সাহিত্য

শামসুল করিম কয়েস : জীবন ও সাহিত্য

জামান মাহবুব প্রকাশিত হয়েছে: ২১-০৭-২০১৯ ইং ০০:৪৪:৩৯ | সংবাদটি ৮৭ বার পঠিত

তখন আমি বাংলাদেশ শিশু একাডেমি সিলেট জেলা শাখার জেলা সংগঠক (জেলা শিশুবিষয়ক কর্মকর্তা) পদে কর্মরত। জাতীয় শিশু পুরস্কার প্রতিযোগিতার বিভাগীয় পর্যায়ের আয়োজন নিয়ে একবার খুব ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছি। হঠাৎ শামসুল করিম কয়েস অফিসে এসে হাজির। সামনের চেয়ারে বসে পায়ের উপর পা তুলে ফস্ করে একটা সিগারেট ধরিয়ে গম্ভীরভাবে বললেন: ‘তোর বিরুদ্ধে আমার একটা অভিযোগ আছে।’ হাতের কাজ টেবিলেই পড়ে রইল। আতংকিত হয়ে বললাম: ‘কোনো পত্রিকায় কি আমার বিরুদ্ধে কিছু ছাপা হয়েছে?’ কয়েস ভাই অম্লান বদনে বললেন ‘ছাপা হয়নি, এবার হবে।’ খানিকটা আশ্বস্ত হয়ে বললাম: ‘অভিযোগটা কী, একবার শুনি!’ কয়েস ভাই দারুণ গম্ভীর হয়ে বললেন; ‘শিশু একাডেমির নানা অনুষ্ঠানে জেলা ও বিভাগীয় প্রশাসনের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক, সাংবাদিকসহ তাবৎ গুণীজনেরা আমন্ত্রিত হয়ে মঞ্চ আলোকিত করে থাকেন, কিন্তু তুই আজ পর্যন্ত আমাকে একটা বক্তৃতা দেওয়ারও সুযোগ দিলি না! আপন চাচাতো ভাই হয়ে তুই এমন বৈষম্য করতে পারলি? অন্য কেউ হলে এতোদিনে আমি নির্ঘাত একটা মামলাই ঠুকে দিতাম।’
আমি হাসতে হাসতে বললাম: ‘খেলাঘরের সাপ্তাহিক সাহিত্য আসরের সেই ঘটনা আমি কিন্তু একদম ভুলিনি!’ জোঁকের মুখে চুন পড়লে যেমনটি হয়, কয়েস ভাইয়ের মুখ তেমনি চুপসে গেল। হঠাৎ ব্যস্ততা দেখিয়ে বললেন; ‘অফিসে একটা জরুরি মিটিং আছে, এক্ষুণি উঠব।’ কয়েস ভাই বাংলাদেশ বেতার সিলেট কেন্দ্রের সহকারী আঞ্চলিক পরিচালক। ব্যস্ততা থাকতেই পারে। বললাম: ‘চা দিতে বলি?’ দ্রুতলয়ে বললেন: ‘না, না, কাজ আছে।’
কয়েস ভাই আমার কক্ষ থেকে আস্তে আস্তে বেরিয়ে গেলেন। সেদিকে তাকিয়ে আমি ফিরে গেলাম ১৯৬৯ সালে। কয়েস ভাই তখন বিএ পরীক্ষার্থী। লিখছেন দু’হাতে। নিয়মিত লেখা বেরুচ্ছে দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক পাকিস্তান, আজাদ, সংবাদ, পূর্বদেশ, লাল সবুজ, জনপদ, আল আমিন, চট্টগ্রামের দৈনিক পূর্বকোণ, আজাদী, ঢাকার বিচিত্রা, রোববার, বেতারপরিক্রমা, মাসিক কচি ও কাঁচা, নবারুণ, খেলাঘর এবং সিলেটের সাপ্তাহিক যুগভেরী, জনশক্তি, দেশবার্তা প্রভৃতি পত্রপত্রিকায়।
ঠিক এ সময়ে আমি ঢাকায় বেড়াতে গেছি। দিনটি ছিল রোববার। দুপুর গড়িয়ে বিকেল। গুলিস্তানে হাঁটছি, হঠাৎ কয়েস ভাইয়ের সাথে দেখা। কোনো কথা নেই। আমাকে বগলদাবা করে নিয়ে চললেন বংশাল রোডে দৈনিক সংবাদ কার্যালয়ে। পুরাতন ভবন। দেওয়ালের পলেস্তরা খসে খসে পড়ছে। ভয়ে ভয়ে দোতলায় খেলাঘরের অফিসকক্ষে ঢুকলাম। নিচে সাদা ধব্ধবে কাপড় বিছিয়ে বসে আছেন জনাপঞ্চাশেক তরুণ লেখক-লেখিকা। মধ্যমণি খেলাঘর আসরের পরিচালক ‘ভাইয়া’ বজলুর রহমান (সাংসদ মতিয়া চৌধুরীর প্রয়াত স্বামী)। পাশে আলী ইমাম, মশউদ্-উদ-শহীদ, মুনা মালতী, আখতার হোসেন, সালেহ আহমদ, আহমদ আনিসুর রহমান, খালেক-বিন-জয়েনউদ্দিন, ভবেশ রায়, শাহাদাত হোসেন বুলবুল, জাকির হোসেন, তারেক শামসুর রহমান প্রমুখ। কয়েস ভাইকে দেখে সবাই হইচই করে উঠলেন। ভাইয়া বললেন: ‘আজকের সাপ্তাহিক সাহিত্য আসরের সভাপতি আমাদের সিলেটের বন্ধু শামসুল করিম কয়েস।’ কয়েস ভাই মিন্মিনে গলায় আপত্তি জানালেন। কে শোনে, কার কথা! কয়েস ভাইকে জোর করে মাঝখানে সভাপতি হিসেবে বসিয়ে দেওয়া হলো। অনেকের স্বরচিত ছড়া ও কবিতা পাঠের পর আমিও কাঁপা কাঁপা গলায় একটা গল্প পড়লাম। পঠিত লেখাগুলোর ওপর আলোচনা চলছে। হঠাৎ দেখা গেল, সভাপতির আসন শূন্য। এখানে-ওখানে বিস্তর খোঁজাখুঁজি। না, নেই। সভাপতি শামসুল করিম কয়েস কোথাও নেই। লজ্জায় আমার মাথা হেঁট হয়ে গেল।
সাহিত্যসভা শেষে রাস্তায় নেমে দেখি, একটা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে কয়েস ভাই সিগারেট ফুঁকছেন আর হাত ইশারায় আমাকে ডাকছেন। নিকটবর্তী হতেই বললাম: ‘এরকম পাগলামির কোনো মানে হয়?’ কয়েস ভাই নির্লিপ্ত কন্ঠে বললেন: ‘পনেরো মিনিট বহু কষ্টে, ধৈর্য ধরে বসেছিলাম, সেই ঢের!’
পরদিন খেলাঘরের সাহিত্য-পাতায় ঘটনার রসালো বিবরণ দিয়ে প্রতিবেদন বেরুল। শিরোনাম ‘খেলাঘরের সাপ্তাহিক সাহিত্যসভা অনুষ্ঠিত: সভাপতি পলাতক!’ তখনকার সময়ে এ ঘটনা দেশজুড়ে কিশোর-তরুণ লিখিয়েদের মধ্যে দারুণ চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল। কয়েস ভাই রাতারাতি ‘বিখ্যাত’ হয়ে উঠলেন।
বাংলাদেশ বেতার সিলেট কেন্দ্রের তেতলায় নামাজের কক্ষ। কেন্দ্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সচরাচর নিজেদের মধ্য থেকেই একজনকে ইমাম মেনে নামাজ আদায় করেন। একদিন জোহরের নামাজের সময় ইমামতি করার জন্য সহকর্মীরা কয়েস ভাইকে সামনে ঠেলে দিলেন। কয়েস ভাই অভ্যস্ত নন। তাই প্রবল আপত্তি তুললেন। কিন্তু তাঁর আপত্তি ধোপে টিকল না। নামাজ শুরু হলো। কিন্তু সেজদায় যাওয়ার পর অনেকক্ষণ কাটল, কয়েস ভাইয়ের সাড়াশব্দ নেই। একজন ধৈর্যচ্যুত হয়ে মাথা উঁচু করে দেখেন, সামনে ফাঁকা। কয়েস ভাই উধাও। এরকম বহু বিচিত্র কাহিনি কয়েস ভাইয়ের জীবনকে ঘিরে ঘটেছে।
আমার কাছে অবাক লাগে, যিনি আপাদমস্তক খামখেয়ালি, চঞ্চল, ধৈর্যহীন, আড্ডাবাজ, আমোদপ্রিয় এবং হালকা মেজাজি, কী করে তিনি ৩৩টি বইয়ের প্রণেতা হলেন? তা-ও নানাবিষয়ক রচনা! শামসুল করিম কয়েস একাধারে শিশু সাহিত্যিক, গল্পকার, কবি, ছড়াকার, সম্পাদক, গবেষক এবং বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের অনুমোদিত গীতিকার। একজন অনুসন্ধানী গবেষক হিসেবে তিনি ‘বাংলা সাহিত্যে সিলেট’ গ্রন্থের বারোটি খ-ে প্রাচীন যুগ থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত ৩৬৪ জন সাহিত্যসাধকের জীবন ও সাহিত্য যেভাবে তুলে ধরেছেন, তা অত্যন্ত দুরূহ ও শ্রমসাধ্য। ড. জফির সেতুর ভাষায়, ‘গবেষণাকর্মটি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে একটি বিকল্প পাঠ হিসেবেই গণ্য করা যায়।’ (ভূমিকার বদলে ॥ শামসুল করিম কয়েস রচনাসমগ্র)
বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী শামসুল করিম কয়েস ১৯৫০ সালের ১ জানুয়ারি দরগাহ্ মহল্লায় জন্মগ্রহণ করেন। পৈত্রিক নিবাস সিলেট সদর উপজেলার কান্দিগাঁও ইউনিয়নের সুরমা নদী তীরবর্তী গ্রাম দর্শা। মরমি কবি হাফিজ মোহাম্মদ হাতিম চৌধুরীর প্রপৌত্র, শামসুল হাসান চৌধুরি ও কমরুন্নেছা দম্পতির একমাত্র সন্তান শামসুল করিম কয়েসের শিক্ষাজীবন শুরু হয় দরগাহ জালালিয়া পাঠশালায় (বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়)। ১৯৬৫ সালে সিলেট সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি, ১৯৬৭ সালে সিলেট এমসি কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ১৯৬৯ সালে সিলেট সরকারি কলেজ থেকে তিনি বিএ পাশ করেন। ১৯৭৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর শামসুল করিম কয়েস বাংলাদেশ বেতার সিলেট কেন্দ্রে অনুষ্ঠান প্রযোজক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৯০ সালে অনুষ্ঠান সংগঠক হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন। ২০০৭ সালের ১ জানুয়ারি সহকারী আঞ্চলিক পরিচালকের পদ থেকে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। তাঁর গোটা কর্মজীবন কেটেছে বাংলাদেশ বেতারে।
শামসুল করিম কয়েসের বিচিত্রমুখী প্রতিভার স্বাক্ষর রয়েছে তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থসমূহে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে- ১. ঠোকাঠুকি ২. কিছু রোদ্দুর কিছু ছায়া ৩. সুরমা নদীর সবুজ তীরে ৪. অন্তরঙ্গ আলোকে মাহমুদ হক ৫. চোখের ভেতর ছায়া ৬. জীবনশিল্পী দিলওয়ার ৭. গল্প থেকে নাটক ৮. বাংলা সাহিত্যে সিলেট (১২ খ-) ৯. মরমি কবি হাফিজ মোহাম্মদ হাতিম চৌধুরী ১০. মরমি কবি রকীব শাহ ১১. রব্বানী চৌধুরী ও তাঁর সাহিত্যকর্ম ১২. বিদগ্ধ বিচিন্তা (সম্পাদিত) ১৩. মরমি কবি শিতালং শাহ ১৪. কবি প্রজেশকুমার রায় ১৫. সৈয়দ মুজতবা আলীর বৈচিত্র্যময় সাহিত্য ভুবন ১৬. ফুলের রাজা ১৭. অ ঝযধফড়ুি গবসড়রৎ (‘চোখের ভেতর ছায়া’র ইংরেজি অনুবাদ) ১৮. গিন্নি সমাচার ও অন্যান্য এবং বৃহৎ চারখ-ে শামসুল করিম কয়েস রচনাসমগ্র।
বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে শামসুল করিম কয়েসের পদচারণা শুরু হয় একজন সমাজ সচেতন ছড়াকার হিসেবে। ছড়ার ছন্দে তিনি যখন বলেন- ‘কোথাও একটা কাজের আগে/দিতেই হবে ঘুষ,/ নইলে মামা কাজ করে না,/ থাকে না তাঁর হুশ। ... ’ তখন আমাদের বর্তমান সমাজ জীবনের নিরেট বাস্তবতার প্রতিচ্ছবিই দেখতে পাই। তেমনি তাঁর ব্যঙ্গাত্মক ছড়ায় উৎসারিত হয় প্রচ- শ্লেষ- ‘ছাগল দিয়ে করলে জমি চাষ/ ধানের মাঠে ফলবে বরুয়া বাঁশ। ... ’ শামসুল করিম কয়েসের বিশেষত্ব এখানেই।
কবি দিলওয়ার ছড়াকার হিসেবে তাঁকে ‘রঙ্গরসের তিরন্দাজ’ বলে অভিহিত করেছেন। প্রফেসর নন্দলাল শর্মা বলেছেন, ‘তাঁর ছড়ায় কেবল শব্দ ও ছন্দের দ্যোতনাই নয়, সমাজ চেতনাও লক্ষণীয় (শামসুল করিম কয়েস, জীবন ও সাহিত্য)।’ তবে শামসুল করিম কয়েস ছড়ায় শেষপর্যন্ত স্থিত হননি। তাঁর প্রতিভা ছিল বহুমুখী। প্রফেসর ড. আব্দুর রহিম বলেন, ‘সাহিত্যের বহু আঙ্গিনা তাঁর পদচারণায় মুখর হলেও মূলত বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রেই তাঁর অবদান সবচেয়ে বেশি।’ গবেষক আবদুল হামিদ মানিক বলেন, ‘লেখালেখিতে তিনি হিসাবি এবং সুপরিকল্পিত কাজে নিমগ্ন। সাময়িক দৃষ্টি কাড়ার পরিবর্তে তিনি স্থায়ী প্রকৃতির লেখালেখিতেই বেশি মনোযোগী।’
সমাজসেবায়ও শামসুল করিম কয়েসের আগ্রহ ও অবদান ছিল। তাঁর পৈত্রিক নিবাস সিলেট সদর উপজেলার সুরমা নদী তীরবর্তী গ্রাম ‘দর্শা’-র চৌধুরি বাড়ির পারিবারিক উদ্যোগে নিজস্ব ভূমিতে গড়ে উঠেছে ‘মাশুক বাজার’। এ ছাড়া বাড়ির চৌহদ্দীতে জামে মসজিদ, হাফেজ মোহাম্মদ হাতিম চৌধুরী ইসলামিয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসা এবং আজিজুন্নেছা জেনারেল হাসপাতাল। সম্পূর্ণ পারিবারিক উদ্যোগ ও অর্থানুকূল্যে গড়ে-ওঠা এসব স্থাপনা প্রতিষ্ঠা এবং উন্নয়নে শামসুল করিম কয়েসের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকা রয়েছে।
২০১৯ সালের ২৩ জুন রোববার সকাল ৭টা ৫০ মিনিটে ৬৯ বছর বয়সে শামসুল করিম কয়েস শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। নশ্বর পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেও তিনি যে অক্ষয়কীর্তি রেখে গেছেন, তা তাঁকে স্মরণীয় করে রাখবে।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT