক্ষমতা ও আকৃতিতে পরিপক্ক না হলেও সকল ছাত্রদের সাথে ক্লাশ বর্জন করে মিটিং মিছিল ও আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলাম। মিটিং, মিছিল, বক্তৃতা ও শিক্ষকবৃন্দের নিকট থেকে আলোচনা সমালোচনা শুনে দেশ মাতৃকার জন্য হৃদয় মনে দেশাত্মবোধ সৃষ্টি হচ্ছিল। সেই দেশাত্মবোধ থেকেই সেদিন অত্রাঞ্চলের সচেতন ও স্বাধীনতাকামী সাধারণ মানুষদেরকে নিয়ে আমরা সারা দেশের ন্যায় বিক্ষোভে ফেটে পড়েছিলাম এবং স্বতঃস্ফুর্ত ও সর্বাত্মক হরতাল আন্দোলন চালিয়েছিলাম। সেদিন বাংলার প্রতিটি সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে এসে আমাদের সাথে মিছিলে যোগ দিয়েছিল। তখন দেশের আনাচে কানাচে আওয়াজ উঠেছিল, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’ ‘কিংবা ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা’, ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ ইত্যাদি নানা স্লোগান ও মিটিং মিছিলে ভরে গিয়েছিল বাংলার আকাশ বাতাস। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসটি ছিল এক অগ্নিঝরা মাস। এ মাসের প্রতিটা দিন যে কতটা উত্তাল ছিল আজ দীর্ঘ ৫০ বছর পর তা উপলব্ধি করা অসম্ভব ও কঠিন। প্রত্যক্ষদর্শীগণের মধ্যে যারা বিজ্ঞ, জ্ঞানী ও লেখক তারা নানা আঙ্গিকে কিছু কিছু প্রকাশ করেছেন অথবা কলম তুলিতে ধরে রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন। আমার ক্ষুদ্র প্রয়াসে মুক্তি পাগল ঐ মানুষগুলোর চেতনা ও বিশ্বাস আমার কৈশোর জীবনের দেখা ঘটনাবলীর স্মৃতিগুলো আজও অনুভূতিতে শিহরণ জাগায়। যা পরবর্তী সংখ্যায় প্রকাশ করতে চেষ্টা করব ইনশাল্লাহ।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT