পাঁচ মিশালী

অধ্যাপক আসাদ্দর আলী ও কিছু স্মৃতি

মাওলানা আব্দুল মালিক মোবারকপুরী প্রকাশিত হয়েছে: ২০-০৭-২০১৯ ইং ০০:৫০:৫৩ | সংবাদটি ১৮২ বার পঠিত

মৃত্যু হলো এমন অমোঘ সত্য, যার মধ্যে কোন প্রকার দ্বিধা-দ্বন্দ্ব নেই, কোন ইখতেলাফ নেই। সকলেই বিশ্বাস করে যে, মউত আসবেই। কিন্তু খুব স্বল্প সংখ্যক লোকই না বলে আসা এই মেহমানের মেজবানি এবং যথোপযুক্ত অভ্যর্থনা জানানোর প্রস্তুতি নেয়।
এ ব্যাপারে মরহুম আসাদ্দর আলী সাহেব ছিলেন ব্যতিক্রমধর্মী, তিনি ঐ স্বল্পসংখ্যক লোকের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন; যারা অনাকাক্সিক্ষত অবশ্যম্ভাবী আগন্তুক মৃত্যুদূতের মেজবানীর জন্য প্রস্তুতি নিতেন। এ কথা শুধু লিখে আমার ক্ষুদ্র চোখে স্বল্প সময়ে তার সাথে ওঠা বসার মাধ্যমে লব্ধ অভিজ্ঞতা। তাই আমরা দেখেছি মরহুম আসাদ্দর আলী সাহেব অতীব সাবধানী জীবন-যাপন এবং সতর্কভাবে জীবনের মুহূর্তগুলো ব্যয় করতেন। তিনি আজ আমাদের মধ্যে নেই। পরম সত্য মৃত্যু আমরা এবং তাঁর মধ্যখানে অলঙ্ঘনীয় প্রাচীর তৈরি করে দিয়েছে।
মউত মৃত এবং জীবিতদের মধ্যে প্রাচীর সৃষ্টি করে সত্য, কিন্তু মৃতের স্মৃতি, কর্ম তাঁকে জীবিতদের মনে জাগরুক রাখে। তাইতো জীবিতরা কখনো শোকে, কখনো কর্তব্যের খাতিরে, কখনওবা বিবেকের দায়বদ্ধতা থেকে মৃতের রেখে যাওয়া কর্মস্মৃতি আওড়িয়ে মনের প্রশান্তি লাভের চেষ্টা করেন। কেউ কেউ বলে থাকেন ‘ইয়াদ তেরী সাতায়েগী মুঝে হাশর তক’ অর্থাৎ তোমার স্মৃতি কাল-কালান্তর মহাপ্রলয় পর্যন্ত আমাকে আন্দোলিত করবে; তোমার কর্ম-স্মৃতির স্মরণ আমাকে মুহ্যমান এবং বিমর্ষ করতেই থাকবে। মরহুম আসাদ্দর আলীও এমন একটি নাম, এমন প্রতিষ্ঠান যার কর্ম, স্মৃতি, বন্ধু-বান্ধব, সহপাঠী এবং শুভাকাক্সক্ষীদের হৃদয়কে যুগযুগ আন্দোলিত করবে; তার বিয়োগ-ব্যথার অনল সকলকে দগ্ধ-বিদগ্ধ করবে।
বক্ষমান নিবন্ধে মরহুম আসাদ্দর আলী সাহেবের কর্ম বা জীবন, তার রেখে যাওয়া গবেষণা লব্ধ জ্ঞান ভান্ডারের মূল্যায়ন, আলোচনা করা উদ্দেশ্য নয়; আমার মত অতি ক্ষুদ্র এবং সীমাবদ্ধ মানুষের পক্ষে তা হবারও নয়; এটা লেখক গবেষকদের আলোচ্য বিষয়। আরবীতে একটি প্রবাদ আছে: ‘লি-কুল্লে ফান্নিন রিজাল; ওয়া-লি কুল্লে-মাক্বামিন-মাক্বাল’ অর্থাৎ প্রত্যেক বিষয়ের জন্যই তার যোগ্য লোক আছে এবং প্রত্যেক স্থান কাল পাত্র ভেদে উপযুক্ত কথা আছে। সুতরাং আমি মরহুমের পুণ্যস্মৃতির কিঞ্চিত আলোচনাই করবো।
প্রথমেই বর্ণনা দিচ্ছি তার কর্মনিষ্ঠা এবং গবেষণার স্বচ্ছতা সম্পর্কে। তিনি তার মূল্যবান গবেষণার মাধ্যমে সিলেটের ইতিহাস, কৃষ্টি, ঐতিহ্য, লোকসাহিত্যকে অত্যন্ত দুঃসাহসের সহিত দস্যুদল তথা গবেষণার নামে যারা এগুলো ছিনতাই করে নিয়ে যাচ্ছিল; তাদের কবল থেকে লুপ্ত প্রায় ইতিহাস-ঐতিহ্য, স্বাতন্ত্র্য এবং বীর গাঁথা উদ্ধার করেন। শুধু উদ্ধারই নয়, এগুলোর শক্ত ভিত দালিলিকভাবে গড়ে তুলেছেন। আসলে গবেষণা একটি কর্ম-চঞ্চল বিষয়। যেখানে নিজের মেধা-মনন, জ্ঞানকে অত্যন্ত সতর্কতা এবং সাবধানে পরিচালিত করে সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হতে হয়। এখানে প্রচুর লেখা-পড়ার প্রয়োজন পড়ে। সঠিক সিদ্ধান্তের জন্য দলিল-প্রমাণের প্রয়োজন প্রবলভাবে দেখা দেয়। এমনকি যারা ভুল লিখেছে তাও পড়তে হয় এবং কোথায় কী মৌলিক ত্রুটি এবং প্রমাণহীন উক্তি তা সপ্রমাণে উপস্থাপন করে তার প্রকৃত তথ্য-তত্ত্ব, উপাত্ত দলিল ভিত্তিক দাঁড় করাতে হয়। এই দুঃসাধ্য, কষ্টকর, নিষ্ঠা এবং একাগ্রতার কাজ অত্যন্ত সুন্দর এবং রুচিশীলভাবে করতে পেরেছেন যা তার কর্মনিষ্ঠার প্রকৃষ্ট প্রমাণ।
মরহুম আসদ্দর আলীর ঐ কাজগুলো উপন্যাস বা কল্পনারাজ্যে বিচরণ ছিলনা; ছিল ন্যায়-বিশ্বাস, সত্য এবং বাস্তবতার মূর্ত প্রকাশ। একজন সাধারণ লেখক কল্পনা জগতে ঘুরে বেড়াতে পারেন। কখনো আকাশে ওড়ে যাওয়া, কখনো বাতাসে চড়া, কখনো হিমালয়ের চূড়ায় পদচারণা করতে পারেন। কিন্তু প্রকৃত গবেষকরা সেটা পারেন না। তাই আমরা দেখি সিলেটের ঐতিহ্য ছিনতাইকারী বাতাসে ওড়ে চলা কথিত লেখকগণ মরহুম আসাদ্দর আলীর জ্ঞানলব্ধ গবেষণা দেখে মূক-বধিরের ন্যায় হতাশ হয়েছেন। শেষতক বাংলা একাডেমির পুরস্কার প্রাপ্তির মাধ্যমে তা রাষ্ট্রীয় এবং জাতীয় স্বীকৃতি লাভ করে। কবি আল মাহমুদের ভাষায়: ‘যারা আসাদ্দর আলীকে পুরস্কৃত করেছে তারা আসাদ্দর আলীর কেউ নয় বা পক্ষের লোক নয়। তাই আসাদ্দর আলী মরহুমের পুরস্কার প্রাপ্তি শুধু তার গবেষণার জন্যই।’
কবি আল মাহমুদ আরো বলেন, ‘আসাদ্দর আলীকে বাংলা একাডেমি পুরস্কৃত করে নিজেই সম্মানিত হয়েছে।’ বাংলা একাডেমি তাকে ‘পদক’ না দিলেও আগামী শতাব্দীতে অবশ্যই তাকে এই সম্মান দেয়া হত। কারণ আসাদ্দর আলীর গবেষণাকর্ম এর দাবীদার। (বক্তৃতা- ৩০/৬/০৫)
আমি লিখছিলাম মরহুম অধ্যাপকের কর্মনিষ্ঠা নিয়ে। তার গবেষণা ছিলো নিখুঁত ও সচ্ছ। তিনি তা কর্ম জীবনে দেখিয়ে গেছেন। তিনি অনেক আগে সিলেটের বিস্মৃত প্রায় একটি অধ্যায় নিয়ে গবেষণা কাজ শুরু করেন, বিষয়টি হল আরবি, ফার্সী ও উর্দ্দু চর্চায় সিলেটের অবদান। এই কাজটি করা উচিত ছিল সিলেটের আলেম-উলামাদের। কিন্তু আগেই বলেছি যে, গবেষণাকর্মে হাত দেয়া চাট্টিখানি কথা নয়; এ কাজে মনোনিবেশ করা দুঃসাহসিক ব্যাপার। এটা সকলের দ্ধারা হয় না। নিজে আলেম না হয়েও মরহুম আসাদ্দর আলী বৃহত্তর সিলেটের আরবী ফার্সী, উর্দুতে অবদান শীর্ষক স্বর্ণালী অধ্যায়টি উদ্ধার করতঃ জাতীয় ইতিহাসের ভা-ারকে সমৃদ্ধ করার প্রয়াস নেন। এ ব্যাপারে তাকে যারা বিভিন্নভাবে সহযোগিতা এবং তথ্য প্রদান করেন তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন গবেষক ও লেখক আব্দুল হামিদ মানিক। মানিক ভাইয়ের পরামর্শে অধ্যাপক সাহেব তার প্রাগক্ত বিষয়ের পা-ুলিপির আরবী- ফার্সী-উর্দ্দু অংশটুকু খুটিয়ে খুটিয়ে দেখে নিখুঁত এবং স্বচ্ছ করার দায়িত্ব আমার উপর অর্পন করেন। এই কাজটি অর্পন করতে যেয়ে মরহুম অধ্যাপক যে বিনয় এবং নির্মলভাবে অনুরোধ করেন, তা শব্দমালায় প্রকাশ করা যাবেনা। তা ছিল অনুপম নিখাঁদ এক ভঙ্গিমা, সে জন্য আমি নিজেই লজ্জিত হই। এবং কাজটি করে দেয়া যে তার প্রতি কোন করুণা নয় বরং কাজ করতে পারলে নিজেকে গৌরবান্বিত মনে করব তা বলে সান্ত¦না দেই। এ কাজ যে সকলের তা বলায় আনন্দিত হয়ে বললেন, তবুও তো আমার কাজে আপনার মূল্যবান সময় খরচ হবে!
মরহুমের আলাদা স্নেহ-মমতা আমার প্রতি ছিল। আস্থাও ছিল অনেক। প্রায়ই তিনি বন্ধু মহলে আমার মত নগন্যকে ‘এক তথ্যবোদ্ধা’ বলে পরিচয় দিতেন। এটা ছিল তাঁর হৃদয়ের উদারতা, অনুজদের প্রতি উৎসাহ প্রদানের অকপট আন্তরিক প্রচেষ্টা।
মানিক ভাইয়ের ইঙ্গিত ও প্রফেসর সাহেবের নির্দেশনা মোতাবেক যথারীতি পা-ুলিপির নির্দিষ্ট বিষয়াদি মনোযোগ দিয়েই দেখতে শুরু করি। কিন্তু তিনি যে, আরবী ভাষা মোটেও জানেন না, তা আমাকে বললেও এটাকে আমি তার বিনয় এবং উদারতা হিসাবেই বিশ্বাস করি। তাই পা-ুলিপির আরবী, ফার্সী উর্দু স্থানগুলোতে প্রুফের ভুল-ত্রুটি যা ধরা পড়েছে তা সরাসরি কাট- ছিট না করে লাল কালি দ্বারা রেখা টেনে রাখি এবং পৃষ্ঠা-পৃষ্ঠা করে পৃথক একটি তালিকা তৈরী করে কিভাবে শুদ্ধ তা লিপিবদ্ধ করে দেই। সরাসরি এত বড় মাপের একজন মনীষীর লেখাকে কেটে দেয়া শালীনতা বিবর্জিত মনে করেই এটা করেছিলাম। তাই পা-ুলিপি তাকে দেয়ার সময় 'অশুদ্ধ' এবং বিশুদ্ধ সংবলিত তালিকাটিও দিয়েছিলাম। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে পুরো বিষয়টি আমি তাকে বুঝাতে অক্ষম ছিলাম; তার উপর ঐ তালিকাটিও হারিয়ে যায়। পরবর্তীতে ঐ পা-ুলিপিটি গবেষক আবদুল হামিদ মানিক ভাইকে দেখান। মানিক ভাই প্রুফের ত্রুটি বিচ্যুতি ভুল-ভ্রান্তি দেখে বলে দিলেন, ‘মাওলানা মোবারকপুরী মনযোগ দিয়ে এগুলো দেখেননি, নতুবা আরবী ‘বাকুরাহ’ শব্দকে প্রুফে ‘বাক্বারাহ’ লেখা হয়েছে, এর মর্ম-অর্থ মোবারকপুরীর নিকট দুর্বোধ্য নয়; তিনি অবশ্যই ঠিক করে দিতেন।’ আর যায় কোথায়? তিনি আমার উপর মনোক্ষুণœ হয়ে রইলেন এবং সাথে সাথে এই বিষয়টির কাজ বন্ধ করে দিলেন। অনেক দিন পর আমাকে বললেন যে, ‘দুঃখের বিষয় হলো আরবী-ফার্সী-উর্দুর ‘আ’, ‘উ’-ও জানিনে! আপনাকে দিলাম ঠিক করার জন্যে তাও করলেননা’-! ভুল ছাপিয়ে বা অ-স্বচ্ছ উদ্ধৃতি দিয়ে কী লাভ হবে? আকাম থেকে নাকাম ভাল’......। আমি স্বলজ্জ মুচকি হাসি দিয়ে ঘটনা খুলে বলি এবং তাকে আশ্বস্ত করি যে, সকল কিছুই ঠিক আর আরবী, ফার্সী এবং উর্দু অংশ অস্বচ্ছ; কাজ শুরু করুন। আপনার সামনে বসে এবং কম্পিউটারে আমি নিজে গিয়ে তা যথাসাধ্য ‘সহীহ’ করে দেব। ইনশাআল্লাহ! এ কথা শুনে যেন তিনি হারানো মানিক কুড়িয়ে পাওয়ার আনন্দে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুললেন।
এরপর থেকে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে বইটির কম্পোজ শেষ হয়। এ সময় তিনি এমন বিনয় এবং মমতা দিয়ে আমাকে বরণ করতেন যেন তিনি কৃতজ্ঞ। আমি বরাবরই তাকে বলতাম এ কাজ ছিল আমার
আপনি করছেন, তাই যথাসম্ভব সহযোগিতা করতে পারা আমার সৌভাগ্য এবং দায়মুক্তি বলে মনে করি।
শেষতক কাজ সমাধা হলো। কিন্তু জীবনমৃত্যু নিয়ে তিনি খুবই চিন্তিত ছিলেন। তিনি আমাকে মৃত্যুর কিছু দিন আগেও বলেছিলেন যে, ‘আমার জীবনে হয়তো আমাদের উলামাদের এই অবদান বিষয়ক রচনার প্রকাশনা হবে না। জানিনা আল্লাহর কী ইচ্ছা?’
বাস্তবিকই সকল দিক থেকে সবকিছু প্রস্তুত কিন্তু তিনি এর প্রকাশনা দেখে যেতে পারেন নি। ফারসীতে একটি প্রবাদ আছে, ‘কলন্দর হরচে গোয়েদ দিদাহ গোয়েদ’ অর্থাৎ সূফী সাধক (কলন্দর) যা বলেন তা' দিব্যি চোখে দেখেই বলেন। তিনি ছিলেন সাবধানী, নির্ঝঞ্ঝাট নীরব একজন বিপ্লবী খোদাভীরু মানুষ।
হাদীস শরীফে আছে তোমরা মউতকে অধিক হারে স্মরণ করো। মরহুম অধ্যাপক মৃত্যুকে তার সঙ্গী মনে করতেন। মৃত্যুকে স্বাগতম জানানোর জন্য ছিলেন সদাপ্রস্তুত৷ এমনকি বাংলা একাডেমি পুরস্কার আনার আগের রাতেও ঢাকা থেকে আমার সঙ্গে মোবাইলে অনেক্ষণ আলাপ হয়েছে৷ তিনি (আগামীকাল) বাংলা একাডেমি পুরস্কার আনতে যাবেন। এজন্য খুবই আনন্দিত। সে সময়েও বললেন- ‘মারা যাবার আগ মুহূর্তে এই পুরস্কার পেলাম! আমি তাকে আরো দীর্ঘজীবী হবেন বলে আশান্বিত করার বৃথা চেষ্টা করি। উত্তরে বললেন, আমার শরীরের খবর আমি জানি৷ এই ছিল তার মৃত্যু এবং জীবনের হিসাব। যে মানুষ মৃত্যুকে এতো নিকটে দেখেন, তিনি পাপ কাজে লিপ্ত হবেন তা কল্পনাও করা যায় না।
তিনি সব সময়ই নির্ঝঞ্জায় চলাফেরা করতেন। সাবধানতা ছিল তার সঙ্গী। তাই চলার সময় রিক্সাভাড়া কোথায় গেলে কত দিতে হয়? এই পরিমাণ টাকা তার নিকট ভাংতি থাকতো। যাতে ভাংতি নিয়ে কোন ঝামেলা না হয়।
আরবী, ফার্সী, উর্দু প্রুফ দেখতে অথবা আলোচ্য বিষয়ে কোন মতবিনিময় বা আলোচনার প্রয়োজন হলে এই হীনজনের নিকট মোবাইলে অথবা নিজে এসে সময় নির্ধারণ করতেন। আমি বরাবরই তাকে বলেছি আপনি বয়স্ক, মুরব্বী, আমি নিজেই আসব। বেশ! আরো ঝামেলা! তিনি মেহমানদারী যা' মুমিনের একটি বিশেষগুণ তা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেলেন। কী খাব? রুচি কী? ইত্যাদি নানা প্রশ্ন। যখন বলি আমি এই পর্বটা শেষ করেই আসব। কিন্তু অতিথিপরায়ণ আসাদ্দর আলী তা মেনে নিতেন না। তিনি বলতেন আপনি শুধু আপনার পানের থলি নিয়ে আসবেন। আমার এখানে পানে অভ্যস্ত কেউ নেই এবং ঘরে পানও নেই।
প্রফেসর আসদ্দর আলী সাহেবের অন্যান্য গুণাবলীর মধ্যে বন্ধু-বান্ধব, পরিচিত জন এবং আত্মীয় স্বজনের খবর রাখা, তাদের সুখদুঃখে খোঁজ নেয়া ছিল অন্যতম। যা একটি ঈমানী গুণ। অধ্যাপক আসাদ্দর আলীর দাদীর বংশীয় এক চাচাতো ভাই- ওই বছর হজ্বে (২০০৫ ইং) যান। তার শারীরিক এবং আর্থিক অবস্থা তেমন ভাল ছিল না। প্রফেসর সাহেব পবিত্র মক্কায় তার ঠিকানায় প্রায় প্রতিদিন টেলিফোনে করে খবর নিতেন। আমি যাওয়ার সময় মক্কাতে উনার ঠিকানা এবং ফোন নাম্বার দিয়ে কিছু নগদ টাকা প্রদান করে বলেন- উনি আমার নিকটাত্মীয়। আপনি কষ্ট করে তাকে গিয়ে দেখবেন এবং ঐ টাকা দিয়ে তার জন্য কিছু ফলমুূল কিনে নেবেন।
ব্যক্তিগত জীবনে অধ্যাপক আসাদ্দর আলী ইসলামী অনুশাসনের প্রতি ছিলেন বেশ অনুরাগী। একবার খেতে বসে সোপ দেখে জিজ্ঞেস করা শুরু করলেন৷ বললেন যে, এতে এক প্রকার ‘ফ্যাট’ থাকে। এই ফ্যাট হালাল কি হারাম কিছুই জানা নেই; তাই আমি ‘চিকেনসোপ’ খাইনে। এই ধরনের সতর্কতা এবং পরহেজগারী ছিল তার ধর্ম।
এখানে নির্ভরযোগ্য একজন ব্যক্তির স্বপ্ন দিয়ে ইতি টানছি। যদিও স্বপ্ন কোন দলিল নয়, তবুও তা সুসংবাদ বহনকারী৷ একজন আলেম স্বপ্নে অধ্যাপক আসাদ্দর আলীকে দেখলেন নয়াসড়ক মসজিদে এসে বসে আছেন। ইমাম সাহেব তাকে জিজ্ঞাসা করলেন যে, আপনি নিজে মারা গেছেন? এখানে আসলেন কিভাবে? উত্তরে তিনি বললেন, আল্লাহর হুকুমে আসছি। দু'টি কথা বলার জন্য। তা হল ‘কবর’ খুবই ভয়ানক জায়গা এবং বেহেশতে যাওয়া এত সহজ নয়। পরে আরো অনেক আলোচনার পর বললেন যে, আল্লাহ পাক আমাকে দয়া এবং মায়া করেছেন।’ সত্যিই! আমরাও আশা রাখি দয়া ও মায়ার। আরো আশা রাখি আল্লাহ পাক যেন মরহুম অধ্যাপক আসাদ্দর আলীকে মাফ করে তার মুরতবা বাড়িয়ে দেন।
বাহ্যিকভাবে মরহুম আসাদ্দর আলী যেভাবে থাকতেন শ্বেত-শুভ্র ভূষণে, তেমনিভাবে এর প্রভাবও পড়েছিল তার অর্ন্তলোকে। তার জীবনে নামাজ ছিল অন্তরের প্রশান্তি। যে দিন তিনি মারা যান সেই দিন ফজরের নামাজ কাজিটুলা মসজিদে জামাতের সহিত আদায় করে মসজিদে বসে হাদীস শুনেন। ইমাম সাহেবকে অনুরোধ করেন যে, মৃত্যু বিষয়ে হাদীস ক্বোরআনের আলোকে আলোচনা করতে৷
ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন দরগাহে শাহ জালাল (রহ.) মসজিদের ইমাম মাওলানা আকবর আলী সাহেবের মুরীদ। যাবতীয় ভ-ামী, কু-প্রথা, কু-সংস্কৃতি থেকে ছিলেন মুক্ত। তার একমাত্র মেয়ের বিবাহের একটি আলাপ এক পাত্রের পক্ষ থেকে আমি উত্থাপন করলে তিনি বলেন, ‘পাত্র যদি সত্যিকার নামাজী বলে আপনি জানেন, তবেই আলাপ করব.......’।
যাক মরহুম আসাদ্দর আলীর স্মৃতি অনেক। যদিও তিনি আজ আমাদের মধ্যে নেই। তবুও তার মহান কীর্তি, বর্ণাঢ্য জীবনের অনেক স্মৃতি বন্ধু-বান্ধব হিতৈষীদের হৃদয়ে তাকে যুগ যুগ স্মরণীয় করে রাখবে। তার আত্মার শান্তি ও মাগফেরাত কামনা করি।
লেখক : শায়খুল হাদীস, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT