পাঁচ মিশালী

‘গীতাধ্যান’ কাননে পুষ্পচয়ন

ডাঃ মৃগেন কুমার দাস চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ২০-০৭-২০১৯ ইং ০০:৫০:১২ | সংবাদটি ৯১ বার পঠিত

আমাদের পরমারাধ্যা মাতৃদেবী জীবন সায়াহ্নে বার্ধক্যভারে ও ¯œায়বিক দুর্বলতায় কাতর হয়ে পড়লে ক্রমে কন্ঠে আড়ষ্টতা প্রতিপন্ন হলে ভাই বোনেরা ¯েœহময়ী মায়ের অন্তিম সময় আসন্ন অনুভব করে শোককাতর মনে মাকে উনার পছন্দসহ খাবার আস্বাদনে পরিতৃপ্ত করার বাসনা পোষণ করলাম। দুর্বল দেহে মায়ের জ্ঞান ও বোধ শক্তি অবিচল। অধিক কথনে অনাগ্রহী ও দুর্বল শরীরে এর সায় পাচ্ছেন না। জননী ক্রোড়ে জন্ম নিয়ে ঈশ্বরের কৃপালব্ধ ইহলৌকিক জীবনে প্রবেশক্রম সংসার আবর্তের এ মুহূর্তে বিগলিত অন্তরের সে অনুভূতি প্রাণ জুড়ে আকুলতা সৃষ্টি করেছে। অনাগত মাতৃহীন জীবনের আকুলতা হৃদয়কে বিদীর্ণ করছে। মায়ের ক্ষরদেহ ক্রমে অনিত্য সংসারের বন্ধন মুক্ত হয়ে নিত্যলীলায় অক্ষর ব্রহ্মের সন্ধানে উন্মুখ। সেখানে ¯েœহমমতায় জড়ানো সন্তান বা ইহলৌকিক ভাবনা গৌন। মোহানূকারে বিধির অমোঘ পরিণতি বিন¤্র অন্তকরণে প্রজ্জ্বলিত হয়ে উঠে বাস্তবতার আলোক বর্তৃকায়। শ্রীমদ্ভাগবদগীতায় কুরুক্ষেত্র (কর্মক্ষেত্রে!) যুদ্ধের প্রাক্কালে অর্জুনের বিষাদ গ্রন্থ অন্তরে ভগবানের অশেষ করুণায় প্রোথিত হয়েছিল মোহমুক্ত বাস্তবতার বিমূর্ত উপলব্ধি। ভূমিষ্ট হবার পর ঈশ্বর প্রদত্ত মাতৃদুগ্ধ মুখে নিয়ে গড়ে উঠেছে অন্তময় জীবন। অযাজিত জননন্দিত গণসঙ্গীত শিল্পী ফকির আলমগীরের দরাজ কন্ঠে গীত- ‘মায়ের একধার দুধের দাম, কাটিয়া গায়ের চাম/ পাপোষ বানাইলেও ঋণের শোধ হবে না/ এমন দরদী ভবে কেউ হবে না, আমার মা-’ মন প্রাণকে সিক্ত করে তুলে। অন্তিমকালে মায়ের রসনা তৃপ্ত করার মনোবাসনা নিয়ে আমরা কাছে গিয়ে মাকে জিজ্ঞাসা করলে, ক্ষীণ কন্ঠে উত্তর এলো, ‘রাবড়ী’। ‘রাবড়ী’ সচরাচর বাজারে কিনতে পাওয়া যায় না, ঘরেও তৈরি হয় না। যাই হোক পরিমাণ মত মিষ্টি ও মুখরোচক উপাদান ঘন দুধে মিশিয়ে এতে খন্ড খন্ড দুধের সরের গাঢ় গাঢ় চাক চুপিয়ে সে সুস্বাদু রাবড়ী তৈরি করে মাকে খাওয়ানো হল। মা কতটুকু তৃপ্ত হলেন জানি না তবে আমরা পরম তৃপ্ত হয়েছিলাম মাকে রাবড়ী মুখে তুলে দিয়ে। দুধ, চিনি, সর ও চিনি এপর রাবড়ী, মা চিনালেন শোকময় মুহূর্তে সন্তানকে ক্ষণিক পরিতৃপ্তি প্রদানের ¯েœহময় অনুরাগে, কৃপাভরে।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ পরম করুণাভরে ইহজাগতিক মোহমুক্তির উদ্দেশ্যে জাগতিক শোকে শোকান্বিত কৃপাভিক্ষু সখা অর্জুনকে উপলক্ষ করে বিশ্বমানবতার উদ্দেশ্যে শ্রীমুখে উৎকীর্ণ করে গিয়েছেন সর্বজনীন সুনির্দেশনামূলক গীতার অমৃত বাণী। ‘পুরান মুনি’ (প্রাচীন মুনি) ‘বিশাল বুদ্ধি’ (মহাবুদ্ধিমান) বেদব্যাস কর্তৃক ঐ বাণী গ্রথিত হয়ে শ্রীমদ্ভগবদগীতা নামে বিশ্বে প্রচারিত হয়েছে। পরবর্তীতে মুদ্রাযন্ত্রের আবিস্কারের পর বিভিন্ন মনীষীদের চিন্তা চেতনা ও ভাষ্য সমৃদ্ধ গীতা গ্রন্থের বহুল প্রচারে পাঠক মন অনুরক্ত হচ্ছে। এর মধ্যে জ্ঞান তপস্বী পন্ডিত প্রবর মহানামব্রত ব্রহ্মচারীজী সংকলিত ‘গীতাধ্যান’ গ্রন্থখানি প্রায়োগিক বিশ্লেষক, বহুমাত্রিক চিন্তা ভাবনার সমন্বয়ক, প্রচলিত ভিন্নধর্মী মতাদর্শের দিশারী, ধর্মীয় ও সমাজ জীবনের সর্বজনীন ক্রিয়াকান্ডের পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের দ্যোতক হিসাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে সাধারণ পাঠকের অন্তরে। ‘গীতাধ্যান’ গ্রন্থখানা অসাম্প্রদায়িক ভাবাদর্শের স্বার্থক রূপায়ন ঘটিয়েছে। গীতা গ্রন্থ পাঠের সঠিক মূল্যায়ন বিবেচনায় চিন্তাধারায় পরিপক্কতা লাভে যে পর্যায়ে গীতাময় ভাবের জন্ম হয় সাধারণ পাঠকের অনেকে সে পর্যায়ে পৌঁছাতে সমর্থ হন না। মহানাম সহজ ভাষায় সে কথাটি গ্রন্থের প্রারম্ভে উপস্থাপন করে শ্লোক ভিত্তিক মূল গীতা শেষাংশে পরিবেশন করায় পাঠকের মূল গ্রন্থ পাঠের আগ্রহ সৃষ্টি হয়। পূর্বাংশ পাঠশেষে এর উৎসহ হিসাবে মূল গ্রন্থ পাঠে অনুসন্ধিৎসু বাসনা তীব্রতর হয়। গীতাধ্যান গীতা গ্রন্থে প্রবেশের পথে হাতছানি। মধুরম মধুরম। এরপরও গীতাধ্যানে প্রবেশের পথ সুগম করার মানসে মনোজ বিকাশ দেব রায় মহোদয়ের এ প্রয়াস ‘শ্রী মহানামব্রত অমিয়বাণী-১’ গ্রন্থ। ভক্ত মনে বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে জেগে উঠা দ্বিধা দ্বন্দ্বের প্রাবল্যে যে উদ্বেলতা সৃষ্টি হয় এর সাথে মহানামের কথা মিলায়ে গীতাধ্যানে প্রবেশের পথ অল্প আয়াসেই উন্মুক্ত হয়ে যায় অমিয়বানীর অনুসন্ধানে। দ্বিধাহীনভাবে বলা যায় সুযোগ্য শিষ্য তদীয় গুরুদেবের মনোভিলাষ পূরণে একটা সুচিন্তিত ও সফল চিন্তাধারায় সংযুক্ত হয়েছেন।
দুধ ও সরের মিশ্রণে সাধারণের ইন্দ্রিয় তৃপ্তির সহায়ক আরো উপাদেয়, আরো স্বাদু ‘রাবড়ী’র সন্ধান পাওয়া গেল মনোজ বিকাশ দেব রায়ের সংকলিত ‘শ্রীমহানামব্রত অমিয়বানী-১’ গ্রন্থে। ভক্ত মনের একাগ্র বাসনায়ই উন্মেষ ঘটে এমন সৃষ্টিশীল ধর্মপ্রবণতার। হৃদয়সঞ্জাত প্রেমভক্তিতে সিক্ত মনে ভগবানের ইচ্ছা চরিতার্থ করার বাসনার অঙ্কুরোদগম হয়। ভোগবাদী সংসারে নিমজ্জিত মানুষ ঈশ্বর কৃপায় রসনাতৃপ্ত ‘রাবড়ী’র স্বাদে প্রলুব্ধ হয়ে উপজীব্য সর এবং সরের সন্ধানে দুগ্ধরূপ মহান অমৃত গীতাতে (‘দুগ্ধং গীতামৃতং মহৎ’) নিজেকে নিবেদিত করার সৌভাগ্য লাভ করেন। ভক্তের মনের কথা মিশান মহানামের অমিয়বাণী নিয়ে সংকলিত মনোজ বিকাশ দেব রায়ের নিবেদিত গ্রন্থখানা পাঠকের হৃদয়তৃপ্ত ‘রাবড়ী’। সে ‘রাবড়ী’তে প্রলোভিত মন আত্মিক অনুরাগে আকর্ষিত হয়ে ‘ঘনীভূত সর’ ও পর্যায়ক্রমে ‘দুগ্ধ’ রূপ গীতামৃতের সন্ধান লাভ ঈশ্বরের কৃপাধন্য হবে। শ্রীমহানামব্রত অমিয়বাণী-১’ গ্রন্থের নামকরণে পরবর্তীতে বাণী সমৃদ্ধ আরো গ্রন্থ প্রকাশনার ইঙ্গিত রয়েছে। এই ইঙ্গিতের বাস্তবায়নে বাণীর অমিয়ধারা আরো সমৃদ্ধিশালী হয়ে ভক্তমনকে আকুলিত করবে সে প্রত্যাশা রাখি। গ্রন্থখানা পাঠক মনের আশা পরিপূরণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করুক তা কামনা করি।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT